সিডনী রবিবার, ৭ই আগস্ট ২০২২, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৯

মধুকবির অর্ধেক আকাশ : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
২০ জুলাই ২০২২ ১৮:০৬

আপডেট:
৭ আগস্ট ২০২২ ২২:২৬

 

বাবু রাজনারায়ন দত্ত স্থির করেছেন এবার তাঁর তরুণ পুত্রকে সংসারে বাঁধতে হবে। আঠারো বছর বয়সী সদ্যযুবক মধুসূদন ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করছেন। ক্যালকাটা লিটারারী গেজেট, বেঙ্গল হেরাল্ড, ওরিয়েন্টাল প্রভৃতি ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। ছেলের সমবয়সি বন্ধুবান্ধব গৌরদাস, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ন বসু, প্যারীচরন সরকার ইত্যাদি সবাই প্রায় বিবাহ করে সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ। ১৮৪২ খৃ: রাজনারায়ন দত্তের সাথে তমলুক গিয়ে এক ধর্মপ্রাণা সন্ন্যাসিনীর প্রেমে পড়লেন মধুসূদন। তমলুক থেকে কলকাতায় ফিরে এলেন এক বিরহকাতর যুবক। রাজনারায়ন আর কালক্ষেপ না করে এক সুন্দরী অল্পশিক্ষিতা জমিদার তনয়ার সাথে মধুসূদনের বিবাহ স্থির করলেন। পাশ্চাত্য সমাজের অনুরক্ত মধুসূদনের কাছে আবাল্য হিন্দু সমাজ ও ধর্ম ছিল ব্রাত্য। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা তাঁকে হিন্দু সমাজ ও ধর্মের প্রতি বিরাগভাজন করে তুলেছিলো। একজন অল্পশিক্ষিতা অচেনা গ্রাম্য বাঙালী কন্যাকে জীবনসঙ্গিনী করার কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। তাঁর কাছে জীবনসঙ্গিনী তিনি হবেন যিনি তাঁর চিন্তা ভাবনার শরিক হতে পারবেন, বিবাহের পূর্ব থেকেই যার সাথে তাঁর জানাশোনা থাকবে। গুরুজনদের ইচ্ছাপূরণের জন্য নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া তাঁর স্বভাব-বিরুদ্ধ, চিন্তার ও অতীত। ১৮৪২ খৃ: ২রা নভেম্বের বন্ধু গৌরদাস বসাককে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেন "কেউ এসে আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিক। আজ থেকে তিনমাস পরে আমার বিয়ে দেওয়া হবে। কী ভয়াবহ ঘটনা। আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যন্ত্রনাদায়ক হয়ে ছুটোছুটি করছে। আমার চুল শজারুর কাঁটার মত খাড়া হয়ে উঠেছে। আমার সাথে যার বিয়ে হবার কথা, তিনি নাকি মস্তবড় জমিদার কন্যা। হায়রে বেচারী! অন্ধকার ভবিষ্যতের গর্ভে তাঁর জন্য কতশত দুর্দশাই না জমা হয়ে আছে।" (ইংরাজী চিঠির অনুবাদ) চোখে যার বিলাত যাবার স্বপ্ন,ইংরাজি ভাষার বিরাট কবি হওয়ার স্বপ্ন, তাঁর কাছে পিতার এই প্রস্তাব স্বপ্নভঙ্গ বলেই মনে হলো। সুবোধ বালকের মতো মেনে না নিয়ে ১৮৪৩খৃ: পরিবারের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে গৃহত্যাগ করে তিনি ধর্মান্তরিত হলেন খ্রীস্ট ধর্মে। সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে নিজের নামের সাথে যুক্ত করলেন মাইকেল শব্দটি। রাজনারায়ন দত্ত বিধর্মী পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করলেও বিশপ কলেজে তাঁর পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করছিলেন। চারবছর পর তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করলেন| স্বভাবে অত্যন্ত বেহিসেবি, বিলাসী মধুসূদন পড়লেন বিপদে। অর্থকষ্ট এমন পর্যায়ে পৌছালো যে নিজের পাঠ্যপুস্তক বিক্রয় করে তিনি মাদ্রাজ পাড়ি দিলেন ভাগ্যাণ্বেষনে।
কপর্দকহীন অবস্থায় মাদ্রাজে পা রেখে মধুসূদন বহু চেষ্টা করে অবশেষে তাঁর এক ইংরেজ বন্ধুর সহায়তায় মাদ্রাজের 'মেল অরফ্যান এসাইলাম' স্কুলে সহকারী শিক্ষকের চাকরী পেলেন। বেতন মাত্র ছেচল্লিশ টাকা। সেইসাথে মাদ্রাজের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় 'টিমোথি পেনপোয়েম' এই ছদ্মনামে কবিতাচর্চাও চলতে লাগলো। ভাগ্যবিপর্যস্ত, স্বজনবিচ্ছিন্ন, অস্থির দিগভ্রান্ত মধুকবির জীবনে এলেন এক অসাধারণ সুন্দরী ইংরেজ রমণী রেবেকা টমসন। মেল অরফান এসাইলাম স্কুলের পাশে ছিল অরফান এসাইলাম গার্লস স্কুল। সেই গার্লস স্কুল সংলগ্ন লেডিজ ইন্সটিটিউটের ছাত্রী রেবেকা টমসনের প্রেমে পড়লেন মধুকবি। যতদূর জানা যায় রেবেকার পিতার নাম ছিল রবার্ট টমসন, মা ক্যাথরিন টমসন। রবার্টের মৃত্যুর পর মা ক্যাথরিন রেবেকাকে নিয়ে নীলকর ডুগ্যাল্ড ম্যাকটাভিসের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রেবেকার পালকপিতা ছিলেন ম্যাকটাভিস। সুন্দরী রেবেকার সাথে মাত্র ছেচল্লিশ টাকা বেতনের এক কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষকের সম্পর্ক মেনে নিতে পারলো না শ্বেতাঙ্গ সমাজ। চারপাশ থেকে এলো অনেক প্রতিবন্ধকতা। রেবেকা অরফ্যান হলেও তিনি শ্বেতাঙ্গ সুন্দরী রমণী। কিন্তু মধুসূদন দৃঢপ্রতিজ্ঞ, রেবেকাকে তিনি জীবনসঙ্গিনী করবেনই। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ দ্য ক্যাপটিভ লেডি। তাঁর ও রেবেকার প্রেমরসে অনুপ্রাণিত। যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা অগ্রাহ্য করে স্থানীয় ইংরেজ বন্ধু মি. নেলর ও অনান্য বন্ধুদের সমবেত প্রচেষ্টায় ১৮৪৮খৃ: ৩১শে অগাস্ট রেজিস্ট্রী করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন মধুকবি ও রেবেকা। ১৮৪৯ খৃ: ১৪ ই ফেব্রুয়ারী প্রিয় বন্ধু গৌরদাসকে পত্রে বিবাহের সংবাদ জানিয়ে মধুসূদন লিখেছেন "আমার বিবাহ ব্যাপারে তুমি যে সংবাদ জেনেছো তা সঠিক। শ্রীমতি দত্ত একজন ইংরেজবংশীয়া। তাঁর বাবা এই প্রেসিডেন্সির একজন নীলকর ছিলেন। তাঁকে পেতে আমায় অনেক বিড়ম্বনা পেতে হয়েছে। সহজেই অনুমান করতে পারবে যে তাঁর বন্ধুরা এই বিবাহের ঘোর বিরোধী ছিল। যাই হোক সব ভালো যার শেষ ভাল তার.... তিনি অতি চমৎকার মেয়ে।"
অনেক খুশি, আবেগ, ভালোবাসা নিয়ে শুরু হয়েছিল দাম্পত্য জীবন। ইতিমধ্যে মধুসূদনের আর্থিক অবস্থার ও একটু উন্নতি হয়েছে। মাদ্রাজ সার্কুলেটর পত্রিকায় শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাও করছেন। তাঁর রচিত ক্যাপটিভ লেডি যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। ১৮৫০খৃ: জন্ম হলো তাঁদের প্রথম সন্তান কেনেট বার্থা ডটনের। সন্তান জন্মের পর ভগ্নস্বাস্থ্য রেবেকা স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য নাগপুরে বেড়াতে গেলেন। মাদ্রাজে গৃহে একাকী বিরহকাতর কবি লিখলেন সনেট "মাই হোম ইজ লোনলি ফর আই সিক ইন ভেন/ফর দেম হু মেড ইট স্টার লাইটস।"(অন দ্য ডিপারচার অফ মাই ওয়াইফ এন্ড চাইল্ড টু দ্য আপার প্রভিন্সেস) এই সুখী সংসারের দর্পন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মধুসূদনকে দুই কন্যাসন্তান আর দুই পুত্র সন্তান উপহার দিয়েছেন রেবেকা। ভালোবেসে সহ্য করেছেন অসংসারী কবির অমিতব্যয়ীতা,স্বেচ্ছাচারিতা, অত্যধিকমাত্রায় পানাসক্তি। ১৮৫৫ খৃ: মধুসূদন মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটির চাকরী ত্যাগ করে পুরোপুরি সাংবাদিকতাকে পেশা করেন মাদ্রাজ স্পেক্টেটর পত্রিকায়। এইসময় ১৮৫৫ সালের ১৯শে ডিসেম্বর বন্ধু গৌরদাসের লেখা একটি পত্র থেকে তিনি জানতে পারলেন তাঁর পিতা রাজনারায়ন দত্ত পরলোকগমন করেছেন। কলকাতায় রটে গেছে মধুসূদন মারা গেছেন। পিতার বিশাল সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয় স্বজন কাড়াকাড়ি শুরু করেছে। কবি স্থির করলেন পৈত্রিক সম্পত্তির উদ্ধারের জন্য তিনি কলকাতায় ফিরে যাবেন। ১৮৫৫ খৃ:২৮শে জানুয়ারী কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। কিন্তু আর কলকাতা থেকে মাদ্রাজে ফিরে এলেন না। মাদ্রাজে পড়ে রইল তাঁর স্ত্রী চার নাবালক সন্তান সন্ততি সহ সাজানো একটি সংসার। শুধু তাই নয় সারা জীবনে মধুসূদন কোথাও কোনো পরিস্থিতিতেই রেবেকা ও তাঁর চার সন্তানের নামোল্লেখ ও করেন নি। যেন তাঁর জীবন থেকে এক ঝটকায় মুছে দিলেন পরিপূর্ণভাবে তাঁর উপর নির্ভরশীল একটি পরিবার| কিন্তু কি হয়েছিল রেবেকা ও মধুকবির দাম্পত্যে? কি সেই ঝড় যাতে গুঁড়িয়ে যায় একটি নীড়? কেন হলো এই মহাবিচ্ছেদ? মধুসূদনের যে চিঠিপত্র পাওয়া গিয়েছে তাতে কোথাও রেবেকার সাথে তাঁর সামান্যতম দ্বন্দের উল্লেখ নেই। এমনকি বিচ্ছেদের সামান্যতম পূর্বেও তিনি বন্ধু গৌরদাসকে পত্রে জানিয়েছেন"আই হ্যাভ ফোর চিলড্রেন আনড ফাইন ওয়াইফ।" মধুসূদনের অমিতব্যয়ীতার জন্য অর্থাভাব, সংসারের অনটন এই তিক্ততা এনে দিয়েছিল এই যুক্তি আদপেই সত্যি নয় কেননা রেবেকা সব জেনেশুনেই ছেচল্লিশ টাকা বেতনের শিক্ষককে বিবাহ করেছিলেন। তাঁর অত্যধিক পানাসক্তি ও এই বিচ্ছেদের কারন নয়। রেবেকা আজন্ম যে সমাজে লালিত হয়েছেন সেখানে মদ্যপান একটি অতি সাধারন, স্বাভাবিক ঘটনা। তাহলে কি এমন অপরাধ করেছিলেন রেবেকা যে মধুসূদন তাঁকে এতবড় একটা শাস্তি দিলেন? মধুসূদন মাদ্রাজ থেকে রেবেকাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে আসেননি। মধু গবেষক ড:গোলাম মুরশিদ এথেনিয়ম পত্রিকা থেকে তথ্য আবিস্কার করে দেখিয়েছেন যে মধুসূদন নিজের নামেই জাহাজে টিকিট কেটে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রেবেকা জানতেন তাঁর স্বামী কলকাতায় যাচ্ছেন পৈত্রিক সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে। মধু গবেষকদের মতে বিবাদ নয়, আসলে রেবেকা ছিলেন আত্মসম্মানী, ব্যক্তিত্বসম্পন্না শ্বেতাঙ্গ নারী। আবাল্য পিতামাতার প্রশ্রয়ে বড় হওয়া মধুসূদনের পক্ষে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব স্বীকার করা অসম্ভব ছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল তাঁর জীবনে দ্বিতীয়া নারীর আগমন। রেবেকা যখন সংসার ও সন্তান নিয়ে ব্যস্ত, সেইসময় মধুসূদনের সাথে পরিচয় হয় হেনরিয়েটার। হেনরিয়েটার পিতা জর্জ হোয়াইট ছিলেন মাদ্রাজ স্কুলে মধুসূদনের সহকর্মী। সেই সূত্রে তাদের বাড়িতে মধুকবির আগে থেকেই যাতায়াত ছিল। জর্জ হোয়াইটের স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁর কন্যা হেনরিয়েটার সমবয়সী এক কিশোরীকে বিবাহ করেন। এই বিবাহ হেনরিয়েটা ও তাঁর ভাই মেনে নিতে পারেননি। হেনরিয়েটার এই অশান্তময় জীবনে দু:খী হেনরিয়েটার দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন মাইকেল। এই সহানুভূতি থেকেই দুজনের ভিতরে গড়ে ওঠে প্রণয়ের সম্পর্ক|।স্বভাবে অসংসারী, অস্বাভাবিক আবেগপ্রবণ মধুকবি রেবেকা ও তাঁর চার নাবালক সন্তান সন্ততি নিয়ে গড়ে তোলা গৃহকোণ ভুলে কলকাতায় এসে জীবনের নতুন দিশা খুঁজে পেলেন প্রেমিকা হেনরিয়েটার মধ্যে| হেনরিয়েটা মাদ্রাজ ছেড়ে কলকাতায় এসে মাইকেলের সাথে স্ত্রীর মতো থাকতে শুরু করলেন। কোনোরকম বিবাহ তাঁদের মধ্যে হয়নি, রেবেকার সাথে মাইকেলের ডিভোর্স ও সারা জীবনে হয়নি।
বিবাহ না হলে ও হেনরিয়েটাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ৬নং চিৎপুর রোডে বাড়ী ভাড়া করে বসবাস শুরু করলেন মধুসূদন। কলকাতার পুলিশি আদালতে দোভাষীর পদে নিযুক্ত হলেন। বেলগাছিয়া নাট্যশালার জন্য শ্রীহর্ষের রত্নাবলী নাটকের অনুবাদ করতে এসে বাংলা নাটকের দূরাবস্থা দেখে রচনা করলেন বাংলা ভাষার সর্বপ্রথম সার্থক নাটক শর্মিষ্ঠা। ১৮৫৯ খৃ: জন্মগ্রহণ করলেন মধুসূদন হেনরিয়েটার প্রথম কন্যাসন্তান শর্মিষ্ঠা। ১৮৬১খৃ: তাঁদের পুত্রসন্তান মেঘনাদ মিল্টন দত্ত। হেনরিয়েটার ভালোবাসা, কোমল আনুগত্য, অনুপ্রেরণায় মধুসূদন নূতন করে মেতে উঠলেন সৃষ্টিকর্মে। বাংলা সাহিত্যেকে সমৃদ্ধ করলেন একাধিক নাটক, প্রহসন নাটক, অমিত্রাক্ষর ছন্দে মহাকাব্য ইত্যাদি। ১৮৬১ খৃ: মেঘনাদবধ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়ে গেলো। তিনি মহাকবি হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করলেন। হেনরিয়েটা ও পুত্রকন্যাকে নিয়ে মাইকেল ঘুরে এলেন সাগরদাঁড়ি গ্রামে, তাঁর জন্মস্থানে। ফিরে এসে ১৮৬২ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে মাইকেল ইংলান্ড যাত্রা করলেন উদ্দেশ্য ছিল বিলাত থেকে ব্যারিস্টারী পাশ করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করা। বিদ্যাসাগরের সহায়তায় ভূ সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে বিলাত যাবার অর্থ যোগাড় হলো। হেনরিয়টা ও তাঁদের সন্তানদের প্রতি এবার তিনি একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে গেলেন। তাঁর পিতার আমলের কিছু কর্মচারীর কাছে যাবতীয় সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে স্ত্রী হেনরিয়েটা ও সন্তানদের জন্য প্রতিমাসে দেড়শত টাকা প্রদানের চুক্তি করে গেলেন। মধুসূদনের বিরহ ব্যথায় কাতর হেনরিয়েটা বহুদিন কলকাতায় পড়েছিলেন। কিন্তু কলকাতায় নাবালক সন্তান সন্ততি নিয়ে বাস করা একরকম দুস্কর হয়ে পড়লো হেনরিয়েটার পক্ষে। কিছুদিন পর থেকেই হেনরিয়েটা কে চুক্তিমত দেড়শ টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় পত্তনিদারগণ। অসহায় বিপর্যস্ত হেনরিয়েটা কোনোরকমে চেয়ে চিন্তে পাথেয় যোগাড় করে স্বামীর কাছে ইংলান্ডে পৌছালেন। সেখানে মধুসূদনের আর্থিক অবস্থাও তথৈবচ। দেশ থেকে অনিয়মিত অর্থের যোগানে তাঁকে চারদিক থেকে দেনা করতে হয়েছে। সপরিবারে মধুকবি ভার্সাই নগরে বসবাস করতে লাগলেন। বিদ্যাসাগরের বদান্যতায় আবার নিজে ইংলান্ড গিয়ে ব্যারিস্টারী পড়া শেষ করেন। ১৮৬৭সালে আবার হেনরিয়েটা ও পরিবারকে ভার্সাইয়ে ফেলে রেখে তিনি স্বদেশে ফিরে এলেন। অর্থকষ্টে জর্জরিত হয়ে হেনরিয়েটা ভার্সাই নগরীতে চার সন্তান সন্ততি নিয়ে আরো দুই বছর ছিলেন। মধুসূদনের এই নিষ্ঠুরতা তাঁকে দীর্ণ বিদির্ণ করে দিয়েছিলো। কিন্তু তিনি রেবেকা নন, কোনো অবস্থাতেই হার মানার পাত্রী ছিলেন না। এক ফরাসী ভদ্রমহিলার সহায়তায় ভারতে আসার অর্থ সংগ্রহ করে তিনি সন্তানদের নিয়ে কলকাতায় ফিরে এলেন মধুসূদনের কাছে। মধুসূদন ইতিমধ্যে ভালোই উপার্জন করছিলেন। হেনরিয়েটাকে নিয়ে তিনি বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ী ভাড়া করে বসবাস শুরু করলেন। রাজকীয় বিলাসব্যসন, অত্যধিক অমিতব্যয়ীতার জন্য যথেষ্ঠ উপার্জন করা সত্ত্বেও তাঁর ধার দেনা বাড়তেই লাগলো। সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকলো। এর উপরে ছিল তাঁর মানসিক অস্থিরতা ও অত্যধিক পানাসক্ত। শারীরিক ভাবেও পীড়িত হয়ে পড়লেন কবি।
অসুস্থ, অর্থাভাবে ক্লিষ্ট কবি ও হেনরিয়েটাকে উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় গঙ্গাতীরস্থ উত্তরপাড়া লাইব্রেরী ভবনের দ্বিতলে নিয়ে এলেন। মধুসূদনের উত্তরপাড়ায় অবস্থানকালে বন্ধুবর গৌরদাস সর্বদা তাঁকে দেখতে যেতেন। একদিন তিনি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখলেন মধুসূদন শয্যার উপর রক্তবমন করছেন। ঘরের মেঝেতে হেনরিয়েটা প্রবল জ্বরে ছটফট করছেন। গৌরদাস হেনরিয়েটাকে মূর্ছিতাপ্রায় দেখে সাহায্য করার জন্য ব্যস্ত হলে হেনরিয়েটা তাঁকে কাতর স্বরে অনুরোধ করলেন "আমার জন্য চিন্তা নাই, আমি মরিতে ভয় করি না। যদি পারেন আমার স্বামীর প্রাণ রক্ষা করুন।" জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও মধুসূদনের জন্য তাঁর দুশ্চিন্তার,উদ্বেগের অন্ত নেই। অথচ আইনত: মধুসূদনের স্ত্রী নন, এক চির দুর্ভাগা নারী। ভালোবেসে যিনি উজাড় করে দিয়েছেন নিজের সত্তা। বন্ধুরা কবিকে কলকাতায় হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। হেনরিয়েটাকে নিয়ে গেলেন তাঁর জামাই আংলো ইন্ডিয়ান পাড়ায় ১১নং লিন্ডসে স্ট্রীটে। ১৮৭৩খৃ: ২৬শে জুন বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় অনাদরে মৃত্যু হল তাঁর। মধুকবিকে গৃহী করতে, সুখী করতে অনেক চেষ্টা করেছেন হেনরিয়েটা। অভাব, দুর্দশা সহ্য করে ও বারবার ছুটে এসেছেন তাঁর কাছে| ভালোবেসে এক অযৌক্তিক, ব্যাখাতীত, পাগলপারা, দিশাহারা অথচ অসীম প্রতিভাবান, মেধাবী পুরুষকে জীবনসঙ্গী করে বরণ করে নিয়েছিলেন অবর্ণনীয় দু:খ কষ্ট। প্রকৃত ভালোবাসা ব্যতীত যা কখনোই সম্ভবপর নয়। হেনরিয়েটার মৃত্যুতে রোগজীর্ণ মাইকেল আরো ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র তিনদিন পরে ২৯শে জুন, ১৮৭৩ সালে কপর্দকহীন অবস্থায় ইহলোক ত্যাগ করেন মাইকেল। একরকম সহমরণ হল তাঁদের দুজনের। হেনরিয়েটার পাশেই সমাধিস্থ করা হয় মাইকেলকে। শুধু জীবনে নয়, জীবনের ওপারেও মাইকেল হেনরিয়েটা পাশাপাশি রয়ে গেলেন অনন্তকাল।

কিন্তু রেবেকার জীবনে কি হয়েছিল পরবর্তী কালে? মধুসূদন যখন তাঁকে ত্যাগ করে কলকাতায় চলে আসেন রেবেকা বয়স মাত্র ছাব্বিশ বৎসর। এক পূর্ণ যৌবনা রমণী তিনি। সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরেও আঠারো বছর জীবিত ছিলেন মধুসূদন। একটি বারের জন্যও নিজের, সন্তানদের অধিকার দাবি করে কবির সামনে আসেননি রেবেকা। আলাদা হওয়ার পরেও সুদীর্ঘ সাইত্রিশ বৎসর বেঁচে ছিলেন রেবেকা| নতুন করে জীবন শুরু করেননি সন্তানদের কথা ভেবে। সন্তানদের মানুষ করেছেন একাকী লড়াই করে। স্বামী তাঁকে নিষ্ঠুরের মতো ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তবুও স্বামীকে সারা জীবন তিনি বাদ দিতে পারেন নি। আজীবন নিজের নামের পাশে ডটন পদবী রেখে দিয়েছিলেন। ১৮৭৩ খৃ: মধুসূদনের মৃত্যুর আগে রোগশয্যায় কবির পাশে থেকে তাঁর সেবা করার অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন রেবেকা। যদিও তা কার্যকরী হয়নি। মধুসূদনের মৃত্যুর পরে দীর্ঘ কুড়ি বছর বেঁচে ছিলেন রেবেকা। ১৮৯২ খৃ: ২২শে জুলাই ক্ষয়রোগে যখন তাঁর মৃত্যু হয় তখনো চার্চের খাতায় তাঁর নাম 'রেবেকা টমসন ডটন'। স্বামীর সাথে কোনো বিচ্ছেদই তিনি মেনে নেনে নিতে পারেননি অন্তর থেকে।

 

তথ্যসূত্র: যোগীন্দ্রনাথ বসু, খসরু পারভেজ - মাইকেল পরিচিতি|

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top