সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮

কেনা হলো না লালশাড়ি : মালেক মাহমুদ


প্রকাশিত:
২০ জুলাই ২০২১ ০৩:৩১

আপডেট:
২৪ জুলাই ২০২১ ২২:২৫

 

ঈদ মানে খুশি। হাসি-খুশি আনন্দ। এই আনন্দের ছোঁয়া পেতে কত যে বেদনা পোহাতে হয়, তার হিসেব কে রাখে। খুশিকে ভাগাভাগি করে নেয়ার শক্তি সবার কী থাকে? 
না, থাকে না।
উপর তলায় বসে গরিবদেরকে বেমালুম ভুলে যায় বিত্তশালী। 
ধনী ও গরীবের পার্থক্য বোঝে দুখী। বিত্তশালী হওয়ার ভেতরে আনন্দিত হতে থাকে ধনী।
ধনী কী ঈদে প্রকৃত সুখ অনুভব করতে পারে?
না, পারে না।
গরীব কী ঈদে প্রকৃত সুখ অনুভব করতে পারে?
না, পারে না।

ধনী ও গরীব যদি সুখ ও দুঃখ ভাগাভাগি করতে পারে তবেই মিলে যায় প্রকৃত সুখ। সমাজে এ ছাড়াও কতরকম ঘটনা ঘটে যায়। এর হিসেব কে রাখে। দুখীর মনে সুখের ছবি হাবুডুবু খায়। সুখের ছবি মনে এঁকে এগিয়ে চলে সাধারণ মানুষ।

কষ্টের সিঁড়িতে হাবুডুবু খায় সুখের ছবি ধরা দিবে সেই আশায়। একটু সুখ। একটু আনন্দ। দুখীর কাছে সুখ বিলিয়ে দেয়ার ভেতরেও আনন্দ আছে। সেই আনন্দে আনন্দিত হতে পারে সেই তো খাঁটি মানুষ। একটি আনন্দের গল্প বলতে এসে চোখে পানি চলে এলো।

এই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে অপেক্ষা করে বছরের পর বছর। একটি স্বপ্নীল স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যায় মানুষ। দুখী মানুষের গল্প। মেঠো পথে যাদের বসবাস।

লালন ও লালনের বউ। এই বাড়িতে আসার পরে সবাই লালনের বউ বলেই ডাকে। লালনের সঙ্গে হাসিখুশিতে কাটতো সময়। কেউ ডাকেনি সালেহা বেগম বলে। লালনের একটি গরু ছিল সেই বাড়িতে সালেহা বেগমের মা একটি লাল বাছুর দিয়েছিল। এই বাছুরটি পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিল লালন। লাবলু জন্য নাকি দিয়েছিল এই লাল বাছুর। লাল বাছুরটি বাড়ি আসার পর থেকে অানন্দের ছোঁয়া লাগে। লালন বলে, এই লাল বাছুরটি আমাদের আশার প্রদীপ। এই বাছুর বড় হবে। বিক্রি হবে অনেক টাকা। সেই আশায় তাজা ঘাস কেটে এনে খাওয়ায় বাছুরকে। একটি স্বপ্ন যেনো ধরা দিয়েছে। দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। লাল বাছুর গায়গতরে বেশ তরতাজা হয়ে ওঠছে। বেশ শান্ত। শিং দুটি বেশ চৌক্কা হয়েছে। দুটি কুরবানির ঈদ চলে গেল। সামনে ঈদে তিন বছর হবে। লালনের চোখেমুখে স্বপ্ন ভেসে বেড়ায়। 

চাঁদনি রাতে লাবলুর মায়ের সঙ্গে গল্পে মেতেছিল। গল্পের কথাগুলো এরকম, অাগামী ঈদে অনেক ডাঙর হবে লাল গরু। ঈদে বিক্রি করলে দামও পাওয়া যাবে বেশ। তাই আমি আমার মনের কথা তোমাকে বলছি- যখন লাল গরু বিক্রি করতে যাব তার আগে একটি লাল জামা কিনব। লাবলুর জন্যও কিনে দিব লাল জামা। লালনের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে সালেহা বেগম বলে,

গরু বিক্রি হলে আমার জন্য আনবে একটি লাল শাড়ি। তুমি কীকরে জানলে? আমি এমনটি ভবছি।

তোমার কথারভাবে তাই মনে হয় আমার। এখন তুমি আমার জন্য লাল শাড়ি কিনবে সে টাকা পাবে কোথা থেকে। গরু বিক্রি হলে পাবে টাকা সেই টাকা দিয়ে কিনবে লাল শাড়ি।

তুমি ঠিকই বলেছো। 

দুজনেই স্বপ্নের সাগরে হাবুডুবু খেলতে লাগল। রাত চলে যায়। সকাল হয়। সকালে গরুর দিকে তাকিয়ে ছিল সালেহা বেগম। একটি সুন্দর দিনের জন্য অপেক্ষায় করছে। ভাবছে খুব তাড়াতাড়ি আসবে সুন্দর দিন। মিষ্টি হাসি দিয়ে কাজে চলে গেল। লালন চলে গেল গরুর জন্য ঘাস কাটতে। দুপুর বেলা গরু নিয়ে বাড়ির বাহিরে গেল। গরু নিয়ে যেই বড় সড়কে উঠছে ঠিক তখনি একটি লালগাড়ি দেখতে পেল।

 লালগাড়ি বড় সড়ক দিয়ে পিপ পিপ করে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় লালন তার লাল গরু নিয়ে রাস্তা পাড় হচ্ছিল। অনাকাংখিত ভাবে লালগাড়ি দেখে লালনের লাল গরু ভয় পেয়ে গেল। হঠাৎ জোরে দৌড় দিল। দৌড়াচ্ছিল দৌড়াচ্ছিল। দড়ি ধরে ছিল লালন। গরুর দৌড়ের সঙ্গে নিজেকে সামলাতে পারছিলনা, সামলাতে নাপেড়ে যেই দড়ি ছেড়ে দিল, তখনি লালন গাড়ি চাপা পড়ে। লাল গরু দৌড়াচ্ছিল। দৌড়াচ্ছিল। দৌড়ে বাড়ি চলে আসে লাল গরু। রক্তে লাল হয় যায় লালন। ঘাতক গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। পথের লোকজন কাছে আসতে না আসতেই প্রাণপাখি উড়ে যায় যায়। তাকে বাঁচাতে একটি ভ্যানে উঠানো হয়, নেয়া হয় ডাক্তারের কাছে। ভ্যানের উপরে মারা যায় লালন। শোকের ছায়া নেমে আসে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা গ্রামে। সবার একি কথা বড় ভালো মানুষ ছিল লালন। সালেহা বেগম  হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। শোকে পাথর হয়ে গেল। এত অল্প বয়সে বিধবার শাড়ি পরে হবে সে কখনো ভাবেনি সালেহা বেগম। ভাবতে থাকে লাল গরু রক্তে লাল করে দিয়েছে আমার সংসার।

লাল গরু ড্যাপড্যাপ করে তাকিয়ে থাকে সালেহা বেগমের দিকে। 
গরু কী মনে করে, তার মনিবের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী?
ড্রাইভার কী এই মৃত্যুর জন্য দায়ী?

এরা কেউ দায়ী নয়। রক্তের সিঁড়িতে মিশে গেছে লালন। কষ্টের সাগরে ভাসে সালেহা বেগম। ঈদের হাটে নেওয়া হলো লাল গরু। বিক্রি হলো বেশ টাকায়। কুরবানি ঈদে কুরবানি হলো লাল গরু। 

লালন আজ হয়ে আছে শুধুই স্মৃতি। স্মামী হারিয়ে দিশেহারা লালনের বউ। একটি সোনার সংসার তছনছ হয়ে গেল! ঈদে লাল গরু বিক্রি হলো টাকাও পেল। কেনা হলো না লাল শাড়ি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top