সিডনী রবিবার, ৭ই আগস্ট ২০২২, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৯


পরিচালক তরুণ মজুমদারের মৃত্যুতে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শূন্যতার সৃষ্টি হলো : বটু কৃষ্ণ হালদার


প্রকাশিত:
২৬ জুলাই ২০২২ ২০:১৭

আপডেট:
৭ আগস্ট ২০২২ ২২:০৪

ছবিঃ তরুণ মজুমদার

 

ষাট, সত্তর হোক কিংবা আশির দশক বাংলা বাংলা সিনেমার স্বর্ন যুগ। বাংলা সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন যে সমস্ত দিকপাল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা তরুন মজুমদার।যে সময় সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের মতো পরিচালকরা সিনেমার জগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই সময়ে বড়পর্দায় পারিবারিক কাহিনি ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন তরুণ মজুমদার। তরুণ মজুমদার মানে নিজস্ব ঘরানা, আবেগ প্রেম সুখ-দুঃখ হাসি কান্না, নতুন নতুন তারকা সৃষ্টি করা, যারা বাংলা সিনেমা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি পরিচালক তরুণ মজুমদারের প্রতিটি ছবিতেই রেখে গেছেন শাশ্বত মূল্যবোধ, নৈতিকতার সুষ্পষ্ট ছাপ এবং সুস্থ নির্মল বিনোদনের অনাবিল উৎস। যা আক্ষরিক অর্থেই শুধু বাংলা নয়, সারা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র জগতের কাছে এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। তাঁর চলচ্চিত্রের অধিকাংশই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বিমল করের মতো বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের অবিস্মরণীয় সব সৃষ্টির ওপর আধারিত। ৭০-৮০ দশকে বাংলা সিনেমাতে কমার্শিয়াল ছবি হিট করানো ছিল যথেষ্ট কষ্টসাধ্য কাজ।কিন্তু সেই চিরাচরিত প্রথাকে ভেঙে বারবার হিট ছবির জন্মদাতার নাম তরুণ মজুমদার।পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রতেই রয়েছে অবিস্মরণীয় রবীন্দ্রগানের সার্থক প্রয়োগ । পেয়েছেন চার-চারটি জাতীয় পুরস্কার (কাঁচের স্বর্গ, গণদেবতা, নিমন্ত্রণ ও অরণ্য আমার ছবি চতুষ্টয়ের জন্য), সাতটি বি.এফ.জে.এ. সম্মান, পাঁচটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ও একটি আনন্দলোক পুরস্কার।
১৯৩১ সালে তরুণ মজুমদারের জন্ম ওপার বাংলার বগুড়ায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে সেই বগুড়া চলে গিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের। তিনি নিঃসংকচে স্বীকার করেছিলেন আমার পরিচালক জীবনের প্রথম দিনটা আনন্দ আর আতঙ্কের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল। বাবা বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। জ্যাঠামশাই হেমচন্দ্র ব্রিটিশ সরকারের হাতে নিহত হন ফরিদপুর জেলে। স্বাধীনতা সংগ্রামী একান্নবর্তী পরিবারেই কেটেছে তাঁর শৈশব। তৎকালীন সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের জেরে বাড়ির সবাই প্রায় জেলে বন্দি ছিলেন, তাই ছোট্ট তরুণ প্রতিবেশীদের সহচর্যা তে যেতেই বেড়ে উঠেছিলেন। শৈশবে বগুড়া করোনেশন হাই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর চলে আসেন কলকাতায়।পরবর্তী পড়াশোনা কলকাতা সেন্ট পলস স্কুলে।স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক হন। স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তে।কৈশোর বয়স থেকে সিনেমার প্রতি যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় তা আরো গভীর হয় কলেজ পড়ার সময়।সে সময় যোগাযোগ হয় কানন দেবীর সঙ্গে। কানন দেবী প্রোডাকশন হাউসেই আলাপ হয় শচীন মুখোপাধ্যায় এবং দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
শচীন মুখোপাধ্যায় এবং দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিলে ‘যাত্রিক’ টিম তৈরি করে সিনেমা পরিচালনার কাজ শুরু করেন তিনি। তিন পরিচালকের প্রথম সিনেমা ‘চাওয়া পাওয়া’।অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার,সুচিত্রা সেন, তুলসী চক্রবর্তী।‘যাত্রিক’-এর পরিচালনাতেই তৈরি হয় ‘কাঁচের স্বর্গ’। জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল ছবিটি।
কলকাতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হল যেখানে ডিসিকা,রসেলিনির মত দিকপাল পরিচালকদের ছবি দেখে তিনি উৎসাহ বোধ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউরোপ সেখানকার মানুষের সংকট উপলব্ধি হলো ওই ছবিগুলির ভিতর দিক দিয়ে সেইসব মানুষের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতেন। ভালো ছবির একইসঙ্গে ভালো হয়ে ওঠা এবং কমিউনিকেট করার ক্ষমতা দুই মিলে ছবি বানানোর উদ্দেশ্যটা তাঁর কাছে অনেক বড় হয়ে উঠলো। সম্বল বলতে তার ছিল মফস্বল শহরের স্মৃতি আর অ শৈশব সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা। তবে নিয়মিত ভারতীয় ছবি দেখতেন প্রমথেশ বড়ুয়া,নীতিন বসু থেকে শুরু করে দেবকী বসু পর্যন্ত। অন্যদিকে ভিসান্তারাম বা বিমল রায়। পাশাপাশি তখন আবার ভারতীয় গণনাট্য সংঘের আন্দোলন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সলিল চৌধুরী হেমাঙ্গ বিশ্বাস সুচিত্রা মিত্র দেবব্রত বিশ্বাসকে সেই সূত্রে প্রথম চিনেছিলেন।১৯৫৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতে ছিলেন সক্রিয়। তখন তিনি বেশিরভাগ সময় কাটাতে মুম্বাইতে। সেখান থেকেই সংগীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছবির মিউজিক রেকর্ডিং শেষ করেন। হেমন্ত তরুণ জুটি একটানা ২৫ টি ছবিতে কাজ করেছিল। পলাতকের হিন্দি রাহ গিরের প্রযোজক ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কলা থেকে পর থেকেই জীবনপুরের পথিক তরুণ বাবুকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতিটি ছবি বক্স অফিস হিট, আর একের পর এক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে।তরুণ মজুমদারের সিনেমাতে যৌথ পরিবারের গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন তিনি।মধ্যবিত্ত বাঙালির টুকরো মুহূর্তগুলিকে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছিলেন ‘বালিকা বধূ’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘আলো’, ‘চাঁদের বাড়ি’র মতো সিনেমার মাধ্যমে।মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়, মহুয়া রায়চৌধুরী, তাপস পাল, দেবশ্রী রায়, সহ কত অভিনেতা-অভিনেত্রী তাঁর হাত ধরে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছেন।তরুণ মজুমদারের ছবি মানেই সাহিত্যনির্ভর ছবি। সেটা ‘ভালবাসার বাড়ি’ হোক বা ‘দাদার কীর্তি’, অথবা ‘গণদেবতা’৷
‘দাদার কীর্তি’-ছবিতে তাপস পালের আগে প্রায় জনা তিরিশ জনের অডিশন নিয়েছেন,তরুণ মজুমদারের এক সহকারী একদিন চন্দননগর থেকে তাপস পালকে নিয়ে এল ওকে তরুণবাবুর মনে হয়েছিল অভিনয় না করেও অনেক কিছু প্রকাশ করা যায়, ওর মধ্যে সেই জিনিসটা আছে। কুহেলি’তে দেবশ্রী যখন কাজ করে, তখন ওর বয়স আড়াই-তিন বছর। পরিচালকের কোলে কোলে ঘুরত।‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ আবার মহুয়ার চরিত্রটায় অন্য আর এক জনের অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু মহুয়াকে দেখেই মনে হয়েছিল, চোখ দুটো ভারী অদ্ভুত! তার পর তিনি সিলেক্ট হলেন৷ তরুণ মজুমদার বলতেন আসলে মহুয়ার মধ্যে যা ছিল, তা অন্য কারও মধ্যে ছিল না।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা অনুপকুমারের আসল নাম হয়ত অনেকের অজানা! তিনি সত্যেন দাস ৷তরুণ মজুমদারের ‘পলাতক’ ছবি,ছোট রোল নয়, রীতিমতো নায়ক৷ প্রযোজকেরা নাকি বেঁকে বসেছিলেন! অনুপকুমার নায়ক! ছবি চলবে না। সেই ছবি নিশ্চিতভাবে তাঁর জীবনে একটা মাইলস্টোন, একজন নতুন অনুপকুমারের জন্ম হয়েছিল তরুণ মজুমদারের হাত ধরে সেই ঘটনা ১৯৬৩ সালের৷তরুণ মজুমদার এমন এক ব্যাক্তি ছিলেন যিনি কখনোই প্রচারের পিছন ছুটেছেন,বরং তিনি বলতেন,টিভিতে বাইট তিনি দেন না। অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন, কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না খুব সাধারণ ভাবে ছবি তৈরির চেষ্টা করেছেন দর্শক, চলচ্চিত্রবোদ্ধারা তাঁর ছবির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন৷‘কাঁচের স্বর্গ’ ছবিতে রবীন্দ্র সংগীত ব্যবহার করলেন বাংলা চলচ্চিত্রের সদ্য প্রয়াত পরিচালক তরুণ মজুমদার। তখন রবীন্দ্র সংগীতের কথা শুনলে ডিস্ট্রিবিউটররা আঁতকে উঠতেন,অত আস্তে গান চলছে। আবার এই ছবির জন্যই তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার ৷ এক একটা গল্পের জন্য নতুন-নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছেন তবে ছবিতে সব সময় একটা আশার আলো দিতে পেরেছেন৷
স্বামীর অসুস্থতার খবর পাওয়ার পরেই ঘুম ভুলে ভুলে গেছেন।অঝোরে কাঁদছেন সন্ধ্যা রায়। কান্নায় গলা বুজে আসছেন তাঁর। তরুণ মজুমদারের অবস্থা সঙ্কটজনক। খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে।এরপর ঠায় এক ভাবে বসে ঠাকুরঘরে দিন কাটাচ্ছিলেন।সমানে ঈশ্বরের কাছে একটাই প্রার্থনা করেছেন,সমস্ত বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে যেন ঘরের মানুষ ঘরে ফিরে আসেন।
তরুণ মজুমদার সন্ধ্যা রায়ের জীবনে একাধারে স্বামী, পরিচালক, গুরুর ভূমিকা পালন করেছেন। এক সঙ্গে কাজ করতে করতে প্রেম। সেই প্রেম আরও গাঢ় সাতপাকের বাঁধনে। পরিচালক-নায়িকার প্রেম-পরিণয় নতুন নয়। তবে তনুবাবু-সন্ধ্যায় রায়ের প্রেম বহু ভাল ছবি, নতুন নায়ক-নায়িকার জন্ম দিয়েছে। মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়, রাখী গুলজার, তাপস পাল, অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ তরুণ মজুমদারের আবিষ্কার। ‘ফার্স্ট লুক’ থেকেই প্রত্যেক নায়িকাকে যত্ন নিয়ে তৈরি করতেন সন্ধ্যা নিজে। অভিনয়ের প্রশিক্ষণও দিতেন দু’জনে। যার ফলাফল একমুঠো জনপ্রিয় ছবি।শেষেবড্ড শখ ছিল, শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জনপদবধূ’ উপন্যাস নিয়ে ছবি বানাবেন।নায়িকা হিসেবে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ওঁর প্রথম পছন্দ ছিলেন। পাশাপাশি, ছবিতে নাচের ভূমিকাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।ছবিটা আর করা হয়ে উঠল না।’’অপূর্ণ থেকে গেল জীবনের শেষ ইচ্ছাটুকু।
ভালোবাসার বাড়ি' তরুণ মজুমদার পরিচালিত শেষ ছবি। যেটি ২০১৮ সালে মুক্তি পায়। পদ্মশ্রী সম্মানেও সম্মানিত হয়েছেন। তবে তাঁর সেরা প্রাপ্তি বাঙালি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ভালোবাসা।বাংলা সিনেমার দিকপাল সত্যজিৎ রায় চলে গিয়েছেন অনেক দিন,মৃণাল সেন,তপন সিনহা,ঋত্বিক ঘটক রা না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন অনেক আগেই,এবার সেই পথে হাঁটলেন কিংবদন্তি তরুণ মজুমদার৷বাংলা চলচ্চিত্রে মেধা,উদ্ভাবনী শক্তি,সৃষ্টি কর্তার খামতিটা যেন দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। তবে এ কথা না বললেই নয়, বাংলা সিনেমা জগতের যে অভাবনীয় ক্ষতি হয়ে গেল, যে শূন্যতার সৃষ্টি হল তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত' ছবির শুটিং চলছিল। কুমারসাহেব তাঁবু ফেলেছেন জঙ্গলের কোল ঘেঁষে। চলছে পিয়ারিবাইয়ের নাচ গান। চলছে মানে, ধীরে ধীরে সেই সব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়ে উঠছে। নাচের দৃশ্যের কিছু অংশ শুট হয়ে গিয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে তরুণ মজুমদারের মাথায় প্রায় বিনা মেঘে বজ্রপাত। মিসেস সেনকে মানে, সুচিত্রা সেনকে তাঁকে ডায়লগ মুখস্থ করাতে হবে।
'বজ্রপাত' কথাটার একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। প্রথমদিন সেটে ঢুকেই সুচিত্রা সেন তরুণের অভিন্নহৃদয়বন্ধু দিলীপ মুখার্জীকে নিয়ে নেহাতই মশকরা করেছেন, তাঁকে 'দিলীপ' শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা যেন একটু মিঠে সুরে অপদস্থ করতে চেয়েছেন এবং কথার ছলে আরও নানা ভাবে। ফলে প্রথমদিন থেকেই তরুণ মজুমদার, শচীন মুখার্জী ও দিলীপ মুখার্জী সুচিত্রার থেকে দূরত্ব রক্ষা করে চলছেন, একটু গুটিয়ে থাকছিলেন। খুব দরকার না পড়লে তাঁর সামনেই যাচ্ছেন না। ভয় এই বুঝি নায়িকা তাঁদের নিয়ে হাসি-মশকরা শুরু করে দেন।কিন্তু তরুণ মজুমদার সেটা এড়াতে পারলেন না। যথারীতি প্রথমদিন ডায়ালগ পড়ানোর কাজ চলছে। মিনিট দশেক কেটেছে কি কাটেনি। এরই মধ্যে সুন্দরী নায়িকার মুখ থেকে বেরিয়ে এল--- 'আপনি বুঝি সব সময় এ-রকম?'
কী রকম?' তরুণের বিস্মিত প্রশ্ন।মুখটা প্যাঁচার মতো করে থাকেন। গুরুগম্ভীর।কথা শুনেই তো তরুণের আক্কেল গুড়ুম। তিনি মনে মনে স্থির করে নিয়েছেন, ওদিক থেকে যতই প্ররোচনা আসুক, ফাঁদে পা দেবেন না। ফলে, যেন কিছুই হয়নি এভাবে আবার ডায়ালগ শিটে মন দেন তরুণ বাবু। কিন্তু বোঝা যায়, সুচিত্রা আছেন সুচিত্রাতেই। তিনিও যেন চারপাশে অন্য কিছুই চলছে না এই রকম সুরে বলে চলেছেন, 'বলুন না, বলুন না। চিড়িয়াখানায় বাঁদর দেখলেও আপনার যা এক্সপ্রেশন,পূর্ণিমার চাঁদ দেখলেও তাই?'
তরুণ বাবু তাতেও কোনও উত্তর দিলেন না। শেষে সুচিত্রা বলে ওঠেন, 'বলবেন না তো? ঠিক আছে, বলবেন না। তাহলে আমিও আপনার কাছে ডায়ালগ পড়ব না। পাতাগুলো রেখে যান, ও আমি নিজেই পড়ে নেব'।পরিচালক নিজেই তার ঘরে স্ক্রিপ্ট রেখে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। এই হলো তরুণ মজুমদার, যাঁর ছবি থেকে প্রযোজক টাকা ফেরত পেতেন।তাাঁর ছবি দেখে দর্শক আনন্দ পেতেন, আর নব্য অভিনেতারা সমাজের কাছে সমৃদ্ধ হতেন। তার সান্নিধ্য আশার মানে হল অনেক কিছু শেখা। বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁর সমস্ত ছবির প্রিমিয়ারে সত্যজিৎ রায় কে ডাকতেন।
তিনি শুধু বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না, ছবি তৈরি পাশাপাশি তাঁর কলম কখনো থেমে থাকে নি। শেষের দিকে কয়েকটা বছর প্রচুর লিখেছেন। বাতিল চিত্রনাট্য,নকশি কাঁথা,সিনেমা পাড়া দিয়ে, ইত্যাদি লেখাগুলির মধ্য দিয়ে পাঠক মহলে তরুন মজুমদারকে লেখক হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। শেষের কয়েক মাস সময় কেটেছে ইংরেজি আর বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত সব লেখকদের বই পড়ে। দিনের বিভিন্ন সময়কে ভাগ করে নিয়ে পড়তেন জেরম কে জেরম,ওয়ার্ডসওয়ার্থ, বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের ছিন্নপত্রাবলী, ম্যাক্সিম গোর্কি সহ বহু সাহিত্যিকের বই।
মহান পরিচালকের মৃত্যুর পর অনেকেই নানান ভাবে স্মৃতিচারণা করেছেন। তার মধ্যে হলেন অজয় সেনগুপ্তের কথায়, আলো নিভে গেলো। চলে গেলেন চলচ্চিত্রকার তরুণ মজুমদার। ৯২ বছর বয়সে। নক্ষত্র পতন। ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৪০ বছরের পরিচয়। বহু মহৎ চলচ্চিত্রের শুধু স্রষ্টা নয়, সিনেমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা,তাঁর নিষ্ঠা ছিল অপরিসীম।১৯৮৯ সাল থেকে ২০০৪/২০০৫ সাল পর্যন্ত ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত প্রতিটি সেমিনারে,আলোচনাচক্রে অথবা খোলামঞ্চে তর্ক বিতর্কে তাঁর ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। কখনো বক্তা হিসেবে, আর বেশীরভাগ সময়ে শুধু শ্রোতা হিসেবে। সারাজীবন ব্যাপি তাঁর উপদেশ আমাদের সম্মৃদ্ধ করেছে। সেই মানুষটি চলে গেলেন। মর্মাহত, বিষন্ন।কথা বলার জায়গায় নেই। ওঁর স্মৃতিতে বিনীত প্রণাম। সমবেদনা জানাচ্ছি ওঁর পরিজনকে আর অসখ্য গুনমুগ্ধ অনুরাগী ও ভক্তদের।
সদ্য প্রয়াত বর্ষীয়ান পরিচালকের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুতে কোন আড়ম্বর চাননি।তাই তিনি এসএসকেএম হাসপাতালে মরদেহ দান করে গেছেন। আবার রবীন্দ্রসদন কিংবা নন্দনে যেন তাঁর মর দেহ নিয়ে যাওয়া না হয় সেটাও তিনি চাননি। শুধুমাত্র এটিওয়ান স্টুডিওতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে সেখানেই তাঁকে ফুল বিহীন শ্রদ্ধা জানাবেন অনুরাগীরা।তবে সৃষ্টি কর্তার মৃত্যু হয়।জাগতিক নিয়মে মৃত্যু হয় শরীরের।তবে তিনি যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবেন কালজয়ী অমর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। যতদিন বাংলা সিনেমা জগৎ বেঁচে থাকবে, ততদিন তিনি আলোচিত হতে থাকবেন।তাঁকে নিয়ে চলবে তর্ক বিতর্ক আলোচনা ও গবেষণ।

 

বটু কৃষ্ণ হালদার
কবরডাঙ্গা,কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top