সিডনী শুক্রবার, ১৯শে জুলাই ২০২৪, ৪ঠা শ্রাবণ ১৪৩১

সিটি টু সার্ফ: পদব্রজে সিডনি প্রদক্ষিণ : মোঃ ইয়াকুব আলী


প্রকাশিত:
১৫ আগস্ট ২০২৩ ২২:২৬

আপডেট:
৩১ আগস্ট ২০২৩ ২২:৫৬

 ছবিঃ তেরাশি বছরের ডাক্তার রাজু তেতাল্লিশ বছর ধিরে সিটি টু সার্ফে অংশ নিচ্ছেন


গত ১৩ই আগস্ট ২০২৩ অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফান ওয়াক 'সিটি টু সার্ফ'। এটা ছিল এই আয়োজনের ৫৩তম আসর। ১৯৭১ সালে মাত্র ২০২৫ জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই ইভেন্ট। এইবার সত্তর হাজারের উপর মানুষ এই ফান ওয়াক'এ অংশ নেয়। এখন অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে অতিপ্রিয় এই ইভেন্ট। এটা সিডনি সিবিডি (সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট) থেকে শুরু হয়ে চৌদ্দ কিলোমিটার হাঁটার পর শেষ হয় বন্ডাই সমুদ্র সৈকতে যেয়ে। সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে শুরু হয়ে বিভিন্ন ওয়েভে যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন রঙের মাধ্যমে ওয়েভগুলোকে ভাগ করে দেয়া হয় কাঠিন্যের ভিত্তিতে। রঙগুলো হলো গোলাপি, নীল, হলুদ এবং কমলা। যারা একটু বেশি দক্ষ তাদের জন্য ছিল শুরুতেই দৌড়। এরপর সময়সূচি ধরে একে একে অন্য গ্রুপের মানুষেরাও অংশ নেয়। সবশেষে ছিল কমলা গ্রুপ। এই ওয়েভের মানুষেরা গিয়েছিল হাটতে। এই ওয়েভে সব বয়সী হাটুরেরাই অংশগ্রহণ করতে পারে।
 ছবিঃ স্পরিবারে লেখকের বন্ধু আলম এবং পিয়াস
সিটি টু সার্ফ'র খবর প্রথম পাই আমাদের বন্ধু আলমের কাছ থেকে। আলম আমাদের বন্ধুদের মধ্যে আয়রন ম্যান নামে পরিচিত। এই বয়সে এসে আমাদের সবারই কম বেশি শরীর মুটিয়ে গেছে। কিন্তু আলম এখনো দেখতে একহারা পেটা গড়নের। আর এটা সম্ভব হয়েছে ওর নিয়মিত শারীরিক কসরত করার কারণে। দৌড়ানো, সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল প্রায় সব খেলাতেই আলমের থাকে সরব উপস্থিতি। আমাদের আরেক বন্ধু রায়হানও আলমের মতোই এখনো ফিট আছে। একদিন আলম আমাদের গ্রুপে ক্ষুদেবার্তা দিয়ে জানালো যে এই সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করলে কর্তৃপক্ষ 'রেস রিব'গুলো বিনামূল্যে ডাকে পাঠিয়ে দেবে। রেস রিব হলো সিটি টু সার্ফ'র ব্যাজ। যেটা পড়ে দৌড়াতে বা হাটতে হয়। আমি সাথে সাথেই নিজের জন্য নিবন্ধন করে ফেললাম। এরপর আমাদের মেয়েকে বললাম সেও যেতে চাই কি না? সে রাজি হলে তার জন্যও নিবন্ধন করে ফেললাম। তবে ততদিনে অন্য ওয়েভগুলো শেষ হয়ে শুধুমাত্র কমলা রঙেরটাই অবশিষ্ট ছিল। তাই আমিও নীল গ্রুপের সাথে না যেয়ে বাপ বেটি একসাথে কমলা ওয়েভের সাথে যাওয়াটাই স্থির করলাম।


ছবিঃ সিটি টু সার্ফ শুরু করার জন্য হাজারো মানুষ
সিটি টু সার্ফ এ যাওয়া নিয়ে আমাদের মধ্যে খুবই উত্তেজনা কাজ করছিল। সেই উপলক্ষে জুতা ট্রাউজারও কেনা হলো। আগের রাত্রে বন্ধুদের আড্ডাও আগেভাগেই শেষ করলাম। আলম শেষ মুহুর্তে একটা টিপস দিল। শুরুতেই তাড়াহুড়ো করে যেন ক্লান্ত না হয়ে যায়। কারণ শেষের কয়েক কিলোমিটার রাস্তা অনেক উঁচুনিচু। ১৩ই আগস্ট সকালে উঠে আমরা তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। ট্রেনে উঠে দেখি আমাদের মতো আরও অনেকেই যাচ্ছেন সিটি টু সার্ফ-এ। যেতে যেতে আলাপ করা হলো, কোন স্টেশনে নামতে হবে, কোন রাস্তায় যেয়ে জমায়েত করতে হবে। সেইন্ট জেমস স্টেশনে নেমে ম্যাকুয়ারি স্ট্রিট-এর এক্সিট নিয়ে এগিয়ে গেলাম। সেখানে অনেক সাহায্যকারী সহযোগিতা করছিল কোন দিকে যেতে হবে এই বিষয়ে। আমরা দ্রুতই রেস রিব পরে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। সিটি টু সার্ফ'র ব্যানারের সামনে দাড়িয়ে একটা ছবি তুলে নিলাম এরমধ্যেই। এরপর শুরুর স্থানের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমরা প্রায় আধাঘন্টা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম তাই শুরুর দিকেই ছিলাম। জমায়েতকে চাঙ্গা রাখতে রেডিওতে বিভিন্ন ধরনের ঘোষণা আসছিল। আমরা সেই মোতাবেক কখনও হাত নাড়ছিলাম আবার কখনও বা তারস্বরে চিৎকার করছিলাম।
ইতোমধ্যেই আমাদের পেছনে একটা বিশাল জনসমুদ্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষের মাথা। একসময় আমাদের শুরুর সময় ঘনিয়ে আসলো। রেডিওর সাথে সাথে আমরা সবাই দলবেঁধে গণনা শুরু করলাম। দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক, শুন্য। এরপর জনসমুদ্র ঢেউ তৈরি করে এগিয়ে চললো। আমাদের পাশেই একটা পরিবার ছিল ডাইনোসরদের থিম নিয়ে। মা বাবা দাদি পরেছিল ডাইনোসরদের পোশাক। আর বাচ্চা দুটোকেও পরিয়ে দিয়েছিল ডাইনোসরের মুখোশ। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে উনাদের সাথে ছবি তুলতেছিলেন। তার পাশেই দুই তরুণ পরেছিল হাঙরের পোশাক। এছাড়াও কেউ সেজেছিল, সুপারম্যান, কেউ হারকিউলিস, কেউ ডাইনি বুড়ি, কেউ সান্তাক্লজ এমন আরও অনেক বাহারি সাজ এবং রঙের সমাবেশ ছিল পুরো জনসমুদ্র জুড়ে।
হাটা শুরু করার কিছু পরেই মেয়েটা বললো পানি খাবে। তখন আমরা রাস্তার পাশের ওয়াটার স্টেশনে দাঁড়িয়ে পানি খেয়ে নিলাম। সেখানে অনেক স্বেচ্ছাসেবক দাঁড়িয়ে ছিল পানিভর্তি গ্লাস হাতে নিয়ে। এমন ওয়াটার স্টেশন ছিল কিছুদূর পরপরই। এছাড়াও ছিল ফার্স্ট এইড স্টেশন। সেখানে জরুরি চিকিৎসার সব ব্যবস্থার পাশাপাশি ছিল সানস্ক্রিম এবং স্যানিটাইজার। এছাড়াও কিছুদূর পরপরই ছিল প্রসাধন কক্ষের ব্যবস্থাও। আর আমাদের সাথে সাথেই সাইকেলে টহল দিচ্ছিল আরও একদল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। কারও শরীর খারাপ করলেই সাথে সাথে তাকে আলাদা করে সেবা শুশ্রূষা দেয়া হচ্ছিল। এছাড়াও অনেক মানুষ এবং সংগঠন নিজ উদ্যোগে পানীয় এবং হালকা খাবার সরবরাহ করছিল। আর বিভিন্ন দেশের মানুষ তাদের দেশের নাচ এবং গানের মাধ্যমে হাটুরেদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিল। এছাড়াও খেলার চিয়ারলিডারদের মতো একদল স্বেচ্ছাসেবক কিছুদূর পরপর দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার দুধারের মানুষও হাততালি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল এবং উৎসাহ দিচ্ছিল। পুরো সিডনি শহরজুড়ে বিরাজ করছিল উৎসবের আমেজ।

 ছবিঃ দূর থেকে দেখা সিডনি শহর
হাঁটতে হাঁটতে পরিচয় হলো অনেক রকমের মানুষের সঙ্গে। আমাদের মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে গেছে শুনে বুদ্ধি দিচ্ছিল কিভাবে ক্লান্তিভাব দূর করা যায়। এরপর দেখলাম একজন ভদ্রমহিলা শাড়ি পরে আমাদের পাশাপাশি হাঁটছেন। দেখে খুবই ভালো লাগলো। আমি যেচে যেয়ে উনার সাথে পরিচিত হলাম। উনার নাম শিমা, ভারতের মানুষ। তাই শাড়ি পরে নিজের দেশের ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিতে এসেছেন। সাথে এসেছে উনার মেয়ে। আমি বললাম, আপনি যে শাড়ি পরে চৌদ্দ কিলোমিটার হাঁটার সাহস দেখিয়েছেন এই জন্য আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন এবং মোবারকবাদ। স্মৃতিটা ধরে রাখার জন্য এরপর উনার সাথে একটা ছবি তুলে নিলাম। উনি বললেন, আমার বেশি বেশি ছবি তোলা দেখে আমার মেয়েটা বিরক্ত হচ্ছে। আমি বললাম আমার মেয়েটারও একই অবস্থা।
এরপর দেখলাম আমাদের পাশাপাশি দৌড়াচ্ছেন আরেকজন প্রৌঢ়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, স্যার আপনি ঠিক আছেন তো? উনার পেছন থেকে এক ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, উনি একদম ঠিক আছেন। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকালে উনি বললেন, উনি আমার বাবা। উনার বয়স এখন তেরাশি বছর। উনি গত তেতাল্লিশ বছর ধরে সিটি টু সার্ফ'এ অংশ নিচ্ছেন। আমি বললাম স্যার আপনার মতো মানুষেরাই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। এরপর উনাদের বাপ বেটির সাথেও ছবি তুলে নিলাম। উনার মেয়ে বললেন, তুমি গুগুলে উনাকে খুঁজে পাবে। উনার নাম ডাক্তার রাজু। এরপর আমি উনাকে লিংকডইনা খুঁজে পেলাম। উনার পুরো নাম সি কে রাজু। উনি সিডনির একজন জেনারেল প্রাকটিশনার। একটা উৎসবের মূল উদ্দেশ্যই আসলে মানুষে মানুষে এই মিথষ্ক্রিয়া। এর মাধ্যমে আমরা একে অন্যকে জানার সুযোগ পাই। জানতে পারি অন্যান্য মানুষের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতিও।
এভাবে চলতে চলতে একসময় আমরা বন্ডাই সমুদ্র সৈকতের দেখা পেলাম এবং মনেকরলাম আমাদের হাঁটা মনেহয় শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তখনও সৈকত প্রদক্ষিণ করে আরো এক কিলোমিটার হাঁটা বাকি ছিল। হাঁটা শেষ হবার স্থানে একটা গেট বানানো আছে। সেই গেট পার হবার সাথে সাথে আমার মোবাইলে ধন্যবাদ জানিয়ে ক্ষুদেবার্তা আসলো। এরপর আরেকটা গেটে যারা হাটা শেষ করলো তাদের জন্য ছিল অভিনন্দন বার্তা। সেই গেটের সামনেই স্বেচ্ছাসেবকরা সবার হাতে সিটি টু সার্ফ'র মেডেল তুলে দিচ্ছিল। আমরা মেডেল নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। তখন আবারও শিমা এবং তাঁর মেয়ের সাথে দেখা হলো এবং আমরা সৈকতকে পেছনে রেখে একটা পারিবারিক ছবি তুলে রাখলাম।

 ছবিঃ সিটি টু সার্ফ শেষ করার জন্য অভিনন্দন
সৈকতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছিল পরবর্তি করণীয় বিষয়ে। যারা বাড়ি ফিরতে চান তাদেরকে কোথায় লাইনে দাঁড়াতে হবে। আর যারা আরও কিছু সময় থাকতে চান তাদেরকে কোথায় দাঁড়াতে হবে। পুরো সৈকতে যেন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। এরমধ্যেই বিভিন্ন ধরণের স্টল ছিল খাওয়াদাওয়ার জন্য। আমরা আর দেরি না করে বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। এটা ছিল আমাদের জন্য 'ওয়ান্স ইন এ লাইফ টাইম এক্সপেরিয়েন্স'। আমি মনেমনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম এরপরও অবশ্যই আসবো এবং পরেরবার পুরো পরিবার নিয়েই আসবো। তাহলে হাঁটাটা আরও বেশি আনন্দায়ক হবে। উৎসবগুলো আসে আমাদের নিরানন্দ দৈনন্দিন জীবনকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে দিতে। মনের ভেতরকার একঘেঁয়েমি দূর করে দিতে। সেদিক দিয়ে সিটি টু সার্ফ পুরোপুরি সফল একটা উৎসব। মানুষে মানুষে মিথষ্ক্রিয়ার এইসব উৎসব চলতে থাকুক আবহমানকাল ধরে।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top