শাপলা ঢাকা জলকন্যা (পর্ব-০২) : শাহান আরা জাকির পারুল
প্রকাশিত:
৯ নভেম্বর ২০১৯ ০০:২৪
আপডেট:
৩ মে ২০২০ ২০:৪১

ফরিদ আলী যে হাসনার স্বামী, একথা সে বুঝি ভুলেই গিয়েছিলেন। দিনে দিনে ফুলে ফুঁসে থাকা ঈর্ষা তাকে একদিন বেপোরোয়া করে তুললো। ফরিদ আলীর তখন ব্যবসাও কিছুটা মন্দা চলছিল। মন মেজাজ খারাপ ছিল। হাসনা গিয়েছিল পাশের বাড়ী। সুযোগ বুঝে ফরিদ আলীকে তার মা ইনিয়ে বিনিয়ে হাসনা সম্পর্কে অনেক কুটনামো কথা বলে। এই জন্যি তুই মন খারাপ কর্যা থাকিস মা? এতদিন কস্ নাই ক্যা আমারে।
ডরে কই নাই বাজান। তর সুখের জন্যি আমি এই বিয়াতে রাজি হইছিলাম, ঐ মাইয়ারে আমি কুনদিনও ঘরে আনবার চাই নাই। মরিয়মের মাইয়াডা আমার কি পছন্দই না ছিল। ওই সব কতা বাদ দ্যাও তো মা।
হ’ বাদই তো দেব। আমি তোর কিডা? তর বৌইতো আহন তর সব। দশমাস প্যাটে লইয়া বিধবা অবস্থায় তরে মানুষ করছি। এই ঋণ তুই শোধ করবার পারবি? এই সব কথা আর কত শোনাবি মা? কি করলি এই ঋণ শোধ হবি, তাই কও? হাসনারে তুই তালাক দিবি। এক নিঃশ্বাসে ঝটপট কথাগুলি বলে ফেলে আলেয়া বিবি।
বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ আর আক্রোশ নিয়ে চরম ঈর্ষায় ফেটে পড়েছিল যেন।
গ্রামের শিক্ষিত মেয়ে হাসনাকে মোটেই পছন্দ করতেন না।
তার উপর একমাত্র মেয়ে। এরা খুব আহ্লাদী হয়। ছেলেটাকে তার বুক থেকে ইনিয়ে বিনিয়ে একেবারেই কেড়ে নেবে। উহ্, অসহ্য। বৌ? তাতে কি? সেও তো মা। ছ’ মাসের পেটে নিয়ে বিধবা হয়েছে। স্বা র সোহাগ কতটুকু পেয়েছে? সমস্ত আদর সোহাগ দিয়ে তিল তিল করে বড় করেছে সে ফরিদ আলীকে।
মা ছাড়া ফরিদ কিছুই বুঝতো না।
সেই ফরিদ ভালবাসা করে বিয়া করলো।
তার পছন্দের মেয়ে।
বোনঝি রুবীরে বিয়া করলো না।
এতসব ইচ্ছে অপূরণ রেখে ফরিদের সুখের জন্য সে ফরিদের পছন্দের মেয়েকেই ঘরে আনলো।
কিন্তু কে জানতো এই মেয়ে যাদুকরের মতই যাদু করে নেবে তার ছেলেকে। বৌ ছাড়া কিছুই বোঝে না ফরিদ।
মা কে আগের মত যখন তখন কান খোজও করে না।
বাড়ীতে পা দিয়েই ফরিদ আদর করে হাসনাকে হাসু বলে ডাকে।
উহ্.ঁ... কেন মাকে একবার ডাকলে কি হয়?
বৌ আগে, না মা আগে?
এইসব অবান্তর কথা মনে পুষে পুষে, হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকতো আলেয়া বিবি।
আজ অনাকাঙ্খিত ভাবেই সুযোগ মিলে গেছে।
হাসনা কখনো এ বাড়ী ওবাড়ী যায় না।
আজ বাল্য সখী মমতাজ জোড় করেই নিয়ে গেছে তাদের বাড়ী।
হাসনা কিছুতেই যেতে চায় নাই।
ফরিদ আলী যখন তখন ঘরে ফেরে।
এসেই হাসনাকে খোজ করে।
বিয়ের পর থেকেই হাসনা এরকমটাই দেখে আসছে।
হাসনা ও সবসময়ই উদগ্রীব থাকে।
কখন ফরিদ এসে ডাক দেবে?
সে চঞ্চল হরিনীর মতই দৌড়ে যায়।
কত কথা মনে পড়ে ফরিদ আলী দুষ্টুমী করে বলে- তুই আমার চিত্রা হরিন।
বাপরে, হরিনের নাম ও জান?
জানবো না ক্যা? আমি কি লেখাপড়া কম জানি? বাংলাদেশে কত রকম হরিন আছে, সব জানি।
কত রকম? কততো দেহি!
অত জানতে হবি না। জেডা জানি, সেডা তো কল্যাম। আয়, আমার কাছে আয়। হাসনা কাছে আসে। ফরিদ আলী ছোট একটা চুমু দিয়ে বলে তুই আমার ঘরের লক্ষী।
হুঁ- লক্ষী না ছাই। অলক্ষী।
ক্যারে, এ কতা কলি ক্যা?
কব না। তোমার ব্যবসা কেমন মন্দা যাতিছে, তাই।
ও , আবার ঠিক হয়া যাবি নি। ব্যবসা মানেই এই রকম। একবার মন্দা, আবার ভাল।
কি রে হাসু? কি ভাবতিছিস এত?
আয়শার ডাকে সান্ধিৎ ফিরে পায় হাসনা।
নারে সই, আইজকা বাদ দে। আর একদিন খাবনে। ফরিদ অহনই আস্যা পড়বিনি। পাশের ঘর থেকে হাসনার কথাগুলো শূনে দাঁতে দাঁতে ভ্যাঙ্গাঁয় আলেয়া বিবি।
আজক্যার এই সুযোগটা কিছুতেই ছাড়া যাবে না। ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
খুব স্নেহের ঢংএ হাসনার মাথায় হাত রেখে বলে, যাও বৌ। আয়শা, অনেক দিন থেক্যা তুমার বেড়াতি নিব্যার চায়। যাও, আইজক্যা ঘুর্যা আস। আমি তো বাড়ীত আছি। ফরিদের খাওন দাওন আইজ আমিই দেখবনে।
না, মা আপনের কী হবি। হাতের ব্যাথা নিয়া কষ্ট করা লাগবিন্যা।
বাতের ব্যাথা? কিসের ব্যাথা যে, তা তুমি জানবা কেবা কর্যা। আমি জানি। মনে মনে কিটমিট করে আলেয়া বিবি।
একদিন, বাতের ব্যাথায় কিছু হবি না। তুমি যাও মা।
একরকম অনিচ্ছায়ই হাসনা, আয়েশার সাথে বেড়াতে যায়। শর্ত রাখে সাঁঝ হওয়ার আগেই চলে আসবে।
সন্ধ্যা তখন নেমে আসছে।
গোধুলী বেলা।
দুধেল গাভীটা ঘরে তুলতে হবে। শাশুড়ী অসুস্থ।
হাসনা দৌড়ে দৌড়ে ঘরে ফেরে।
কিন্তু উঠোনে পা রাখরেতই চমকে ওঠে।
ঘরের আঙিনাতে বসে আলেয়া বিবি বিলাপ করছে- “এই ছিল আমার কপালে, আল্লাগো তোমার এমন বিচার। সারা জেবন কষ্ট কর্যা, তার ফল এমন পাব। কিডা জাইনতো।”
হাসনা কিছু বুঝে উঠবার আগেই ফরিদ আলী ক্ষিপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে সারাদিন কই ঘুর্যা বেড়াচ্ছিস, খানকি মাগী বেশরম কুনকার।
হাসনা আকাশ থেকে পড়ে ফরিদের কথায়।
পা থেকে মাঠি সড়ে যায়।
একি ভয়ানক রূপ দেখছে ফরিদ আলীর।
এ সব কি কচ্ছ তুমি?
চুপ। আর একটা কথা ও কবি না কল্যাম।
আমার বিধবা মা‘রে তুই এত জ্বালা যন্ত্রনা দিস্ কিছুই জানবার, বুঝবার পারি নাই। ডাইনী কুনহার।
কি কল্যা আমারে? আমি ডাইনী? ডাইনী তুমার ঐ মা। বুড়া শয়তান। আমাগো সুখ সহ্য করব্যার পারে না। কোনদিন কই নাই আইজক্যা কল্যাম। ঐ ডাইনী আমাগো সব সর্বনাশ করবো?
শুনছিস, এতকিছু শুন্যাও তুই চুপ আছিস ফরিদ?
হায় হায়রে....... আমার নসিবের দোষ।
ফরিদ আলী, মার স্বভাব কিছুটা জানলে ও সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের কোন সুযোগ পায় না।
আলেয়া বেগমের চিৎকারে আশে পাশের লোক জমে যায়।
কি হইছে, হইছে কি, সবাই জানতে চায়।
আলেয়া বিবি আরো জোড়েসোড়ে মায়াকান্না জুড়ে দেয়। অল্পবয়সে বিধবা হওয়ার কারণে গ্রামের লোকজনদের আলেয়া বিবির প্রতি কিছুটা দুর্বলতাও ছিল।
বিপদে আপদে পাশে দাঁড়িয়েছে।
সবাই ফরিদ আলীকে ঘিরে ধরে।
কি অইছে ব্যাডা, আমাগরে কও। আমরা তুমার পাশে আছি।
ফরিদ কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে পড়ে।
একদিকে তার প্রিয় পত্নী হাসনা।
অন্য দিকে মা।
মা তার কঠিন একগুয়ে জেদী স্বভাবের জানলেও এ কথা কোনদিনই প্রকাশ করতে পারবে না।
গ্রামের কুসংস্কারে ভরা মাতবর তাকে গ্রাম ছাড়া করবে, নয় এক ঘরে করে রাখবে।
কারও সংগে ওঠাবসা করতে দেবে না।
দূরে অসহায় হাসনা নির্বিকারে চেয়ে থাকে ফরিদ আলীর দিকে।
ফরিদ আলীর অন্তর ঝরঝর করে কেঁদে ওঠে।
পরক্ষনেই মার প্রতি জেদে, ক্ষোভে, ঘৃনায়, সবার সামনে হাসনাকে দুশ্চরিত্র, নষ্টমেয়ে বলে ঘোষনা করে।
ঐ যে মিয়া ছাওয়ালডা দাঁড়ায়া আছে, যারে আপনারা আমার বউ বল্যা জানেন, আসলে ও একটা নষ্টা মিয়াছাওয়াল, দুশ্চরিত্র, বদমাইশ। আমার বিধবা মার চোখে ফাঁকি দিয়া পাড়ায় পাড়ায় পুরুষ মাইনষের সাথে.........
ও গো তোমার পায়ে পড়ি, তোমার হিংসুটে মার কথায় আমারে এসব কি কচ্ছ, ও সব মিথ্যে কথা। আমি আইজই প্রথম তোমার মা’র কথায় সইয়ের বাড়ী গেছিলাম। তোমার মা’, মা না। একটা আস্তা ডাইনী বুড়ী, ডাইনী বুড়ি। আইজ না বুঝলিও একদিন বুঝব্যা।
কি, কি কইলি? আমার মা, ডাইনী বুড়ি? শুনলেন তো আপনারা? এইবার ব্যাবাক মানুষ শোনেন। এই যে নষ্ট মিয়াছাওয়াল, তুই ও শুন্যা রাখ, তরে আমি তালাক দিলাম, তালাক।
এক তালাক!
দুই তালাক!!
তিন তালাক!!!
পাঁজরে মোচড় খায় ফরিদ আলী।
উপস্থিত মুরুব্বীরা হায় হায় করে ওঠে।
এমন ঘটনার কথা কেউ-ই ভাবে নাই।
গ্রাম প্রতিবেশী জব্বার মোল্লা ফরিদ আলীরে নিজের ছেলে মত দেখতো। হাসনাকেও বড়ই আদর করতো।
এ বিয়ের ব্যাপারে ফরিদের মাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে সেই রাজী করিয়েছিল।
ফরিদের সংসার খুব সুখের বলেই জানতো সবাই।
চঞ্চল স্বভাবের হাসনাকে সবাই আদর স্নেহ করতো।
হঠাৎ এ ধরনের ঘটনায় সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকে।
ফরিদ আলী নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে।
হাসনা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
জীবনের সব সুখ-শান্তি, স্বপ্নেঘেরা সংসার নিমেষে ছাড়খাড় হয়ে গেল।
কচি মনটা অভিমানে কুঁকুড়ে কুকঁড়ে যায়।
সাথে ফরিদ আলীর প্রতি সব ভালবাসা ঘৃনায় তিক্ত হয়ে ওঠে।
অগ্নি চোখে একবার তাকায় ফরিদ আলীর দিকে।
ফরিদ আলী অসহায় ভাবে তাকাতেই চমকে ওঠে।
একি অগ্নিমূর্তি হাসনার?
বিষধর কালনাগিনী যেন এক্ষুনি বুকের মধ্যে ছোবল মারবে।
একি অন্যায় করলো সে?
এর প্রতিকার কি?
জব্বার মোল্লা ফরিদ আলীর গালে একচড় মেরে বলে, ব্যাডা ব্যাক্কল। তোরে অনেক জ্ঞানী মনে করছিলাম। তর মা’রেও চিনলি না, বউরেও চিনলি না। টর্নেডোর মতই মুহুর্তে একটা প্রবল ঝড় ফরিদ আলীর অস্তিত্বকে গুড়িয়ে দিল।
চারদিকের হৈ চৈ এর মধ্যে দিয়ে হাসনার বাড়ীতে তড়িৎ খবর পৌছে গেল।
এ পাড়া ও পাড়া।
হাসনার বাবা জমিরুদ্দিন কেবলই মাগরেবের নামাজের জন্য ওযু করতে গেছে পুকুর ঘাটে।
ওযু করে বাড়ী পৌছতেই হাসনার মা চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
জমিরুদ্দিন বোকার মত তাকিয়ে থাকে।
আশপাশের বউরা ছুটে আসে।
ইতিমধ্যে সব জানাজানি হয়ে গেছে। জমিরুদ্দিনকে সবাই শান্তনা দেয়।
হাসনার মার মাথায় পানি ঢেলে জ্ঞান ফিরিয়ে আনে।
সূর্য ডুবি ডুবি করছে।
পশ্চিমের আকাশটাকে জমিরুদ্দিনের কাছে রক্তের মত মনে হয়। তার বুকের মধ্যে যেন ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে।
আর দেরী নয়।
জমিরুদ্দিন হাসনার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
তার কলজার ধন।
কিভাবে আছে ঐ নরকে?
কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে জোড় পায়ে ছুটে যায় ফরিদ আলীর বাড়ীতে।
বাজান...... বলে চিৎতার দিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হাসনা।
জমিরুদ্দিন আঙিনা ভর্তি লোকের, কারও সাথেই কোন কথা বলে না।
সবাই তার চেনা।
অতি কাছের মানুষ।
এই মুহুর্তে তার মনে হয় হাসনা ছাড়া এখানকার উপস্থিত সবাই তার পর।
কেউ আপন নয়।
আপন হলে, এমন কেন হোল?
এসবই জমিরুদ্দিন এর সহজ সরল মনের সুপ্ত অভিমান।
ফরিদ আলীর দিকে একবার অগ্নিদৃষ্টিতে চেয়ে, হাসনাকে বুকে টেনে নেয় জমিরুদ্দিন।
আমার সোনা মা। চল, তোরে আমি আবার বিয়া দিমু।
হাসনাকে নিয়ে নিজ গ্রামে চলে আসে।
হাসনা তার স্বপ্নের সংসার ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সাথে করে বাবার সংসারে ফিরে আসে।
দেখতে দেখতে তিন মান পাড় হয়ে গেল।
হাসনা এখনো ভাবতে পারে না।
ফরিদ আলী তার কাছে আর কোন দিন আসবে না।
তবুও প্রতিদিন সাঁঝের বেলা ঘুটো তুলতে তুলতে বিলের দিকে তাকিয়ে থাকে হাসনা।
বর্ষা কাল এখন।
নৌকা দিয়ে এপথ দিয়েই আগে ফরিদ আলী হাটবাজারে যেত।
এখনো নাকি মাঝে মাঝে যায়।
দু’একজন বলাবলি করে।
যাওয়ার সময় হাসনাদের বাড়ীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
পাশের বাড়ীর দাদী নাকি নিজ চোখে দেখেছে।
এসব শুনে, হাসনার মনটা সব অভিমান ভুলে আবার ব্যস্ত হয়।
ফরিদ আলীকে এক নজর দেখার জন্য মনটা কেমন আকুলি বিকুলি করে।
ওদিকে ফরিদ আলীরও তাই।
এই ক’মাসে মায়ের সমস্ত পরিকল্পনাই ধরা পড়ে যায় ফরিদ আলীর কাছে।
সে তার বোনঝিকে বিয়ে করার জন্য ফরিদ আলীকে চাপ দিতে থাকে।
দিনে দিনে ফরিদ আলী অস্থির হয়ে ওঠে হাসনার জন্য।
আলেয়া বিবি ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, কিভাবে ফরিদকে বিয়ে দেয়া যায়।
নইলে ঐ যাদুকরী হাসনার ভূত মাথা থেকে নামবে না।
তাবিজ-কবজ, নানান তদবির করতে থাকে।
এদিকে ফরিদ আলী একদিন তার দোস্ত মতিকে দিয়ে হাসনাকে বলে পাঠায়, সে যা কিছু করছে সব তার রাগের বশে।
মায়ের মুখে আজেবাজে কথা শুনে তার মনডা ইবলিসে পাইছিলো।
এখন সে সব ভুল বুঝতে পারছে।
হাসনা যেন তারে মাফ কর্যা দেয়।
সে আবার হাসনারে ঘরে নিতে চায়।
এসব কথা শুনে, হাসনার এতদিনের সমস্ত রাগ অভিমান কোথায় মিলিয়ে যায়। সে ফরিদ আলীর দোস্তকে বলে, ভাই তুমি ওরে তাড়াতাড়ি কও আইতে। আমি কিছু মনে রাখি নাই ভাই। আমার জীবনের সব কিছু ফরিদ। তুমিও ওরে তাড়াতাড়ি আইতে কও। নয়তো, আমারে নিয়া চল।
সহজ সরল হাসনার কথা শুনে মতির চোখে পানি চলে আসে।
তার বোন হলে সে কি করতো?
হাসনাকে তার বোনের মতই মনে হয়।
হাসনার নিষ্পাপ মুখের দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকে মতি।
আমি কথা দিলাম, ফরিদের কাছে তোমার সব কথাই বলবো। একটু ধৈয্য ধর বোন।
হাসনা আশায় আশায় দিন গোনে।
মতি ভাইয়ের কাছে সব শোনার পর ফরিদ নিশ্চই খুশী হবে।
সব মান অভিমান ভুলে আবার তারা নতুন জীবন শুরু করবে।
এবার শশুর বাড়ী গিয়েই আগে শাশুড়ীকে সালাম করবে।
তার মন যুগিয়ে চলবে।
আর কোনদিন এবাড়ী ওবাড়ী বেড়াতে যাবে না।
শাশুড়ীকে কোন কান কথা ফরিদ আলীকে বলার সুযোগই দেবে না।
এইসব নানাকথা ভাবতে ভাবতে হাসনা অস্থির হয়ে ওঠে।
ফরিদ কবে আসবে তাকে নিতে?
কতদিন ফরিদকে দেখে না।
মনটা কেমন আনচান করে।
কিরে হাসু, কি ভাবতিছিস এত?
কিডা মমতাজ আইছিস?
হ, চল,।
কোনে যাব?
ক্যা ভুলে গেছিস? বিলে নতুন পানি পড়ছে। বর্ষা আস্যা গেছে। চল্ নতুন পানিতে সাঁতার কাট্যা কাট্যা গোসল করব।
ন্যারে মম, মনডা ভালো নাই আইজ। তুই যা।
কি কলি? আমি একলা একলা যাব বিলে? চলতো, খালি আজে বাজে চিন্তা করিস।
নারে, মম। ফরিদের আসার কথা আছে। যদি আস্যা আমারে না পায়।
হাসু, তুই কি পাগল হইছিস। ফরিদের ডাইনী মা আসব্যার দিবি? তুই এসব কি ভাবতিছিস? তাছাড়া গেরামের পাতি মৌলকীগরে চিনিস্ না। তোরে তালাক দিছে সে কথা গেরামের সগলেই জানে।
কিসির তালাক? রাগের মাথায় তালাক কইলেই হইলো? দেখলি না মম, সে দিন টিভি অনুষ্ঠানে কি কইলো?
হ’ সে কথা তো তুই আমি বুঝছি, রাগের মাথায় তালাক হয় না। অনুশোচনায় সব বুঝতি পারলি, বৌকে আবার ঘরে নেয়া যায়। তালাক হইলো- দুই জনের মধ্যে সমঝোতা না হলি ধর্মীয় রিতীতে বিচ্ছেদ। আমার আর ফরিদের তো সেই তালাক হয় নাই। তা হলি, ফরিদ আসবি না ক্যা? তুই ক মম?
না, না আসবি। তুই মন খারাপ করিস নে সই। চল, গোসল করবি আমার সাথে চল।
হাসু, অস্থির পায়ে এগিয়ে চলে মমতাজের সাথে বিলের দিকে।
এই বিলে তার আর ফরিদের কত যে স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হাসুর চোখ দুটি জলে চিকবিক করে ওঠে।
বিল থেকে অনেক শালুক তুলে আনে হাসু।
লবন দিয়ে সেদ্ধ করে খেতে খুব মজা।
ফরিদ আলীও শালুক সেদ্ধ খুব পছন্দ করে।
এসসাথে অনেক শালুক সেদ্ধ করে আঁচলে বেধে চুপি চুপ করে কত নিয়ে গেছে হাসু।
বিলের ধারে দুজনে বসে বসে গল্প করতো আর খেত।
এসব আজ স্মৃতি।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ী আসে হাসু।
উঠোনে পা রাখতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।
মতি ভাই মন খারাপ কর্যা বস্যা আছে।
বাজান কেমুন বাঘের মত বিকট ভাবে তাকাচ্ছে।
হাসুর দিকে চোখ পড়তেই গর্জে ওঠে।
এসব কি শুনত্যাছি রে হাসু?
কি বাজান, কি অইছে?
মতি এসব কি প্রস্তাব নিয়া আইছে? তুই নাকি আবার ফরিদের বাড়ী যাব্যার চাচ্ছিস? লজ্জা নাই তোর? আমার মান ইজ্জত কিছু নাই? আর কত জ্বালবি আমারে। সমাজের বাইরে এক ঘর্যা করব্যার চাইস?
বাজান, কি কও এসব?
কি কই বুঝিস না? তালাক দেয়া বউ ঘরে নিলি কি করতি হয়, তুই জানিস?
না, না, চাচা, ওদের তো তালাক হয় নাই। আপনারে বুঝাইলাম না।
আমি বুঝলি তো হবি ন্যা মতি। এই গেরামের মৌলবীগরে তুমি বুঝাব্যার পাইরব্যা?
পারবো চাচা। আপনি ধৈর্য্য ধরেন।
ধৈর্য্য আমি অনেক ধরছি। মৌলবীগরে যদি বুঝাব্যার পার ভাল কথা। আমার আর একটা কথা আছে।
কি কথা চাচা?
ফরিদ আলীর মা’রে তার ভুলের জন্যি মাফ চাওয়া লাগবি গেরামের মুরুব্বীদের সামনে। ফরিদ আলী, ছাওয়ালডা ভালো মানুষ। সব নষ্টের গুড়া উয়্যারি মা।
হ’ চাচা, ঠিক কইছেন। তারে আমরা বুঝাবো। আপনি খালি দ্বিমত করবেন না আর।
দেখ মতি, তুই তো জানিস বাজান, আমার আর সন্তানাদি নাই। ছাওয়াল কও, মিয়া কও, সব আমার ঐ হাসু। অর ছাড়া আমার আর কিডা আছে বাজান কও। আর সুখেই তো আমাগরে সুখ। জমির উদ্দিন আবেগপ্রবন হয়ে ওঠে।
মতি মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয়।
চাচা, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না।
মতি চলে যায়।
হাসু, একদিন, দু’দিন করে দিন গোনে।
সাতদিন হয়া গ্যাল মতি ভাইতো কোন খবর নিয়্যা আসে না?
কি হোল?
কিছুই বুঝতে পারে না হাসু।
ছট ফট করে।
হাসু, কই গেলি?
মা’র ডাকে হুশ হয়।
আসি মা।
গরু, ছাগল গুলি ঘরে তোল মা। কেমুন মেঘ করছে, বিজলী চমকাচ্ছে। ঝড় বাদল হবি। তাড়াতাড়ি কর মা। আঁধার হয়্যা গ্যাছে।
হাসু, দৌড়ায়ে দৌড়ায়ে গরু, ছাগল গোয়াল ধরে বাঁধে।
হঠাৎ রাস্তায় চোখ পড়তে চমকে ওঠে।
ফরিদ আলী দাঁড়িয়ে।
হাসু, বুঝতে পারে না কি করবে।
মনে হয় চিৎকার করে ছুটে যায় ফরিদের কাছে
শাড়ীর আঁচল টেনে দৌড়ে যাবে, ভাবতেই, তাকিয়ে দেখে, ফরিদ খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।
একেবারে রাস্তার ঐ মাথায়।
হাসু তাকিয়ে থাকে নির্বাক।
ভেবে পায় না, ফরিদ আলী কেন এমন করলো?
যাকে নিয়ে সে দিনরাত জ্বলতে জ্বলতে জীবন কাটাচ্ছে।
যার কাছে যাওয়ার জন্য এত ব্যাকুল হয়ে আছে।
সে কেন এমন করলো?
হাসু, কান্নায় ভেঙ্গেঁ পড়ে।
গোয়াল ঘর থেকে এখনো হাসু আসে না কেন?
মা, অস্থির হয়ে ওঠে।
ঝড় উঠে আসছে।
হাসুর মা গোয়াল ঘরে যায়।
হাসু শাড়ীর আঁচলে মুখ গুজে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।
কি হইছে মা? ও বাজান, কি হইছে তোর? আমার কাছে ক’ বেডা।
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাসুর মা।
হাসু আরো জোড়ে কাঁদতে থাকে।
কি রে, ফরিদরে দেখছিস?
হাসু চমকে ওঠে।
তুমি জানল্যা ক্যাবা করে মা?
ফরিদ প্রতিদিন এই সময় রাস্তা দিয়্যা যায় মা। এইদিকে তাকায় থাকে।
কই, এতদিন তো আমারে কও নাই মা।
কয়া কি হবি মা? চলবে...
শাহান আরা জাকির পারুল
নাট্যকার, লেখক ও গবেষক
বিষয়:
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: