সিডনী মঙ্গলবার, ২৩শে এপ্রিল ২০২৪, ১০ই বৈশাখ ১৪৩১

পয়মন্ত লক্ষ্মীট্যারা : আফরোজা পারভীন


প্রকাশিত:
১৮ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:২৬

আপডেট:
১৮ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:২৬

ছবি : আফরোজা পারভীন

 

জন্মের সময় মেয়েটার চোখ কেউ সেভাবে খেয়াল করেনি। খেয়াল করলেই যে বুঝতে পারত এমনও না। অতটুকু শিশুর চোখ কেমন তা বোঝা যায় না। চোখ খোলা না বন্ধ সেটুকুই বোঝা যায়। অনেক শিশুর তো জন্মের সময় চোখ ফোটেও না। কিন্তু এ শিশু জন্মেই চোখ খুলেছিল। তা দেখে নানি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল,
: দেখেছ দেখেছ কেমন পিটপিট করে তাকাচ্ছে
দাদি বলেছিল,
: পিট পিট বলছেন কেন, ওতো চোখ বড় বড় করে নানির রূপ দেখছে!
এই নিয়ে দুই বেয়ানের হাসাহাসি হয়েছিল। সাধারণত সন্তান জন্ম নেবার সময় মেয়েরা বাপের বাড়ি যায়। পাখিও এসেছিল। আর শ্বশুরবাড়ি কাছে বলে সন্তান জন্ম নেবার সময় শাশুড়িও হাজির ছিল। সেদিক দিয়ে পাখিকে ভাগ্যবানই বলা যায়। আরও বেশি ভাগ্যবান সদ্য জন্ম নিযো মেয়েটি। যে জন্মেই নানি-দাদিকে এক সাথে দেখেছিল।
বেশ ঘটা করে মেয়ের নাম রাখা হলো আঁখি। মেয়ের বাপ শাহেদ বলল,
: বড় বড় চোখের মেয়ে আঁখি নামেই মানায়। তাছাড়া মায়ের নামের সাথে মিলও হলো।
ওই মায়ের নামের সাথে মিল শুনে ননাস শিউলি একটু গাঁই গুঁই করেছিল। সে চেয়েছিল তার নামের সাথে মিলিয়ে ভাস্তির নাম রাখতে। শেষাবধি অবশ্য সে আব্দার ধোপে টেকেনি মায়ের কারণে।
এ বাড়িতে মায়ের কথাই আইন। শিউলিও আছে দাপটের সাথে। শাহেদের বড় সে। শাহেদকে সে কথা মাঝে মাঝেই মনে করায়। শাহেদও বোনকে মানন্য করে।
মেয়ে একটু বড় হবার পর শিউলি একদিন বলল,
: আঁখিকে একটু ট্যারা মনে হচেছ। এই এদিকে তাকা দেখি। ঠিক তাই, তাইতো
পাখি উঠোনে কাজ করছিল। একথা শুনে তার কাজের হাত থেমে গেল। বিমূঢ় চোখে ননাসের দিকে তাকিয়ে বলল,
: বলছেন কী, ট্যারা! কী সর্বনেশে কথা:
: সর্বনেশে তো বটেই। বড় হলে তো এই মেয়ের বিয়ে হবে না!
: হায় হায় বলেন কী!
পাখির মনে হয় তার হাত পায়ের সমস্ত শক্তি পড়ে গেছে। সে টলতে টলতে মেয়ের কাছে আসে । মেয়ের দিকে তাকায়। কিছুই বুঝতে না পেরে চিৎকার করে বলে,
: মা, মা, কী হবে মা!
শাশুড়ি রান্নাঘরে ছিলেন । ছুটে আসেন।
: হয়েছে কী, কী হয়েছে?
শিউলি তাকে ট্যারা বৃত্তান্ত শোনায়। শাশুড়ি আঁখিকে কোলে নিয়ে ভাল করে দেখে বলে,
: আরে ট্যারা না, লক্ষট্যিারা। লক্ষীট্যারা মেয়েরা বড় পয়মন্ত হয়। খুব ভাগ্যবতী আর স্বামী সোহাগী!
শিউলি বিড় বিড় করে,
: আগে তো বিয়ে, তারপর ভাগ্যবতী আর স্বামীসোহাগী। যত্তোসব!
আঁখি তখনও তেমন কিছু বুঝত না। মাঝে মাঝেই আত্মীয় স্বজনরা বলে, লক্ষীট্যারা। ও দু’একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে। একময় ওর মনে হয়েছে, আসলেই ওর চোখ অন্যদের চেয়ে আলাদা। অন্যদের চোখ কতো ভাল! ওরটা যেন কেমন কেমন!
আঁখির জীবনে প্রথম ধাক্কা স্কুলে। ও তখন ক্লাস থ্রির ছাত্রী। একদিন ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ফুল বলল,
: জানিস আমাকে সবাই বলে তুই ট্যারার সাথে মিশিস কেন?
: ট্যারার সাথে মিশলে কী হয়?
: তা জানি না। ওরা বলে
এরপর আঁখি লক্ষ্য করে ফুল ওর সাথে আগের মতো মিশছে না। আগে ওদের দুজনের মধ্যে যে আগে স্কুলে যেত সে জায়গা রাখত। একদিন ও একটু দেরিতে গিয়ে দেখল, ফুল জায়গা রাখেনি। ও পেছনে গিয়ে বসল। বাসায় এসে সেদিন ফুলে ফুলে কাঁদল। বুঝতে পারল চোখ ট্যারা হওয়া অপরাধ। যদিও এ অপরাধে তার কোন হাত নেই।
ফুল আস্তে আস্তে দূরে চলে গেল। ক্লাসের আর কারো সাথে তার বন্ধুত্ব হলো না। সে একা স্কুলে যায়, আসে, টিফিন খায় একা একা। মনমরা হয়ে থাকে।
ও যত বড় হলো ওর ট্যারা ভাব তত বাড়ল। এতদিন যে দাদি ওকে বলত লক্ষ্মীট্যারা সেও চিন্তিত হলো। একদিন দাদি আব্বাকে বলল,
: মেয়েটাকে শহরে নিয়ে বড় ডাক্তার দেখা বাপ। এখন ওর দিকে তাকালেই বোঝা যায় । শুনেছি শহরে ট্যারা সারানোর চিকিৎসা আছে
দাদি বলেছিল আস্তে। কিন্তু ফুফুর চিৎকারে সেটা আঁখির কানে পৌঁছে গেল
: সেই বোঝা বুঝলে, তবে বড় দেরিতে। ছেলেবেলায় চিকিৎসা করালে সারলেও সারতে পারত। এই এত বড় বয়সের মেয়ের ট্যারা কী আর সারবে
মা আড়ালে কাঁদল। দাদির কপালে অনেকগুলো ভাঁজ পড়ল। আব্বা অনুচ্চ কণ্ঠে বলল,
: দেখি খোঁজ করে একজন ভালো ডাক্তারের
শহরে এলো আঁখি। উঠল এক আত্মীয়ের বাড়ি। সেখানেও ফিসফাস
: মেয়েটা দেখতে বড় সুন্দর। কী চমৎকার এক ডালা চুল! কী টানা টানা ভ্রু । শুধু যদি চোখটা!
ডাক্তার দেখলো। চিকিৎসা দিলো ডাক্তার, তবে আশা দিলো না।
ট্যারা চোখ ট্যারাই রয়ে গেল। ফুফু ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,
: খালি খালি গুচ্ছের টাকা খরচ!
আঁখি মরমে মরে গেল!
আাঁখি বিএ পর্যন্ত পড়ল পাশের গ্রামের কলেজে। বরাবরই ভাল রেজাল্ট তার। আচার আচরণ ন¤্রতা ভদ্রতার প্রশংসা চারদিকে। মা পাখি চেয়েছিল মেয়েটা লেখাপড়া করে চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। আঁখিরও তাই ইচ্ছে। কিন্তু দাদি চাচ্ছে ভাল একটা ছেলে দেখে আঁকির বিয়ে দিতে। যত দিন যাবে চোখ তো আরো খারাপ হতে পারে। তাছাড়া বয়স হয়েছে তার। পুতনির বিয়ে দেখে যেতে চান। আল্লাহ তো ওই একটামাত্র সন্তানই দিয়েছে ছেলেকে। এ নিয়ে অবশ্য শাশুড়ি কোনদিনই বউকে কোন কথা শোনাননি। আরো সন্তান হলে ভাল হতো, সন্তানের চেষ্টা করা দরকার বলেছেন ঠিকই কিন্তু চাপ দেননি কখনও। অন্য দশটা শাশুড়ির মতো ছেলেকে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর কথাও ভাবেননি। ছেলের বউকে তিনি ভালবাসেন। বিশ্বাস করেন আল্লাহর ইচ্ছা ছিল এই সংসারে একটাই মেয়ে দেবার, দিয়েছেন। জোর জবরদস্তি করে তো সব হয় না।
এ নিয়ে জ¦ালিয়েছে ননাস। পাখিকে সরাসরি কথা শুনাতে ছাড়েনি।
: কী ব্যাপার বউ একটাতেই যে ক্ষান্ত দিলে
সন্তান হচ্ছে না বলে এমনিতেই মরমে মরে থাকে পাখি। তার ওপর এই হামলা
: ক্ষান্ত না আপা। আল্লাহ দিচ্ছেন না
: দেবে কী করে। অত বয়সে বিয়ে দিলে কি আর বাচ্চা কাচ্চা হয়। তোমার মেয়েরও একই অবস্থা হবে। বেছন বানিয়ে রাখো
আত্মা কেঁপে যায় পাখির। তাকে যা বলে বলুক আপা। কিন্তু তার মেয়েটাকে টানা কেন? এমনিতে আপা খারাপ না। মুখে যাই বলুক পাখির হাতের কাজ কেড়ে নিয়ে করে দেয়। আঁখির চুল বেধে দেয়। খাবার সময় পাতে এটা ওটা তুলে দেয়। নিজে খরখর করে কথা বলে কিন্তু পাখি আখি বা পরিবারের কাউকে ছুঁয়ে কেউ কথা বললে মারমুখী হয়ে ওঠে। ফালা ফালা করে দেয় তাকে কথার চাকুকে। তাই আপার শত কথা পাখি চুপ করে সহ্য করে। মনে মনে তার যন্ত্রণা বুঝতে পারে। অল্প বয়সের বিধবা। জীবনে কিছুই সে পায়নি। তার মনে মনে ইচ্ছে ছিল ভাল পাত্র জুটলে দ্বিতীয় বিয়ে করবে। পাত্রও দু’চারটে এসেছিল। কিন্তি তার শ্বশুর শাশুড়িও এ পথে হাঁটেননি। মেয়ের যন্ত্রণাটা বুঝতে চাননি। এটাই আল্লাহর বিধান মেনে নিয়েছেন। পাখি একদিন শাহেদকে বলেছিল,
: আপার এত অল্প বয়স। দেখতে এত ভাল । আপার আবার বিয়ে দাও না তোমরা। একা থাকা খুব কষ্টের!
যেন খুবই অদ্ভুত কথা বলেছে এমনভাবে পাখির দিকে তকিয়ে শাহেদ বলেছিল,
: বলছ কী! আমাদের বংশে মেয়েরা দ্বিতীয় বিয়ে করে না।
তার মানে ছেলেরা করে। কী অদ্ভুত নিয়ম। শিউলি আপার কষ্টটা পাখি বোঝে। একজন মানুষ যদি জীবনভর বঞ্চিত থাকে তার মুখে মধু আসবে কী করে! মিষ্টি কথা বলবে কীভাবে! তাই আপার কথার সে জবাব দেয় না। কিন্তু আজ তার মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে
: আপা আমার যখন বিয়ে হয় তখন বয়স মাত্র আঠারো। আর অকারণে আমার মেয়েটাকে টানছেন কেন? ও তো আপনার ভাস্তি
চেঁচিয়ে পাড় মাত করে শিউলি । আজ চেঁচানোর মতো একটা মোক্ষম সুযোগ সে পেয়েছে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নিজেকে হালকা করে।
: মা তুমি না বলো তোমার ছেলের বউ সাত চড়ে রা কাড়ে না। এই নাকি তার নমুনা! ননাসের মুখে মুখে চোপা! তুমি চিরদিন একচোখাই থেকে গেলে। নিজের মেয়ের চেয়ে ছেলের বউ প্রিয় হয় এটা তোমাকে দেখেই শিখলাম
শিউলি আপার চিৎকার সহজে থামে না। পাখি ঘরে চলে যায়। আর আঁখি অবুঝের মতো তাকিয়ে থাকে।
আাঁখির বিয়ের সম্বন্ধ আসছে একের পর এক। আসে, কথা বলে, খায় দায় চলে যায়। কেউ না বললেও সবাই বোঝে ওই লক্ষীট্যারা আর যাই হোক বিয়ের জন্য পয়মন্ত না।
দিন গড়িয়ে যয়ি। দাদির শরীর ভীষণ খারাপ। স্থানীয় হাসপাতালে ডাক্তার দেখানো হয়েছে। উন্নতি নেই। দিন দিন শরীর ভেঙে পড়ছে। তার একমাত্র চিন্তা পুতনির বিয়ে। যেমন তেমন বিয়ে হলে হবে না বিয়ে হতে হবে ভাল ঘরে, ভাল বরে। এমন জায়গায় বিয়ে দিতে হবে যারা ওর লক্ষীট্যারা নিয়ে কোন কথা বলবে না। কোন খোঁটা দেবে না মেয়েকে। ছেলে চেয়েছিল মেয়েকে ঢাকায় পাঠিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে। মেয়েরও তাই ইচ্ছে। কিন্তু দাদি রাজি হলেন না। আসলে পুতনিকে পড়াতে পাঠাতে তার যতটা না আপত্তি তার চেয়ে অনেক বেশি আপত্তি কাছ ছড়া করতে। ওকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেনা দাদি। রাতে আঁখিকে পাশে নিয়ে ঘুমান। দাদির ওষুধ পথ্যি বাথরুমে আনা নেয়া সব করে আঁখি। সারাক্ষণ দাদির সাথে সাথে থাকে। এমন একটা ভাল মেয়ে এর ভাল না হয়েই পারে না, দাদি ভাবেন। নামাজের পাটিতে অনেকটা সময় কাটান পুতনির জন্য আল্লাহর দোয়া চেয়ে। চোখের পানিতে তার জায়নামাজ ভেসে যায়। আঁখি বলে
: রোজ নামাজে কাঁদো। কী চাও আল্লাহর কাছে?
: কী চাই বুঝিস না?
: না দাদি
: তাহলে তুই আমাকেই বুঝিস না। আমি তোর একটা ভাল বিয়ের জন্য আল্লাহকে ডাকি
আঁখি ক্ষণকাল চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
: বিয়েই কী মেয়েদের জীবনে সব দাদি। মেয়েদের কী আলাদা সত্তা থাকতে পারে না? সেকি নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে না?
আঁখির মুখে এমন কথা শুনে অবাক দাদি। সে সবসময় চুপচাপ। কথা বলে কম। যে যা বলে নিঃশব্দে মেনে নেয়। আজ সে কিনা এমনভাবে কথা বলছে! দাদি বলেন,
: অবশ্যই পারে
: তাই যদি পারে তাহলে আমাকে ঢাকায় পড়তে যেতে দিলে না কেন?
দাদি চমকান। মনে মনে ভাবেন পুতনিকে ভালবাসেন বলেই কি তিনি তাকে ছাড়তে চাননি। নাকি সাথে ছিল স্বার্থচিন্তা? আাঁখি চলে গেলে কে তাকে এমনভাবে দেখে রাখবে, কে ওষুধ খাওয়াবে, কে গোসল করাবে, কে পথ্য দেবে? প্রশ্নের জবাব পেয়ে যান।
: এখন যাবি পড়তে?
: তুমি অসুস্থ কী কওে যাব। কে দেখবে তোমাকে?
: সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। দেখত সময় আছে কি না
ততদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষ। আঁখির মন খারাপ হয়। তবে এটাও ভাবে, দাদি যখন মত দিয়েছেন এবার না হোক পরের বছর ঠিকই সে পড়তে যেতে পারবে।
এরমধ্যে আঁখির একটা প্রস্তাব আসে। ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে। ভাল বেতন পায়। বনেদি বংশ। ঢাকায় থাকে। মেয়ে দেখতে আসে ছেলের মা ভাবি আর বোন ছেলে ছেলের বাবা।
আঁখি ওদের সামনে বসে। পর ছেলের মা বলেন,
: কি নাম তোমার মা?
আঁখি মাতা নিচু রেখেই বলে,
: আখি
খুব সুন্দর নাম! কিন্তু তুমি মুখ নিচু করে বলছ কেন? মুখ তোল। লজ্জা পেও না
আঁখি মুখ তোলে
ছেলের মা তাকিয়ে আৎকে ওঠেন। ওদিক আঁতকায় আঁখির মা । দাদি শয্যায়। তিনি হাঁটতে পারেন না।
এরপর কেন জানি কথার তার কেটে যায়। একসময় ছেলের বাবা বলে,
: আমাদের যদি দু’চারমিনিট একটু একা আলাপ করতে দেন। অথবা আমরা বাইরে যেয়ে আলাপ সেরে আসি
: না না আপনারা আলাপ করুন। আমরা ভেতেরে যাচ্ছি
মিনিট কয়েক পর ভেতরের দরজার কাছে গিয়ে যাকে ছেলের বাবা।
: আমাদের আলাপ শেষ । আপনারা আসুন
আখির মা বাবা ফুফু ঘরে ঢোকে। গৃহকর্মীরা ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে দেয় সারাদিন ধরে রান্না করা নানারকম সুস্বাদু খাবার। খেতে খেতে ছেলের বাবা বলেন,
: মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে
লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ে মা বাবা এমনকি ফুফুও।
:কিন্তু
: কিন্তু কি?
: মেয়ে তো ট্যারা
ছেলের মা বলেন।
: ট্যারা না লক্ষীট্যারা
: একই কথা। তাতে আমাদের আপত্তি নেই। আল্লাহ তো সব মানুষকে সমান করে বানান না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে বিয়ে দিলে আমাদের বংশে ট্যারা ছেলে মেয়ে জন্মাবে ।
: নাও জন্মাতে পারে
আঁখির বাবা বলেন
: জন্মানের সম্ভাবনা ৯৯ ভাগ। দেখননি বোবার ছেলে মেয়ে বোবাই হয়
: তাহলে আপনারা মত দিচ্ছেন কেন? ফুফুর খরখরে প্রশ্ন
: দেখুন আমাদের যে ক্ষতি হবে সেটা যদি আপনারা পুষিষে দেন তাহলে বিয়েটা হতে পারে
: কি রকম?
এরপর ছেলের বাবা লম্বা একটা ফর্দ খুলে বসে। গাড়ি থেকে শুরু করে খাট পালং নগদ টাকা সবই আছে সেখানে
আঁখির আব্বা কিছু বলার আগেই ফুফু বলেন,
: ঠিক আছে আপনারা বলে গেলেল । আমরা ভেবে জানাবো। তবে মনে রাখবেন আঁখির পেট থেকে যদি ট্যারা মেয়্ইে জন্মায় তাহলে তাকে বিয়ে দেবার সময়ও কিন্তু আপনাদের এসব গুণতে হবে
পাত্রপক্ষ এ কথায় অসন্তুষ্ট হয়, কিন্তু প্রকাশ করে না। অনেক কিছু পাবার আশা তাদের সামনে। আর ইসলামে তো চারটে বিয়ের অনুমতি দেয়াই আছে
ওরা চলে যাবার পর শাহেদ তার বোনকে বলে,
: তুমি ওভাবে ওদের না বললেই পারতে । যে চেয়েছে তা দেবার সঙ্গতি আমার আছে । একটাই মেয়ে
: সঙ্গতি আছে বলেই যৌতুক দিতে হবে নাকি। ওখানে তোর মেয়ে সুখি হবে? ওই কসাইদের বাড়িতে? আমি ওর ফুফু, ওর ক্ষতি হতে দিতে পারি না
ঘটক অনেক বোঝাবার চেষ্টা করে। কিন্তু ফুফু অনড়। বলে,
: বিয়ে ভেঙে দাও ঘটক
ওরা যখন ভেতরে আসে আঁখি তখন দাদির পায়ে তেলমালিশ করছে আর দাদি উদগ্রীব হয়ে আছে পাত্রপক্ষের মতামত শোনার জন্য। তিনজন একসাথে ঘরে ঢোকে।
দাদি অনেক কষ্টে কাত হয়ে তাকায়
: কি হলো?
: মত হয়েছিল কিন্তু আপা বিয়ে ভেঙে দিল
দাদি উঠে বসতে চান, পারেন না।
: বিয়ে ভেঙে দিল মানে, আমাকে না জানিয়ে। এত ওর স্পর্দ্ধা! এত ভাল সম্বন্ধ
: ভাল না ছাই। কসাই। লক্ষীট্যারার বিনিময়ে টাকা চায় গাড়ি চায় গয়না চায় । ছি: ! আমরা কী পানিতে পড়ে আছি নাকি
: কী!
: হু তা আর বলছি কী
: ভাল করেছিস, খুব ভাল করেছিস। আমার কাছে আয়। আমি ভাবতাম তুই আমার আঁখিটার কথা ভাবিস না
: তোমার মাথামোটা তাই ভাবতে। আমাদের একই রক্ত
এত বড় একটা গালি দেবার পরও দাদির মুখে হাসি। শিউলি এসে কাছে বসে। ওর হাতে হাত রেখে দাদি বলে,
: আমার আঁখিটাকে বাঁচিয়েছিস তুই !
: কিন্তু ওর বিয়ে
মায়ের কাতরোক্তি
: বিয়ে যখন হবার হবে, না হলে না হবে। ও যাবে ঢাকায় পড়তে । মা তুমি তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে ওঠো তো!
----------------------------------------------

 


আফরোজা পারভীন
কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, কলামলেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top