সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

প্রাণ ভরিয়ে : দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
১৩ এপ্রিল ২০২২ ১৫:৪৭

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৩:৩৯

 

এ সকালটা অন্যরকম অভীকের। মনখারাপের সুর সকাল থেকেই। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই ও আজ কদমগাছটার নিচে এসে দাঁড়ালো। মায়ের হাতে পোঁতা।মা খুব কদম ফুল ভালোবাসতো। গাছটাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন দাঁড়ালো ও। মায়ের গায়ের গন্ধ পেল যেন ও। চোখের কোণ ভিজে উঠলো এক অবরুদ্ধ কান্নায়। কতোক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল খেয়াল নেই। হঠাৎ মেয়ের ডাক ! মনে পড়ল আজ মায়ের জন্মদিনে ওরা কিছু কম্বল বিতরণ করে শীতকাতর অসহায় মানুষদের।মা বলতেন, খুব গরীব মানুষদের পাশে দাঁড়ালেই আমাকে পাবি।তাই সঞ্চিতা ও অভীক মেয়ে বকমকে নিয়ে কম্বল দিতে গাড়ি চালিয়ে দূরে দূরে চলে যায় এইদিনে। কম্বল দেওয়ার সাথে কিছু খাবারের প্যাকেটও তুলে দেয় ওদের হাতে। মেয়ের সারা চোখে মুখে ঝলকে ওঠা আনন্দে অভীক ভিজতে থাকে ভালোলাগায়।ঠাম্মি ছিল বড়ো আশ্রয় বকমের। অভীক বুঝতে পারে,ভেতর ঘরে মেয়েটাও একা হয়ে পড়েছে। তাই এই দিনে ঠাম্মিকে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চায় ও। মন ভরে যায় অভীকের। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা যেন আরো বেড়ে। যায়।নাতনির বুকে বেঁচে আছে আর্তের সেবায়।
আজ যাবে বকখালির রাস্তায়।হাওয়াখালি গ্রামে ওর বন্ধু হরির বাড়ি। ওকে সঙ্গে নিয়ে চলবে ঐ গ্রামে আজকের কাজ। ডায়মন্ড হারবারের রবীন্দ্র পার্কে র সামনে গাড়ি দাঁড় করালো অভীক। মা বকখালি যাবার পথে এখানে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির সামনে চুপটি করে দাঁড়াতো কিছুক্ষণ। তারপর বটগাছটার বেদীতে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে গান ধরতেন খালি গলায়।চোখ বুজে গাইতে থাকা মায়ের রবীন্দ্র সংগীত আশপাশের সকলে মুগ্ধ হয়ে শুনতো। তারপর মাটির ভাঁড়ে এককাপ চা খেয়ে আবার চলা। আজও ওরা তিনজনে দাঁড়ালো রবীন্দ্র মূর্তির সামনে। মেয়ে হাত জোড় করে বিড়বিড় করে কি বলে চলেছে ! অভীক জানে মেয়ে কি বলছে ঐভাবে। ঠাম্মির শেখানো গানটা ও গাইছে মনে মনে “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে"! ও ঠাম্মির কাছ থেকে জেনেছে,এই গান গাইলে মনে একলা চলার শক্তি আসে। এরপর ওরা নদীর দিকে মুখ করে বেদীতে বসলো।আজ জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা। পঁচিশে ডিসেম্বরের ভিড় আজ অন্যমুখে, অন্য মননে ! সঞ্চিতা গুনগুন করে গান ধরলো। চেনা রবীন্দ্র সংগীত। অভীক ও বকম গলা মেলালো ওর সাথে। মায়ের প্রিয় গানটাও গাইলো ও "এসেছিলে তবু আসো নাই জানায়ে গেলে"। কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে বসে থাকলো চুপ করে ওরা। মগ্নতায় যে মা ফিরে ফিরে আসে !
এবার গাড়ির দিকে চললো ওরা। পাশের চায়ের দোকানে চা খেয়ে গাড়িতে উঠবে। বকম প্রজাপতি বিস্কুট খেতে ভালোবাসে। ছেলেবেলায় ও বাগানে প্রজাপতির পেছনে ছুটতো। নাচতে নাচতে গাইতো "প্রজাপতি, প্রজাপতি! কোথায় পেলে ভাই এমন রঙ্গীন পাখা !" ওরা খুব হাসতো তখন ওর কান্ড দেখে। প্রজাপতিগুলোও ‌ যেন মজা পেত ওর গানে। নেচে নেচে ওর কাছেই উড়ে বেড়াতো। এখানেও ওর ঠাম্মি জড়িয়ে। ঠাম্মির কাছ থেকে শিখেছিল গানটা। আজও প্রজাপতি বিস্কুটের মধ্যে বোধহয় ও ওর ঠাম্মিকে খোঁজে।
হঠাৎ একটা আওয়াজে ওরা তাকিয়ে দেখলো এক বয়স্ক ভিখারীকে সামনের চা ওলা ও দোকানের কয়েকজন খুব মারছে।দোকানী লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে দিল ভিখারীকে। ভিখারীর কপালটা কেটে রক্ত গড়াচ্ছে । আশপাশের উপস্থিত সকলে চুপ করে দাঁড়িয়ে। যেন কারো কিছু করার নেই।অভীক উঠে দাঁড়ালো। দোকানীকে মারতে বারণ করলো বৃদ্ধকে। পকেট থেকে রুমালটা বের করে ওর কপালে চেপে ধরলো। বকম ছুটে এসে বৃদ্ধকে তুলে বসালো রাস্তার পাশে। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো, ঐ বৃদ্ধ ভিখারী কেক চুরি করে খাচ্ছিল। বড়দিনের বিক্রির জন্য সাজানো ছিল সব কেক।ও সুযোগ বুঝে চুরি করে খাচ্ছিল। পাশের দোকানের লোক দেখতে পেয়ে ধরে ফেলে হাতেনাতে।তারপর শুরু হয় মার। শুধুমাত্র একটা কেকচুরির জন্য এরকম নির্দয় হতে পারে মানুষজন! বকমের চোখে বিস্ময়।ও মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কেকের দাম দিয়ে দিল। নির্লজ্জ দোকানী হাত পেতে টাকাটা নিয়েও নিল। অভীক দোকানীর দিকে তাকিয়ে করুণার হাসি হাসলো শুধু। বাড়ির বৃদ্ধ বাবার কথাও মনে পড়েনি মানুষগুলোর এভাবে মারার সময়। কপালের রক্ত পড়েই চলেছে। রুমালটা বেশ ভিজে গেছে এরমধ্যে।
বৃদ্ধকে গাড়িতে তুলে নিল ওরা। খোঁজ নিয়ে জানল, একটু দূরেই একটা ডাক্তারখানা আছে। বৃদ্ধের কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধতে হবে মনে হচ্ছে। কাটা জায়গাটায় বেশ ধুলো লেগে আছে। পরিস্কার না করে দিলে সেপটিক হয়ে যেতে পারে। সঞ্চিতা ও বকমেরও মত একটা ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়ার। বৃদ্ধের সারা মুখ জুড়ে কদিনের ক্ষিদের আগুন। লুচি তরকারির একটা প্যাকেট হাতে দিতেই বৃদ্ধ গোগ্রাসে খেতে লাগল।একচোখ জল। মুখের কাশের জঙ্গল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো গাড়ির সিটে। কষ্টে বাকরুদ্ধ ওরা তিনজনই। বকমের চোখে জল। বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে ও যেন ক্ষিদের জ্বালা বোঝার চেষ্টা করছে ! নাকি বৃদ্ধের মুখেও ও ওর ঠাম্মিকে খোঁজার চেষ্টায়।
হঠাৎ বকম বলে উঠলো, "এই দাদুর হাত দিয়েই আজ কম্বল ও খাবার বিতরণ হবে"। ওর ঠাম্মি বলতো, সমব্যথী হলেই কাজে পূর্ণতা আসে। গরীবের কষ্ট এক অসহায় সহায়সম্বল হীন বৃদ্ধ ছাড়া আর কেই বা বুঝবে ! মেয়ের এ হেন বিচারে চোখ ফেটে জল বেড়িয়ে এলো। সঞ্চিতার চোখেও জল। বকমের মানবিকতার পাঠ ঠাম্মিরই দেওয়া।ঠাম্মি যেন ওর সান্তা ! সব সমস্যার সমাধান যেন ঠাম্মির দেওয়া শিক্ষার ঝোলায় বকমের ! বৃদ্ধকে গাড়িতে বসিয়ে ওরা চললো হাওয়াখালির দিকে ।


দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
লেখক, হুগলি, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top