সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২০শে জানুয়ারী ২০২২, ৭ই মাঘ ১৪২৮

পক্ষীমানব : গৌতম সরকার


প্রকাশিত:
২ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:১০

আপডেট:
২০ জানুয়ারী ২০২২ ১৩:৪৯

 

ঘর থেকে বেরোতেই পূব আকাশে কাস্তের ফলার মতো আধখানা চাঁদ চোখে পড়লো৷ কালো মেঘের টুকরোগুলো চাঁদের গায়ে পালক স্পর্শ বুলিয়ে ভেসে যাচ্ছে। পাঁচটা বাজতে চললেও সূর্যদেবের ওঠার কোনো প্রস্তুতি চোখে পড়লোনা। নিবারণ দ্রুত পায়ে হেঁটে চলল, মিনিট কুড়ি লাগে শহরতলীর বাইরে ঝিলটায় পৌঁছতে। ঝিল বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, বরং জলা বলাই ভালো। একসময় গোটা এলাকাটি বাদা অঞ্চলের মধ্যে ছিল, চতুর্দিকে জলা আর জঙ্গল। এখন মানুষের চাপে শহর জল-জঙ্গল ঠেলতে ঠেলতে এদিকটায় এসে পৌঁছেছে৷ কিছুটা জায়গায় এখনও হাত পড়েনি, সেখানেই আপাততঃ মিলেমিশে আছে পাখি-পতঙ্গ, জন্তু-জানোয়ার। লকডাউন শুরু হওয়ার পর যখন কাজে যাওয়া বন্ধ হল, তখন ঘুরতে ঘুরতে এই জায়গাটার সন্ধান পেয়েছে নিবারণ।
সকালের দিকে এদিকটায় কেউ আসেনা, এখানে এসে সে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়, এখানকার অগণিত অধিবাসীদের সাথে মন খুলে কথা বলে, শাসন করে, আদর করে। মিনতি প্রথমে বেশ আপত্তি করেছিল, এই রোগের সময় রাত থাকতে তার এই বেরিয়ে আসা নিয়ে অনেক অশান্তি করেছে। নিবারণ শরীর-স্বাস্হ্যের অজুহাত দিয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজ করেছে৷ কাঁধের ঝোলাটা মাটিতে নামিয়ে রাখলো নিবারণ, ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে জল খেল। পূব আকাশ আস্তে আস্তে লাল হচ্ছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে বিল সংলগ্ন জল-জঙ্গল জেগে উঠছে। দিন দিন নতুন নতুন পাখি ঝিলে এসে বাসা বাঁধছে, ঝিলের জল স্বচ্ছ হয়ে উঠছে৷ নিবারণ অত না বুঝলেও শুনতে পায় লকডাউনে কলকারখানা বন্ধ থাকার কারণে পরিবেশ দূষণ কমেছে। কাগজে, টিভিতে দেখিয়েছে শহরের বড় বড় রাস্তায় বুনো জন্তু, জানোয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছে। চিড়িয়াখানার ওভারশিয়ার পালসাহেবের মুখে কয়েকটা শব্দ প্রায়ই শোনে, পলিউশন, ইকোসিস্টেম, বাস্তুতন্ত্র। একদিন সাহস করে নিবারণ জিজ্ঞাসা করেছিল, “এগুলোর মানে কি?” পালসাহেব খুব যত্ন করে বুঝিয়েছিলেন- "এই পৃথিবীটা সবাইকার, বেঁচে থাকতে গেলে সবাইয়ের সবাইকে দরকার। সে একটা ছোট পিঁপড়ে হোক, বা অতিকায় হাতি হোক। এমনকি এই চিড়িয়াখানায় জঙ্গলের জীবকে আটকে রাখাও অন্যায়৷ এসব হচ্ছে মানুষের লোভের কারণে।" আরও অনেক কিছু বলেছিলেন, সব কথা নিবারণের মাথায় ঢোকেনি।
ছোটবেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি নিবারণের ভালোবাসাটা অকৃত্রিম। সে রাস্তার কুকুর, বেড়াল হোক বা লোকের বাড়ির পোষা টিয়া, ময়নাই হোক৷ তাদের বাদা অঞ্চলে পশুপাখির কোনো অভাব ছিলনা, হামাগুড়ি দেওয়া বয়স থেকেই তাদের সাথে সখ্যতা হয়ে যেত। স্কুলের পড়া শেষ করতে পারেনি, এদিক সেদিক টুকটাক কাজ করতে করতে চিড়িয়াখানায় এই টেম্পোরারি কাজটা জুটেছে। কাজটা নিবারণের বড় প্রিয়। তাকে পশুপাখিদের খাবার দেওয়ার কাজে সাহায্য করতে হয়। মুখ্য দায়িত্বে থাকে সুখন, রঘুবীর, ব্রজেশ, শ্যামলদা, আর ওরা কয়েকজন হেল্পার। এই কাজে পশুপাখিদের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা হয়, আদর-শাসন করা যায়, সবচেয়ে বড় কথা কয়েকদিনের মধ্যেই ওদের বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়৷

গোটা ঝিল জুড়ে এখন পাখির ডাকাডাকি। নিবারণ এখানে একমাস আসছে। পাখিগুলো ইতিমধ্যেই ওকে চিনে ফেলেছে। এবার সব পায়ে পায়ে এগিয়ে আসবে। নিবারণ মাটিতে একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে পড়েছে। ব্যাগ থেকে বেরোচ্ছে ছোট ছোট বাটি। এবার বেরোলো বেশ কয়েকটা কাগজে মোড়া প্যাকেট, তার কোনোটায় চালের গুঁড়ো, গমের খুদ, মুড়ি, সাগু দানা, রুটির ছোট ছোট টুকরো। একটু একটু করে সব পাত্রতে সে খাবার ভরতে থাকে। ইতিমধ্যে চারপাশে হাজির হয়েছে শালিক, দোয়েল, তিতির, বাবুই, শ্যামা, ফিঙের দল। নিবারণ আড়চোখে তাকিয়ে দেখে। সোজাসুজি দেখলে হবেনা, তাহলেই বিচ্ছুগুলো এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে। খাবারগুলো ঠিকঠাক গুছিয়ে দেবার সময় এই অভিনয়টুকু করতেই হয়। প্রথম প্রথম এদের সভ্য করতে কম ঝামেলা পোহাতে হয়েছে! যত না খেত তার চেয়ে ছড়াতো বেশি। নিবারণের শাসনে এখন তারা একটু সভ্য হয়েছে। একটা বাটিতে দুজনের বেশি বসতে দেয়না, খাবার ছড়ালে বকুনি বা হালকা পিটুনিও দিয়ে থাকে। খাবার গুছিয়ে নিবারণ ডাক দেয়, পাখির দল গুটি গুটি এগিয়ে আসে৷ যারা বাটির খাবারে লাইন পায়না, নিবারণ তাদের জন্য ব্যাগ থেকে দুহাত ভরে খাবার বার করে হাত দুটো উঁচু করে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমান পাখিগুলো উড়ে এসে তার কাঁধে, পিঠে, হাতে, মাথায় এসে বসতে লাগল৷ সবাই মিলে ঠোঁট ডুবিয়ে তার হাতের খাবার খেতে থাকে৷ এ এক অন্য জগৎ, এ জগতের বাসিন্দা কেবল একটি মানুষ আর অগণিত পাখি। এখানে অন্যদের প্রবেশাধিকার নেই।

দিন দিন দেশের অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। মানুষের দুর্দশা বেড়ে চললো। প্রায় দশমাস চলার পর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের মাহিনা বন্ধ করে দিল। নিবারণের মাথায় বাজ পড়ল৷ সকালে সে কোথায় যায় সেই রহস্য নিবারণ উন্মোচন করে দিয়েছে, তানাহলে কাঁহাতক মিনতিকে লুকিয়ে খুদ-মুড়ি-রুটি জোগাড় করবে। মিনতি মানুষটার জানোয়ার প্রীতি জানে, তাই খুব খুশি না হলেও বাধা দেয়নি। এতদিন নিজে হাতেই পাখিদের জন্য খাবার ধরে দিচ্ছিল। কিন্তু মাইনে বন্ধ হওয়ার খবর শুনে আর কি সে খাবার দেবে! নিবারণ চিন্তায় পড়ে গেল। তার পক্ষীবিহারের খবরে ছেলে-মেয়ে দুজনেই খুব উত্তেজিত। ছেলে তো আবদার ধরেছিল, তাকে একটা পাখির ছানা এনে দিতে হবে, সে খাঁচায় রেখে পুষবে। তাকে অনেক বুঝিয়ে তবে রেহাই পেয়েছে। এছাড়া বাচ্ছাদুটোর তার সাথে পাখি দেখতে যাওয়ার আবদারও সে রাখতে পারেনি। নিবারণ জানে, সঙ্গে অচেনা লোক থাকলে একটা পাখিও তার খাবার খেতে আসবেনা। সুখন বলতো, “নিবারণ তুই জাদু জানিস। এই কদিনে পশু-পাখিগুলোকে যতটা পোষ মানিয়েছিস, আমরা এতদিনেও পারিনি”৷ চিড়িয়াখানা বন্ধ হওয়ার কয়েকমাস আগে বাংলাদেশ বর্ডারে তিনটে ধনেশ পাখির বাচ্ছা ধরা পড়লো। তাদের নিয়ে আসা হল চিড়িয়াখানায়। রোগা, ডিগডিগে, লোমওঠা তিনটে অর্ধমৃত জীব, বুকের ধুকপুক প্রায় বোঝাই যাচ্ছেনা। সেই বাচ্ছাগুলোকে তারা খুব যত্নে বাঁচিয়ে তুলেছিল। যত বড় হতে লাগলো, পালকে নতুন নতুন রঙের পোঁচ লাগতে লাগলো। তিনমাস যেতে না যেতেই পাখিগুলো রূপের জৌলুসে চিড়িয়াখানায় অন্যতম দ্রষ্টব্য হয়ে উঠল। সেই তিনটে ধনেশের মধ্যে একটা মেয়ে, বাকি দুটো ছেলে। একদিন নারীর অধিকার নিয়ে দুই পুরুষ ধনেশের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। দুজনেই চোট পেল, কেটে-ছিঁড়ে গেল। চিড়িয়াখানার ডাক্তারবাবু এসে সব দেখে ওষুধ দিলেন। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো, লড়াই করল ছেলে পাখি দুটো, কিন্তু মেয়ে পাখিটা খাওয়া বন্ধ করে দিল। সবাই ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। আবার ডাক্তারবাবুর ডাক পড়লো, তিনি সব দেখেশুনে শরীরে কোনো সমস্যা খুঁজে পেলেন না। কর্মীদের অবস্থাও তথৈবচ। তিনদিন যাওয়ার পর, নিবারণ পালসাহেবের কাছে অনুমতি নিয়ে পাখির খাঁচায় ঢুকলো। তবে সে শর্ত দিল, যে সময়ে সে খাঁচায় থাকবে কেউ আশেপাশে থাকতে পারবেনা। খাঁচায় ঢুকে মেয়ে পাখিটাকে কিছু না বলে ছেলেপাখি দুটোকে তাড়িয়ে একদিকে নিয়ে গেল। হাতে নিল একটা ছিপটি। পাখি দুটো চুপ করে দাঁড়িয়ে নিবারণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। নিবারণ নিজের কায়দায়, কথা শুরু করলো। চোখ-হাত নাচিয়ে ভর্ৎসনা বানীর সাথে সাথে হাতের মৃদু আঘাতে পুরুষ পাখী দুটোকে চাঁটি দিতে লাগলো। তারপর মেয়ে পাখিটাকে আড়াল করে ছিপটির বাড়ি পড়তে লাগলো, সপাৎ...সপাৎ। সেগুলো সে মাটিতে আছড়াচ্ছিল, পাখিদের শরীরে নয়। এই আকস্মিক আওয়াজে ভয় পেয়ে ছেলে পাখিদুটো চিৎকার করতে করতে সারা খাঁচাময় উড়ে বেড়াতে লাগলো। এতক্ষণ মেয়ে পাখিটির টনক নড়েছে, সে গোঁসাঘর ছেড়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে। নিবারণ তাকে দেখানোর জন্য আরোও জোরে জোরে বকতে লাগলো, আর হাতের ছিপটিটা বাতাসে চালাতে লাগলো। এবার মেয়ে পাখিটাও ভয় পেয়ে গেল, সে উড়ে ছেলেপাখি দুটোর কাছে চলে এল। তাদের রক্ষা করতে না শাস্তি সমানভাবে ভাগ করে নিতে সেটা বোঝা গেলনা৷ তবে নিবারণের উদ্দেশ্য সফল হল। গোঁসা ভেঙে মেয়ে পাখিটি আবার খাওয়া-দাওয়া শুরু করলো। চিড়িয়াখানার সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
মাঝে একদিন নিবারণ ঝিলে গিয়ে দেখল, ফিঙের একটা বাচ্ছা পা ভেঙেছে। নিবারণ বিপদে পড়ল, তার বাড়িতে ওষুধ-ব্যান্ডেজ থাকলেও সেগুলো তো সঙ্গে আসেনি৷ আবার এটাও বুঝলো ওষুধ, ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিলেও এই খোলা আকাশের নিচে জল লেগে ঠান্ডায় ক্ষত আরো বেড়ে যাবে। সে তখন নিজের কায়দায় মা ফিঙেটার মাথায়, পালকে হাত বোলাতে শুরু করলো। একহাতে অসুস্থ বাচ্চাটা নিয়ে অন্য হাতে মা ফিঙেকে আদর করতে করতে বিড়বিড় করে অনেক কথা বলে যেতে লাগলো। পাখিদের খাইয়ে যখন অসুস্থ বাচ্চাটাকে নিয়ে সে বাড়ি ফিরছিল, মা ফিঙে অনেকক্ষণ তাদের অনুসরণ করেছিল, কিন্তু অশান্তি করেনি। পাখিছানা দেখে বাড়িতে ছেলেমেয়ের আনন্দ আর ধরেনা। দুদিন ধরে দুজনে অক্লান্ত সেবায় পাখিটাকে সুস্থ করে তুলল এবং তৃতীয় দিন সকালে জলভেজা চোখে বাচ্চাটাকে বাবার হাতে তুলে দিল।
আজ তিনদিন বাড়ির সবাই একবেলা খেয়ে আছে। গত সাতদিন নিবারণ ঝিলের ধারে যায়নি। যাবে কি করে ! একটুকরো খাবারও ওদের জন্যে বাঁচাতে পারেনি। এখন চাল-ডালের খুদ দিয়ে মিনতি খিচুড়ি রাঁধছে, যেটুকু মুড়ি ছিল, বাচ্ছারা রাত্রে এক গাল করে খেয়ে শুয়ে পড়ে, তাই ঝিলের অগণিত সন্তানসন্ততিদের জন্যে কিছু বাঁচিয়ে উঠতে পারেনি। রাত্রে শুয়ে নিবারণের চোখ জলে ভরে যায়। তার কষ্ট বুঝে মালতি সান্ত্বনা দেয়, “আরে পশু-পাখি কি না খেয়ে থাকবে! ওরা ঠিক খুঁজে খুঁটে পোকামাকড়, ফলপাকড় খেয়ে পেট ভরিয়ে নেবে। তুমি এত চিন্তা কোরোনা”। রাত্রে নিবারণ স্বপ্ন দেখলো, ঝিলপাড়ে যে জায়গাটায় গিয়ে সে বসে সেখানে অন্ধকারে ঘেঁষাঘেঁষি করে অজস্র পাখি দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ক্লান্তি আর ঘুমে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে। সকাল থেকে অপেক্ষায় থেকে তারা ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, তবুও জায়গা ছেড়ে নড়েনি। তারা কি অনন্তকাল নিবারণের অপেক্ষায় ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে! নিবারণের ঘুম ভেঙে যায়, সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। উঠে বসে একটু দম নেয়, বাথরুম থেকে ঘুরে এসে দেখে চারটে বাজে। চুপি চুপি কাউকে না জাগিয়ে তৈরি হতে থাকে৷ আজ যদিও তৈরি হওয়ার কিছু নেই। ব্যাগ, বাটি কিছুই তো গোছানোর নেই। শুধু বেরোবার সময় চুপিচুপি বাচ্ছাদের জন্য মিনতির না খেয়ে রাখা রুটির টুকরোটা পকেটে ভরে বেরিয়ে পড়ল৷

দূষণহীন পৃথিবীতে ভোর হচ্ছে। রাস্তার আলোগুলো সারা রাতের ডিউটি সেরে এখন ক্লান্ত, ম্রিয়মাণ। আলো-আঁধারি পথ ধরে দ্রুতপদে হেঁটে চলেছে একজন মানুষ, কোনোদিকে তার লক্ষ্য নেই। আশপাশের ঘরের দরজা-জানালাগুলো শক্ত করে আটকানো। রাস্তার কুকুরগুলোও এই ভোর রাত্রে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় মানুষটা। দূর থেকে ঝিলটাকে একটা অন্ধকার মাখা মরুদ্যান মনে হচ্ছে। এই একমাত্র জায়গা যেখানে করোনা মহাব্যধি ছুঁতে পারেনি। কিন্তু ঝিলটা এত শান্ত কেন! এতক্ষন তো এখানকার অধিবাসীদের দৈনন্দিন কাজকর্ম শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। আস্তে আস্তে সে নিজের জায়গায় এসে দাঁড়ায়। কান খাড়া করে কোথাও কোনো ডাক বা ডানা ঝাপটানোর শব্দ কানে এলোনা। এবার দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত আওয়াজ তোলে মানুষটা। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ, আস্তে আস্তে খসখস আওয়াজ হয়, পাতার, খড়-বিচালির। ধীরে ধীরে একটা একটা পাখি বাসা থেকে সতর্কতার সাথে মাথা বের করে। এক আধটা পাখি ডেকে ওঠে। সেই ডাক শুনে আরও অনেক পাখি ডাকতে শুরু করে। তারপর আশপাশের সমস্ত গাছ, ঝোপঝাড় থেকে পাখির দল আনন্দে চিৎকার করতে করতে উড়ে আসতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে মানুষটা পাখির ভিড়ে ঢাকা পড়ে যায়। তার হাত, কাঁধ, মাথা, পায়ে সব বসে পড়ে। তাদের ছোট ছোট ঠোঁটের আদুরে ঠোকায় অভিমান ঝরে পড়ে, কেউ একবারের জন্যেও খেয়াল করেনা আজ তাদের বরাদ্দ খাবার আসেনি। তবু মানুষটার কষ্ট হয়, খুব কষ্ট হয়। কোনরকমে পকেটে হাত ঢুকিয়ে রুটির টুকরোটা বের করে আনে। কিন্তু একটা পাখিও সেই রুটির দিকে নজর দেয়না। বন্ধুকে এতদিন পর ফিরে পাওয়ার আনন্দে তারা মশগুল। আরও শত শত পাখি মাথার ওপর গোল হয়ে উড়তে থাকে। গায়ে বসা পাখিগুলো তাদের ঠোঁট আর নরম পাখার পরশে অভিমান ভুলে আদর জানাতে থাকে। মানুষটার চোখ দিয়ে দরদর জল গড়াতে থাকে। দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে সারা শরীরে পাখিদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষটা। পূব আকাশ লাল রঙে রাঙিয়ে সূর্য উঠছে। কামরাঙা আলোয় তাকে একজন পক্ষীমানব বলে মনে হয়।

 

গৌতম সরকার
কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top