সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

বাংলায় মুসলিম জাগরণে এক প্রাতঃস্মরণীয় নাম মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ : রোজীনা পারভীন বনানী


প্রকাশিত:
১৪ জুন ২০২২ ০৯:১৪

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০১:৪৩

 ছবিঃ মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ

 

ভাব মন দমে দম,
রাহা দূর বেলা কম
ভুখ বেশী অতি কম খানা।
ছমনে দেখিতে পাই
পানি তোর তরে নাই
কিন্তুরে পিপাসা ষোল আনা !
দেখিয়া পরের বাড়ী
জামা জোড়া ঘোড়া গাড়ী
ঘড়ি ঘড়ি কত সাধ মনে,
ভুলেছ কালের তালি,
ভুলেছ বাঁশের চালি,
ভুলিয়াছ কবর সামনে।

ছোটবেলায় যখন গ্রামের বাড়ি যেতাম তখন রাস্তাটা এখনকার মতো এরকম পিচঢালা পাকা রাস্তা ছিল না। বাস থেকে নেমে স্কুলের মাঠ দিয়ে শর্টকাটে যেতাম। মাঠটা পার হলেই মাটির সোজা রাস্তায় দশ মিনিট তারপর বায়ে মোড় নিয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই পাওয়া যেত উঁচু প্রাচীর ঘেরা তরফদার বাড়ীর সিংহ-দরোজা। রাস্তাটা যেখানে বায়ে মোড় নিয়েছে, সেখানে হাতের ডানদিকে রাস্তার ধারেই ছিল একটা শান বাঁধানো কবর, পাশেই বাঁশঝাড় তারপর ছোট একটা পুকুর। এই কবরের কাছে আসলেই দিনের বেলাতেও কেমন ভয়-ভয় লাগতো। আমরা চোখ বন্ধ করে আব্বার হাত ধরে কোন রকমে জায়গাটা পার হয়ে যেতাম। আসলে ভয় লাগার একটা কারণ ছিল। এই কবরটা নিয়ে সত্য- অর্ধসত্য মিলিয়ে একটা মিথ প্রচলিত ছিল—গ্রামের অনেকেই রাত্রে বাজার থেকে বাড়ী ফেরার সময় এই কবরের মাথার কাছে একটা বিষধর সাপের মাথায় আলো জ্বলতে দেখেছেন, অনেকেই বলতেন সেটা নাকি সাপের মাথার মণি। এই অনেকের মধ্যে আমার দুই চাচাও ছিলেন। সত্য-মিথ্যা জানিনা, তবে ছোটবেলায় আমাদের কাছে এটা দারুণ রহস্যের এবং ভয়ের ব্যাপার ছিল। বড় হওয়ার পর মনে হয় যে মানুষটা সারাজীবন অন্যদের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন, মৃত্যুর পর তাঁর কবরে আলো জ্বলবে এতে আর আশ্চর্যের কি আছে!! আমি আসলে যাঁর কথা বলছিলাম তিনি আর কেউ নন, তিনি ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সমাজের উন্নতির জন্য জীবনোৎসর্গ করা সেই বাগ্মী পুরুষ মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। উপরের কবিতাখানিও তাঁরই লেখা।

মুন্সী মেহেরুল্লাহ’র জন্ম ও বাল্যকাল:

ইংরেজ সরকার খ্রিষ্টান মিশনারি ও তাদের সহযোগী হিন্দু উচ্চ শ্রেণী ও জমিদার শ্রেণী এ দেশের মুসলমানদের ওপর যে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে, সে কথা এ দেশবাসীর অজানা নয়। মুসলিম জাতির এমনই এক ক্রাতি লগ্নে মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর যশোহর (বর্তমান যশোর) জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার বারবাজার এলাকার ‘ঘোপ’ নামক গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল যশোর জেলার ‘ছাতিয়ানতলা’ নামক গ্রামে। তাঁর বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তাকে পড়ালেখা শেখার জন্য পাঠঠশালায় ভর্তি করে দেয়া হয়। তিনি অল্পদিনের মধ্যেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ শেষ করেন। এতে তাঁর পিতা অতিশয় আনন্দিত হন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। এর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। এই সময়ে মুন্সী সাহেবের মাতা একটি পুত্র ও কয়েকটি নাবালিকা কন্যা নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে পতিত হন। কিন্তু মুন্সী সাহেবের মাতুলদের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল বলে তাঁরা বিশেষ সাহায্য করতেন। মুন্সীসাহেবের মাতা ছিলেন অত্যন্ত সতী-সাধ্বী এবং বিদ্যানুরাগিনী মহিলা। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি পুত্রের বিদ্যাশিক্ষার জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট হন। মুন্সীসাহেবের বয়স যখন ১৩-১৪ বছর তখন তিনি যশোহর শহরের কর্চিয়া নিবাসী মৌলবী মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেবের কাছে যান এবং সেখানেই তিনি কোরআন শরীফ, শেখ সাদীর গুলিস্তাঁবোস্তাঁ ও উর্দু ভাষা শেখেন।

মুন্সী মেহেরুল্লাহ’র কর্মজীবন:

সংসারে অন্য কোন কর্মক্ষম ব্যক্তি না থাকায় শিক্ষা জীবনের মধ্যেই তাঁকে সংসার চালানোর দায়িত্ব নিতে হয়। তিনি মোহাম্মদ আছগর মিয়ার সাথে যশোরে যেয়ে দর্জির কাজ শেখেন। সেলাইয়ের কাজ শেখার পাশাপাশি তিনি যশোর জেলা বোর্ডে একটি কেরানি পদে চাকরি নেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে সে চাকরি ছেড়ে স্বাধীন পেশা হিসেবে দর্জিকাজকে বেছে নেন। এ কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি লেখাপড়াও চালিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় মুন্সী সাহেব ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজী ভাষার ব্যকরণ ও নানা ধরনের সাহিত্য সাধনায় বেশি গুরুত্ব দেন। পেশাগত শিক্ষার প্রতিও ছিল তাঁর প্রখর নজর। তিনি দর্জির কাজে এত বেশী দক্ষতা ও সুনাম অর্জন করেন যে, তৎকালীন যশোর জেলার উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারী, এমনকি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা জজ-ব্যারিস্টার পর্যন্ত এ কাজের জন্য তাঁর কাছে আসতেন।

মুন্সীসাহেব যখন যশোরে দোকান করেন তখন খ্রিষ্টান মিশনারিদের বড়ই প্রাদুর্ভাব ছিল। এসময় খ্রিষ্টান মিশনারিরা যাজক শ্রেণী ইংরেজ কোম্পানির সহযোগিতায় এ উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্রই খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের নিম্নশ্রেণীর হিন্দু ও স্বল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত মুসলমানদের খ্রিস্টধর্মের মুখরোচক বাণী শুনিয়ে ও অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে যে কোনভাবে খ্রিস্টধর্মে দিক্ষীত করা। খ্রিস্টান মিশনারিরা শুধু যে খ্রিস্টধর্মের প্রচার চালাতেন তাই নয়, এর সাথে ইসলাম, ইসলাম ধর্মের নবী ও আল-কোরআনের বিরুদ্ধেও ব্যাপক অপপ্রচার চালাতেন। মিশনারিদের সাথে সাথে ইউরোপীয় পন্ডিতরাও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসামূলক বহু বইপত্র রচনা করেন। অনেকগুলো কারিগর এ সময় খ্রিষ্টান ধর্মে দিক্ষীত হয়। এমতাবস্থায় মুন্সীসাহেবেরও পাদ্রি আনন্দবাবুর প্রচার শুনে এবং বাইবেল ও খ্রিষ্টান ধর্ম সংক্রান্ত পুস্তকাদি পাঠ করে ইসলাম ধর্মে তাঁর অবিশ্বাস জন্মে এবং খ্রিষ্টান ধর্মে তাঁর আস্থা জন্মে। কিন্তু তিনি ধর্ম ত্যাগ করার পূর্বেই হাফেজ নিয়ামতুল্লা সাহেব কর্তৃক রচিত ‘খ্রিষ্টান ধর্মের ভ্রষ্টতা’ ও বাবু ঈশান চন্দ্র মন্ডল ওরফে এহসানুল্লা সাহেব কর্তৃক রচিত ‘ইঞ্জিলে হযরত মোহাম্মদের(সঃ) খবর আছে’ নামক পুস্তকদুটো পাঠ করে তাঁর পবিত্র ইসলাম ধর্মে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে। এই সময়ে অর্থাৎ ১৮৮৬সালে তিনি ‘খ্রিস্টীয়ধর্মের অসারতা’ নামক একখানা ক্ষুদ্র পুস্তক লিখে প্রকাশ করেন এবং পাদ্রীদের মতই যশোর শহরের হাটে দাঁড়িয়ে খ্রিষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচার আরম্ভ করেন।


বাগ্মীবীর মুন্সী মেহেরুল্লাহ:

মুন্সী মেহেরুল্লাহ এভাবেই ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্যের প্রচার শুরু করেন। মুন্সী সাহেব যখন হাটের ভিতর দাঁড়িয়ে খ্রিষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলতেন তখন পাদ্রিদের নিকট একটা লোকও থাকতো না। মুন্সী সাহেব প্রথমে গ্রামের হাট-বাজারে এভাবেই খ্রিষ্টানদের মোকাবিলা করতে থাকেন। ক্রমে ক্রমে তার নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে মৌলবীদের বিভিন্ন সভা-সমিতি থেকে তাঁর ডাক আসতে শুরু করে। তাঁর বক্তৃতার বিবরণ দিয়ে শেখ হাবিবুর রহমান লিখেছেন:
“হাটের একদিকে পাদ্রীদের বক্তৃতা, অন্যদিকে মুন্সী সাহেবের বক্তৃতা; হাটের লোক ভাঙ্গিয়া আসিয়া মুন্সী সাহেবের বক্তৃতা শুনিতে লাগিলেন। তাহারা এতদিন দেখিয়া আসিতেছেন, পাদ্রীগণ নিঃস্বার্থভাবে হাটে-হাটে ধর্ম বক্তৃতা করেন, কেহ কখনো তার প্রতিবাদ করে না।.....যে পাদ্রীদের বিরুদ্ধে এতদিন কেহই একটি কথা বলিতে সাহস করে নাই , মহম্মদ মেহেরুল্লাহ নামক একজন তরুণ যুবক আজ তাহাদিগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান করিতেছেন। দেশের দূর-দূরান্তে সাড়া পড়িয়া গেল”। (কর্মবীর মুন্সী মেহেরুল্লাহ, মখদুমী লাইব্রেরী, কলিকাতা,, ১৯৩৪ পৃ.২০-২১)।

হাটে হাটে খ্রিষ্টান মিশনারিদের মোকাবিলা করা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে মুন্সী সাহেব খ্রিষ্টানদের সাথে পূর্বঘোষিত বাহাসে অংশ নিতেন। বিভিন্নস্থানে খ্রিস্টানদের ইসলাম বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভায় বক্তৃতা করার মাধ্যমে তিনি জনগণকে পাদ্রীদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সংগঠিত করে তোলেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থান, যেমন-কুষ্টিয়া, কুমারখালী, রাজবাড়ী, পাবনা, নাটোর, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, নীলফামারী, করটীয়া, গোয়ালন্দ, কুচবিহার, ডায়মন্ডহারবার, নদীয়া, যশোহর, খুলনা, ২৪ পরগনা, বরিশাল, দার্জিলিং, আসাম ইত্যাদি পরিভ্রমণ করেন। তিনি যেখানেই বক্তৃতা দিয়েছেন সেখানকার হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেই উপকৃত হয়ে শতমুখে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছেন। তাঁর বক্তৃতা করার ছিল অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি বাংলার সাথে আরবী, উর্দু, ফার্সী মিলিয়ে সুললিত কণ্ঠে এমন বক্তৃতা করতেন যে শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতো।

খ্রিস্টানদের সাথে তর্ক করতে করতে মেহেরুল্লাহ্ তর্কবাগিশ হয়ে উঠলেন এবং খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুশাস্ত্র ও ইসলাম ধর্মের উপর তিনি অগাধ জ্ঞান আহরণ করতে সমর্থ হলেন। এ সময় তাঁর সাথে হেরে গিয়ে যে সব হিন্দু ও মুসলিম মনীষী ইতঃপূর্বে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরদের অনেকেই ইসলামের পতাকাতলে ফিরে আসেন। তাঁদের মধ্যে শেখ মুন্সী জমিরুদ্দীন ও পাদ্রী আনন্দবাবু অন্যতম। এ ছাড়াও অনেক পাদ্রী তাঁর সাথে প্রকাশ্য জনসভায় তর্কযুদ্ধে হেরে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন । মুন্সী মেহেরুল্লাহ্ কিভাবে খ্রিস্টানদের তর্কযুদ্ধে হারাতেন তাঁর একটি নমুনা এখানে তুলে ধরছি।

কথিত আছে একবার বরিশাল জেলার পিরোজপুর মহকুমার পাদ্রীগণ মুসলমান সমাজকে লক্ষ্য করে কতকগুলো প্রশ্ন বিতর্ক সভায় উপস্থাপিত করলেন, তার মধ্যে একটি হলো : “মুসলমানগণ হজরত মুহাম্মদ(সঃ)কে আল্লাহ্’র প্রিয় বন্ধু ও মানবজাতির মুক্তির দিশারী বলে মনে করেন, তাহলে কারবালার প্রান্তরে যখন প্রিয় বন্ধুর দৌহিত্র হজরত হাসান-হোসাইনের বংশ এমনভাবে পর্যুদস্ত হলো তখন আল্লাহ্ অতাঁর আপন বন্ধুর দৌহিত্র ও তাঁদের বংশের এই করুণতম হত্যাকাণ্ডের কোন প্রতিকার করলেন না কেন?”
এই বক্তব্যের মুন্সী মেহেরুল্লাহ্ যে জবাব দিয়েছিলেন তা এখানে উল্লেখ করছি—“আখেরী নবী হজরত রসূলুল্লাহর পরিবারবর্গের প্রতি মমত্ববোধ করে পাদ্রীসাহেব সত্যিই আমাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু আমরা বলি পরের দিকে দৃষ্টি দিতে গিয়ে তারা নিজেদের কথা ভুলে গেছেন। রসূলুল্লাহ যখন এই সংবাদ আল্লাহ্’র কাছে জানতে গেলেন তখন আল্লাহতালা গম্ভীরভাবে জবাব দিলেন-বন্ধু, তুমিতো তোমার নাতি-নাতনীদের কথা ভাবছো, এদিকে খ্রিষ্টানরা যখন যিশুকে (যারা তাঁকে আমার পুত্র বলে) ক্রুশবিদ্ধ করে মেরে ফেলল, আমি স্বয়ং খোদা হয়েই বা তার কি করেছি।“ মুন্সীসাহেবের বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই দেখা গেল পাদ্রীদের চেয়ার শূন্য।

এমনিভাবেই তিনি খ্রিস্টান পাদ্রীদের হাত থেকে মুসলমান সমাজ তথা ইসলাম ধর্ম রক্ষার একজন দক্ষ কারিগর হয়ে ওঠেন। খ্রিস্টান মিশনারি ও হিন্দু সমাজের আক্রমণ থেকে নিজ ধর্মকে রক্ষার জন্য রাজধানীর সাথে যোগাযোগ করতে তখনকার রাজধানী কলিকাতায় গিয়ে নিখিল ভারত ইসলাম প্রচার সমিতি গঠন করেন। তিনি ঐ সময় বলিষ্ঠ ভূমিকা না রাখলে বঙ্গদেশে ইসলামের যে অপূরণীয় ক্ষতি হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


সমাজ সংস্কারক ও সাহিত্যিক মুন্সী মেহেরুল্লাহ্:

ইসলাম প্রচারক মুন্সী মেহেরুল্লাহ শুধু ধর্ম প্রচারেই থেমে থাকেননি, তিনি মুসলিম জাতির উন্নয়নে সাহিত্য ও সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি চব্বিশ পরগনা নিবাসী শেখ আব্দুর রহিমের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে মুসলিম ঐতিহ্যবাহী ‘সুধাকর’ নামক পত্রিকার পৃষ্ঠাপোষকতা করেন। এই পত্রিকার তিনি নিয়মিত লেখকও ছিলেন। জাতির প্রয়োজনে তিনি শক্তহাতে কলম ধরেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে মুন্সী মেহেরুল্লাহর প্রথম পুস্তক ‘খ্রিস্টীয় ধর্মের অসারতা’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ বাইবেল সম্পর্কে সমালোচনা এবং খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকদের কার্যকলাপ সম্পর্কে লেখা। এরপর একে একে তিনি পনেরোখানা গ্রন্থ রচনা করেন এবং প্রকাশ করেন।
তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল ‘বিধবা গঞ্জনা ও হিন্দু ধর্ম রহস্য’। হিন্দু বিধবাদের জীবনের করুণ চিত্র মর্মস্পর্শী ভাষায় সমালোচনা করে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে রচিত এ এক অপূর্ব সাহিত্যসৃষ্টি।

হিন্দু বিধবা নারীদের চরম দুর্দশা পরিলিক্ষত করে তিনি শুধু পুস্তক রচনাতেই থেমে থাকেননি, তিনি বিধবাদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে সারা বাংলা এবং আসামে তার প্রচারাভিযান শুরু করেন। বিভিন্ন সভা সমিতিতে ওয়াজ নসিহত ও জরালো যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিধবা বিবাহের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। তার আহ্বানে দেশের বিবেকবান মানুষ বিধবা বিবাহের পক্ষে এগিয়ে আসেন। যশোরের( বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার আওতাধীন)নলডাঙ্গার রাজা প্রমথভূষণ দেবরায় মহাশয় হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলনে জোর আন্দোলন শুরু করেন এবং মুন্সী মেহেরুল্লাহ সাহেবের বিভিন্ন সভা সমিতিতে উপস্থিত হয়ে বিধবা বিবাহের সপক্ষে হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করতেন। রায় মহাশয় আপ্রাণ চেষ্টা ও নিজ অর্থ ব্যয়ে বহুসংখ্যক হিন্দু বিধবা নারীকে পুনরায় বিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সতীদাহ প্রথা বিলোপ এবং বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয় আইন প্রচলনের মুক্তির দিশারী হিসেবে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে মুন্সী মেহেরুল্লাহও প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ইতিহাসে চিরকাল।

তাঁর সমাজ সংস্কারের কাজ এবং ইসলাম প্রচার রক্ষার কাজ দেখে বিরুদ্ধবাদীরা আস্তে আস্তে তাদের কর্মকাণ্ড স্থগিত করতে বাধ্য হয়। তাঁর এহেন কার্যকলাপের ফলে সরকারি মহল পর্যন্তও তাঁকে সমীহ করে চলছিল। এ রকম এক প্রেক্ষাপটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক তাঁর নিজ এলাকার আঞ্চলিক প্রধান(প্রেসিডেন্ট)হিসেবে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

মুন্সী মেহেরুল্লাহ ছিলেন অনন্য বিদ্যোৎসাহী ও অনুপম শিক্ষানুরাগী। তিনি যেখানেই বক্তৃতা করেছেন সেখানেই শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, অবহেলিত মুসলিম সমাজকে শিক্ষা ও জ্ঞানের দ্বারা আলোকিত করে তুলতে না পারলে মুসলিম জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যে তিনি নিজ গ্রাম ছাতিয়ানতলার পাশে চূড়ামনকাঠি বাজারে একটি মাদ্রাসা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী হিন্দুর বিরোধিতার কারণে তিনি ব্যর্থ হন। তখন তিনি তার গ্রাম থেকে প্রায় এক মাইল দূরে মনোহরপুর গ্রামে ‘মাদ্রাসা-ই-কারামতিয়া’ নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এইভাবেই সারাদেশে অসংখ্য মক্তব, মাদ্রাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করে অশিক্ষিত জাতিকে শিক্ষার আলো দানের জন্য সারাজীবন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।


মুন্সী মেহেরুল্লাহ'র জীবনাবসানঃ

মেহেরুল্লাহ সাহেব দিনরাত পরিশ্রম করে করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯০৭ সালের ৭ই জুন মাত্র ৪৬বছর বয়সে এই ধর্ম প্রচারক বাগ্মীবীর, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক মুন্সী মেহেরুল্লাহ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যশোরের ছাতিয়ানতলা গ্রামে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। সমাপ্ত হয় উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণের এক আলোকিত অধ্যায়ের।

মুন্সী মেহেরুল্লাহ’র সময়কালের দিকে তাকালে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়—কী করে সামান্য শিক্ষিত একজন গ্রাম্য মানুষ আপন প্রতিভাবলে সম্পূর্ণ বৈরী স্রোতে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে এনেছিলেন। সমসাময়িক কালেতো বটেই, বর্তমান সময়ের পন্ডিতরাও একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, তার সময়ে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বক্তা ও সমাজসংস্কারক। যে কারণে তখনকার মানুষ তাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করেছিল, যেমন- বাগ্মীকুল তিলক, জাতির ত্রাণকর্তা, বঙ্গবন্ধু, মুসলিম বাংলার রামমোহন, বাংলার মার্টিন লুথার, যশোরের চেরাগ, দ্বীনের মশাল প্রভৃতি। তাইতো মুন্সী মেহেরুল্লাহ’র মৃত্যুর পর তাঁর ভাবশিষ্য কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লেখেন—

“একি অকস্মাৎ হল বজ্রপাত! কি আর লিখিব কবি! বঙ্গের ভাস্কর প্রতিভা আকর অকালে লুকাল ছবি!
কি আর লিখিব কি আর বলিব, আধাঁর যে হেরি ধরা!
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল খসিয়া কক্ষচ্যুত গ্রহতারা!

শেষ হলো খেলা পুবে গেল বেলা আঁধার আইল ছুটি,
বুঝিবি এখন বঙ্গবাসীগণ কি রতন গেল উঠি।
গেল যে রতন হায়, কি কখন মিলিবে সমাজে আর?
মধ্যাহ্ন তপন হইল মগন বিশ্বময় অন্ধকার”।


তথ্যসূত্রঃ
• বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং মুন্সী মেহেরুল্লাহ’র জন্ম শতবার্ষিকীর স্মরণিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ সমূহ।
• ইন্টারনেট।

 

রোজীনা পারভীন বনানী 
ঝিনাইদহ, বাংলাদেশ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top