সিডনী সোমবার, ৬ই ডিসেম্বর ২০২১, ২২শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং : সায়ন্তনী পূততুন্ড


প্রকাশিত:
২ নভেম্বর ২০২১ ১৫:১৩

আপডেট:
৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩:২০

 

১.

ক্যামেরার ফ্ল্যাশ মুহুর্মূহু ঝলসে উঠছে। সামনে উদগ্র জনতার ভিড়। অগুনতি কালো কালো মাথা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে মানুষ নয়, যেন একরাশ কালো পিপড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে! শ্রমজীবি ঠিকই, কিন্ত তুচ্ছ বিশ্বের যে কোনও শক্তি, তা দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগই হোক, কিংবা মহামারী – সবার আগে ওদেরই পিষে দিয়ে যায়। যুগে যুগে পদপিষ্ট হওয়ার ইতিহাস ও অধিকার একমাত্র ওদেরই আছে। এবারও তার অন্যথা হয়নি।

ওদের প্রত্যেকেরই মুখের ভাঁজে উদ্বেগ স্পষ্ট। মুখের মানচিত্রে হয়তো কিছুক্ষণ আগেও দুশ্চিন্তা আঁকা ছিল৷ কিন্তু এখন উত্তেজনায় ভরপুর৷ কয়েকশো সতর্ক ও ক্ষুধিত দৃষ্টি বারবার স্পর্শ করে যাচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে। চতুর্দিকে মাছির ভনভনানির মত চাপা গুঞ্জন। তার মধ্যেই কোথা থেকে যেন শিশুর কান্না ভেসে এল। উত্তেজনায় জনতা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল অতি ছোঁয়াচে মহামারীর রক্তচক্ষুর কথা। বারবার ভুলক্রমে পেরিয়ে যাচ্ছিল ছয়ফুট দূরত্বের লক্ষ্মণরেখাকে। সম্বিত ফিরল দেহরক্ষীদের ক্রুদ্ধ ধমকে –

‘এই, এত এগিয়ে আসছিস কেন বে? রথের মেলা হচ্ছে নাকি! পিছনে যা! সরে দাঁড়া! স-র!?’

ভিড়ের মধ্যেই ধাক্কা খেয়ে একটু পিছিয়ে গেল কমলা। কী করবে বুঝতে না পেরে বিহ্বল চোখে তাকিয়েছে মাস্ক পরা দেহরক্ষীদের দিকে। তার সামনের রক্ষীটি আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল পিছনের সাদা চৌকো দাগটাকে। রুক্ষ স্বরে বলল – ‘ওখানে দাঁড়া!’

তেলবিহীন উস্কাখুশকো মাথা নেড়ে সসঙ্কোচে কয়েক পা পিছিয়ে যায় কমলা। জড়োসডো হয়ে দাঁড়ায় চৌকো দাগটার ভেতরে। কিন্তু তার কৌতুহলী দৃষ্টি ছুঁয়ে যাচ্ছিল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীমূর্তিকে! ওঁকে টিভির পর্দায় অনেকবার দেখেছে সে। এই প্রথমবার সামনাসামনি দেখছে। যদিও মুখের বেশ খানিকটা দামি মাস্কে ঢাকা, তবু চিনতে অসুবিধে হচ্ছে না৷ সেই টানাটানা অপূর্ব সুন্দর দুই চোখের মোহময়ী কটাক্ষ। ঘন রেশমী চুল হাওয়ায় ফুরফুর করে উড়ছে। গায়ের রঙ! সে যেন ফেটে পড়ে! সাদা ধবধবে বাহুদুটিতে আইভরির মসৃণতা। আর তাঁর সৌরভ বোধহয় যোজনগন্ধাকেও হার মানাবে! এত দূরেও সেই আশ্চর্য সুগন্ধ এসে ঝাপ্টা মারছিল কমলার নাকে। সে অবাক হয়ে ভাবছিল – গায়ে ঠিক কী মেখে থাকেন এই অভিনেত্রী! তাদের সবার দৌড় তো ফুলেল তেল বা বাবুদের উপহার দেওয়া সস্তার সেন্ট অবধি। সে গন্ধ কয়েকমুহূর্তের জন্যই স্থায়ী হয়৷তারপরই ঘাম আর আঁশটে মাংসের গন্ধ প্রবল হয়ে ওঠে!

কমলা কী ভেবে যেন একটু কুঁকড়ে যায়। ওই হাত তার হাতদুটোকে ছোঁবে! নিজের হাতদুটোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে আপনমনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে! রুক্ষ চামড়ায় খড়ি উঠছে। কোথায় ওই স্বর্গীয় হাত আর কোথায় এক বারাঙ্গনার ছিরিহীন, চামড়া ওঠা আঙুল! একসময়ে এ চত্বরে তার দেহসৌষ্টব নিয়েও রীতিমত চর্চা ছিল! স্বর্গের দেবী না হলেও আটোসীটো গড়নের দীর্ঘাঙ্গী কমলার যৌবন অনেক বাবুর মনে আগুন জ্বালিয়েছে! কিন্তু পেট হতেই সব যেন টিলে হয়ে গেল। যমুনা মাসি অবশ্য বলেছিল – ‘একটু সতর্ক থাকতে পারিস নে আবাদী! শেষে পেট বাধালি! এই শরীলটাই আমাদের সব। যন্তর টিল দিলে আর কেউ তাকাবে নে। আর এখন তো তোর কামানোর বয়েস। একেবারে ডবকা জৈবন! এখন ছাওয়াল নিয়ে কী করবি? খসিয়ে ফ্যাল যত ঝামালা।‘

তার সহকর্মীরাও অনেকবার সতর্ক করেছে। যৌনকর্মীদের আবার মা হওয়ার শখ কীসের! পোয়াতি অবস্থায় তো খদ্দের ধরার বালাই-ই নেই! পরেও বিপদ! ঘরে যদি একটা ছা সর্বক্ষণ ট্যাঁ ট্যাঁ করে তবে বাবুদের মুড নষ্ট হয়। তার পাশের ঘরের জ্যাসমিন বলেছিল – ‘ভুলে যা কমলা। ওসব আমাদের জন্য নয়৷ ছেলে হলে দালাল হবে, মেয়ে হলে ছেনাল! লাভ কী?’

তা সত্বেও পেটেরটাকে কিছুতেই খসায়নি কমলা। সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে অবশ্য চিন্তিত ছিল৷ কিন্তু একটা প্রাণকে গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করেনি তার। ওদের পাড়ায় বাচ্চার বাপ কে, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তবে সন্তানের অবস্থা হয় আগাছার মত। জ্যাসমিনের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি – হয় দালাল, নয় ছেনাল! তবু মা হতে পেরে অদ্ভুত একটা পরিপূর্ণতার স্বাদ পেয়েছিল সে।

কিন্তু তখন কে জানত যে কয়েক মাসের মধ্যেই এমন ভয়ঙ্কর মহামারী রে রে করে তেড়ে আসবে! স্বপ্নেও কি ভেবেছিল যে এমন সরগরম পাড়াটা আচমকা নীরব হয়ে যাবে! ওদের মধ্যে জ্যাসমিনই অল্পবিস্তুর ‘লিখিপড়ি লাল ছড়ি’! সে জানিয়েছিল, চীনদেশ থেকে কী যেন একটা ছোঁয়াচে রোগ আমদানি হয়েছে। ওরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল তার কথা। যাদের মাথার ওপর নানারকম যৌনরোগ, এইচ আই ভির মত সর্বেনশে মারণরোগ সবসময় খাঁড়া হাতে ঘুরছে তাদের আবার ছোঁয়াচে অসুখের ভয়! নাঙ্গা কোনওদিন বাটপাড়ের ভয় পেয়েছে?

তখন কেউ ভাবতেও পারেনি, যে রোগটার নামও ঠিকমতন জানে না সেই কোভিড নাইন্টিন কার্যক্ষেত্রে গোটা শহরকেই গৃহবন্দী করে দেবে! এখন লক ডাউনে সবার রুটি রুজি বিপন্ন! যে ব্যবসা চিরকালীন, যার চাহিদার পারদ সবসময়ই উর্ধ্বগামী সেই রেডলাইট এরিয়ার ব্যবসাও এমনভাবে মার খেল যা ভাবাই যায় না! নতুন কুঁড়ি সুসজ্জিত, ফুল সগর্বে ফুটে আছে, কিন্তু ভ্রমরের দেখাই নেই! এখন খিদে আর নিরাপত্তাহীনতাই ওদের একমাত্র সঙ্গী!

‘সারাদিন কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি!’

আচমকা পাশ থেকে ভেসে এল রক্ষীর গর্জন – ‘এগো না মা-গী! এখানে এসেও নখরা দেখাচ্ছিস!’

কর্কশ কণ্ঠের চিৎকারে চিন্তাসূত্র ছিড়ে গেল কমলার৷ সে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, লাইনটা কখন যেন এগিয়ে গিয়েছে। এখন কমলাই সবার সামনে! আর তার ঠিক সামনেই ...!

দেবী! তাঁর হাতের প্লাস্টিকে চাল, ডাল, আলু আর পিঁয়াজ! তিনি দাঁড়িয়ে আছেন! একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ঠিক ওরই দিকে! রৌদ্রতপ্ত রক্তাভ মুখে, দৃষ্টিতে কিঞ্চিৎ বিরক্তি ও অসন্তোষ। কমলার মনে হল সেই বিরক্তিমাখা চাউনি একরাশ অবজ্ঞা নিয়ে যেন মুখর হয়ে বলছে – ‘আমি কি তোর জন্য সারাদিন মাথায় গনগনে রোদ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব নাকি! কোথাকার ভি আই পি'র বেটি এয়েছে!?’

সে অপ্রস্তুত! কয়েক পা এগোতেই বুঝল তার শরীর আবার বিশ্বাসঘাতকতা করছে। পাঁচদিন হল, ঘরে চাল, ডাল, আটার এক কণাও অবশিষ্ট নেই! ওদিকে বাচ্চাটা ক্রমাগতই দুধ টানে। কিন্তু অনাহারে জর্জরিত মায়ের দেহ পুষ্টি পাওয়া তো দূর, দু মুঠো অন্নও পায় না। ব্যবসা নেই, তাই অর্থও নেই! কয়েকদিন ধরে সে শুধু জল খেয়ে রয়েছে। ফলম্বরূপ মাঝেমধ্যেই চোখে অন্ধকার নেমে আসে। হঠাৎ হঠাৎই মাথা ঘুরে পড়ে যায়।

অবসন্ন মেয়েটির মনে হল দেবীর দামি পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে তার খিদের গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে চতুর্দিকে। একেই পেটের ভেতরে খিদের তান্ডব, তার ওপর চাল,ডাল বিতরণ করা হবে শুনে সকাল থেকেই কাঠফাটা রোদের মধ্যেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘেমে নেয়ে একসা। জলতেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ। শূন্য পাকস্থলী মোচড় দিয়ে উঠল!

‘আগে! আ–গে! হ–ট! হ–ট্!?

হিন্দিভাষী রক্ষী এমনভাবে হাঁই হাঁই করে উঠল যেন মানুষ নয়, শুয়োরের পাল তাড়াচ্ছে! একরকম ধাক্কা মেরে কমলাকে খানিকটা এগিয়েই দিল লোকটা। কোনমতে দ্রুত পা ফেলে অভিনেত্রীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল সে৷ কিন্তু দেহ যে অবশ হয়ে আসে! চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে৷ ঠিক কয়েকহাত দূরত্বেই দাঁড়িয়ে আছেন স্বর্গের সুন্দরী! কিন্তু কমলার মনে হয়, সে বুঝি পাতালের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে! সারা শরীর দুর্বলতায় কাঁপছে। পা দুটো প্রচন্ড ভারি হয়ে আসে...!

অসাড় হয়ে পড়ে যাওয়ার আগে কোনমতে দু হাত বাড়িয়ে কিছু একটা অবলম্বন আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করল ও। তার হাত দুটো আশ্রয়ের আশায় স্পর্শ করল অভিনেত্রীর বাহু!

‘হোয়াট দ্য হেল ... !' একটা ক্রুদ্ধ নারীস্বর তীত্র প্রতিবাদে বাঁঝিয়ে ওঠে – ‘ডোন্ট টাচ মি ইউ হো-র!?’

ইংরেজি শব্দগুলো বুঝাতে না পারলেও বক্তার কণ্ঠস্বরের ভৎসর্না স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে কমলা। ততক্ষণে কিছু লোক তাকে হাঁ হাঁ করে টেনে সরিয়ে নিয়েছে নিরাপদ দূরত্বে। কমলার ধারে কাছেই ছিল জ্যাসমিন। সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ছুটে এসেছে। কমলা হয়তো পড়েই যেত, কিন্তু জ্যাসমিন তার আগেই তাকে ধরে ফেলে।

‘ন্যা–স্টি!’

অসম্ভব বিরক্তিতে বলে উঠলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও অভিনেত্রী মালবিকা। হাতে স্যানিটাইজার ঘষতে ঘষতে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন কমলার দিকে। এদের স্পর্ধা দেখো! সারা গায়ে ঘামের দুর্গন্ধ, জট পড়া মাথার চুলে উকুন আ্যান্ড সন্স ওঁত পেতে বসে আছে, হাতের আঙুলে চর্মরোগ–আর কথা নেই বার্তা নেই, তাঁকে ছুঁয়ে দিল! ওর গায়ের দুর্গন্ধেই অণ্ণপ্রাশনের ভাত উঠে আসছে মালবিকার! পরনের শাড়িটা যতটা হতশ্রী, ঠিক ততটাই নোংরা! এমনকি মুখের মাস্কটাও তেলচিটে ও শতছিদ্রযুক্ত!

মনে মনে আফসোস করেন মালবিকা! তিনি নামজাদা অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী। ব্রথেলের মানুষগুলোর দুর্দশার কথা শুনে এখানেও চাল ডাল বিতরণ করতেই এসেছেন ! এখন মনে হচ্ছে, কেন যে মরতে এসেছিলেন! হ্যাঁ, প্রেসের জন্য গরমাগরম নিউজ ঠিকই, কিন্তু এদের গায়ের ও মুখের দুর্গন্ধ তাঁর লক্ষাধিক মূল্যের পারফিউমকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে! চর্মরোগ, রাজ্যের নোংরা জামা-শাড়ি দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন! মালবিকার মনে হয় - কোভিডের থেকেও হয়তো মারাত্মক জীবাণু নিয়ে ঘুরছে এরা! তার ওপর সোশ্যাল ডিসট্যান্সিঙের বালাই নেই! সুযোগ পেলেই হুড়মুড়িয়ে ঘাড়ের ওপর এসে পড়ছে! এ কী জাতীয় অসভ্যতা!

তিনি গলার গভীরে গরগর করে ওঠেন – ‘ব্লাডি প্রস্টিটিউটস!’

মাথায় প্রায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। অতি কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলালেন মালবিকা। ততক্ষণে জ্যাসমিন চোখে মুখে জল দিয়ে কিছুটা সুস্থ করে তুলেছে কমলাকে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন প্রেসের ক্যামেরা এদিকেই তাক করা আছে। ভাগ্যিস মুখে মাস্ক আছে, তাই প্লাস্টিক হাসিটা হাসতে হচ্ছে না! তিনি খানিকটা সতর্কভঙ্গিতে এগিয়ে দিলেন চাল, ডাল, আলুর প্যাকেটটা৷

মেয়েটা এবার আর কোনওরকম অভদ্রতা করল না। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়েই স্পর্শ করল প্যাকেটটাকে।

ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল। হ্যাঁ, এইবার দুজনের মাঝখানের দুরত্বটা ঠিক আছে। একদম সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেনেই দাঁড়িয়েছে দুজন!

 

২.

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মালবিকা। আজীবনের বিশ্বস্ত পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিমানী কিন্তু ওর পাশে বসল না৷ সে ঠিক ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। হিমানী জানে ম্যাডাম বেশি নৈকট্য পছন্দ করেন না৷ অজানা, অচেনা লোকের স্পর্শ তো তাঁর চুড়ান্ত অপছন্দের! তার ওপর রেডলাইট এরিয়ার এক গণিকা তাঁকে আবার ভুল করে ছুঁয়ে ফেলেছে বলে ম্যাডামের মেজাজ গরম! বাতিকগ্রস্তের মত বারবার স্যানিটাইজার মাখছেন। সে চোখের কোণে দেখল, তিনি এখন দুর্মূল্য ফরাসি পারফিউমের সুদৃশ্য শিশিটা বের করে এনে নিজের গায়ে স্প্রে করতেই ব্যস্ত! হিমানী আপনমনেই হাসে। যতদিন রূপোলি জগতের জলপরী হয়ে সাঁতরাচ্ছিলেন, ততদিন এসব বাতিক দেখা দেয়নি। সমাজসেবিকা হয়েই হয়েছে যত বিপদ! রিল আর রিয়েল লাইফে যে কতখানি সোশ্যাল ডিসট্যান্স তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন!

‘গ–শ!’ মালবিকা পারলে পুরো শিশিটাই নিজের গায়ে ঢেলে দেন। আলগোছে মুখের মাস্ক খুলতে খুলতে বললেন – ‘কী দুর্গন্ধ রে বাবা! আরেকটু হলেই বোধহয় বমি করে ফেলতাম’

হিমানী কোনও উত্তর না দিয়েই মৃদু হাসল। রেডলাইট এরিয়ায় এসে ম্যাডাম ঠিক কোন ব্র্যান্ডের পারফিউমের সুরভি আশা করেছিলেন তা একমাত্র তিনিই জানেন! কোভিড নাইন্টিনের দুরন্ত প্রভাব এখন এসে পড়েছে দেহপসারিণীদের ওপরেও। ব্রথেল মানেই নানারকম দুরারোগ্য ও ছোঁয়াচে রোগের ঘাঁটি। যৌনকর্মীদের মধ্যেই এস টি ডি অর্থাৎ সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ সবচেয়ে বেশি! ওদের মরার জন্য কোভিডের প্রয়োজন বিশেষ হয় না। হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস, গনোরিয়া, ক্ল্যামিডিয়া, সিফিলিস তো আছেই – সবার ওপরে স্বয়ং কাল হয়ে বসে আছে এইচ আই ভি এইডস৷ মরার জন্য এগুলোই যথেষ্ট, কোভিড তো বাহুল্যমাত্র!

কিন্তু তা সত্তেও সে বাহুল্যের সংখ্যা নেহাত কম নয়৷ হাভার্ড মেডিক্যাল স্কুল আর ইয়েল স্কুল অব মেডিসিন তাদের সমীক্ষায় জানিয়েছে, ভারতে শুধুমাত্র ব্রথেল খুলে দিলেই কোভিড সংক্রমণ চার লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে৷ আনুমানিক মৃতের সংখ্যা ন্যুনতম বারোহাজার! সুতরাং রেডলাইট এরিয়া খোলার আপাতত কোনও সম্ভাবনাই নেই!

‘এন জি ও গুলোকে ডোনেশন পাঠিয়ে দিয়েছ তো?’

সম্ভবত দেবী কিঞ্চিৎ প্রফুল্ল হয়েছেন। মালবিকার মেজাজই এমন! কখন ভালো ব্যবহার করবেন, কখন রূঢ় হয়ে উঠবেন – বোঝাই দায়। হিমানী পেশাদারি তৎপরতায় জানায় – ‘কাল রাতেই সবগুলোতে টাকা অনলাইন ট্রান্সফার করে দিয়েছি ম্যাম। মিসেস ভিরানি ধন্যবাদ জানিয়ে আপনাকে মেইলও করেছেন’।

‘কই?’

বলতে বলতেই নিজের দামি ল্যাপটপটাকে কোলে টেনে নিলেন মালবিকা। বিন্দুমাত্রও বাক্যব্যয় না করে প্রায় হুমড়িই খেয়ে পড়লেন ল্যাপটপের স্ক্রিনের ওপরে। হ্যাঁ, মিসেস শীলা ভিরানি ধন্যবাদসূচক মেইলই পাঠিয়েছেন বটে। অনেক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানিয়ে বলেছেন – মালবিকাদের মত মানুষেরা আছে বলেই পৃথিবীটা আজও সুন্দর!

প্রশস্তিটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন মালবিকা। ঠিক এই কথাগুলোই তো শুনতে চান! নিজের প্রশংসা শুনতে কখনোই ওঁর ক্লান্তি নেই! পার্টিতে সবাই তাঁর দুরন্ত পোষাকের সঙ্গে অনিন্দ্যসুন্দর দেহবল্লরীর তারিফ করে, তখন ভারি আনন্দ পান। রীতিমত পৃথুলা মিসেস ভিরানি প্রায়ই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন – ‘ও মা-ই মা-ই! হোয়াট আ সেক্সি ফিগার মালবিকা! তোমায় দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে তুমি দুই সন্তানের মা! সিক্রেটটা কী?’

মালবিকা মৃদু হেসে স্তুতি গ্রহণ করেন৷ উপস্থিত পুরষবৃন্দের চোখের উষ্ণতার ওম তীকে আরাম দেয়। দুই সন্তানের মা হওয়া সত্ত্বেও যে কী কষ্টে নিজের যৌবনের উদ্ধত্যকে ধরে রেখেছেন তা সবাইকে বলে বেড়াবার ইচ্ছে নেই। এই নবনীকোমল ,মখমলের মত শরীরটার পেছনে কত টাকা ঢেলেছেন তার হিসেব নেই। টাকা থাকলে সৌন্দর্য ও চিরযৌবন তো দুর – দুনিয়ার সমস্ত সুখ ধরা দেয়। টাকাই কাউকে রাণী করে, কাউকে গণিকা!

মিসেস ভিরানির গদগদ মেইলটার উত্তরে একটা ঠান্ডা সৌজন্যমূলক মেইল পাঠিয়ে মালবিকা গাড়ির নরম সিটে আরাম করে ঠেস দিয়ে বসলেন! মিসেস ভিরানির মেইলের ওপরেই একগাদা নোটিফিকেশন অপেক্ষারত! ‘হেল্প মি টু হেল্প ইউ’ নামক একটি সাইটের অনেকগুলো নোটিফিকেশন এসে বসে আছে৷ সাইটের মালকিন স্বয়ং মালবিকা। একটু অন্যমনক্কভাবেই ‘হেল্প মি টু হেল্প ইউ'র সাইটটা খুললেন তিনি। যৌনকর্মীদের পেছনে যতখানি সময় নষ্ট করেছেন তার মধ্যেই একগাদা আ্যাপয়েন্টমেন্ট এসে বসে আছে!

বিরক্ত হয়ে ঠোঁট কামড়ালেন অভিনেত্রী! তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে মেয়েরা সব ঠিকঠাক সামলে নিতে পেরেছে তো! নতুন করে কোনওরকম অভিযোগের সামনে পড়তে চান না। তিনি একঝলক সাইটটাকে দেখে নিলেন। পাঁচহাজার থেকে ত্রিশহাজারের নানারকম প্যাকেজ আছে। যে যতটা আ্যাফোর্ড করতে পারে তেমনভাবেই প্যাকেজগুলো সাজানো। ইদানিং পঁচিশহাজারি কিংবা ত্রিশহাজারি প্যাকেজের প্রতিই মানুষের বেশি উৎসাহ দেখা যাচ্ছে৷ গোল্ড আর প্ল্যাটিনাম কার্ডের দিকেই ক্রেজ বেশি!

একটা মিষ্টি হাসি ভেসে উঠল মালবিকার ঠোঁটে। নিজের অ্যাপয়েন্টমেন্ট গুলোর টাইমিং দেখে নিয়ে আস্তে আস্তে বন্ধ করে রাখলেন ল্যাপটপটাকে।

কে বলে মানুষের হাতে টাকা নেই!

 

৩.

‘শেষপর্যন্ত এলি তাহলে? আগে এত নখরা করছিলি কেন? রেট বাড়ানোর ধান্দা?’

একটি পুরুষের মন্দ্রস্বর সারা ঘরে গমগমিয়ে উঠল। লোকটাকে অবশ্য ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না। তার ঠিক মাথার পেছনে একটা আলো জ্বলছে। ফলস্বরুপ মানুষটার চেয়ে তার ছায়া বেশি স্পষ্ট।

কমলার অবশ্য ওসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তার কাজ হলেই হল। সে মৃদুস্বরে বলল – ‘পেটের থেকে হারামি চিজ আর নেই রে বাবু’।

সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এ একটি বাক্যেই স্পষ্ট। পুরুষকণ্ঠ জানতে চাইল – ‘বাচ্চাটাকে নিয়ে এসেছিস?’ 

‘কোতায় রাখব?’ সে বিমর্ষ স্বরে জানায় – ‘ এতটুকুনি বাচ্চা মা ছাড়া থাকতি পারে? তুই তো বলেছিলি বাচ্চা নিয়ে এলে তোর ঝামেলি হবে না’।

‘না। হবে না’।

পুরুষকণ্ঠ সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়। বলাইবাহুল্য তার এখন কমলার সন্তানকে নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা নেই। কাজের মধ্যে বিরক্ত না করলেই হল। সে একটু অধৈর্যভাবেই বলে – ‘কাজ শুরু কর। হাতে বেশি সময় নেই’।

তর আর সয় না! মনে মনে একটা অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করে চতুর্দিকটা একটু ভালো করে দেখে নিল সে। এই মুহূর্তে একটা আলো ছায়া ঘেরা ঘরে দাঁড়িয়ে আছে কমলা। ঘরের এককোণে আরও একটা ম্যাড়ম্যাড়ে আলো জ্বলছিল। তারই হলুদ রশি প্রতিফলিত হয়ে পড়ছে কমলার মুখে। তার অনাহারক্লিষ্ট মুখে বাইরে থেকে কোনওরকম উদ্বেগের প্রকাশ নেই। কিন্তু মনের মধ্যে আশঙ্কা! বুক টিপটিপ করছে। ঠিক কী চায় লোকটা! লকডাউনের কড়া প্রহরায় একমুঠো টাকার লোভ দেখিয়ে একজন রূপোপজীবিনীকে ডেকেই বা পাঠিয়েছে কেন? পরিষ্কার করে কিছু বলছেও না! কোনওরকম বদ উদ্দেশ্য নেই তো?

বিষয়টা নিয়ে কয়েকদিন আগেও সে সংশয়ান্বিত ছিল। বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। অনেক ভেবেচিন্তে একদিন সন্ধের দিকে জ্যাসমিনের সঙ্গে পরামর্শ করতে গিয়েছিল। তখন জ্যাসমিন নীরবে প্রভু যীশুর সামনে মোমবাতি জ্বালাচ্ছিল। সে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ খ্রীস্টান। আগে প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে চার্চে যেত। এখন সব দেবালয় বন্ধ থাকার দরুণ আর যাওয়া হয় না। অদ্ভুত এক একগুয়ে রোগ! জেদ করে দেবালয় আর বেশ্যালয় – দুই ই বন্ধ করে দিল। ঈশ্বরের তবু উপায় আছে, কিন্তু সমাজের তথাকথিত এই নষ্ট মেয়েরা কোথায় যায়!

কমলা একদৃষ্টে তাকিয়েছিল প্রার্থনারত জ্যাসমিনের দিকে। এই সময়ে ওর মুখে আশ্চর্য একটা আলো খেলা করে। সে আলোয় যতটা বিষন্নতা থাকে ঠিক ততটাই আস্থা! করুণ চোখদুটো নিবদ্ধ থাকে শিশু ঈশ্বরপুত্র ও তাঁর মায়ের দিকে। ছবিটা যতবার দেখেছে কমলা ঠিক ততবারই বিস্মিত হয়েছে। ছোট যীশুর চতুর্দিকে ডানাওয়ালা মানুষ। সে জ্যাসমিনের মুখে শুনেছে প্রভু যীশুর মায়ের নাম মেরি। তিনি চিরকুমারী। অথচ তাঁর সন্তানই গোটা পৃথিবীর রাজা হয়ে বসে আছে। অর্থ ছিল না, প্রতিপত্তি ছিল না, কিচ্ছু ছিল না মানুষটার কাছে! কিন্তু তিনিই যে রাজার রাজা!

কমলা স্থিরদৃষ্টিতে তাকায় মা মেরির দিকে। কমলার কোলের ছোট্ট শিশু কী বুঝেছে কে জানে, কিন্তু ছবিটার দিকে পুটপুটে চোখে তাকিয়ে ফোঁকলা মাড়ি বের করে একগাল হাসল সে! হয়তো পবিত্রতাকে পবিত্রতাই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে চিনে নেয়। কী করুণাঘন চোখে তাকিয়ে আছেন মেরি! এমন চোখ কি আদৌ মানুষের থাকে? রাজার মা- তবু কোনও গর্ব কোনও অহঙ্কারের লেশমাত্র নেই তাঁর দু চোখে। রাজমাতার দেহে কোনও অলঙ্কার নেই। শুধু একটি সাধারণ মলিন কাপড় মাত্র। তা ও কী সুন্দর! চোখে চোখ পড়লেই যেন মন শান্ত হয়ে যায়। তিনি যেন শুধু দেবী নন, এমন একটি মানুষও বটে যাঁর কাছে অন্তরের সমস্ত বেদনা নিবেদন করা যায়। প্রার্থনা করা যায় – জগতের ঙ্গল হোক!

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ভার্জিন মেরি! ভার্জিন শব্দটা বেশ কয়েকবার শুনেছে মাসি ও দালালদের মুখে। শব্দটার অর্থ সে এখন বোঝে। অনেক খদ্দেরই কয়েক গ্লাস পেটে পড়লেই গদগদ হয়ে জানতে চাইত – ‘তুই কি ভার্জিন?’

প্রশ্নটা শুনলেই তাদের জুতোপেটা করার অদম্য ইচ্ছে হত কমলার। মর্‌ মুখপোড়া! মারতে হয় এক থাপ্পড়! বেবুশ্যের কাছে এসে জানতে চাইছে সে ভার্জিন কী না! তবু অক্ষম ক্রোধকে লাস্যময় এক হাসিতে রূপান্তরিত করতে দেরি হত না। যেন ভারি মজার কথা! মালবিকা আর কী অভিনয় করেছেন! তার থেকেও বড় অভিনেত্রী এ তল্লাটের মেয়েরা। খদ্দেররা যা খুশি বলুক, যা খুশি করুক – তারা হাসবেই! তাদের হাসির খেলা ঘন্টার পর ঘন্টা চলতে থাকে। সে হাসি যে কত অদম্য কান্নাকে লুকিয়ে বেরিয়ে আসছে সে খবর কেউ রাখে না। সে হাসির ঝলসে ওঠার জন্য লাইট-সাউন্ড-অ্যাকশন বলতে হয় না।

মা মেরির পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, ‘ভার্জিন’ শব্দটা বুঝি ওর জন্যই তৈরি হয়েছিল। এক বিশ্বজয়ী সন্তানের মা হলেও তিনি চিরকুমারী। কৌমার্য শুধু ওকেই মানায়।

‘হারামিটা কি বলছে?’

প্রার্থনা শেষ করে জ্যাসমিন তার দিকে তাকিয়েছে – ‘আবার যেতে বলেছে?’ 

কমলা একটু চুপ করে থেকে বলল – ‘হ্যাঁ’।

‘এ মাল তো আমাদের থেকেও ছেনালিতে ওস্তাদ! তার গতর নাড়িয়ে এখানে আসতে কী হয়েছে! বাইরে ডাকছে কেন?’ জ্যাসমিন একটু অসন্তুষ্ট – ‘ কোথায় ডেকেছে? বাড়িতে?’

‘হ্যাঁ রে। বাড়ির লম্বরও বলে দেছে’।

‘শা-লা ...! একটি অশ্লীল খিস্তি দিয়ে বলল সে – ‘এই লকডাউনে তুই কি উড়ে উড়ে যাবি না সে তোর জন্য এরোপ্পেন পাঠাবে? রাস্তায় দেখলে মামারা পেঁদিয়ে বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে। অথবা ...’।

‘অথবা’র পরের আশঙ্কাটা কী তা বুঝতে দেরি হয় না কমলার। তারা যে পেশায় আছে তাতে পুলিসের পক্ষে পেটানোর চেয়ে আরও মারাত্মক একটি সম্ভাবনা আছে। আজকাল লোকে ভদ্রবাড়ির মেয়েদেরই ছাড়ে না, তারা তো মার্কামারা দেহপসারিণী!

সে ফিক করে হেসে ফেলল – ‘আমাদের মান ইজ্জত কই রে জ্যাসমিন যে নতুন করে লুটবে! ভাবতেছি, যাব’।

‘যাবি!’ জ্যাসমিন অবাক – ‘কিন্তু কীভাবে!’

‘নুকিয়ে নুকিয়ে’। কমলা উলোঝুলো মাথাটা একটু চুলকে নিয়ে বলে – ‘আর যে উপোস সয় না রে! ভালো মালকড়ি দেবে সাত রাতের রেট চোদ্দ হাজার।‘

‘বলিস কী!’ বিস্ময়ে চোখ ব্রহ্মতালুতে তুলে ফেলেছে জ্যাসমিন – ‘এ-ত টা-কা! এই বাজারে পার নাইট দু হাজার আমাদের কেউ দেয়! এ শালা পাগল না শুয়োরের বাচ্চা?’

কমলার মনেও কিছুটা সংশয় ছিল৷ এমনিতেও ঘন্টায় তিনশো টাকার বেশি খুব একটা কেউ দিতে চায় না। দালালের ভাগ থাকে, যমুনামাসিও কাট ছাড়ে না। সেখানে এক রাতে দু হাজার! তার ওপর আবার এ বাবু কমলার চেনা বাবুও নয়৷ বরং তারই আরেকজন সহকর্মী পারুলের মাধ্যমেই যোগাযোগ। পারুলও ঠিকমতন লোকটাকে চেনে না। দু তিনদিন তার ঘরে এসেছিল লোকটা। আচমকা পারুলের সঙ্গে কমলাকে দেখে তার কী মনে হয়েছে তা ভগবানই জানেন। কথা নেই, বার্তা নেই ফট করে মোবাইল নম্বরই চেয়ে বসল।

কমলা আর পারুল হেসেই কুটোপাটি। কমলা খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল – ‘মোবিল লম্বর নিয়ে কী করবি বাবু?’ বলতে বলতেই চটুলভাবে চোখ টিপেছে – ‘ঘরকে ডাকবি? ঘরওয়ালি বানাবি?’

লোকটা কিন্তু নাছোড়বান্দার মত তার পেছনে লেগেই ছিল। কী ভেবে শেষপর্যন্ত নিজের মোবাইল নম্বর দিয়েই দিয়েছে কমলা৷ আশাও করেনি যে সত্যিই যোগাযোগ করবে। অথচ এই লকডাউনের বাজারেই হঠাৎ করে ফোন এল তার! লোকটাকে কমলা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ওদের জীবনে এমন বাবু কত আসে, কত যায়! কে মনে রাখে! লোকে তো মাতাল হয়ে তাদের বিয়েও করতে চায়। কিন্তু রাত কাটলেই সব ভুলে যায়।

অথচ এ ভবি ভোলেনি! একদিন সকালে তার ফোন। আর তারপরই এই উদ্ভট প্রস্তাব! কমলাকে তার বাড়িতে যেতে হবে৷ সঙ্গে পার নাইট দু হাজার টাকার টোপ।

‘এ শালা কিচাইন কেস!’ জ্যাসমিন জানায় – ‘আমার ঠিক লাগছে না কমলা। এ মালের মতলব ভালো নয়’।

কমলা বিপন্নদৃষ্টিতে তাকিয়ে ঢোঁক গিলল – ‘কী বলিস!’

‘এত টাকার টোপ দিচ্ছে...!’ একটু ভেবে নিয়ে বলে সে – ‘এত টাকাই যদি গচ্চা দেবে তবে আমাদের মত বাজারে মেয়েছেলেকে ডাকবে কেন? এর অর্ধেক টাকায় তো ঝাক্কাস মোমপালিশ কলগার্ল পাওয়া যায়! তারা সব উচুতলার পাব্লিক। পটর পটর করে ইংরেজি ঝাড়ে। মেমসাহেবের মত দেখতে এক একজনকে। দেখলে মনে হবে ফিল্মের পর্দা থেকে নেমে এল! টাকা ছড়াতে হলে তাদের পেছনেই ছড়াবে। আমাদের মত দাগী রেড লাইট এরিয়ার মেয়েদের ডাকবে কেন? তা ও আবার বাড়িতে!’

‘তা – লে! কী করব?’

‘যাস না কমলা’। জ্যাসমিন নেতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায় – ‘টাকাটা টোপ! ও মাল অন্য কিছু চায়! কার মনে কী আছে কে জানে!’

বারংবার বারণ করেছিল জ্যাসমিন, সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু কমলা শোনেনি। অনাহার আর সহ্য হয় না৷ কটাদিন ফেনাভাত আর আলুসেদ্ধ খেয়ে কাটিয়েছে। কিন্তু এ সামান্য চাল, ডাল, আলু আর পেঁয়াজ দিয়ে ক'দিন চলে! দেবী সেই যে প্লাস্টিক ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলেন তারপর আর কেউ আসেনি তাদের খবর নিতে। ঘরে ঘরে অনাহার! সব সহ্য হয়, কিন্তু খিদের জ্বালা বড় জ্বালা। পেটের মধ্যে আগুন জ্বলে। বুক ধড়ফড় করে। ভীষণ দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরে। বাচ্চাটার গায়ে একটুও বেবিক্রিম, নিদেনপক্ষে একটু পাউডারও দেওয়ার ক্ষমতা নেই। শিশুর কোমল চামড়া খসখসে হয়ে উঠছে। ছোট্ট ছোট্ট হাত পা যেন আরও কুঁকড়ে গিয়েছে। বিজ্ঞাপনের উজ্জ্বল ত্বকের স্বাস্থ্যবান ফুটফুটে শিশু দেখলে বড় কান্না পায় কমলার। তার বাচ্চাটার কপালে তো পেটভরা দুধও জোটে না! মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত না থাকলে শিশুর প্রয়োজনীয় দুধ আসবেই বা কী করে! ছোট শিশু সে কথা বোঝে না৷ ক্ষুধার তাড়নায় থেকে থেকে মায়ের বুকে গোঁত্তা মারে। শুষ্ক স্তনগ্রন্থি ছোট্ট হাতে আঁকড়ে ধরে অসহায়ের মত কাঁদতে থাকে।

আর প্রাণে সইল না মায়ের। অচেনা লোকটার প্রস্তাবে সে রাজি হয়ে গেল৷ অতগুলো টাকার টোপকে প্রত্যাখ্যান করার সাধ্য ছিল না তার।

‘সুন্দরী কমলা!’

লোকটার গুরুগম্ভীর স্বরে সম্বিত ফিরল কমলার। মানুষটা যেন অন্ধকারেই সামান্য হাসল – ‘তাহলে আর কী? নাচ শুরু করে দাও’।

‘নাচতি হবে!’

কমলার বিস্মায় দেখে সজোরে হেসেই উঠল অপরিচিত ব্যক্তি। হাসতে হাসতেই বলে – ‘যে নাচ তুই জানিস, সেটাই নাচ। এবার শাড়ি, ব্লাউজ খোল’।

এবার নিজের মূর্খামি বুঝতে পেরে কমলারও হাসি পেয়ে গেল৷ বাবু তাকে সেটাই করতে বলছে যা করে সে অভ্যস্ত। আর তিলমাত্র দেরি না করে সে একে একে খুলে ফেলতে লাগল তার সমস্ত আবরণ।

কমলা লক্ষ্য করেনি বাবুর হাতে ঠিক তখনই উঠে এসেছে একটা লম্বা জিনিস। সামান্য আলো পড়তেই জিনিসটা চকচক করে উঠল!

কয়েক মাসের শিশু আচমকা তারস্বরে কেঁদে ওঠে!

 

৪.

‘মাম্মি ... মাম্মাম! আজ আমি তোমার সঙ্গে ঘুমোবো!’

পাঁচ বছরের বালক মায়ের হাত চেপে ধরে আবদার করে৷ সারাদিনে মায়ের সঙ্গে তার প্রায় দেখাই হয় না। ছোটবেলা থেকেই গভর্নেস শালিনী আন্টির কোলেপিঠেই সে মানুষ হয়েছে। কিন্তু রোজ রাত্রে এই এক বায়না সে করবেই। মায়ের বুকে মুখ গুঁজে গল্প শুনতে তার খুব ইচ্ছে করে৷ মাম্মামের গায়ের গন্ধটা কী সুন্দর! এত মিষ্টি গন্ধ আর কারোর মায়ের গায়ে নেই – শুধু তার মাম্মামের গায়েই আছে। অবোধ শিশুর মন সেই গন্ধে নিরাপত্তা পায়, মায়ের কোলে আশ্রয় খোঁজে।

মালবিকা তাঁর পুত্রের এই একঘেয়ে বায়নায় সামান্য বিরক্ত হলেন। কিন্তু সে বিরক্তি প্রকাশ না করে মৃদু হেসে বললেন – ‘সানি, মান্মাম খুব ব্যস্ত। এখন বিরক্ত কোরো না। আন্টির কাছে যাও। আন্টি তোমায় সুন্দর সুন্দর গল্প শোনাবে’।

‘নাঁ-আ-আ! অনুনাসিক স্বরে বায়না ধরল সানি – ‘আমি আজ তোমার কাছেই শোবো’।

‘এমন করে না সোনা’। শিশুপুত্রের গাল টিপে আদর করলেন মালবিকা – ‘ইউ আর আ গুড বয়, নো?’

মাথা ঝাঁকাল সানি। অর্থাৎ সে গুডবয়। তিনি মিষ্টি হাসেন – ‘তাহলে মাম্মামের কথা শোনো। শালিনী আন্টির কাছে যাও’।

সানি বুঝে পায় না মাম্মামকে কী করে বোঝাবে। সারাদিনই তো শালিনী আন্টির সঙ্গেই থাকে। শুধু সে একাই নয়, তার ছোট ভাই, তিনবছরের রনিরও শালিনী আন্টিই ভরসা। চেতনা পাওয়ার পর থেকে নিজের গভর্নেসের মুখই দেখছে ওরা দুজনে। মা যেন কখনও কখনও অপ্রত্যাশিতভাবে লেগে যাওয়া লটারির মত। কয়েক মুহূর্তের জন্যই তাঁর আবির্ভাব হয়। দুজনকে সামান্য আদর করেন, শালিনীর কাছে ওদের খবর নেন। ব্যস, এ পর্যন্তই আর তাঁর দেখাই পাওয়া যায় না৷ শালিনী আন্টি বলে – ‘মান্মাম খুব বিজি’। কিন্তু ছোট্ট সানি বোঝে না ‘বিজি মাম্মাম’ অন্যদের মায়েদের মত তাদের গল্প শোনানোর সময়ও পান না কেন! রাতে তো সবাই ফ্রি থাকে! তাদের বাবা ‘বিজি’, মান্মামও ‘বিজি' – তবে তারা কার কাছে আবদার করবে, বায়না করবে!

‘না মান্মাম! প্লি–জ!’

মায়ের রাতপোষাক ধরে প্রায় ঝুলেই পড়ল সানি – ‘আজ আমি তোঁমার সঙ্গেই থাকবঁ’।

এবার ধৈর্যচ্যুতি হল মালবিকার। তিনি বিরক্তিতিক্ত স্বরে চেঁচিয়ে ওঠেন – ‘শালিনী! শা-লি-নী!’

শালিনী সম্ভবত তখন রনিকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল৷ ম্যাডামের চিৎকার শুনেই শশব্যস্তে দৌড়ে এল। মনে মনে প্রমাদ গুনেছে। সর্বনাশ! ম্যাডামের মেজাজ বিগড়ে যাওয়া মানেই বিপদ! একহাতে তিনবছরের রনিকে ধরে দ্রুত পায়ে, আতঙ্কিত মুখে ছুটে এল সে সাড়া দিতে একমুহূর্তও দেরি হলে চাকরিই হয়তো চলে যাবে। তাই কোনমতে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলে – ‘হ্যা ম্যাডাম?’

'মালবিকা বক্রদৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে – ‘তোমায় কি পেমেন্ট কম করা হচ্ছে? না আরও বেশি টাকা চাও?’

প্রশ্নটার মর্মার্থ বুঝতে না পেরে ঢোক গিলে নীরবতা অবলম্বন করেছে শালিনী। মুখে মুখে তর্ক করা মালবিকার অত্যন্ত অপছন্দ। তিনি চাকর বাকরদের নতমস্তক দেখতেই অভ্যস্ত। অগত্যা নিজের অপরাধ বুঝতে না পেরেও সে অপরাধীর মত মাথা হেঁট করেই দাঁড়াল।

‘সানি ফের আমার কাছে শুতে চাইছে কেন?’ 

এ একটা কথাতেই শালিনীর প্রতি তাঁর হুকুম স্পষ্ট হয়ে গেল৷ সে ত্রস্তব্যস্ত হয়ে সানিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে চলে যায়। মালবিকার ধনুকের মত ভুরুতে সামান্য ভাঁজ পড়ল। আস্তে আস্তে বললেন –

‘ডিসগাস্টিং!’

এখন তাঁর পরনে স্বচ্ছ রাত্রিবাস। রীতিমত দামি ও ডিজাইনার রাত্রিবাস ছাড়া তিনি পরেন না। তাঁর স্বামী ক্যাবিনেট মিনিস্টার হওয়ার দরুণ সবসময়ই ব্যস্ত থাকেন। কোভিডের অচলাবস্থার মধ্যেও পার্টির জরুরি মিটিঙের জন্য দিল্লীতে গিয়ে বসে আছেন। স্ত্রীয়ের জন্য সময় ছাড়া তাঁর কাছে আর সবকিছুই আছে! একে মন্ত্রীর স্ত্রী, তার ওপর ধনবতী এবং সুন্দরী সেলিব্রিটি! কারোর সাহস নেই মালবিকার আদেশ অমান্য করার। দুনিয়ার যা কিছু শোভন ও সুন্দর – সবকিছুতেই তাঁর একচ্ছত্র অধিকার!

মালবিকা একটা জোরালো শ্বাস টানেন। আঃ, অর্থ, ক্ষমতা, একরাশ অনুগত ভৃত্য, সমাজে প্রতিষ্ঠা – কী নেই তাঁর! চিরকাল তো এমনই জীবন চেয়ে এসেছেন। বাঁচতে হলে কিংসাইজ জীবনই বাঁচতে হয়। নয়তো জীবনের কোনও মানে নেই!

তিনি আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে বেডরুমের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বারোটা বাজছে। এখন চতুর্দিক নিস্তব্ধ। সানি হয়তো কিছুক্ষণ একঘেয়ে স্বরে কাঁদবে, তারপর শালিনীর কাছেই ঘুমিয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে তাঁকে কারোর দরকার নেই৷ তাঁরও কাউকে প্রয়োজন নেই। কেউ এ ঘরে আসবে না! চূড়ান্ত প্রাইভেসি!

দরজা বন্ধ হওয়ামাত্রই মালবিকা ঘরের উজ্জ্বল আলোটা অফ করে নাইটল্যাম্প জ্বেলে দেন! হাল্কা নীল রঙের আলোয় গোটা ঘরটাই অন্যরূপ ধারণ করল। মায়াবী ও রহস্যময়। তারপর ওয়ার্ডরোব থেকে একটা অদ্ভুতদর্শন মুখোশ বের করে আনেন। না, কোভিড মাস্ক নয়। এ মাস্ক চোখ ঢাকে! ঢেকে দেয় মুখোশের অধিকারিনীর সব পরিচয়! টকটকে লাল রঙের ঝলমলে মুখোশ! মাস্কারেড পার্টির উপযুক্ত গ্ল্যামারাস মাস্ক!

মুখোশটাকে সযত্নে পরে নিয়ে মালবিকা ল্যাপটপ খুলে বসলেন। পরে নিলেন হেডসেট ও মাইক্রোফোন। ব্রাউজারে ‘হেল্প মি টু হেল্প ইউ’র লোগো ভেসে উঠল। কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। পরক্ষণেই মনিটরে উদ্ভাসিত হল দর্শনপ্রার্থী! তাঁকে স্ক্রিনে দেখতে পেয়েই মুখোশধারী পুরুষ হাসল৷ হেডসেটে ভেসে আসে তার উষ্ণ কণ্ঠস্বর – ‘ হ্যালো হানি, আজ কী দেখাবে?’

পাহাড়ি ঝর্ণার মত খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন মালবিকা – ‘কী দেখতে চাও বলো?’

‘কাল তোমায় খুব মিস করেছি! কিছুতেই পুরোটা দেখালে না!’

অনুযোগের উত্তরে মোহিনী হাসেন মুখোশধারিণী – ‘পুরোটা দেখতে হলে প্ল্যাটিনাম কার্ড নিতে হবে ডার্লিং! গোল্ড কার্ডে ঠিক ততটাই পাবে যতটা প্যাকেজে আছে’।

গোল্ডকার্ড অর্থাৎ পঁচিশ হাজারের প্যাকেজ, প্ল্যাটিনাম বিশহাজারি! উল্টোদিকের লোকটা সজোরে হাসল – ‘মাত্র তো পাঁচহাজারের ফারাক! কী আসে যায়! ইউ আর সো ক্রুয়েল!’

ল্যাপটপের স্ক্রিনে আলতো আলতো চুমু এঁকে পুরুষটিকে উত্তেজিত করে তুললেন মালবিকা। রতিক্রিয়ায় তাঁর থেকে পারদর্শী খুব কম নারীই আছে সে ভার্চুয়ালই হোক কিংবা বাস্তব! হাস্কি কষ্ঠস্বরে বললেন – ‘রুলস আর রুলস!’

মুখোশধারী স্ক্রিন স্পর্শ করে মালবিকার ঠোটের উষ্ণতা শুষে নিতে চাইল – ‘আজ কিন্তু আমি প্ল্যাটিনাম কার্ড নিয়েই এসেছি। আজ আর পালাতে পারবে না!’

রহস্যময়ী ফের হাসছেন। প্ল্যাটিনাম কার্ডের অর্থ তিনি ভালোই বুঝতে পেরেছেন! প্যাকেজে স্পষ্ট লেখা আছে।

‘শো মি ইওর লঁজারে ফার্স্ট!’

বিনাবাক্যব্যয়ে প্ল্যাটিনাম কার্ডের অধিকারীর হুকুম তামিল হল! কুহকময়ী নাইটগাউন সরে গিয়ে প্রকট হল সুন্দরীর ব্র্যান্ডেড অন্তর্বাস! দর্শক তাঁর মাখনের মত শরীরের খাঁজে খাঁজে বাঁকে বাঁকে ডুবতে ডুবতে বলল – ‘একটু নোংরা কথা বলো না প্লিজ!’ 

কোভিড ব্রথেলের ব্যবসা লাটে তুলেছে। কিন্তু অনলাইন সেক্সের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তরোত্তর! কামার্ত পুরুষদের একমাত্র ভরসা ভার্চুয়াল সেক্স সাইটের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। নানারকমের প্যাকেজ! সুন্দরীকে দিয়ে কী কী করানো যাবে তা টাকার অঙ্কের ওপর নির্ভর করে৷ শুধু অনলাইন পেমেন্ট করতে হবে! কে কেমন নারী পছন্দ করে তার ওপরেও নির্ভর করে টাকার অঙ্ক। এই সাইটে কর্মী হিসেবে আছে গৃহবধূ থেকে কলেজগার্ল অবধি সবরকমের সব বয়েসের নারী! সব মিলিয়ে দিনে লক্ষ লক্ষ টাকার রোজগার! তবে এরা কেউ বেশ্যা নয়! হাই প্রোফাইল!

উল্টোদিকের পুরুষ উত্তেজনার চুড়ান্ত সীমায়! ফরাসি সৌরভের গন্ধ মিলিয়ে গিয়ে এখন এ ঘরেও মাংসেরই গন্ধ!

৫.

‘এ কী করলি বাবু’

অসম্ভব বেদনায় আর বিস্ময়ে কাতর স্বরে বলল কমলা! সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কী হল! কেনই বা! 

আজ সপ্তম দিন। আজই পেমেন্টের কথা ছিল। বাবু আগে টাকাটা দিতে চায়নি। বলেছিল – ‘তাড়া কীসের? কাজ শেষ হলেই টাকা পেয়ে যাবি'। উপায়ান্তর না দেখে সে শর্তও মেনে নিয়েছিল কমলা। কোনও প্রতিবাদ করেনি। বাবু যেমন চেয়েছে, তেমনই কাজ করেছে সে।

আজ দ্রুতহাতে জামাকাপড় পড়তে পড়তে বলেছিল – ‘আজই ট্যাকা দিয়ে দিবি বাবু। কতার খেলাব নয়’।

কথার খেলাপ অবশ্য করেনি লোকটা। সঙ্গে সঙ্গেই নির্বিবাদে তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল একটা মোটা খাম – ‘গুনে নে’।

গুনে নিয়েছিল কমলা। একদম কড়কড়ে চোদ্দ হাজার! এক পয়সাও কম বেশি নয়। টাকা গোনা শেষ করেই কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল বাবুর দিকে। বাবু তার মনের ভাব বুঝতে পেরেই মৃদু হেসে বলল – ‘দেখবি? আয়, দেখে যা’।

কমলা আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে দেখল। পরক্ষণেই সর্বশরীরে তড়িদাঘাত! এ কী! ক্যানভাসে এ কে! মুখের আদল হুবহু তার মত, দাঁড়ানোর ভঙ্গিও একই! বুকের কাছেও তার নিজেরই সন্তান ধরা! ক্যানভাসে অবিকল কমলার স্তন্যপানরত তারই রক্তের ধন। কিন্তু এ তো সে নয়! হতেই পারে না!

এই সাতদিন বাবু তাকে ছুঁয়েও দেখেনি। বরং শাড়ি ব্লাউজ খুলে অন্য একটা পোষাক পরে নিতে বলেছিল। পোষাকের একদিক খুলে দিয়েছিল যাতে তার একদিকের স্তন পরিষ্কার দেখা যায় তারপর শিশু সন্তানকে কোলে ধরিয়ে দিয়ে বলল – ‘নে, দুধ খাওয়া!’

এতদূর উজিয়ে এসে শেষপর্যন্ত নিজের সন্তানকে দুধ খাওয়াতে হবে! শেষমেষ এই জিনিস দেখার শখ হয়েছে বাবুর! কমলা অবাক! এর জন্য পার নাইট দু হাজার টাকা! এ আবার কী জাতীয় রসিকতা!

‘কী হল! তাড়াতাড়ি কর!’

বাবু প্রায় খিঁচিয়েই ওঠে। কমলা আর একটিও কথা না বলে কোলে তুলে নিয়েছিল শিশুকে। আর বাবু তুলে নিয়েছিল লম্বাটে চকচকে পেন্সিল। পরবর্তীতে রঙ তুলি!

‘তোকেই তো এঁকেছি!' ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল মানুষটা – ‘শুধু একটু চেঞ্জ করেছি। ক্যানভাসে যাকে দেখছিস সে ...’।

চোখ বুঁজে ফেলল কমলা। তার রুক্ষ গাল বেয়ে নেমে আসছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। ক্যানভাসে ঘিনি আছেন তাঁকে হুবহু কমলার মতই দেখতে। সেই একইরকম লম্বাটে পানপাতা মুখ, ভাসা ভাসা করুণ চোখদুটো দেখছে স্তন্যপানরত শিশুকে। সে চোখে অনাবিল স্নেহধারার সঙ্গে সংশয়ের সঙ্গন। একদিকে একা কুমারী মা কী করে এই অভাবের মধ্যে শিশুকে বড় করে তুলবে, মানুষ করবে সেই দৃশ্চন্তা। অন্যদিকে পরম বাৎসল্য দৃষ্টি চুঁইয়ে পড়ছে! স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাম স্তন। কিন্তু তা কামনার নয়, পবিত্রতার প্রতীক! মাথার ওপরে উড়ছে নগ্ন দেবশিশু! এই ছবির মানুষটির সামনেই মোমবাতি জ্বালায় জ্যাসমিনের মত হতভাগীরা, তাবৎ পৃথিবীর হতভাগ্যরা! ওঁর সামনেই সম্মানে নতজানু হয় গোটা বিশ্ব! কমলার আদলে স্পষ্ট ভাজিন মেরি!

কমলা সজোর শ্বাস টানল। তারপরই মোটা টাকার প্যাকেটটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল অবহেলাভরে!

‘কী হল! ওটা তোর পেমেন্ট! নে!’

বাবু অবাক। কমলা চাপা অথচ দৃঢ়স্বরে বলল – ‘না’।

‘এটাই তো তোর রেট!’

আবার সজোর উত্তর – ‘না!’

‘সে কী! কিন্তু...!’

‘না!’

বুলেটের মত শব্দটা ছুঁড়ে দিয়ে নিজের সন্তানকে বুকে চেপে ধরে তীরবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কমলা। বাবু সবিস্ময়ে দেখল আস্তে আস্তে রাতের অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে এক বারবণিতা ও তার শিশু। না, আর নিজের পরিচিত পাড়ার রাস্তা ধরবে না সে। পোষাক খোলার সর্বাধিক মূল্য আজ পেয়ে গিয়েছে। আর কিছু পাওয়ার নেই! তার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চোয়াল বলে দিচ্ছিল যে আর কখনও শাড়ি খুলবে না ও।

পরদিন সকালের খবরের কাগজের পেজ থ্রি’র অন্যতম হেডলাইন – ‘অতিমারীতে যৌনকর্মীদের পাশে দাঁড়ালেন অভিনেত্রী’!

ঠিক নীচেই ছবি। ওরা দূজন দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ফ্রেমে। মালবিকা ও কমলার মাঝখানে নিরাপদ দুরত্ব হয়তো বা এক মিটার বা ছ’ফুট অথবা হয়তো বা সেই দুরত্ব কয়েক আলোকবর্ষের!

যাই হোক, আদতে এর নাম সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং!

 

সায়ন্তনী পূততুন্ড
লেখিকা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top