সিডনী সোমবার, ৬ই ডিসেম্বর ২০২১, ২২শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

হাসান আজিজুল হক: একজন কথা সাহিত্যিকের প্রয়াণ : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
১৮ নভেম্বর ২০২১ ১৬:০১

আপডেট:
৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩:৩২

ছবিঃ হাসান আজিজুল হক

 

ভারতীয় উপমহাদেশে দেশ ভাগের পর পারস্পারিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য শেষে প্রকট হয়ে উঠে স্বার্থের নগ্নরূপ। তাই পরিবারের সবাই পূর্ব পাকিস্থানে চলে যেতে চাইলেও অবিভক্ত ভারতের এক রমণী অনুভব করে শেকড়ের টান। তার উপলব্ধি “ চারাগাছ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় লাগাইলে হয়, এক দ্যাশ থেকে আরেক দ্যাশে লাগাইলেও হয়, কিন্তু গাছ বুড়িয়ে গেলে আর কিছুতেই ভিন মাটিতে বাঁচে না ”। দেশ ভাগের পর এমনই বাস্তবিক চিত্র আমরা দেখতে পাই হাসান আজিজুল হক রচিত ‘ আগুনপাখি ’ উপন্যাসে। দেশ ভাগের যন্ত্রনার মধ্যেও স্বদেশ ভাবনায় কিভাবে মানুষকে আপ্লুত করে তাঁর লেখাতেই দারুণ ভাবে তোলে ধরেছেন। বাংলা সাহিত্যে হাসান আজিজুল হক কথা সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। মুলত: জীবন সংগ্রামে লিপ্ত সাধারণ মানুষকে বাস্তব জীবনের আঙ্গিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাই সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামকে বাংলা সাহিত্যে বার বার টেনে ধরেছেন।
সাহিত্যে তাঁর অনবদ্য বিচরণ ছাত্রাবস্থায় তাঁকে সমধিক পরিচিতি এনে দেয়। যার প্রভাব ‘ শামুক ’ উপন্যাসে স্পষ্টত লক্ষণীয়। খুব বড় ক্যানভাস নেই, আরপরও জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত এক কেরানীর জীবন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন ‘ শামুক ’ উপন্যাস। তাতে বাস্তবিক জীবনকে অতি সুন্দরভাবে তুলে ধরার চেষ্ট করেছেন। তাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি পুরস্কার প্রতিযোগিতায় প্রধান সাতটি উপন্যাসের একটি বিবেচিত হয় ‘ শামুক ’ উপন্যাস। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে রচনা করেন এই উপন্যাসটি।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন সময়ে তাঁর লিখা ছোট গল্প ‘ আত্মজা ও একটি করবী ’ অতি আগ্রহ ভরে পড়ি। সাহিত্য চর্চা বলতে যা বুঝায় তা তখনো বুঝে উঠেনি। বলতে গেলে তখনো সাহিত্যের আবডালে বিচরণ করা হয়নি। তাই, সাহিত্যের ভেতর থেকে কোন রস বোধ খোঁজে বের করা আমার পক্ষে সহজ ছিল না। তারপরও এ বইটি পড়া শুরু করতে পড়ার উৎসাহ বোধ করি। গল্পটিতে সাহিত্যের ভেতরে প্রকৃত সাহিত্যের মনোভাব ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলেই জীবনযুদ্ধের মানবিক ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে ধরা দেয়। ‘ আত্মজা ও একটি করবী ’ ছোটগল্পে বুড়োর ভাষায়, “আমি একটি করবী গাছ লাগাই বুঝলে? ফুলের জন্য নয়,বিচির জন্য। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে। ” বুড়োর বিক্ষিপ্ত কথোপকথনে মানবিক ট্র্যাজেডি তুলে ধরেছেন। করবী গাছটি একটি প্রতীক মাত্র। মুলত: বুড়োর পরাজিত জীবন যুদ্ধে সমাজকে দেয়া শেষ তিরষ্কারই মুখ্য বিষয! উক্ত গল্পটির ভেতর দিয়ে জীবন-যন্ত্রণা কিংবা দু:খ-কষ্টের নিপুন বাস্তবতায় আমাদের জিজ্ঞাসার সম্মুখে দাঁড় করিয়ে রাখে। তার ভাবনার মিশেলে থাকতো নিম্নবর্গীয় সমাজের বাস্তবিক রূপ। সমাজের নিম্ন শ্রেণীর প্রতিটি মানুষের জীবনকে যেমন চিত্রায়িত করেছেন তেমনি শোষিত সমাজের মাঝেও বেঁচে থাকার আর্তি প্রকাশ করেন। সেজন্যই আমরা দেখতে পাই ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের মাঝে বেদনাহত রুপ নিয়ে সমাজে টিকে থাকার লড়াই। যদিও সে লড়াইয়ে হার-জিত থেকেই যায়।
শৈশবের কাঁটাতার পেরিয়ে তিনি লেখায় মনোনিবেশ করেন। সাহিত্যে ও শৈলীকে এক ভিন্ন আঙিকে তুলে ধরেন। তাই বাংলা সাহিত্যে নতুন আঙ্গিক ধারার প্রথম সারির একজন সাহিত্যিক ছিলেন। জীবনকে নির্মান করতে সকল সময়ই তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে নতুন একটি শিল্প উঠে এসেছে। সে কারণেই তাঁর লিখিত প্রথম গল্প ‘ শকুন ’ এর বিষয় ও আঙ্গিক এক অবিচ্ছিন্ন সত্ত্বায় মিলিয়ে যায়। বস্তুত: তাঁর উপন্যাস ও ছোট গল্পে বাস্তব জীবনের যে নির্মমতা উপস্থাপন করেছেন তা আমাদের অভিজ্ঞতার দিগন্তকে বিস্তৃত করে। ছোট গল্পের মধ্য দিয়েই তাঁর লেখক সত্ত্বার আবির্ভাব ঘটে। শিল্পী মাত্রই চেষ্টা করেন বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাহিত্যে ধারায় প্রবেশ করতে। হাসান আজিজুল হকের বেলায়ও সেরকমই আমরা দেখতে পাই। মুলত: শিল্পী সত্ত্বার বহি: প্রকাশ ঘটে তাঁর ছোট গল্পের মধ্য দিয়েই। এখানেই একজন সাহিত্যিকের মুল ব্যঞ্জনা ধরা দেয়। এভাবেই বাংলা সাহিত্যে বাস্তবিক জীবন ধারা তোলে ধরে তিনি সাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন। অসাধারণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাস্তব জীবনে আঁধারের যবনিকা টানতে চেয়েছিলেন। তাই বাস্তব জীবনের সুখ-দু:খই তাঁর সাহিত্যে বেশি স্থান করে নিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।
হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ২ ফেব্রæয়ারী ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলার যব গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর হাতে চরম নির্যাতীত হন। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে দর্শনে সম্মানসহ ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ারপদের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে একুশে পদক ও ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। সাহিত্য চর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বরে ‘ সাহিত্যরত্ন ’ ঊপাধি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। ১৯৬৭ সালে আদমজীসাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০)। এছাড়াও পেয়েছেন অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে ‘ একুশে পদকে ’ ভূষিত হন। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের জন্য আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। উদ্বাস্তুদের জীবনের দগ্ধতা কিংবা অসহায়ত্ব নিয়ে পাকিস্থানি শাসণের বিরুদ্ধে লড়েছেন। সেজন্যই পাকিস্থানিদের চোখে রুষ্ট ছিলেন। জয় বাংলার চেতনায় তিনি সদা উজ্জীবিত ছিলেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি বহু লেখালেখি করেছেন। একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি।
হাসান আজিজুল হকের নির্বাচিত গল্প-এর ভূমিকায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, এতখানি লিখেও বলা সম্ভব নয়, হাসান কেমন। সে প্রয়াস অক্ষম। তাঁকে জানার শ্রেষ্ঠ উপায়, তাঁকে পড়ে ফেলা। অনাবিল গল্প বলার ভঙ্গি, তরতর করে এগিয়ে চলা। অভিজ্ঞতাঋদ্ধ এক প্রবীণ মানুষ সবার সামনে ঝুলি উপুড় করে দেন, আর সবাই গোগ্রাসে গেলে। তাঁর ভাষা কেমন, বলতে হয় তাঁর গদ্য ধার করেই: ‘নিতান্তই সরল সহজ’।
অনেকদিন অসুস্থ থাকার পর গত ১৫ নভেম্বর মারা যান। তাঁর চিরপ্রস্থান আমাদের সাহিত্য জগতে অপূর্ণতা থেকেই যাবে। সেটি পূরণ করা কখনো হয়তো সম্ভব হবে না। এই বহুমাত্রিক জ্যোতিমর্য়কে নিরব কান্নায় বিদায় জানানো হয়।

 

অনজন কুমার রায়
ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top