সিডনী মঙ্গলবার, ২৮শে মে ২০২৪, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

কোন ঠিকানায় কে জানে : ডা: মালিহা পারভীন


প্রকাশিত:
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২৩:৩৭

আপডেট:
২৮ মে ২০২৪ ১০:১৫

 

আজ হাজেরা বেগমকে তাহার পুত্র ও পুত্রবধু নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের চেম্বারে লইয়া আসিয়াছে। মধ্য বয়সী গোফওয়ালা ডাক্তার রোগিণীর শ্রবন শক্তি পরীক্ষা করিবার জন্য চীৎকার করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন - মা আপনার নাম কি, নাম
' কি বললা দাম? কিসের দাম?
দাম না, আপনার নাম, নাম।
আম?
হাজেরা বেগম গলা ততোধিক চড়া করিয়া উত্তর দিলেন। ডাক্তার ও রোগী এই দুইপক্ষের উচ্চাংগ স্বর প্রতিযোগিতা ক্রমে তুংগে উঠিতে লাগিল। শেষে ডাক্তার সাহেব পরাস্ত দিয়া গম্ভীর মুখে রোগিণীর পুত্রকে বলিলেন পরীক্ষাগুলি করাইয়া আনুন। একটা সার্জারির প্রয়োজন হইলেও হইতে পারে।
এরপর নানানরকম পরীক্ষার ফর্দ , অস্ত্রোপাচারের আনুমানিক দিনক্ষন ইত্যাদি লিখিয়া কাগজ ধরাইয়া দিলেন কুঞ্চিত কপালিকা পুত্রের প্রসারিত হস্তে।
হাজেরা বেগম মৃদু হাসিলেন।

ডাক্তারের চেম্বার হইতে বাহির হইয়া পুত্র তানভীর
ও পুত্রবধু কেয়ার সাথে গাড়িতে উঠিলেন তিনি। গাড়ি চালাইতেছে পুত্র। তাহার পাশে সুন্দর মুখটিতে আষাড়ের কালো মেঘ সাঁটিয়া বসিয়া আছে তাহার স্ত্রী। পিছনে হাজেরা বেগম।
কিছুক্ষন পর সামনের স্বামী স্ত্রীর গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর ফোঁসফাস বরাবরের মতন গাড়ির গতিবেগ বাড়িবার সাথে সাথে ভূমিকম্পে পরিণত হইতে লাগিল । পুত্রবধু বলিল -' কি প্রয়োজন তিন কাল যাইয়া এককালে আটকে থাকা বুড়িটির জন্য অহেতুক এতো অর্থ ব্যয় করা। পুত্রের যুক্তি অবশ্য আলাদা। কয়দিন পরই তো হাজেরা বেগমকে বৃদ্ধাশ্রমে স্থানান্তরিত করা হইবে। এর আগে অন্তত কানে শুনিবার মতন অবস্থা করিয়া পাঠাইতে পারিলে মাঝে মধ্যে ফোনে বাকচিত করিতে পারিবেন। এছাড়া ফোনে সরাসরি তাহার খোজখবর লইতেও সহজ হইবে। পুত্র হিসাবে ইহা তাহার অবশ্য কর্তব্যও বটে।


পরদিন সকালে কেয়া দেখিল তাহার শ্বাশুড়ি প্রতিদিনের মতন বাড়ির পাশের পার্কটিতে হাঁটিতে যাইবার প্রস্তুতি নিতেছেন । মাঝেমাঝে কেয়ার হিংসা হয় এই সত্তোর্ধ্ব গ্রাম্য অল্প শিক্ষিত মহিলাটিকে। যেমন ছিপছিপে বেতের মতন তাহার গড়ন তেমনি কঠোর তার ব্যাক্তিত্ব। কানে শুনতে পারলে সামনে কিছু বলার সাহস হতো!!

অন্যান্য দিনের মতন হাজেরা বেগম আজো সকালে উঠিয়া সাদাকালো চুলের গোছায় খোঁপা বাধিলেন। নীল পাড় সাদা শাড়ির আঁচলখানি ঘুরাইয়া আনিয়া আঁটসাঁট ঘোমটা টানিলেন। ইহার পর নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেলেন।

ওই বাড়িতে সেদিন সারাদিন হাজেরা বেগমের কেউ খবর না লইলেও রাতে খোঁজ পরিয়া গেল। কোথাও তাহাকে পাওয়া যাইতেছে না। বাড়ির সবাই বিচলিত বোধ করিতে লাগিল। বহুদিন বাদে এই বাড়ির এককোনে পরিত্যক্ত আসবাবের ন্যায় পরিয়া থাকা মানুষটি কিছুটা মূল্যবান হইয়া উঠিল।

তানভীর চেনা জানা আত্মিয়স্বজনের বাড়ি মায়ের সন্ধানে ফোন করিল। থানায় জিডি করিবে কিনা সেটাও ভাবিয়া লইল। এমন সময় কেয়া শ্বাশুড়ির ঘর হইতে একটা কাগজ হাতে নিয়া বাহির হইয়া আসিল। সেইটা হাজেরা বেগমের চিঠি --

প্রিয় তানভীর, ,

দোয়া নিও। তোমার বাবা একদিন তোমার ব্যবহারে দুঃখ পাইয়া বলিয়াছিলেন ' তানভীরের মা, সন্তানদের মুখে এমন কথা শুনিবার আগে আল্লাহ আমায় কেন যে বধির করিয়া দিলেন না। তোমাদের হয়তো খেয়াল আছে তোমার বাবা মারা যাবার পরদিন আমার শ্রবন শক্তি সহসা লোপ পায়।
ডাক্তার ও তোমরা ধরিয়া নিলে অতিরিক্ত মানসিক আঘাতে আমার অনুরুপ হইয়াছে।
আজ তোমাদের সত্যিটা বলি। আমি আসলে কানে ঠিকই শুনিতে পাই। কখনোই বধির হইনি। শুধু কানে শুনিতে না পাওয়ার অভিনয় করিয়া গিয়াছি এই এগারোটি বছর। এর ফলে সম্মান দেখানোর ভান আমায় তোমাদের সামনে করিতে হয় নাই, অনেক অস্বস্তি হইতে বাচিয়া গিয়াছি। আর লাভের লাভ এও হইয়াছে যে তোমাদের সকলের প্রকৃত রুপ আমি দেখিতে পারিয়াছি স্পষ্ট । দেখিয়াছি আমাকে নিয়া তোমাদের নিত্য দাম্পত্য কলহ, ভাগ বাটোয়ারা, নানানরকম সমস্যা।

কিছুদিন হইলো আমায় তোমরা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাইবার জন্য তোড়জোর শুরু করিয়া দিয়াছ। তোমরা আমায় পাঠাইবার আগে আজ আমিই চলিয়া যাইতেছি। নিজের কাছে নিজের এই সামান্য সম্মানটুকু বজায় রাখিতে চাহি আমি । নতুন সেই ঠিকানায় আমি কেমন থাকিব জানি না। তবে সন্তানের সার্থপরতা দেখিতে হইবে না। কানে শুনিতে পাইয়াও আমায় আর না শুনিবার অভিনয় করিতে হইবে না, বধির সাজিয়া থাকিতে হইবে না।
ইতি
তোমাদের মা -
হাজেরা বেগম

মসৃন পথ ধরিয়া বাসটি চলিতেছে। গন্তব্য যশোহরের ঝিকরগাছা। বাসে বসিয়া হাজেরা বেগমের খানিক ঝিমুনিও আসিতেছে। তিনি 'আমার বাড়ি' নামে এক বৃদ্ধাশ্রমে যাইতেছেন। সেখানে তাহার থাকার সব ব্যবস্থা করিয়া রাখয়াছেন তাহারই কলেজ জীবনের বান্ধবি যে নিজেও ওইখানের একজন বাসিন্দা।
হাজেরা বেগম এতোদিন পরে আজ কেন যেন মুক্তির স্বাদ অনুভব করিতেছেন।

কোনো পিছুটান নাই, কেমন হালকা। তিনি জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইয়া থাকেন ।

আজ এই বর্ষায়ও আকাশ শরতের মতন রোদঝকঝকে, নীল । শ্রাবনের মেঘগুলি উড়িয়া যাইতেছে। আচ্ছা এরা কোথায় যায়, কোন ঠিকানায় !
হাজেরা বেগমের চোখ ঝাপসা হইয়া আসে ।

 

ডা: মালিহা পারভীন
কবি ও কথা সাহিত্যিক

সেগুনবাগিচা, ঢাকা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top