সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮

মোটিভিশান : শাহানারা পারভীন শিখা


প্রকাশিত:
১০ জুন ২০২১ ১৩:৩৯

আপডেট:
১০ জুন ২০২১ ১৩:৪০

ছবিঃ শাহানারা পারভীন শিখা

 

নিলা এই মধ্যবয়সে এসেও সমানভাবে উচ্ছল। বিশেষ করে প্রকৃতির কাছে গেলে হারিয়ে ফেলে নিজেকে।
এক ছুটির দিনে ছেলে নূহাস আর স্বামী পলাশকে নিয়ে পরিচিত একদলের সাথে মাওয়া ফেরীঘাটে বেড়াতে যায়। এই বর্ষায় প্রমত্তা পদ্মার ভয়ংকর রূপ দেখতে। ফেরীঘাটে পৌঁছে নিলার সে কি আনন্দ! ফেরীঘাটের পল্টুনে উঠে আসে ওরা। ফেরী তখনও ঘাটে এসে পৌঁছেনি। নদীর পানি পল্টনে এসে ঠেকেছে।
প্রচন্ড স্রোত নদীতে।
পলাশ ছেলের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেছে। পল্টুনের পানিতে পা ডুবিয়ে ছেলেকে নদী দেখাচ্ছে।
নদীর বিভোরতায় ডুবে আছে নিলা। পল্টুনের উপরে পানি মনে করে আনন্দ উচ্ছ্বাসে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সামনে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের নিমেষে ঘটে যায় ঘটনা। নদীতে পড়ে যায় নিলা। প্রচন্ড স্রোতে ভেসে যেতে থাকে সে।
নিমিষেই ঘটে যাওয়া ঘটনায় নিলা বুঝে যায় কি ঘটতে চলেছে তার জীবনে। এক মুহূর্তের অসচেতনতায় ভয়াবহ ঘটনায় পড়ে গেছে সে। তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে যেতে শুধু এটুকুই তার চোখে পড়ে, খয়েরী রঙের গেঞ্জি পরা পলাশকে নদীতে ঝাপিয়ে পড়তে।
এরপর চোখ বন্ধ করে নিলা। মনে সাহস ধরে রাখে। বাঁচার সম্ভাবনা হয়তো নেই। তাই বলে নিজের কাছে কিছুতেই হারবে না সে। হাত পা ছুড়াছুড়ি কিংবা চিৎকার চেচামেচি কিংবা আর্তচিৎকার কোনটাই করে না সে। ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়। মাঝে মাঝে শুধু দুহাত উঁচু করে নাড়াতে থাকে। দিনের বেলা। পাশ দিয়ে যাওয়া কোন নৌকার কারো যদি চোখে পড়ে সেই ভরসায়। শরীরটাকে যথাসম্ভব হালকা করে স্রোতে ভেসে যেতে থাকে। তবুও চোখ খোলে না। মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। হঠাৎ নিলার মনে হয় স্রোত ওকে এবার কুলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
দুহাত তুলে নাড়াতে থাকে। চোখ বন্ধ অবস্থায় নিলা বুঝতে পারে কেউ ওর দুহাত ধরে টেনে তুলছে।
চোখ মেলে তাকায়। নৌকার মানুষগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। হালকা হাসি দিয়ে উঠে বসতে চায় নিলা। কেউ একজন বলে,আপা। আল্লাহ আপনার সহায় ছিল বলে এমন স্রোতেও আপনি তলিয়ে যাননি।
নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসছেন আপনি।
নৌকা থেকে নেমে আসে নিলা। শরীরের ক্লান্তি এখন বেশ বুঝতে পারছে। এটাও একটা ঘাট। কিন্তু আগের টার মত না।চারপাশে তাকায়। চেনা কাউকে চোখে পড়ে না। সামনে কয়েকজন ছেলে মেয়েকে দেখতে পায়। ওদের মতো এরাও হয়তো বেড়াতে আসছে এখানে। কাছে যেয়ে পলাশের কথা জিজ্ঞেস করে। নামকরা মানুষ। চিনবে হয়তো। একটা মেয়ে বলে, হ্যা আন্টি চিনি উনাকে। পলাশের নাম্বারটা দেয় নিলা। ফোন করে একটু জানিয়ে দিতে বলে ওর কথা। এবং এই জায়গায় আসার কথা বলতে বলে। একটা বেঞ্চে বসে পড়ে।
মেয়েটা কিছু জিজ্ঞেস করে ওকে। কথা বলতে ইচ্ছে করেনা ওর।
বেশ কিছু পরে চোখ মেলে তাকায়। দেখে সামনে দাড়িয়ে পলাশ। উদভ্রান্ত চেহারা। দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। উঠে দাঁড়ায় নিলা। একহাত দিয়ে পলাশের গাল ছুঁয়ে দেয়। বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে দুজন।
একটু স্বাভাবিক হয়ে পলাশ বলে, চল ঐদিকে। পোলাপানগুলো ডুবুরির সাথে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তোমাকে খুঁজতে। পলাশের হাতে হাত ধরে চলতেই,
-এই নিলা! ওঠো তাড়াতাড়ি। হাঁটতে যেতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।
চোখ মেলে তাকায় নিলা।
কোথায় ফেরীঘাট! ওতো বিছানায় শুয়ে আছে। এখনো ভোরের আলো ঠিক মতো ফোটেনি।
এতোক্ষণ তাহলে সে স্বপ্ন দেখছিল।
হ্যা! নিলা এতোক্ষণ একটা স্বপ্ন দেখছিল। পরিস্কার সেই স্বপ্ন। স্বপ্ন হলেও পুরো ঘটনার মধ্যে একটা বিষয় খুব পরিস্কার। সেটা হচ্ছে তীব্র স্রোতের মধ্যে নদীতে পড়ে যাওয়ার পরেও নিলার বেঁচে ফেরা।
কিভাবে সম্ভব হয়েছিল সেটা?
নিলার মনোবল। হ্যা নিলা ভয়াবহ সেই বিপদের মুখেও নিজেকে সুস্থির রাখতে পেরেছিল। চিৎকার চেচামেচি কিংবা হাত পা ছুড়াছুড়ি করেনি সে।করলে তলিয়ে যেতো কিছু সময়ের মধ্যে।
সে নিজেকে শুধু ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দিয়ে বসে ছিল তা কিন্তু নয়। সেই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও নিজেকে স্থির রাখতে পেরেছিল। কোনরকম দুশ্চিন্তা মনে এনে মনোবল নষ্ট করেনি।শরীরটাকে একদম হালকা করে রেখেছিল পানিতে। এই কারণে সে তলিয়ে যায়নি। বেঁচে ফিরতে পেরেছে সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে।
এই স্বপ্নের কথা শুনে আমার যেটা মনে হলো, আমরা যদি কোন বড় বিপদে পড়ি।তাহলে অযথা টেনশন না করি।অস্থির না হয়। বরং ধীর স্থির ভাবে সেই বিপদের মোকাবেলা করি। নিশ্চয়ই সময়ের সাথে সাথে সেই বিপদ থেকে আমরা অবশ্যই মুক্তি পাবো। বিপদে আমরা ধৈর্যহারা না হয়ে বরং ধৈর্য নিয়ে বিপদের মোকাবিলা করবো।



শাহানারা পারভীন শিখা
কবি এবং লেখক 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top