সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮

পূর্ববঙ্গের জ্ঞান চর্চা ইতিহাসের নীরব স্বাক্ষী: নর্থব্রুক হল : সোনিয়া তাসনিম খান


প্রকাশিত:
১৬ জুন ২০২১ ১৫:৪৪

আপডেট:
১৬ জুন ২০২১ ১৫:৫০

ছবিঃ নর্থব্রুক হল

 

বাংলায় উপনিবেশিক শাসনামল জারি থাকবার সময় ধর্ম নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান ও ভবনগুলোর মাঝে ঢাকার ফরাশগঞ্জের লাল কুঠির নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। সুডৌল প্রমত্তা বুড়িগঙ্গার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যের শহর ঢাকার ওয়াইজ এলাকায় এক বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই লাল রঙা সুদৃশ্য ভবনটি এখনও অনায়সে সকলের দৃষ্টিগোচর হয়। এটি “নর্থব্রুক হল” নামেও পরিচিত। ভবনটির কাছের যে সড়কটি চলে গিয়েছে তাকে আজও এই নর্থব্রুক হলের নামানুসারে “নর্থব্রুক হল রোড” বলা হয়ে থাকে।

ইতিহাসে বর্ণিত, ১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় বা গভর্নর থমাস জর্জ ব্যারিং এবং (১৮৭২-১৮৭৬) নিযুক্ত ভাইসরয় জেনারেল লর্ড নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে স্মরণীয় করে রাখবার জন্য ঢাকার প্রমুখ প্রখ্যাত ব্যক্তি ও জমিদারবর্গ “টাউন হল” ধাঁচের এই হলটি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাদের মাঝে প্রগতিশীল চেতনার ধারক রাজা রায় বাহাদুরের অবদান বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। ১৮৭৯ সালে তিনি এবং অন্যান্য জমিদার ও কতক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এটি নির্মাণে প্রত্যেকেই ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান করেছিলেন। উক্ত কমিটির সচিব হিসেবে তখন দায়িত্ব পালন করেছিলেন অভয় চন্দ্র দাস। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালের ২৫শে মে ঢাকার কমিশনার এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। জানা যায়, সেই সময় আগত কমিশনার এবং অতিথিদের আপ্যায়ন ও আনন্দ প্রদাণ করবার জন্য ঢাকার তৎকালীন নবাব আব্দুল গণির অর্কেস্ট্রাকে নিয়ে আসা হয়েছিল।

“নর্থব্রুক” মূলত একটি ইন্দো- সারাসেন ভবন যাতে মুঘল ও ইউরোপিয়ান রেনেসাঁর স্থাপত্য শৈলীর সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। এটির উত্তরদিকের প্রবেশ পথে অর্ধাবৃত্তাকার ঘোড়ার পায়ের নালের আকৃতির তোরণ বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভবনটির উত্তরদিকে সজ্জিত তীক্ষ চূড়া এবং অপূর্ব নকশারাজির মাঝে মুসলিম ও মুঘল বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটে। ভবনের গম্বুজের নকশা মুসলিম স্থাপত্যের সাথে সামন্জস্যপূর্ণ হলেও এটির দরজা জানালা এবং দেওয়ালের কারুকাজের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় প্রচ্ছন্ন ইউরোপীয় ছাপ। সেই সময়ে ভবনটির উত্তরদিকের ও দক্ষিণ দিকের নকশা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হওয়াতে দর্শনার্থীদের মাঝে সহজেই ভ্রমণের সৃষ্টি হত। সময়ের আবর্তে দালানটির দক্ষিণ অভিমুখে “ইনসন হল” নামক একটি ক্লাব সংযোজন করা হয়। উল্লেখ্য, এই নর্থব্রুক হলেই ১৯২৬ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

১৮৮২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি হলের দক্ষিন পূর্ব দিকে নর্থব্রুক পাবলিক লাইব্রেরি নামক একটি পাঠাগার যুক্ত করে দেয় ঢাকা মিউনিসিপালিটি এবং পিপলস এসোসিয়েশান। জানা যায়, এই পাঠাগারের জন্য সুদূর বিলেত থেকে বই এনে সংগৃহীত হত। সমৃদ্ধ সব সংগ্রহের কারণে এটি অল্প সময়ে বিদ্যানুরাগীদের কাছে বিশেষ সুনাম কুড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়। তবে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এটির অনেক ক্ষতি সাধন হয়। অনেক বই তখন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পাঠাগারটি পুণ:প্রতিষ্ঠার জন্য ত্রিপুরার মহারাজা, বালিয়াটির জমিদার ব্রজেন্দ্রকুমার রায়, রাণী স্বর্ণময়ী দেবী, কালিকৃষ্ণ এবং বিশাশিশ্বরি দেবীর অবদান অনস্বীকার্য। যার মোট মূল্য ছিল তৎকালীন ৩,৭০০ টাকার সমপরিমান। যেটার ফলশ্রুতিতে ১৯৮৭ সালে ১০০০ বই সহ এটি পুনরায় সুশীল সমাজে বিদ্যার আলো ছড়ানোর অগ্রযাত্রা পথে ধাবিত হয়।

বুড়িগঙ্গা নদীর তীর থেকে আজও ভবনটির একধাপ বিশিষ্ট গাঢ় লাল রঙের বিশাল গম্বুজ, সুউচ্চ চূড়া ও বিশাল পাঁচিল পরিলক্ষিত হয়। যা নীরবে তৎকালীন জ্ঞান পিপাসুদের জ্ঞান চর্চার এক স্মারক হিসেবে স্মৃতি বহন করে চলেছে। নির্মাণের পর নর্থব্রুক থেকে এই প্রশস্ত নদীর সৌন্দর্য অবলোকন করা যেত। তবে ১৯৩০ সালের মাঝে এখান থেকে নদী দেখার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। পরে এটির উত্তর প্রান্তে প্রবেশ মুখে একটি পঞ্চভূজ ঝর্ণা স্থাপনের ফলে ভবনটি একেবারেই নজরে পড়ে না।

“নর্থব্রুক হল” একটি প্রাচীণ ঐতিহ্যের নিদর্শন। তৎকালীন সমাজের জ্ঞানের প্রতি পিপাসা লালন ও তার চর্চা করার মহৎ প্রয়াসের স্মৃতি চিহ্ন বুকে আঁকড়ে ধরে আজও সগর্বে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে চলেছে এই ঐতিহাসিক ভবন। এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটিকে ধরে রাখতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি যৌথ ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মূলত এলাকাটির আবাসিক গুরুত্ব থেকে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়াতে এই ঐতিহ্যবাহী স্মারকটির অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখীন। তবে আশার কথা এই যে, ২০০৯ সালে প্রকাশিত “সংরক্ষিত ঐতিহ্যের” তালিকা নর্থব্রুক হলটি সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

একথা দ্বর্থহীন যে, একমাত্র শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে দিতে। সেই জ্ঞানের আলোর অন্বেষণে আমাদের পূর্ববঙ্গও যে সমান ভাবে এগিয়ে ছিল  তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই নর্থব্রুক হল। সুতরাং কালের এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষীকে সংরক্ষণ করবার মধ্য দিয়েই আমাদের পূর্ব বঙ্গের জ্ঞান চর্চার ইতিহাসের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তাই নিজেদের মেধা ও মননের পরিচয়কে ভবিষ্যতে সমুন্নত রাখবার জন্য আমাদের সকলেরই এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির সংরক্ষণ করবার জন্য এগিয়ে আসা জরুরী।

তথ্যসূত্র: পত্রপত্রিকা, ইন্টারনেট, জার্নাল



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top