সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

ফাঁকি : স্বপ্না ধর


প্রকাশিত:
৩১ মে ২০২২ ১০:১৩

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০২:১১

 

রণিতা প্রতিদিনের মতো যথারীতি কাজকর্ম সেরে সকালে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কাজ বলতে তার নিজেরটা; রান্নাবান্না, ঘর গোছানো, তদারকি করার জন্য এই বাড়িতে ঢের লোক রাখা আছে। স্বামী নিতিশবাবু বেরিয়ে যায় সেই সাতসকালে। কর্মস্থল দূর, তারপরেও সে ডেইলি যাতায়াত করে। সংসারে অভাব অনটন নেই বললেই চলে।

রণিতা-নিতিশবাবুর যমজ কন্যা সন্তান। বাবা-মা থাকার পর‌ও রণিতার ছেলেবেলাটা অনাত্মীয়ের বাড়িতে খুব কষ্টে দুঃখে কেটেছে। মা-বাবার কথা রণিতা ভাবতে চায় না। ভাববেও বা কেন? লোকমুখে যা শুনেছে - সেই কোন কালে তার মা তাকে ফেলে এক বিবাহিত লোকের সাথে থাকতে শুরু করে। জানামতে, বাবাও এক‌ই পথের পথিক। তাই তাদের কথা ভাবলেই রণিতার গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। অফিসের কাজে ঐদিন রণিতা আর মন বসাতে পারে না। বাড়ি ফিরে আসে।

ওদের যৌথ পরিবার। আত্মীয়-স্বজন সব গিজগিজ করে- এটা রণিতার পছন্দ হয় না। নিতিশবাবু সামাজিক মানুষ। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলকে নিয়েই তার চলতে ভালো লাগে। সবার বিপদে পাশে থাকে।
বৌদির পছন্দের পাত্রী হিসেবে রণিতাকেই সে বিয়ে করে আনে। কিন্তু এরপর হঠাৎ রামের মতো বড় ভাইয়ের প্রস্থানে নিতিশবাবু বড় একা হয়ে পড়ে। একমাত্র ভাইপো অশোকটাও দিনদিন ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে! অশোকটা কী ভালো লেখাপড়াতেই না ছিল! এইতো দাদা চলে যাওয়ার পর হরিপদ স্যার ডেকে বলল,"নিতিশ, অশোকটা খুব ভালো ছাত্র, ওর দিকে খেয়াল করো। উঠতি বয়স, মনে যেন কোন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।"

কিছুদিন পর অশোক কাউকে কিছু না বলেই কোথায় যেন চলে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা যায়, সে আশ্রমে গিয়ে সন্ন্যাস নিয়েছে।

রণিতা সংবাদটা পাওয়ার পর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। যাক, পাপ বিদেয় হয়েছে! কিন্তু সে কথা কাউকে বুঝতে দেয় না। এদিকে অশোকের চিন্তায় তার মা পাগলপ্রায়। সেদিকে কারোর কোন খেয়াল নেই।

রণিতার যমজ মেয়ে দুটো এখন বড় ক্লাসে পড়ে। কোলেপিঠে মানুষ করা জেঠিমাকে এখন তারা মানুষ বলে মনে করে না। খুব বাজে ব্যবহার করে। সাথে বাড়ির কাজের লোকগুলোও এক‌ইরকম ব্যবহার করে। একসময় এই ব‌উয়ের হাতেই ছিল সংসারের চাবিকাঠি। কত লোকের আনাগোনা ছিল এই বাড়িতে! কতজন যে পড়াশোনা শিখে, মানুষ হয়ে বের হয়ে গেছে তার‌ই হাতের রান্না খেয়ে - তা এখনো পাড়া প্রতিবেশীরা গল্প করে।‌ তার ভাইয়েরা সব মস্ত বড় বড় চাকুরে। বোনকে তাদের কাছে নেওয়ার জন্য তারা কম চেষ্টা করেনি। কত কম বয়সে বিয়ে হয়ে এই সংসারে এসে হাল ধরেছিল, নিজে না খেয়ে কতজনকে খাইয়েছে! সৃষ্টিকর্তার বিচার কি এমনি হয়?

এর মধ্যে হঠাৎ রণিতার সাথে তার মায়ের যোগাযোগ হয়। একসময় তাদের দেখা হয়। রণিতা পুরোনো সব স্মৃতি ভুলে যায়। দিন দিন তার মায়ের আনাগোনা শুরু হয় তার বাড়িতে। মায়ের সাথে থাকা লোকটার‌ও আসা যাওয়া চলতে থাকে তার বাড়িতে। তারাই ক্রমে ক্রমে রণিতার আপনজন হয়ে ওঠে।
ততদিনে নিতিশবাবু ব‌উয়ের হাতের পুতুল হয়ে যায়। হবে নাই বা কেন? নিতিশবাবু পড়েছেন কঠিন রোগে। সামান্য চিকিৎসা ছাড়া তার ভালো কোন চিকিৎসা করার চেষ্টা করে না তার স্ত্রী রণিতা। সুযোগমতো স্বামীর সব সহায় সম্পত্তি সে নিজের নামে লিখে নেয়।
অসুস্থ স্বামীকে ঘরে ফেলে রেখে অফিস কাছারি, বিয়ে, অনুষ্ঠান, হ‌ই-হুল্লোড় সব আনন্দ সে করে বেড়ায়। এভাবে একসময় নিতিশবাবু চলে যান পরপারে। ধুমধাম করে দশ গ্রামের লোক খাইয়ে স্বামীর শ্রাদ্ধ শান্তি করে রণিতা। চোখে জলের ছিটেফোঁটা নেই।

বাবা-মায়ের এত অবিচারে রণিতার কোন ক্ষোভ নেই। তার যত ক্ষোভ এখন ঐ অসহায় অশোকের মায়ের প্রতি। তার এই বাড়ির আশ্রয়টুকু কেড়ে নিতে চায় সে। এক‌ই এলাকার বিধানবাবু ভদ্রলোক মানুষ। প্রতিবেশী। অশোকের মায়ের দুর্দশা দেখে আর থাকা যায় না। তাই তিনি রণিতাকে একদিন বললেন," বৌদি, উনিও তো এই সম্পত্তির অধিকারী। ওনার একটু চিকিৎসাপাতি তো করতে পারেন।"
ভদ্রলোকের কথায় রেগে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে রণিতা। বলে,"সম্পত্তি চাইলে এই বাড়ি থেকে তার হাড়ি উঠে যাবে।"
বিধানবাবু আর কোন কথা বাড়ান না। কী আর বলবেন, সমাজে তো ভালো মানুষের মূল্য নেই।
একদিন এসব কোন্দলের অবসান ঘটিয়ে টুক করে অশোকের মা মারা যায়। একমাত্র সন্তানের সাথে তার আর দেখা হয় না।

মালতি, বাসন্তী, শান্তি, দুর্গা দাস, নিবেদিতা, শ্রীকান্ত সবাই অশোকের মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে চোখের জল ফেলে। আত্মীয় নয় অনাত্মীয়, তবুও। শুনেছি, দুঃসম্পর্কের এক জ্ঞাতি ভাই তার মৃত্যুর পর সব নিয়মাদি পালন করে তার অন্তোঃষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। আসলে ভালো মানুষের জন্য বিশেষ কিছু নিয়মাদি পালন করার প্রয়োজন হয় না। কয়েক ফোঁটা অশ্রু - তার আত্মা যদি থেকে থাকে তার শান্তির জন্য যথেষ্ট। কেউ অশোককে পেলে তার মায়ের মৃত্যুর খবরটা জানিয়ে দেবেন আশা করি।

পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top