সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে জুন ২০২২, ১৬ই আষাঢ় ১৪২৯


আত্মহত্যা প্রবনতা একটি রোগ : রাশেদ রাফি 


প্রকাশিত:
৬ জুলাই ২০২০ ১১:১১

আপডেট:
১৫ জুলাই ২০২০ ১২:১৯

রাশেদ রাফি 

 

রানী ক্লিওপেট্রা, নোবেল বিজয়ী লেখক  আর্নেস্ট হ্যামিংওয়েসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছিলেন। নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আগেও আত্মহত্যা করেছিলেন হলিউড ও বলিউডের অনেক সেলিব্রিটি।  ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারতের একই পরিবারে ঘরের সবাই মিলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে কয়েকটা। অবাক করা আত্মহত্যার ঘটনায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। কিন্তু কেন? এর কি সমাধান নেই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জনস্বাস্থ্য ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষন থেকে প্রবন্ধ লিখেছেন গবেষক রাশেদ রাফি।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

 আত্মহত্যার ইতিহাস অনেক পুরানো। এ নিয়ে গবেষনাও চলছে বহুকাল ধরে। তখন থেকেই প্রশ্ন চলে আসছে যাদের কোন সমস্যা নেই তারা কেনো আত্মহত্যা করবে? এমনসব প্রশ্ন সাথে নিয়েই এখন পৃথিবীব্যাপী আত্মহত্যা চলছে আরো উদ্যমে। এমনকি পরিবারের সবাই মিলে! এই আধুনিক যুগে একটি দেশের একাধিক পরিবারে সবাই মিলে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে কেন? কি এমন কারণ আছে? খাদ্যাভাব? অর্থাভাব? ভুতের আছড়? মানসিক যন্ত্রণা? নাকি অন্যকিছু? কি সেই কারণ যার সমাধান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রায় চূড়ায় উঠের আসা এই সময়ের নেই! কিছুদিন আগে বলিউড নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা সংবাদমাধ্যমে এতটাই আলোচিত হয় যে  এর রেশ এখনো কাটেনি। সাধারণ মানুষ, পুলিশ সবাই কারণ খুঁজছে। মানুষকে আনন্দ দেয়া যার কাজ, এমনকি নিজের শেষ ছবিতে যিনি জীবনের পক্ষে ও আত্মহত্যার বিরুদ্ধে থাকা চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মামলাও হয়েছে। অভিযোগ দেয়া হয়েছে সালমান খান করণ জোহর, সঞ্জয় লীলা বনশালীসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই ভারতেই দলবেঁধে যারা আত্মহত্যা করছে তাদের কথা কেন বলছেনা কেউ? সামাজিক উন্নয়ন গবেষনায় ঐ ঘটনাবলী কি  তদপেক্ষা বেশী আলোচনার দাবী রাখেনা? কেন গত ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ঐ দেশটির ত্রিপুরা রাজ্যের পূর্ব চাঁনপুর জেলার সন্যাসীমূড়ায় দরিদ্র পরেশ তাঁতি তাঁর পরিবারের আরো তিনজনকে নিয়ে একসাথে আত্মহত্যা করলেন? অভাব এবং এনজিওর চড়াসুদের ঋনই কি আসল কারণ? আবার, এই লকডাউনে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী এত সাহায্য ঘোষনার পরও গত ২২মে কেন ঐ রাজ্যের একই পরিবারের ছয় শ্রমিক আরো তিন শ্রমিককে নিয়ে মোট ৯জন তেলেঙ্গানা থেকে নিজ রাজ্যে না ফিরে ওখানেরই এক কুয়ায় ঝাপ দিয়ে যন্ত্রনাদায়ক আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন? কারনটা কি শুধু বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ? এরপর এইতো সেদিন ১৯জুন আহমেদাবাদের ভাটভা এলাকায় দুইভাই তাদের ৪ বাচ্চাসহ মোট ৬ জন ঝুলে আত্মহত্যা করল। অল্প টাকার ব্যাংক ঋন তো আসল কারণ হতে পারেনা! তবে কি সেই আসল কারণ? এর দুইবছর আগে, জুলাই ২০১৮’র ঘটনা তো সবারই জানা। দিল্লির বুরারির চন্ডাওয়াত পরিবারে একসাথে যেদিন ১১জন আত্মহত্যা করল। ঐ  গণআত্মহত্যার আসল উৎস কি অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস নাকি অন্য কিছু? 

এত গবেষনা-আলোচনার পরও কেন চলছেই এমনসব চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যা? সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে যত আত্মহত্যা হয়েছে তাদের প্রকৃত কারণ আসলে কি? তা আমাদের অতিসত্বর জানা দরকার। এখন বলিউড নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যাকে রসদ ধরে এতসব মর্মান্তিক আত্মহত্যার খবর আমাকে যে তথ্যটা দিচ্ছে তা হলো- ‘আর দেরি না করে ঘরে ঘরে জানিয়ে দেয়া দরকার যে- আত্মহত্যা প্রবণতা হলো একটি রোগ। এই  রোগটাকে  যদি মানসিক রোগ বলি তবে অনেকে অন্য কিছু মনে করেন, গুরুত্ব দিতে চাননা। আর যিনি অসুস্থ তিনি তো রীতিমতো চটে যান! তাই সংক্ষেপে বলুন “এটি একটি রোগ”। আর সে রোগের চিকিৎসাও আছে।  আত্মহত্যা প্রবণতা যে একটা রোগ তা প্রমান করার জন্য বছরের পর বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোচিকিৎসা বিভাগের সাবেক শিক্ষক, সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব মেডিসিন এর  প্রফেসর এমেরিটাস ডঃ ডেভিড শীহান। ডঃ ডেভিড শীহান এর ব্যাখ্যানুযায়ী আত্মহত্যা প্রবণতাকে নেহায়েৎ বিভিন্ন মানসিক রোগের উপসর্গ মনে করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কারণ, এতে করে আত্মহত্যার মতো একটা অতি বড় রোগকে গুরুত্বহীন করে দেখা হয়। আর তাই দেখা গেছে হাসপাতাল থেকে বিষন্নতা,  সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅরডার  প্রভৃতি রোগের চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পরেও কেউ কেউ হুট করে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে আত্মহত্যা করে বসছেন। এর কারণ হলো রোগীর আত্মহত্যা প্রবণতাকে স্বতন্ত্র রোগ ধরে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। ডঃ শীহানের ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করা যায় লিভার ক্যন্সার এর সাথে হেপাটাইটিস বি/সি এর যোগসাজেশ দিয়ে। হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে যারা আক্রান্ত তারা লিভার ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এ ভাইরাসদ্বয়ের যেকোন একটি কারো শরীরে থাকলেই সে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে। লিভার ক্যান্সারসহ যেকোন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার মূল উপাদান হলো কারসিনোজেন বা ক্যান্সার জীবানু। ঐ ভাইরাস দুটি ছাড়াও কারো লিভার যদি যেকোনভাবে কারসিনোজেন দ্বারা আক্রান্ত হয় তবে সে লিভার ক্যন্সারে আক্রান্ত হবে। অর্থাৎ লিভার ক্যান্সার হলো একটি স্বতন্ত্র রোগ। ঠিক তেমনি- বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার প্রভৃতি মানসিক রোগ আত্মহত্যা প্রবণ কারো জন্য  ঝুঁকিপূর্ন। কিন্তু এসব রোগ না থাকলেও কেউ আত্মহত্যা করতে পারে। কারণ, আত্মহত্যা একটি স্বতন্ত্র রোগ। তবে  স্বতন্ত্র রোগ হোক বা অন্য রোগের উপসর্গ হিসেবেই হোক আত্মহত্যা প্রবণতা হলো হলো একটি প্রতিরোধসাধ্য ও চিকিৎসাসাধ্য রোগ। 

বিভিন্ন  পেশা, দেশ ও বয়সের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন কারনে আত্মহত্যা করে। পৃথিবীর বিখ্যাত   -লেকখকদের মধ্যে অনেকেই আত্মহত্যা করেছিলেন। ডঃ শীহানের মতকে সমর্থন দেয়ার মতো প্রকৃষ্ট উদাহরন হলো  যুক্তরাষ্ট্রের নোবেলজয়ী  লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, পুলিৎজার জয়ী কবি জন ব্যারিম্যান ও যুক্তরাষ্ট্রের আরেক নোবেলজয়ী লেখক এনি সেক্সটন। হেমিংওয়ে ও সেক্সটন এ দুজনকেই হাসপাতালে নিয়ে বিষন্নতার চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করেন। আবার হেমিংওয়ে ও জন ব্যারিম্যান এ দুজনের মধ্যে জিনগতভাবেই আত্মহত্যা প্রবণতা ছিল। হেমিংওয়ের বাবা, বোন এবং ভাই আত্মহত্যা করেছিলেন। আর জন ব্যারিম্যানের বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন। এছাড়া জাপানী নোবেলজয়ী লেখক ইউসুনারী কাউবাতাও আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর কোন মানসিক রোগ ছিলনা অর্থাৎ তাঁর আত্মহত্যা প্রবণতা ছিল প্রচ্ছন্ন।  ২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্ণাল অব ইনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এন্ড পাবলিক হেলথ এ গবেষক  লুইস ব্রাডভিক উল্লেখ করেন যে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এ যাবত যত আত্মহত্যা হয়েছে তার ৯০শতাংশই হয়েছে মানসিক রোগের ফলে। বাকী ১০ শতাংশের সবাই যে রোগমুক্ত তাওতো না। অন্ততঃ ডঃ ডেভিড শীহানের ব্যাখ্যানুযায়ী তাদের কারো কারো মধ্যেতো প্রচ্ছন্ন আত্মহত্যা প্রবণতা থাকতেই পারে।

জানি নায়ক সুশান্তের আত্মহত্যাকে রোগ বললে চটে উঠবেন তাঁর ভক্তকুল। কেউ কেউ তো ফেসবুকে লিখেই দিয়েছেন, এটা তার নিজস্ব ব্যাপার, নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে যা তাকে বাধ্য করেছে এমনটা করতে। আমরাও তাই বলি, কারণতো থাকবেই। প্রত্যেকটা রোগের পিছনে যেমন কারণ থাকে তেমনি আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার জন্যও কোন কারণ বা উদ্দীপক লাগবে। এখন বাংলাদেশে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আত্মহত্যা বেশি হচ্ছে। ভিকারুন্নেসা স্কুলের ছাত্রী অরিত্রির আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষন করে ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর আমি ইত্তেফাকে লিখেছিলাম। নকল করে ধরা পড়ার অপমান, শিক্ষক কর্তৃক মা-বাবাকে অসম্মান করাসহ দশটি কারণ কি করে তিলে তিলে অরিত্রির আত্মহত্যা প্রবনতাকে উস্কে দিয়েছিল আমি তার বিশ্লেষন করেছিলাম। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার কারন নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্স’ এ প্রকাশিত একটা গবেষনা প্রতিবেদন স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের আত্মহত্যার  পেছনে যেসব কারন দেখিয়েছে তা হলো- উৎপীড়ক শব্দযোগে হেনস্থার স্বীকার (বুলিয়িং), গালি-গালাজ (স্কল্ডিং), প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সামনে আত্মসম্মানের হানি, যেমন- তুই মরলে বাঁচি, চলে যা, মা-বাবা/শিক্ষকগন কর্তৃক ছেলেমেয়েদেরকেকে এমন নেতিবাচক কথাবার্তা বলা ইত্যাদি। ক্লিয়ারেই এস ও তার সহযোগীগন (২০১৮) উল্লেখ করেন যে- এডভার্স চাইল্ডহুড এক্সপেরিএন্স (এইস) বা  শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা আত্মহত্যা প্রবনতা ও অন্যান্য মানসিক রোগের কারণ হতে  পারে। ২৪আগস্ট, ২০১৮ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের একটা প্রতিবেদনে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের জন্য আত্মহত্যাকে দেখানো হয়েছে মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে। তাহলে প্রতীক, সৌরভ ও অরিত্রিদের আত্মহত্যার পিছনে বয়স একটা বড় কারণ ছিল। আত্মহত্যার আরো কারণের মধ্যে আছে ব্যক্তিত্বের ধরণ,  দূর্বল ই-কিউ (ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কুউশ্যন্ট) ইত্যাদি।  হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাওয়ার্ড গার্নার ই-কিউ এর ব্যখ্যায় বলেন, সহযোগি মনোভাব নিয়ে অন্যদের কথা ও আচরনের অর্থ বুঝে সফলতা আদায় করে নেয়ার কৌশলটাই হলো ই-কিউ। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন ছাত্র ও ২০১৯ সালে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র প্রতীকের আত্মহত্যার পিছনে তাদের ই-কিউ এর অভাব কাজ করেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

সেলিব্রিটিদের আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার পিছনে থাকে ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, অনিয়ন্ত্রিত অহম, আত্মসম্মানের অভাব, সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে আহূত  মানসিক চাপ ইত্যাদি। বলিউড তারকা সুশান্ত বিষন্নতা রোগে ভুগছিলেন যা  বিভিন্ন পত্রিকায় এসেছে। তিনি বিষন্নতার জন্য চিকিৎসা হয়তো করিয়েছিলেন কিন্তু আত্মহত্যা নিরোধের কোন স্বতন্ত্র চিকিৎসা করাননি। এর আগেও অনেক বলিউড তারকা আত্মহত্যা করেছিলেন যারা আত্মহত্যা প্রবণতার চিকিৎসা করাননি। এদের মধ্যে বলিউডের হার্টথ্রব শ্রীদেবী (নিশ্চিত না), দিব্যা ভারতী,পারভীন বব, সিল্ক স্মিতা,  জিয়া খান, অর্চনা পান্ডে, কুলজিৎ রনধাওয়া, কুলি ছবির পরিচালক মনমোহন দেশাই প্রভৃতি তারকার নাম অনেকেই জানেন।   

ষাটের দশকের হলিউড সম্রাজ্ঞী মেরিলিন মনরোর আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দিয়েছিল সম্পর্কের আকর্ষন-আকর্ষন দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত মানসিক চাপ। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সাথে তাঁর নতুন সম্পর্কের কথা কানাঘুষা হওয়ার পূর্বেও তাঁর দুবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল।  ত্রিশের দশকে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রস আলেকজান্ডার ১৯৩৭ সালে সমকামিতার অভিযোগ এর বদনাম, ক্যারিয়ারে ধস প্রভৃতি চাপ মাথায় নিয়ে আত্মহত্যা করেন। হলিউড এর আরেক তারকা চারবারের অস্কার নমিনি চার্লস বয়ার ১৯৭৮ সালে ৭৮ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মতো রবিন উইলিয়ামসও বয়স্ক হয়ে  ৬৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কুস্তিগীর ক্রিস বেনোয়েট তার স্ত্রী ও সাত বছরের বাচ্চাকে মেরে একযোগে আত্মহত্য করেন।  আমেরিকান মডেল তারকা স্টিফেনি এডামস (অনুর্ধ্ব-৩০ কোটিপতি) ২০১৮ সালে তার সাত বছরের  শিশুপুত্রকে সাথে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। এভাবে বিশ্বখ্যাত আরো অনেক সংগীত শিল্পী, অভিনয় শিল্পী বিভিন্ন কারণ দ্বারা উদ্দীপিত হয়ে আত্মহত্যা করেন।

এবার আসি রাজনৈতিক আত্মহত্যার কথায়। প্রাগৈতিহাসিক কালের রাণী ক্লিওপেট্রা থেকে শুরু করে অনেক রাষ্ট্রনায়ক আত্মহত্যা করেছিলেন অনিয়ন্ত্রিত অহম, অপরাধবোধ, আত্মসম্মানরক্ষা  ইত্যাদি কারণে। এ যাবৎ আধুনিক বিশ্বের সাতজন রাষ্ট্রনায়ক আত্মহত্যা করেন। ১৮৯১ সালে চিলির ১১তম প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৭৩ সালে ২৮তম প্রেসিডেন্ট আত্মহত্যা করেন অনিয়ন্ত্রিত অহমের চাপ ও আত্মসম্মান রক্ষার্থে।  সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদগন বেশী পরিচিত হওয়াতে তাদের সুনামের কমতি বা অপমান দ্রুত চাউর হয়ে যায় যা অনেকেই সহ্য করতে পারেননা। তবে সেলিব্রিটিদের আত্মহত্যার পিছনে ই-কিউ এর অভাবও দায়ী থাকে। এই লকডাউনের সময়ে সুশান্ত সিং এর আত্মহত্যার পিছনে যদি তার সাতটি ছবির কাজ চলে যাওয়াটা দায়ী হয়ে থাকে তবে তা তাঁর ই-কিউ এর অভাব বলেই ধরা হবে। এতসব কারণ মাথায় নিয়েও আত্মহত্যা করেন না বেশীরভাগ শিক্ষার্থী, সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদগণ। এর কারণ হলো তাদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা নামক রোগটি নেই।     

এরপর জানা দরকার- আত্মহত্যার বীজ আসলে কিভাবে মস্তিষ্কে উপ্ত হয়? উল্লিখিত কারনগুলোর চাপে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি নিজের অস্তিস্তকে অযথার্থ ভাবতে শুরু করে এবং অসহায় বোধ করতে থাকে। আর তখন নিজেকে রক্ষার উপায় হিসেবে মাথায় আসে আত্মহত্যার বীজ। আত্মহত্যা কখনো কখনো ভাইরাস বা ছোঁয়াচে রোগের মতো কাজ করে থাকে। ১৭৭৮ সালে জার্মাণ উপন্যাসিক গ্যাটের “সরৌজ অফ ইয়াং ওয়েরথার” প্রকাশ পায় । উপন্যাসের  নায়ক তরুন ওয়েরথার আত্মহত্যা করেছিল বলে তাকে অনুস্মরণ করে তরুন পাঠকদের মধ্যে আত্মহত্যা বেড়ে যায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ‘রেল লাইনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা’র খবর পত্রিকায় ছাপানোর পর ঐ খবরের অনুকরনে আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বহুবার। এরপর, গত কয়েকবছর ধরে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘ব্লু হোয়েল অনলাইন সুইসাইড গেম’ এর কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। এমন ঘটনাগুলো আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষদেরকে উৎসাহিত করে যা ভাইরাস বা ছোঁয়াচে রোগের মতো কাজ করে।  নায়ক সুশান্ত সিং এর প্রাক্তন ম্যানেজার দিশার আত্মহত্যা তাকে আত্মহত্যার প্রতি উৎসাহ যোগানোর কাজ করে থাকতে পারে।  তবে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো যাদের মধ্যে জীনগতভাবেই আত্মহত্যার বীজ থাকে তারা ঠুনকো কারনেও আত্মহত্যা করতে পারে। যেমন, বাংলাদেশের ঝিনাইদহ ও ভারতের মহারাষ্ট্রের বিদর্ভে অহেতুক কারণেও অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। 

আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ‘আত্মবিনাশী আচরণ’। ১৯৬৯ সালে ‘বৃটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত একটি গবেষনা প্রতিবেদনে মনোগবেষক ক্রেইটমেন ও তাঁর সহযোগীগণ ‘প্যারাসুইসাইড’ নামক ধারনাটি পরিচিত করান যার মানে হলো ‘আত্মবিনাশী আচরণ যা আত্মহত্যার পূর্ববর্তি আচরনের উপর গুরুত্ব প্রদায়ক, । ২০১৯ সালে কলেজ ছাত্র সৌরভ আত্মহত্যার পূর্বে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল-  ‘সেই পুষ্পে এখনো সৌরভ ছড়ায়নি, হয়তো আর ছড়াবেওনা; ‘বিদায়’’ এইসব লিখে। আর তার বন্ধুরা জানিয়েছে যে আত্মহত্যার পূর্বের কয়েকদিন ধরেই সৌরভকে চুপচাপ থাকতে দেখা গেছে। এর সবই ছিল ক্রেইটমেন এর দেয়া আত্মহত্যাজনিত আচরণের আওতাভূক্ত। 

এবার আসি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের কথায়।  সুশান্ত সিং এর মতো সেলিব্রিটিদেরকে আত্মহত্যা করা থেকে রক্ষা করতে পারে তাদের আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবগন। তাদের মধ্যে প্যারাসুইসাইড বা আত্মহত্যাজনিত কথাবার্তা/আচরণ দেখলেই উচিত হলো তাদেরকে আন্তরিকভাবে সময় দেয়া  এবং চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নেয়া। অরিত্রি-সৌরভ-প্রতীকের মতো শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্য মা-বাবা এবং শিক্ষক উভয় পক্ষেরই উচিত ছেলেমেয়েদের বয়স, ব্যাক্তিত্যের ধরন ও আচরণ বুঝে তাঁদের সাথে মেপে মেপে কথাবার্তা বলা এবং প্রয়োজনে ই-কিউ বৃদ্ধির জন্য উপায় বের করা। পরীক্ষার ফলাফল ঘোষনার ঠিক একমাস আগে থেকে তাদেরকে পাশ এবং ফেল এ উভয় ফলাফলের প্রতিই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরী করতে হবে। অন্যদের সাথে তুলনা দিয়ে অপমানজনক কথা বলা বন্ধ করে ইতিবাচকভাবে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এর প্রতি আশাবাদী করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে তাদের ই-কিউ বিষয়ক যোগ্যতা  বাড়িয়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। বয়সে যারা বড় তাদের ই-কিউ বৃদ্ধির ব্যাপারে বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের লোকজন উদ্যোগী হয়ে ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হবেন।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদেরকে আত্মহত্যা প্রবন হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে আছে এনএইচএস, নাইস, এনএসপিসিসি এবং  যুক্তরাষ্ট্রে আছে  এইচএইচএস,  সিডিসি ও এএসিএপির মতো সংস্থাসমূহ। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও রয়েছে গাইডলাইন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বে ৮লাখ লোক আত্মহত্যা করে। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে আত্মহত্যা একটি অন্যতম কারণ হওয়ায় গতবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- “আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন”। তাছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষভাবে ১0 সেপ্টেম্বরকে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষনা দিয়েছে এবং কমিউনিটির লোকদেরকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে জড়িত হওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এখন আমাদের উচিত আশু পদক্ষেপ হিসেবে দেশের প্রতিটা স্কুল, কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা শ্রেনী/বিভাগে কাউন্সেলিং সাইকোলোজিস্ট নিয়োগ দেয়া যারা শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষক ও অভিভাবকদের বন্ধুসুলভ সম্পর্ক স্থাপনে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ  করে যাবেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের কোন মানসিক সমস্যা থাকবে বা আত্মহত্যা প্রবণতা ধরা পড়বে তাদেরকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে গেলে তারা হীনমন্যতায় ভূগতে পারে। এসব বিষয় খেয়াল রেখে একজন দক্ষ মনোচিকিৎসক শিক্ষার্থীদেরকে রাগ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রন, বিষন্নতা, অযথার্থ হীনমন্যতা, অপরাধবোধ, অপমানবোধ প্রভৃতি সমস্যা সমাধানে যথার্থ প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। একইভাবে, পরিবার ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার প্রভৃতি মানসিক রোগ ও রোগীদের প্রতি স্বাভাবিক ও বন্ধুসুলভ দৃষ্টিভংগী প্রদর্শনের পরিবেশ তৈরী করতে হবে এবং এসব রোগ প্রতিরোধে  মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে। কারো মধ্যে কোন আত্মবিনাশী কথাবার্তা বা আচরণ দেখলেই বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের উচিত হবে তাঁর মতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তাঁর খেয়াল রাখা এবং প্রয়োজনে ডাক্তার দেখানো। মনে রাখতে হবে যে- আত্মহত্যার পূর্বে ভূক্তভুগী ব্যাক্তি ভুলের ধোঁয়াশায় পড়ে মনে করে থাকেন যে- এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য একে একে সব রাস্তা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য, এ পর্যন্ত আসার  পিছনে কোন সামাজিক কারণ থাকতেও পারে, যেমন- পরীক্ষার খারাপ ফল, ঋন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিকভাবে হয়রানি, অসম্মান বা অপমান ইত্যাদি। এসব সামাজিক কারণ আত্মহত্যা প্রবণ ব্যাক্তিকে উদ্দীপিত করে থাকলে তা সমাধানে রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত উদ্যোগ নিয়ে তাকে বেঁচে থাকার হাজারো আলোকিত রাস্তা দেখিয়ে দেয়া। সেইসাথে  সরকারের উচিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ নিয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা।

রোগতত্ত্বের বিচারে আত্মহত্যা একটি স্বতন্ত্র রোগ। কারণ ১৫-১৬% রোগী জীনগতভাবেই আক্রান্ত হয়। তাছাড়া, আত্মহত্যার রোগীদের মস্তিষ্কের গঠন আলাদা এবং স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলোর মধ্যেও রয়েছে তারতম্য। সুতরাং, বিশেষজ্ঞদের উচিত ডঃ ডেভিড শীহানের গবেষনাকে গুরুত্ব দিয়ে আত্মহত্যা প্রবণতাকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীর জন্য  ব্রিফ ইন্টারভেনশন এন্ড কন্ট্যাক্ট (বিআইসি) নামক স্বতন্ত্র চিকিৎসার পরামর্শ দিচ্ছে যা কার্যকর বলে প্রমানিত হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, পাবনা মানিসিক  হাসপাতালসহ দেশের সব হাসপাতালে আত্মহত্যা প্রবণতাকে স্বতন্ত্র মানসিক রোগ হিসেবে ধরে চিকিৎসা দেয়া শুরু করতে হবে। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যাক্তিদের সহায়তা করার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ৯৯৯ এর মতো গোপন হেল্প লাইন থাকা দরকার যেখানে তারা তাদের মনের কথা খুলে বলতে পারবেন।  

নামটা মনে নেই, কোন এক বৃটিশ কবি আত্মহত্যার আগে লিখে গিয়েছিলেন  –“আমার মতো এমন নরম মনের মানুষের জন্য এ কঠিন পৃথিবী নয়”। তাঁর ধারণা ভুল। পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন অসংখ্য ফুল ফুটে, অগণিত পাখি গান গায়, সমুদ্র-নদীরা সৌন্দর্যের বান তোলে, নীলাকাশে সূর্য হাসে, রাতে চাঁদ তারারা আলো দেয় আপন মনে। এইসব সৌন্দর্য স্বার্থপর, চালিয়াত বা ঠকবাজ মানুষদের জন্য নয়; ঐ কবির মতো নরম মনের মানুষদের জন্যই। ১৯৪১ সালের ২৮মার্চ ওভারকোটের পকেটভর্তি নুড়ি পাথর নিয়ে খরস্রোতা ওউজ নদীর গভীরের দিকে হাটতে হাটতে তলিয়ে যান বিখ্যাত বৃটিশ লেখিকা ভার্জিনিয়া উল্ফ। তাঁর এ আত্মহত্যা শুনতে খুব রোমান্টিক মনে হলেও এতে মিশানো ছিল বিষন্নতার যন্ত্রনাময় বিষ। পৃথিবীতে কত কিছুইনা রয়ে গেছে! হাজারো জিনিসের মধ্যে শুধু একটা জিনিস পাইনি বলেই কি বিষন্ন হয়ে মরে যেতে হবে? আরো নয় হাজার নয়শো নিরানব্বইটা জিনিস না দেখেই!  

১৯৪৭ সালের পহেলা মে তরুণী এভিলিন ম্যাকহেল নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এর ৮৬তলা থেকে জাতিসংঘের একটা লিমুজিন গাড়ির উপর পড়ে আত্মহত্যা করেন। অনেকে বলেন এভিলিন ওভাবে আত্মহত্যা করেছিলেন হিরোইজম ফুটানোর জন্য। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে এভিলিনসহ এসময়ের ব্লুহোয়েল গেম এর সকল আত্মহত্যাকারী যারা হিরোইজম দেখানোর জন্য আত্মহত্যা করেছিল তারা মারাত্মক ভুল করেছে। হিরোইজম দেখানোর জন্য এখনো পড়ে আছে ছোট-বড় অনেক কাজ। পৃথিবীকে আরো সহজ, সুখী ও শান্তিময় করে গড়ে তোলার জন্য পৃথিবী প্রতিদিন কোটি কোটি লোক নিয়োগ দিতে চায়। আত্মহত্যা করার পূর্বে আমাদের উচিত উপলদ্ধির চোখ দিয়ে পৃথিবীর ঐ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে দেখা।    

 

রাশেদ রাফি
জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top