সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

চির স্মরণীয় রত্ন : কাইউম পারভেজ


প্রকাশিত:
২০ মে ২০২২ ২০:০০

আপডেট:
২০ মে ২০২২ ২০:০৫

 

স্বনামধন্য লেখক কলামিস্ট ভাষা সৈনিক একুশের অমর গানের স্রষ্টা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী গত ১৯ মে লন্ডনের বার্নেট জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (করুণাময় তাঁকে জান্নাতবাসি করুন)। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকারের আন্দোলন পেরিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ আর বাংলাদেশের নানা ইতিহাসের সাক্ষী আবদুল গাফফার চৌধুরী। স্বাধীনতার পর স্ত্রীর স্থায়ী চিকিৎসার জন্য বেছে নেন লন্ডনের প্রবাস জীবন। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি নিজেকে কখনও জন্মভূমি থেকে। বাংলাদেশকে নিয়ে নিয়মিত লিখেছেন কলাম গল্প-কবিতা-উপন্যাস। করেছেন সাংবাদিকতা। কলাম লেখা ছিল তার পেশা। কিন্তু অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে তরুণ বেলার একটি কাজের জন্যই বাঙালি আর বাংলাদেশের সঙ্গে অনন্তকাল তিনি জড়িয়ে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র সেই গান এখন ধ্বনিত হয় বিশ্বজুড়ে। পলাশী থেকে ধানমন্ডী ডকু-ড্রামা তাঁর আরেক অমর সৃষ্টি। আব্দুল গাফফার চৌধুরী স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো ও বঙ্গবন্ধু পুরস্কারসহ দেশি ও বিদেশী নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। কালজয়ী সেই গান আর নানা লেখার মাধ্যমে যুগ যুগান্তর বেঁচে থাকবেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। তার লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, নাম না জানা ভোর , নীল যমুনা, সম্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দর, শেষ রজনীর চাঁদ এবং ধীরে বহে বুড়ি গঙ্গা।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় দুদশকের বেশী সময় ধরে। আমার স্ত্রী কবিতা সেই ছোট্ট বেলা থেকে তাঁকে চাচা ডাকে সেই সূত্রে তিনি আমারও চাচা। তেমনি আরেক চাচাকে হারিয়েছি বেশ কিছুকাল আগে – তিনি মধ্যরাতের অশ্বারোহী খ্যাত কবি লেখক সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ। বঙ্গবন্ধু পরিষদ অস্ট্রেলিয়ার আমন্ত্রণে আবদুল গাফফার চৌধুরী দুবার সিডনি এসেছিলেন জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হয়ে। দুবারই আমার কাছে ছিলেন। আমিও দুবার লন্ডনে গিয়ে তাঁর পরিবারের সাথে সময় কাটিয়েছি। তাঁর চলে যাবার খবরে মনটা বড় শোকার্ত হয়ে উঠেছে। গত দু দশকের স্মৃতি নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবছিলাম তাঁর বন্ধু এম আর আখতার মুকুলের কথা আর ফয়েজ আহম্মদের কথা। এই তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব আর সম্পর্ক নিয়ে কিছু মজার ঘটনা আছে সেগুলোর দু একটি এ লেখায় সন্নিবেশ করলাম। আশা করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
২৫শে মার্চ্চ ১৯৭১। ঢাকা শহর থমথমে। কখন কী ঘটে যায় সবাই অস্থির - তটস্থ। খবরের সন্ধানে সব সাংবাদিক ছুটছেন ঢাকার এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, পূর্বানী, রেডিও টেলিভিশন, ধানমন্ডী ৩২ নম্বর - সর্বত্র। ইয়াহিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ। হঠাৎ রাত দশটার দিকে সামরিক জান্তা ঝাঁপিয়ে পড়লো নিরীহ বাঙালির উপর। একযোগে রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ি, ঢাকা বিশ্ব^বিদ্যালয়সহ শহরের আনাচে কানাচে সবখানে। মধ্যরাতের অশ্বারোহী খ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ যখন দেখলেন অবস্থা বেসামাল দ্রæত এসে ঠাঁই নিলেন প্রেসক্লাবে। ভাবলেন এ অবস্থায় বাড়ী ফেরা সম্ভব নয় বরং সে ক্ষেত্রে প্রেসক্লাব হবে নিরাপদ। কেবল একটু দম নিচ্ছেন এরমধ্যে প্রেসক্লাবেও হানাদাররা হাজির। গোলাগুলি মর্টার শেল দিয়ে কয়েক মূহুর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দিল সাংবাদিকদের প্রাণকেন্দ্র সেগুনবাগিচার প্রেসক্লাব। ফয়েজ আহমেদ এতো গোলাগুলি আর শেলিংয়ের মধ্যেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন তবে পায়ে ইসপ্লিন্টারের আঘাতে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ নিয়েও লুকিয়ে আছেন। কানে আসছে মানুষের আর্তনাদ হাহাকার আর বিরামহীন গোলাগুলির শব্দ।
চোখের সামনেই সেই বিভীষিকাময় রাত্রির অবসান হয়ে ভোরের আলো দেখলেন। একসময়ে শুনলেন মাইকে ঘোষনা হচ্ছে কারফিউ শিথিল করা হয়েছে দু’ঘন্টার জন্য। প্রেসক্লাবের আসে পাশে মানুষের কোলাহল। সবাই প্রেসক্লাবের ধ্বংসস্তূপ দেখতে এসেছেন। তাদের মধ্যে কে একজন আবিষ্কার করলেন আহত ফয়েজ আহমেদকে। আসে পাশে কোন কাপড় খুঁজে পাওয়া গেল না তাঁর ক্ষত স্থানে একটু বাঁধন দিতে। একটা নতুন লুঙ্গি কিনে আনা হলো। তাই দিয়ে ক্ষত স্থান বেঁধে দেয়া হলো। তিনি উপস্থিত মানুষদের বললেন - পাশেই পুরানা পল্টনে আমার বন্ধু এম আর আখতার মুকুলের বাসা। তোমরা আমাকে কষ্ট করে ওখানে পৌঁছে দাও।
একটা রিক্সায় করে তাঁকে নিয়ে আসা হলো এম আর আখতার মুকুলের বাসায়। দরজা খুলে মুকুল হতভম্ব। তাড়াতাড়ি বন্ধুকে ঘরে ঢোকালেন। মুকুল স্ত্রী রেবা তাঁর পূর্বলব্ধ ফার্স্টএইড ট্রেনিং কাজে লাগিয়ে ফয়েজ আহমেদের ক্ষতস্থানের পরিচর্য্যা করলেন। কারফিউ শিথিলের সময় শেষ হয়ে আসছে। তাঁরা ফয়েজ আহমেদকে তাঁর বাড়ী পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করলেন।
তুই তুই সম্পকের্র হরিহর আত্মার দুই বন্ধু এম আর আখতার মুকুল এবং ফয়েজ আহমেদ। মুকুল ইত্তেফাক আর ফয়েজ আহমেদ সংবাদ এর সাংবাদিক। বঙ্গবন্ধুর দেয়া নাম মোকলা’নামেই মুকুলকে ডাকেন ফয়েজ আহমেদ আর মুকুল তাঁকে ডাকেন ফইজ্জা। এতো গাঢ় বন্ধুত্ব কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শে দু’জন দুই মেরুর। ফয়েজ আহমেদ বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী আর মুকুল আওয়ামী ঘরানার মানুষ। এই মতবিরোধীতা সময়ে এতো তুঙ্গে উঠতো যে দুই বন্ধুর কথা বলা বন্ধ হয়ে যেতো। তারপরেও তাঁদের বন্ধুত্বে কখনো চিড় ধরেনি। একটা মজার ঘটনা বলি। তখন দু বন্ধুর কথা বন্ধ। এমন বন্ধতা বেশী দিন থাকে না। আবার প্রেসক্লাবে গেলে সব ঠিক হয়ে যায়। তো একদিন ফয়েজ আহমেদ বেইলী রোডের সাগর পাবলিশার্সে এলেন। মুকুল দোকানে বসা কিন্তু দু বন্ধুর কথা একদম বন্ধ। দোকানের কর্মচারী রমজানের কাছে সোজা চলে এলেন ফয়েজ আহমেদ। ফিসফিসিয়ে রমজানকে বললেন - মুকুলকে বল আমার হাজার খানেক টাকার দরকার। দু এক সপ্তাহের মধ্যে ও পেয়ে যাবে। রমজান মুকুলের কাছ থেকে টাকাটা এনে ফয়েজ আহমদের হাতে দিলো। ফয়েজ আহম্মদ রমজানকে থ্যাঙ্ক ইউ বলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন।
এবার আরেকটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধু তখন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৩ সাল। সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর স্ত্রী দারুণ অসুস্থ। অজানা এক ভাইরাসে তাঁর শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় চিকিৎসায় কোন উন্নতি নেই। ক্রমশঃ পঙ্গুত্বের হাতছানি। চিকিৎসকদের মত তাঁকে অনতিবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাঠাতে হবে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তখন দৈনিক পূর্বদেশের চীফ রিপোর্টার। রীতিমত ভেঙ্গে পড়েছেন। কী করে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসা করাবেন লন্ডনে। অত টাকা পয়সাও বা কোথায় পাবেন? বন্ধু এম আর আখতার মুকুল আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীকে বললেন ঘাবড়াবেন না শেলী ভাবীকে যেভাবেই হোক আমরা লন্ডনে পাঠাবার ব্যবস্থা করবো। মুকুল সোজা বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেন। সবিস্তারে সব বললেন বঙ্গবন্ধুকে। আপনাকে একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু মুকুলকে সব দায়িত্ব দিয়ে বললেন (এম আর আখতার মুকুল তখন বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক, সরকারী আমলা) তুই সব কিছুর ব্যবস্থা কর কোথাও আটকালে আমারে ফোন দিস। এম আর আখতার মুকুলের উদ্দ্যোগে সব ব্যবস্থা হয়ে গেলো। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী স্বস্ত্রীক লন্ডন চলে গেলেন।
২০০২ সালে এক কনফারেন্সে ডেনমার্ক যাবার পথে লন্ডন গেছি। ব্যস্ততার মাঝে এক বিকেলে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর বাসায় গেছি। পঙ্গুত্ব বরণ করে হুইল চেয়ারে শেলী চাচীর সাথে আমার প্রথম দেখা। ওই হুইল চেয়ারে বসেই তিনি আমার জন্য নানা রকমের রান্না করেছেন। টানা চল্লিশ বছর তিনি হুইল চেয়ারেই কাটিয়েছেন। স্থানীয় কাউন্সিলের উদ্দ্যোগে তাঁর বাসার সর্বত্র হুইল চেয়ারের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা ছিল। এমনকি তিনি হুইল চেয়ারে বসেই সবজীর বাগান করতেন। খেতে বসে বললাম চাচী আপনি অসুস্থ শরীর নিয়ে আমার জন্য এতো কিছু রাঁধলেন । এতো আদর করলেন। চাচাী আমার গলা জড়িয়ে ধরে ডুঁকরে কেঁদে উঠলেন। বললেন বাবা - তুমি মুকুল ভাইয়ের জামাই। আমাদেরও জামাই। তুমি আমার বাসায় প্রত্থম আইলা। আমি পঙ্গু। তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না। মুকুল ভাই আমার জন্য যা করছে আমি সারা জীবনে সে ঋণ শোধ করতে পারবো না। তিনি আমারে লন্ডনে না পাঠাইলে আমি বহু আগেই মইরা যাইতাম। মুকুল ভাই যখন লন্ডনে প্রেস কাউন্সিলর ছিলেন আমাদের তখন কোন গাড়ী ছিলো না - এই মুকুল ভাই তাঁর গাড়ী কইরা আমারে নিয়মিত হাসপাতালে লইয়া যাইতো। সময়তে মুকুল ভাই আর রেবা ভাবী আমারে কোলে কইরা গাড়ীতে উডাইতো নামাইতো। আমি তারে আমার ভাই বানাই ছিলাম - আর তুমি হইলা গিয়া আমার হেই ভাইয়ের জামাই। তোমার লাইগা আমি কিছুই করতে পারলাম না।
২০১২ তে শেলী চাচি পরলোক গমন করেন। তাঁকে ঢাকায় বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
মজার কথা হলো আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী এবং এম আর আখতার মুকুল হরিহর আত্মার বন্ধু ওদিকে নীতিগত কারণে দুজনার সাপে নেউলে সম্পর্ক। কেউ কাওকে ছেড়ে বলেন না লেখেন না। সংবাদপত্রে ওঁদের একজনের বিরুদ্ধে আরেকজনের মার্জিত বিষোদগার দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না যে ওরা দুজন আত্মার বন্ধু।
২০০৩ সাল। এম আর আখতার মুকুল ক্যানসারে আক্রান্ত। ঢাকা কলকাতার নিষ্ফল চিকিৎসা শেষ। শেষ চেষ্টার জন্য চিকিৎসক ও স্বজনদের পরামর্শে লন্ডনে যেতে হবে এম আর আখতার মুকুলকে। মুকুল আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীকে ফোন করে বললেন - আমি আসছি আপনি সব ব্যবস্থা করেন। বন্ধু অসুস্থ - নিজের অসুস্থ শরীর নিয়ে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করলেন। প্রতিদিন হাসপাতালে গিয়ে বন্ধুর পাশে বসে থাকতেন। অথচ তখনো তাঁদের নীতিগত বিরোধ। বিরোধটা হলো মুকুল আওয়ামী রাজনীতির অন্ধ ভক্ত এবং অনুসারী আর আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী আওয়ামী সমর্থক তবে অন্ধ নন। তাই আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু লিখলে মুকুল বরদাস্ত করতে পারতেন না। লেগে যেতো তাঁদের রাজনৈতিক ঝগড়া।
আবদুল গাফফার চৌধুরী, এম আর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহম্মদ দেশের রত্ন। দেশের জন্য এঁদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এঁরা চির স্মরণীয় রত্ন। করুণাময় আল্লাহপাক তাঁদের জান্নাতবাসি করুন – আমিন।

 

ডঃ কাইউম পারভেজ
লেখক, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top