সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

খাদ : রুদ্র মোস্তফা


প্রকাশিত:
৬ এপ্রিল ২০২২ ১৩:২৯

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৫:০২

ছবিঃ রুদ্র মোস্তফা

 

আমরা ভাই-বোনেরা একদিন খাদে পড়ে গেলাম। পড়ে গেলাম বলতে আমাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হলো। কে ফেলে দিলো তা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। আমাদের খাদে পড়ার আগের কথা বলি। প্রথমেই বলতে হয় মা'র কথা। আমাদের মা ভীষণ রূপবতী। শ্যামল মায়ের যেমন ছিলো রূপ তেমনি তিনি ছিলেন ঐশ্বর্যশালী। মায়ের রূপ এবং ঐশ্বর্যের খবর ছড়িয়ে পড়েছিলো চারিদিকে। মা ছিলেন ভীষণ মমতাময়ী। দূর দুরান্ত থেকে মাকে দেখতে ছুটে এসেছিলো লোকজন। তারা মূলত এসেছিলো মায়ের রূপ লাবণ্য এবং ঐশ্বর্য লুট করতে। কিন্তু মা তাদের অতিথি ভেবে বাংলো ঘরে থাকতে দিয়েছিলেন। আপ্যায়নও করেছিলেন সাধ্য মতো। কিন্তু তাদের চোখ বারবারই ঘুরে ফিরে আছড়ে পড়ছিলো মায়ের অন্দর মহলে। আমাদের বুঝের বয়স ততোটা হয়নি। তবু আমরাই ছিলাম মায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। ওরা তাই প্রথমেই আমাদের ভাইদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিলো। লাঠিলজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে প্রথমে কাছে টেনে নিলো। আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম লাঠিলজেন্স দেখে আমাদের জিভ থেকে যে লালা পড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি লালা ঝরছে ওদের চোখ থেকে। মানুষের চোখেও যে লালা থাকে তা দেখে আমরা রাগ করার পরিবর্তে বিস্মিত হয়েছিলাম। আদতে সেটাই ছিলো আমাদের মস্ত বড় একটা ভুল। দাস প্রথা তখন ছিলো কি ছিলো না মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে আমাদের মাঝে কেউ একজন স্বেচ্ছায় প্রথম ওদের দাস হয়েছিলো। সেটা কী জন্য হয়েছিলো জানি না। তারপর হয়ত আরও একজন। তারপর আরও একজন। আমার ক্ষেত্রে এসে বাঁধে বিপত্তি। কেনো না আমি তখন ছিলাম মায়ের কাছাকাছি। আমাকে মায়ের কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিলো মায়ের দিকে। আমার হাতে কোনো অস্ত্র ছিলো না। থাকলেও লাভ হতো না । কেননা আমি অস্ত্র চালাতে জানতাম না। আমার চিৎকারে আমার আর তিনভাই মুহম্মদ, কৃষ্ণ আর যিশু ছুটে এসেছিলো। ওরা ভাইদের বলেছিলো, এই বুদ্ধুটাকে নিয়ে আর পারি না। দেখো তো কতোগুলো লজেন্স পকেটে পুরেছে। ভাইয়েরা দেখলো সত্যি সত্যি আমার পকেটে অনেকগুলো লজেন্স। ভাইয়েরা অবাক হলো। কেনো না আমাদের সবাইকে ওরা সমান করে লজেন্স দিয়েছিলো। ভাইয়েরা নিজেদের পকেটের লজেন্স বের করে গুনতে শুরু করলো। কী যে আশ্চর্য জোছনা উঠেছিলো সেদিন। সেই জোছনায় ভাইয়েরা আবিষ্কার করলো তাদের একেকজনের কাছে একেক রকমের লজেন্স। কিন্তু কারো লজেন্সের সংখ্যাই এক নয়। ভাইদের মধ্যে ঢুকে পড়লো সন্দেহ। জোছনার আলোয় সন্দেহের পর্দা ঢেকে দিলো আমাদের মায়ের দিকে বাড়ানো ওদের হাত। ভাবছেন এত কিছু ঘটার পরও আমাদের মা কেনো চুপ ছিলেন? তিনি কেনো চিৎকার করে ছেলেদের বলেননি, ওরে তোরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করিস না। আমাকে লুট করতেই ওরা তোদের মাঝে বিভেদ ঢুকিয়ে দিয়েছে? হ্যাঁ এমন ভাবনা মাথায় আসা খুব স্বাভাবিক। আসলে আমাদের মা খুব রূপবতী, ঐশ্বর্যশালী সবই ঠিক আছে। কিন্তু মায়ের একটা ত্রুটিও আছে। সে কথা না হয় থাক। সন্তান হিসেবে মায়ের ত্রুটি বলতে কারই বা ভালোলাগে বলুন৷ তারপর কতোদিন গেছে জানি না৷ মাকে অনেক দিন গহনা পরতে দেখিনি। এরপর এটাসেটা নিয়ে আমার ভাইদের গণ্ডগোল হতেই থাকতো। একদিন আমরা চার ভাই লক্ষ করলাম মা একেবারেই নিরাভরণ। মায়ের চোখ টলটল করছে। মাকে ভীষণ দারিদ্র আর মলিন দেখাচ্ছে। আমরা সমস্বরে জানতে চাইলাম আমাদের মায়ের ঐশ্বর্য কই? আমরা ওদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করলাম। ওরা পশ্চিম পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করলো। আমরাও ছুটলাম ওদের পিছু। আমাদের পিছু পিছু ছুটলেন আমাদের মা। মায়ের সেই একটিমাত্র ত্রুটি পাহাড়ের মতো বড়ো হয়ে মাকেই আড়াল করে দাঁড়ালো৷ আমাদের মা কথা বলতে পারতেন না। তিনি ছিলেন বোবা। আমরা ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। ওরা তখন থামলো। আমরা জানতে চাইলাম আমাদের মায়ের অলংকার কোথায়? সেগুলো ফিরিয়ে দাও। তারা তখন বললো, তোমাদের পকেট পরীক্ষা করো। ওখানেই তো সব আছে। আমরা আমাদের পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম আমাদের পকেট খাদ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই পাহাড়ের ওপাড় থেকে বাতাসের কান্নার মতো ভেসে এসেছিলো কার যেনো কণ্ঠ। কে যেনো বলছিলো, রাজনীতি ওদের ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দিলো। অথচ আমরা তখন ঢুকে পড়লাম যে যার পকেটে।
সমাপ্ত

 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top