সিডনী রবিবার, ৭ই আগস্ট ২০২২, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৯

হজ মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের অনুপম নিদর্শন : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
৫ জুলাই ২০২২ ১৬:৩৮

আপডেট:
৭ আগস্ট ২০২২ ২২:১৯

ছবিঃ মোঃ শামছুল আলম

 

কালপরিক্রমায় আমাদের সামনে উপস্থিত পবিত্র হজ মৌসুম। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজি সাহেবরা ছুটেছেন কাবার পথে। ছুটছেন রওজা পাকের জিয়ারতে রসুল (সা.)-এর প্রেমের টানে। যে যেভাবে পারছেন ছুটে আসছেন। কেউ উড়োজাহাজে। কেউ জলপথে জাহাজে করে। আবার কেউবা স্থলপথে। হেঁটে হেঁটে। সে কী স্পৃহা! কী আকর্ষণ! কী ভালোবাসা! হজের মৌসুমে সারা বিশ্বের মুসলমান এক স্থানে একত্রিত হয়। সম্মিলিতভাবে আল্লাহতায়ালার বড়ত্বের গুণগান করে। নিজেদের আবদিয়াত আর দাসত্বকে প্রকাশ করে। ঐক্য, সৌহার্দ্য, একতা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখার শিক্ষা নেয়। শিষ্টাচার, সৌজন্যতা ও ভদ্রতার সবক নেয়। সব কুফুরি শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার তালিম গ্রহণ করে। বাতিল অপশক্তির মোকাবিলায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আর এ সময় শয়তান থাকে ভয়ে কম্পমান। শয়তানের শিষ্যরা থাকে নির্জীব-নিষ্ক্রিয়। ওরা নিস্থির-নিথর দেহের মতো মুসলমানি শক্তির মহড়া দেখে। মুসলমানদের ঐক্যের জামাত দেখে। ঐক্যবদ্ধতা ও সম্প্রীতির আচরণ দেখে।
শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জ অর্থ, আল্লাহর ঘর যিয়ারতের লক্ষ্যে সফর করা এবং ব্যাপক অর্থে ‘পবিত্র জ্বিলহজ্জ চাঁদের ৮ তারিখ হতে ১৩ তারিখের মধ্যে নির্ধারিত নিয়মে সুনির্দিষ্ট স্থানে তাওয়াফ যিয়ারত সাফা-মারওয়ায় দৌড়াদৌড়ি ও কঙ্কর নিক্ষেপসহ শরীয়ত নির্ধারিত কতিপয় অনুষ্ঠান পালন করাকেই হজ্জ বলে।
পবিত্র কুরআন হাকীমে হজ্জের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বপ্রথম গৃহ যা মানব জাতির জন্য নির্মিত হয়েছে। সে গৃহটি মক্কায় অবস্থিত, যা সমগ্র সৃষ্টিজগতের হিদায়েতের কেন্দ্র স্থান। তার মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শন মাকামে ইব্রাহীম। যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। মানুষের প্রতি আল্লাহর হক্ব এই যে, এ ঘর পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ যাদের আছে তারা অবশ্যই হজ্জ আদায় করার জন্য এখানে আসবে (আল ইমরান-৯৬, ৯৭)।
পবিত্র কোরআনের বর্ণনা দ্বারা উপলব্ধি করা যায়, ঐশী নির্দেশনায় ইবরাহিম (আ.) কাবা ঘর নির্মাণের পর আল্লাহর কাছে আরজি পেশ করলেন, হে আল্লাহ! এই নির্জন মরু প্রান্তরে কে এই ঘর তাওয়াফ করতে আসবে। তখন আল্লাহ তায়ালা আদেশ করলেন, তুমি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে এবং তার দেওয়া চতুস্পদ জন্তু সমূহ জবাহ করার সময় নির্দিষ্ট দিন গুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (হজ : ২৭-২৮)
হজ মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের অনুপম নিদর্শন। সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বিরল সেতুবন্ধন। রাসুলে কারিম (সা.) এর হাদিসে মুমিনদের এক দেহের সাথে তুলনা করা হয়েছে। হজের ইবাদতের মধ্যেই এক দেহ এক প্রাণের চোখশীতল করা সেই অভাবনীয় দৃশ্য ফুটে ওঠে আপন মহিমাময়। হজের ইহরাম, তালবিয়া- লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক থেকে শুরু করে সর্বশেষ বিদায়ি তাওয়াফ পর্যন্ত একই ব্যাঞ্জনা ধ্বনিত হয়। পবিত্র কাবার তাওয়াফ, সাফা মারওয়ায় সায়ি, আরাফায় অবস্থান, মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ ও তাওয়াফে জিয়ারত সহ হজের সকল বিধানাবলীর মধ্যে ঐক্যের সুবাস ছড়িয়ে আছে। তাই তো, আরাফার ময়দানে একই ইমামের পেছনে সবাই নামাজ পড়েন। মুসলিম উম্মাহর দিক নির্দেশনামূলক খুতবা প্রদান করে খতিব সাহেব। ব্যক্তি জীবন থেকে জাতীয় জীবনে কী করণীয়; বিস্তর আলোচনা করেন।
হজ পালনে নেই কোনো ভেদাভেদ। একই স্থানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজার অবস্থান। শুভ্র বসনে লাখো হাজির দিল জুড়ানো দৃশ্যের অবতারণা। এখানেই ইসলামের সমতার মর্মবাণী সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। হজের একটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টি করা। প্রতি বছর হজের মৌসুমে সারাবিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান সব ধরনের জাতিগত ও ভৌগোলিক ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে হজের আনুষ্ঠানিক ইবাদত সম্পন্ন করার মাধ্যমে একদিকে আল্লাহর বিধান পালন করেন এবং অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ শক্তিশালী করেন।
বর্তমান বিশ্বে ইসলাম যখন চরম হুমকির সম্মুুখীন। শতধা বিভক্ত মুসলিম উম্মাহ যখন অস্তিত্বের সংকটের সম্মুখীন, তখন হজের শিক্ষা আমাদের মধ্যে বাস্তবায়ন করে জাতীয় জীবনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, হজ এমন একটি ইবাদত যাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের মুসলমানরা একই সময়ে একই জায়গা সমবেত হন। সুতরাং হজের সময় কাবার মিলনমেলাই হতে পারে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যবদ্ধতার মূল চেতনা। সেই চেতনায় উদ্যোগী হলে পতনোন্মুখ মুসলমানদের মধ্যে নতুন জীবনের সুবাতাস বইবে। সুন্দরের আলোক বিভায় শান্তির হিমেল পরশ জারি হবে। আমরা কী হজের এই সুমহান চেতনা নিয়ে একটু ভাববার সুযোগ পাব?

 


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top