সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


আপনার শিশু কি করোনাকালীন মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগছে? : খাদিজা খান সাদিয়া 


প্রকাশিত:
১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:০৬

আপডেট:
১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:৪০

 

“তুমি খেতে পারছো, ঘুমাতে পারছো, যখন যা চাচ্ছ তাই পাচ্ছ, যখন যা ইচ্ছা তাই করছো; তারপরও তোমার কিসের এত ডিপ্রেশন”? মা বাবারা হরহামেশাই কথাগুলো বলে থাকেন । কিসের ডিপ্রেশন? কেন ডিপ্রেশন? কিভাবে ডিপ্রেশন? এই প্রশ্নগুলো এক সাইডে রেখে করোনাকালীন সময়ে, দীর্ঘ দিন ঘরবন্দি থাকার ফলে শিশুর ওপর কি ধরনের মানসিক প্রভাব পড়তে পারে, এখন তা নিয়ে একটু কথা বলি।

এখন অনেকেই বলতে পারেন শিশুদেৱ কি আদৌ মানসিক বিষণ্ণতা/ অবসন্নতা হয়? উত্তর: হ্যাঁ, হয় । যে কোন সুস্থ স্বাভাবিক শিশু ক্ষুধাবোধ আনন্দবোধ বিরক্তিবোধেৱ পাশাপাশি রাগ দুঃখ অবসন্নতা হতাশা ইত্যাদি সবকিছুই সমানভাবে অনুভব করে; এটাই স্বাভাবিক। লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন ইত্যাদি বিষয়গুলো যেভাবে আপনাকে প্রভাবিত করে তেমনি আপনার শিশুটিকেও করে। করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার কারণে শিশুর মানসিক বিকাশে ভয়াবহ বিঘ্ন ঘটতে পারে। যেমন: বিকাশের অবনতি অর্থাৎ যে শিশুটি অনায়াসে দশ-বারোটি শব্দ বলতে পারতো সে এখন কথা বলছে না বা একটি দুইটি শব্দ বলছে।

আবার ক্ষুধা লাগা বা অন্য কোনো প্রয়োজন যে সহজে প্রকাশ করতে পারত সে এখন আর পারছে না। ভালোভাবে বলতে গেলে, যেসব প্রয়োজনীয় জ্ঞান শিশুটি অর্জন করেছিল এবং প্রয়োগ করতে পারতো তা সে ভুলে গিয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে গিয়েছে। এর পাশাপাশি কান্না করা মেজাজ খিটখিটে থাকা কিংবা অপ্রাসঙ্গিকভাবে আচরণ করাও শিশুর মানসিক বিষণ্ণতার লক্ষণ। 

এ তো গেল একদম ছোট শিশুদের কথা কিন্তু যারা স্কুল গোয়িং এবং টিনএজ তাদের কিছু ভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। যেমন: নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের অনীহা। সময়মত না খাওয়া, সময়মত না ঘুমানো, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, রাতারাতি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন।

নিয়মিতভাবে খাওয়া ও ঘুমে অনিয়ম করা অর্থাৎ কোনদিন বেশি খাওয়া-কোন দিন কম খাওয়া-কোনদিন বেশি ঘুমানো-কোনদিন কম ঘুমানো এবং কোনটাই সময়মতো না করা। আরো একটি লক্ষণ হল কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই মন খারাপ এবং দীর্ঘ সময় পরও মনের এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হওয়া। বিশেষত টিনএজারদের মধ্যে মেজাজ খিটখিটে আচরণ এবং অত্যাধিক মুড সুইং।

এমনকি সবচেয়ে পছন্দের কাজটি করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করা, এড়িয়ে চলা এবং ভিত্তিহীন কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্তের মত আচরণ করা।

এসব স্তরের বাড়াবাড়ি অবস্থার লক্ষণ হলো – 

-মনোযোগ কমে যাওয়া। কোনোভাবেই মনঃসংযোগ করতে না পারা।
-আসক্তি সৃষ্টি হওয়া, যেকোনো ধরনের আসক্তি- টিভি/ মোবাইল/ গেমস/ মাদক যেকোনো কিছুর ওপর বাড়াবাড়ি রকমের আকর্ষন বোধ করা।
-ব্যথা না পাওয়া সত্ত্বেও পেশিতে ব্যথা; কখনো কখনো তীব্র মাথাব্যথা। মূলত মানসিক চাপ থেকে এই ধরনের ব্যথা হতে পারে।

এখানে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, প্যানডেমিকের এই সময়ে সকলের জীবনেই কিছু না কিছু পরিবর্তন এসেছে। তাই উপরের লক্ষণগুলো অনেকের মধ্যেই থাকতে পারে। কিন্তু আপনার শিশুর সত্যিই কি কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা এবং তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে আছে কিনা সেই ব্যাপারটা আপনি নিজেই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারবেন।  আর যদি বুঝতে পারেন আপনার শিশুটি মানসিক বিষন্নতায় ভুগছে তাহলে শিশুর প্রতি যত্ন নিতে উদ্যোগী হন। 

এক্ষেত্রে প্রথমেই ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। পাশাপাশি শিশুর সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করুন। শিশুর সামনে বসে থাকলেই কিন্তু শিশুর সাথে থাকা হয় না। শিশুর সাথে কথা বলুন, শিশুর কথা শুনুন, তার পছন্দের বিষয় নিয়ে আলোচনা করুন; সমসাময়িক বিষয় কিংবা করোনা সংক্রান্ত তথ্য নিয়েও কথা বলুন মোটকথা যা আপনার শিশুর বয়সের সাথে যায় তা নিয়ে কথা বলুন। কৃত্তিম ভাবে পড়ালেখার রুটিন ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের রুটিন তৈরি করে দিতে পারেন। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে কথা বলতে দিন। তার ছোট ছোট কাজে প্রশংসা করুন । 

সবশেষ কথা, মানুষের উপদেশ শুনতে পছন্দ করে না- শিশুরাও ঠিক তাই। শিশুদের উপদেশ দিবেন না। কিন্তু শিশুরা যেহেতু অনুকরণপ্রিয় তাই তাদের সামনে যাই করবেন তারা ঠিক তাই করবে। আপনি সময়মতো খেলে সেও খাবে; আপনি সময় মত ঘুমালে সেও ঘুমাবে। তাই আপনি আপনার শিশুটিকে যেভাবে দেখতে চান ঠিক সেভাবে আচরণ করুন। 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top