সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২০শে জানুয়ারী ২০২২, ৭ই মাঘ ১৪২৮

আকাশের ঠিকানায় লেখা পত্র : শাকিলা নাসরিন পাপিয়া


প্রকাশিত:
১২ জানুয়ারী ২০২২ ১৩:৫৮

আপডেট:
১২ জানুয়ারী ২০২২ ১৪:০০

 

বিপু
অপারেশর রুমে ঢুকেই যন্ত্রপাতির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এমনই একটা রুমে অপরিচিত মুখগুলো দেখতে দেখতে চলে গিয়েছিলি তুই।
একটাও স্বজন ছিল না হাত ধরে দাঁড়িয়ে। কিছু কি বলার ছিল? যাবার বেলায় কি একবারও খুঁজেছিলি আমায়?এবার আমার অনুমতি লাগল না, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি লাগল না, ভয়ে হাত আকড়ে ধরারও প্রয়োজন হলো না।
আকাশ পানে তাকাই। অসীম রহস্য বিরাজমান সেখানে। ক্ষণে ক্ষণে রঙ, রূপ বদলে যায়।
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। বুকের ভিতর চাপ চাপ কষ্ট। কষ্টগুলো উড়িয়ে দিতে, ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। পারি না।
ইচ্ছে করে আকাশ, নদী, সাগর, পাহাড়, অরণ্য খানখান হয়ে যাওয়ার মতো করে একটা গগনবিদারী চিৎকার পৌঁছে দেই ঐ দূর দূরান্তে।
একটা প্রশস্ত বক্ষ খুঁজছি তোর চলে যাবার পর থেকে। চোখের প্লাবনে সে বক্ষ ভাসিয়ে দেবার বাসনায় অপেক্ষায় আছি।
হাজার মানুষের কোলাহলেও কখনো কখনো একা হই।হঠাৎ নীরবতা নামে ব্যস্ত জীবনের বাঁকে।
দম বন্ধ হয়ে যাওয়া নিঃশ্বাস, ভিজে ওঠা চোখকে শাসন করি।
হাসপাতালে যাবার পথে যে কাঁধে ছিল তোর মাথা সে অদৃশ্য মাথাটা কাঁধে বহন করি এখনও।
পঞ্চাশে পৌঁছেও বড় হওয়া হয় না তোর। কে জানে আমিই হয়তো বড় হতে দেইনি কখনো।
চলে গিয়ে ছোট একটা চড়ুই পাখি হয়ে গেলি তুই। চলে গিয়ে জানিয়ে গেলি, সারা পৃথিবী জুড়ে কতোটা জায়গা জুড়ে ছিলি।
বুকের গভীরে কোথায় ছিল শুধুই তোর একাধিপত্য। কতোটা দাপটে দাপিয়ে বেড়িয়েছিস আমার গোটা জীবন।
অপু আর দূর্গার মতো আঁচল ধরে ছুটে বেড়ানো জীবন আমরা পেরিয়ে ছিলাম বহুকাল। তারপরও আঁচলটা ছাড়া হয়নি তোর।
আকাশে মেঘ দেখলে, খবরে কাওরান বাজারে মারামারি দেখলে, রাস্তায় বাস নেই জানলে, বাড়ি ফেরার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে বুকের মাঝে অজানা কত আশংকা জেগে উঠতো।
বড় হয়ে গেছিস, নিজের একটা জীবন হয়েছে, কোন যুক্তিই মাথায় থাকতো না।
আমি নেই পাশে তার মানে তোর জ্ঞান, বুদ্ধি, বয়স কোনটাই কাজে আসছে না।
সবাই বড় হয়, দায়িত্ববান হয়। তুই কেন বড় হলি না?
জীবনের জটিলতা, সম্পর্কে জটিলতা, স্বার্থের জটিলতা কোন কিছুই তোকে স্পর্শ করল না কখনো। শুধু কাজ আর কাজ। কেন অন্যদের চেয়ে বেশি কাজ করবি সেটাও ভাবতে বসিসনি কখনো।
এতো বোকা কেন তুই? আমার সংসার আছে, স্বামী আছে, সীমাহীন সমস্যা আছে তারপরও সব আমায় কেন বুঝতে হবে?
সব দায়, সব সমস্যা আমায় দিয়ে কেমন হাসতে হাসতে চলে গেলি।
ফাঁকিবাজ ছোট থেকেই ছিলি। সংসারের ভিতর বাহির সব দায় ছিল আমার। তোকে কোন কাজে, কোন দায়িত্বে কেউ কখনো পায়নি।
আমার লাশটা কাঁধে বহনের দায়িত্বটাও ফাঁকি দিলি শেষ পর্যন্ত। আজন্ম চোখের জল, বুকের দীর্ঘশ্বাস উপহার দিয়ে কেমন নিশ্চিন্তে চলে গেলি।
আমার যন্ত্রের মত কেটে যাওয়া জীবনের প্রতিটি স্মৃতিতে, ঘরের সোফায়, কম্পিউটার টেবিলে, পানি আনার গ্যালনে, বাজার আনার সবজিতে, সি এন জির ভিতরে কাঁধে মাথা রাখায়, মেডিকেলের বেডে, গভীর রাতের নির্ঘুম চোখে কোথায় নেই তুই?
এতো স্মৃতি আমি কী দিয়ে মুছবো?
ফাঁকা হয়ে যাওয়া, শূন্য বুকটা কী দিয়ে পূর্ণ করবো বলতে পারিস?
কত প্রিয়জন চলে গেল। কত হাহাকার, কষ্ট রেখে গেল কিন্তু তুই তো রেখে গেলি আজন্ম চোখের জল। করে গেলি নিঃস্ব।
কোন সাহিত্য কি পেরেছে এ কষ্টকে তুলে আনতে? আমার জানা নেই।
তুই চলে না গেলে তো জানাই হতো না কতোটা ছিলি হৃদয় জুড়ে, জীবন ঘিরে।
মহান সৃষ্টিকর্তা আমায় মাঝে মাঝে অনেক বিষয় বুঝতে সাহায্য করেন। হয়তো এটাও একটা। অজানাকে জানালেন তিনি।
আমাকে ছাড়া এখন দিব্যি চলে যায় তোর। কোথায় গিয়েছিলি, কেন দেরী হলো, কেন এটা খাবি না, কেন এতো মাংস খেতে হবে -- কত কত অভিযোগ জবাবদিহি। সব মুক্ত হয়ে কেমন আছিস তুই?
ভাল থাকিস তাঁর কাছে। একাকী উদাসী দুপুর, আলো নিভে আসা সন্ধ্যা বা মধ্যরাতের নির্জনে চোখ রাখি আকাশ পানে।
তুই কি আমায় দেখিস? সর্বহারা, নিঃস্ব, রিক্ত ভাইহারা এক বোনের চোখের জল, হৃদয়ের হাহাকার তোকে কি স্পর্শ করে? ছোট্ট পাখি হয়ে থেকে যাওয়া আমার যন্ত্রণা দগ্ধ বুকের কান্না কি বুঝতে পারিস?

ভালো থাকিস। জটিলতাবিহীন আনন্দ তোকে ঘিরে থাকুক আনন্দলোকে।

ইতি
তোর বোন

 

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
শিক্ষক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top