সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

ঈশ্বরের মৃত্যু : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
১৩ এপ্রিল ২০২২ ১৫:২৮

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৩:৪৬

 

বাইরে অপেক্ষা করছে একটি ফিটন গাড়ী এবং একটি বগী গাড়ী। বগী গাড়ী যা কেবলমাত্র একটি ঘোড়া টেনে নিয়ে যায়। উত্তরপাড়ার বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে ঈশ্বরচন্দ্র আর সবার সাথে ফিটন গাড়ীতে উঠতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় সেই বগী গাড়ীর চালক এসে হাতজোড় করে অনুরোধ করলেন ঈশ্বরকে "বিদ্যাসাগর মহাশয় আপনি অনুগ্রহ করে আমার গাড়ীতে আসুন। আপনার মতো বিদ্বান, সজ্জন ব্যক্তি আমার গাড়ীতে উঠলে গাড়ী আমার ধন্য হয়ে যাবে।" তিনি করুণার সাগর, দয়ার সাগর, ফেলতে পারেন না কারো অনুরোধ। ঈষৎ হেসে ঈশ্বর রাজী হয়ে গেলেন। শুধু গাড়ীতে উঠে বললেন "বাপু হে, গাড়ী সাবধানে চালিও। আমি এর আগে কোনোদিন বগী গাড়ীতে চড়িনি।"
"ও নিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার এই ঘোড়া আমার সব কথাই শুনে চলে।"
এরপরে আর কিছু বলা শোভা পায় না। ঈশ্বরচন্দ্র চালকের পাশে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলেন। গাড়ী চলতে শুরু করলো। সঙ্গের ফিটন গাড়ীটিতে ছিলেন মি. আটকিসন, মি. উড্রে (ভারতের ব্রিটিশ রাজের উচ্চপদস্থ কর্মচারী) ও মিস মেরি কার্পেন্টার, ব্রিস্টল শহর থেকে এসেছেন ভারতে নারী শিক্ষার প্রচার ঘটাতে। আর এই কার্যে ভারতে নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা যার হাতে, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছাড়া কেই বা হতে পারে যোগ্য উপদেষ্টা? গাড়ী ছুটে চলেছে উত্তরপাড়ার রাস্তা দিয়ে। রাস্তার একপাশে সবুজ গাছপালার ফাঁক দিয়ে মনোরম ভঙ্গীতে বয়ে চলেছে গঙ্গা। এই অপরাহ্নে একঝলক টাটকা বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে পথিকদের। উত্তরপাড়া ছাড়িয়ে বালিতে ঢুকলো গাড়ী। রাস্তা এখানে একটা বাঁক নিয়েছে। সঙ্গের ফিটন গাড়ী অসাধারন মুন্সীয়ানায় গতি কমিয়ে বাঁক পেরোল। কিন্তু বগী গাড়ীর ঘোড়া দ্রুত গতিতে বাঁক পেরোতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে চালক, আরোহী সবাইকে নিয়ে উল্টে গেলো। পথের উপর ছিটকে পড়লেন ঈশ্বরচন্দ্র ও চালক। মুখ থুবড়ে ঘোড়াও মাটিতে পড়ে পরিত্রাহী চিৎকার করে উঠবার জন্য পা ছুঁড়তে লাগলো। আকস্মিক ছিটকে পড়ে পেটে প্রচন্ড আঘাত লেগে অজ্ঞান হয়ে গেলেন বিদ্যাসাগর। আশেপাশের পথচারীরা ভিড় করে ঘোড়ার পায়ের কাছে অচেতন বিদ্যাসাগরকে দেখেও কেউই এগিয়ে এসে তাঁকে ঘোড়ার পায়ের কাছ থেকে সরাবার উদ্যোগ নিলোনা। অচেতন বিদ্যসাগরকে দেখে চিনতে পেরে এক পথচারী চীৎকার করে উঠলো "আরে এ যে বিদ্যাসাগর যে ধরে ধরে বেধবাদের বিয়ে দেয়। " ইতিমধ্যে ফিটন গাড়ী থামিয়ে মি. এটকিসন, মি. উড্রে, আর মিস মেরী কার্পেন্টার| দ্রুত ছুটে এসে ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াটিকে সেই স্থান থেকে অপসারিত করলেন। নয়তো ঘোড়ার পদাঘাতেই ঈশ্বরের মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিলো। মিস কার্পেন্টার পথের মধ্যে বসে পড়ে কোলে তুলে নিলেন অচেতন বিদ্যাসাগরে মাথা। নিজের ধবধবে সাদা রুমাল দিয়ে বিদ্যাসাগরের গায়ের ধূলি কাদা পরিমার্জিত করে দিলেন। ব্যথায় অচেতন বিদ্যাসাগরকে নিয়ে কলকাতায় ডা: মহেন্দ্রলাল সরকারকে দেখানো হলো। মহেন্দ্রলাল পরীক্ষা করে জানালেন লিভারে প্রচন্ড আঘাত লেগেছে ও লিভার উল্টে গেছে। মহেন্দ্রলালের চিকিৎসায় বেঁচে গেলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে আর পারেন নি বিদ্যাসাগর। এর পরেও সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। আমৃত্যু বহন করেছিলেন যকৃৎ এর এই সমস্যা।
শরীর অসুস্থ হতে পারে কিন্তু তাঁর তো বসে থাকলে চলবে না। নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদির প্রসার, সামাজিক অশিক্ষা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই, সাহিত্য সাধনা, দীন দু:খী, আর্তের পাশে থাকা, শিক্ষকতা, যাবতীয় ক্রিয়াকর্মের তিনি প্রধান হোতা। জীবনভর সংগ্রাম করেছেন শৈশব কৈশোরে দারিদ্রের সাথে, আজীবন লড়াই করেছেন সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে। আর বার্ধক্যে শুরু হলো এক তীব্র যন্ত্রণাকাতর লড়াই শরীরের ব্যাধির সাথে। জীবনের এই দীর্ঘ পথে স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই সরে গেছেন তাঁর পাশ থেকে, সুগভীর অভিমানে ত্যাগ করেছেন জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রাম, মায়ের সাথে স্ত্রীর সাথে তাই সাক্ষাৎ বন্ধ দীর্ঘদিন, পুত্র নারায়নচন্দ্রকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। শারিরীক কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে ১৮৭৫খৃ: তিনি তাঁর একমাত্র উইল সম্পন্ন করেছেন। অজান্তে কি মৃত্যুর নি:শব্দ পদচারণা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন? যদিও এরপরেও বিদ্যাসাগর দীর্ঘ ষোলো বৎসর জীবিত ছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, মিথ্যাচরণ, অমানবিকতা দেখে জীবনের শেষদিকে মানুষের আচরণের উপর তাঁর এক রকম বিজাতীয় ঘৃণার সঞ্চার হয়েছিল। মানুষের আচরণে ভগ্নহৃদয় অভিমানী বিদ্যাসাগর অত্যন্ত আর্তভাবে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে লিখে গেছেন "এদেশের উদ্ধার হতে বহু বিপদ আছে। পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বিশিষ্ট মানুষের চাষ উঠাইয়া দিয়া সাতপুরু মাটি তুলিয়া ফেলিয়া নূতন মানুষের চাষ করিতে পারিলে তবে এ দেশের ভালো হয়। "রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন" বিদ্যাসাগর দু:সহ আঘাত পেয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই বেদনা বহন করেছিলেন। তিনি নৈরাশ্যগ্রস্ত ছিলেন বলে অখ্যাতি লাভ করেছেন। তার কারন হচ্ছে যে তাঁর বেদনা ছিল দেশের কাছ থেকে যেখানে তিনি শান্তি পাননি। তিনি যদিও তাতে কর্তব্যভ্রস্ট হননি, তবু তাঁর শেষজীবন বিষাদে আচ্ছন্ন হয়েছিল তা অনেকের কাছে অবিদিত নেই।"
কার্মাটাঁড় সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকা। স্টেশনের কাছে স্থানীয় এক ইংরেজ ভদ্রমহিলার কাছ থেকে প্রায় চোদ্দ বিঘা জমি কিনে একটি ছোট্ট বাড়ি তৈরী করেছিলেন বিদ্যাসাগর। এই বাড়িতে স্থানীয় অধিবাসীদের সন্তানদের জন্য একটি স্কুল ও স্থাপন করেছিলেন তিনি। ক্লান্ত, পীড়িত শরীর মনকে সুস্থ করার জন্য তিনি কার্মাটাঁড়ে থাকতে শুরু করলেন। ভালোবেসে ফেললেন এখানকার সাঁওতালদের। এর প্রধান কারন ছিল অশিক্ষিত হলেও সাঁওতালজাতির সবাই অকৃত্রিম, সরল ও সত্যবাদী। দরিদ্র সাঁওতালদের অন্ন বস্ত্রের যোগান নিয়মিত দিতেন বিদ্যাসাগর। তারা অসুস্থ হলে হোমিওপ্যাথির বাক্স নিয়ে নিজে সাঁওতাল পল্লীতে গিয়ে রোগীকে দেখে ওষূধ, পথ্য দিতেন। সুখে, দু:খে তাদের সাথ দিতেন। সাঁওতালরা তাঁকে ভালোবাসতো, ভক্তি করতো, বিশ্বাস করতো। নির্ভয়ে তাঁর হাত থেকে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে খেত। তারা বুঝেছিল তাদের দু:খ কষ্ট বোঝার জন তারা পেয়ে গেছে। বিদ্যাসাগরকে তারা পরমাত্মীয়, আপনজন মনে করতো। বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন অনেক অভাব, বাঁচার লড়াই থাকা সত্তেও তারা এক দুর্লভ সরল অন্তরের অধিকারী। ভাই শম্ভুচরণ স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন "তিনি প্রাত:কাল হইতে বেলা দশ ঘটিকা পর্যন্ত সাঁওতাল রোগীদিগকে হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা করিতেন এবং পথ্যের জন্য সাগু, মিছরি, বাতাসা প্রভৃতি নিজে প্রদান করিতেন। অপরাহ্নে পীড়িত সাঁওতালদের পর্ণকুটীরে যাইয়া তত্ত্বাবধান করিতেন। তাহাদের কুটীরে যাইলে তাহারা সমাদরপুর্বক বলিত, " তুই আসেছিস! " তাহাদের কথা অগ্রজের বড় ভালো লাগিত।" প্রায় সতেরো বছর সেখানে ছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য কখনো কলকাতার বাদুড়বাগানে, কখনো চন্দননগরে, ফরাসডাঙ্গায় কাটিয়েছেন। কোনো খাবার ই গ্রহন করতে পারতেন না। বার্লি সেদ্ধ, বেলের আঠা, শুকনো মুড়ি খাদ্য ছিল। শরীর ক্রমশ: দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়লো। আর ফরাসডাঙ্গায় থাকা উচিত নয় এই বিবেচনায় তিনি আবার কলকাতায় ফিরে এলেন। শরীরে প্রবল যন্ত্রণা অথচ মুখে সেই যন্ত্রনার প্রকাশ খুব কম। শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও যাবতীয় নৈতিক দায়িত্ব পালনে, সামাজিক হিতসাধনে, দানে তিনি অবিচল। আলোপ্যাথি ডাক্তার ও আয়ুর্ব্বেদীয় চিকিৎসকের নিদানে অহিফেন সেবন বন্ধ না করলে কোনো ওষুধ ই কাজ দেবে না। আফিম পরিত্যাগ করার জন্য এক হাকিমকে আনানো হলো। কিন্তু তার ওষুধে প্রচন্ড হিক্কা ও জ্বর শুরু হলো। হাকিমের পরিবর্তে ডাক্তার হীরালাল বাবু ও অমূল্যচরণ বসু সাহেব ডাক্তার নিয়ে এলেন। ভাল করে তাঁকে পরীক্ষা করে সাহেব ডাক্তার জানালেন তাঁর স্টমাকে ক্যান্সার হয়েছে এবং তাঁর বয়স, জীর্ণ-শীর্ণতা, শারীরিক দৌর্ব্বল্যের কারণে রোগের উপশম হওয়ার আশা নেই। জ্বর ও হিক্কা রয়েই গেলো। মুখমন্ডল থেকে জীবনের শ্রী কমে আসতে লাগলো।
২৯শে জুলাই, ১৮৯১। ঘোর বর্ষার দিন, আকাশে মেঘের ঘনঘটা। জোলো বাতাস সাথে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে হাওয়া। বাদুড়বাগানের ২৫,বৃন্দাবন মল্লিক লেনের চমৎকার দোতলা বাড়ির কক্ষে বিছানায় শুয়ে আছেন বিদ্যাসাগর। তাঁর শিয়রের উল্টো দিকে টাঙ্গানো মা ভগবতী দেবীর একটি ছবি। চেতন... অচেতনতার মাঝে নিস্পলক চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন মায়ের ছবির দিকে। দুচোখ থেকে অবিরাম ধারায় ঝরতে লাগলো জল। মানুষের দু:খমোচন তাঁর জীবনের সর্বাপেক্ষা বড় ধর্ম ছিলো। আজীবন তাই করেছেন কিন্তু জীবন বড়ই ছোট,আরো কত বাকি রয়ে গেলো। অনেকদিন আগে উত্তরপাড়ায় গাড়ী দুর্ঘটনার সময় পথের মাঝে আহত অচেতন বিদ্যাসাগরের মাথা কোলে নিয়ে পরম যতনে তাঁর শুশ্রুষা করেছিলেন এক অজানা বিদেশিনী মেরি কার্পেন্টার। সেই অচেতন অবস্থায় ঈশ্বর দেখেছিলেন যেন তাঁর মা এসে কোলে তুলে নিয়েছেন আহত ঈশ্বরের মাথা। মেয়েরা কি সবাই মায়ের মতই কোমল হয়? আরো কত কি করার ছিল এই অসহায় কোমলস্বভাবা নারীজাতির জন্য। ঈশ্বর কাঁদছিলেন.... আর তখন সারা আকাশ সোনালি আলোয় উদভাসিত... সোনার রথ প্রস্তুত... আকাশলোকে আজ আনন্দের ছড়াছড়ি... পৃথিবীর ঈশ্বর আজ ফিরে যাবেন অনন্তধামে। রাত আড়াইটে শেষ নি:শ্বাসে ছেড়ে গেল নাড়ী। ঈশ্বর বিলীন হলেন ঈশ্বরে।

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top