সিডনী রবিবার, ৯ই মে ২০২১, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৮


যে সকল কাজ থেকে বিরত থাকবেন রোজাদারেরা


প্রকাশিত:
১ মে ২০২০ ১৩:৫২

আপডেট:
১ মে ২০২০ ১৪:৩৮

 

প্রভাত ফেরী:  রমজান। মুমিন মুসলমানের ক্ষমার মাস। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানুল মোবারক আল্লাহর বিশেষ করুণা ও দয়ার অপার সুযোগ এবং সমাজের পাপী-তাপী সব মানুষের জন্য এক অনাবিল শান্তি ও চিরস্থায়ী মুক্তির দিশারি। এর কল্যাণ ও প্রতিদান অপরিসীম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ বলেন, বনি আদমের প্রত্যেক আমলের সওয়াব দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। তবে রোজা ব্যতীত। কারণ, বান্দা রোজা আমার জন্যেই পালন করে, তাই আমি নিজে এর প্রতিদান দেব।’

(মুসলিম : ১৫৮)।

রোজার বিশেষত্ব হচ্ছে, তাতে রিয়া বা লোক দেখানোর সম্ভাবনা নেই। প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিও রোজা রেখে একান্ত গোপনে পানি পান করার চিন্তা করে না। তাই রোজাকে বলা হয় তাকওয়ার সিঁড়ি। রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানবমনে তাকওয়া বা খোদাভীতি সৃষ্টি করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’

(সুরা বাকারা : ১৮৩)

রোজার মাধ্যমে তাকওয়া সৃষ্টি হয় এভাবে যে, রোজা মানুষের পশুবৃত্তিকে থেতিয়ে দেয়। কেননা, মানুষ যখন ক্ষুধার্ত থাকে, তখন তার পাশবিক চাহিদা পিষে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা প্রবৃত্তি দমনের উত্তম উপায়।’ এ কারণেই যেসব যুবক আর্থিক অসচ্ছলতার দরুণ বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না কিন্তু নিজেকে পাপ থেকে সংযতও করতে পারছে না, নবীজি (সা.) তাদেরকে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

রোজা অবস্থায় মানুষের পেট ও যৌন চাহিদা নিবৃত্ত হয়। আর এ দুটি অঙ্গ দ্বারা অধিকাংশ পাপ সংঘটিত হয়। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে পাপের এই অঙ্গদ্বয়কে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু অন্যান্য অঙ্গকে পাপ থেকে নিবৃত্ত না রাখলে রোজা পরিপূর্ণ হবে না এবং তার পূর্ণ সওয়াবও পাওয়া যাবে না। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, ‘শুধু পানাহার পরিত্যাগের নাম রোজা নয়। বরং প্রকৃত রোজা হচ্ছে, রোজা রেখে অনর্থক কথা ও গুনাহ পরিহার করা। যদি তোমাকে কেউ গালি দেয় কিংবা ঝগড়া করতে চায়, তখন বল, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ (ইবনে খুজাইমা : ২৪২)

রোজা কেবল উপোস থাকার নাম না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘কতক রোজাদারের সারা দিন উপোস থাকা ছাড়া আর কোনো লাভ হয় না এবং অনেক রাতের নামাজ আদায়কারীর জাগ্রত থাকা ভিন্ন কোনো ফায়দা হয় না।’ (নাসায়ি : ৩২৩৯)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ তা ফেঁড়ে ফেলা না হবে। জনৈক সাহাবি জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল! রোজা আবার কীভাবে করে ফেঁড়ে যায়? তিনি বললেন, মিথ্যা এবং গীবত দ্বারা।’ এসব হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, রোজা রেখে যাবতীয় পাপকর্ম বর্জন করলে, রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হবে।

এই কারণে ওলামায়ে কেরাম বলেন, রোজাকে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করতে হলে ছয়টি কাজ করতে হবে। তা হলো-

চোখের হেফাজত : চোখের দৃষ্টি পাপের প্রথম ধাপ। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘কুদৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহ থেকে একটি তীর।’ (কানজুল উম্মাল : ১৩০৬৮)। এ তীর সরাসরি অন্তরে আঘাত করে। ফলে অন্তরে তাকওয়ার প্রদীপ জ্বলে না। অতএব, রোজাকে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করতে রমজান মাসে নাচ-গান, ফিল্ম, সিনেমা ও গায়রে মাহরাম নারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

জবানের হেফাজত : জবানের হেফাজত সর্বাস্থায় জরুরি। তবে রোজা অবস্থায় এর গুরুত্ব আরও বেশি। কেননা রাসুল (সা.) রোজাদারকে অশ্লীল বাক্যালাপ, গালি-গালাজ, মিথ্যা, গীবত ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। কতক আলেমের মতে রোজা অবস্থায় মিথ্যা ও গীবত করার দ্বারা রোজা নষ্ট হয়ে যায়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্থায় মিথ্যা বলল কিংবা গালাগালি করল তার রোজার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (নাসায়ি : ৩২৪৭)

কানের হেফাজত : যেসব কথা মুখে উচ্চারণ করা নাজায়েজ, তা শ্রবণ করাও নাজায়েজ। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘গীবত যে করে এবং যে শোনে উভয়ে সমান পাপী।’ সুতরাং রোজা অবস্থায় গান-বাজনা, গীবত-পরনিন্দা, ইত্যাদি শ্রবণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাজত : আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি অঙ্গই মানুষের জন্যে অমূল্য নেয়ামত। তিনি মানুষকে তা দান করেছেন সঠিক পথে ব্যবহার করার জন্য। যদি অঙ্গ দিয়ে আল্লাহর নাফরমানি করা হয়, তবে রোজ কেয়ামতে সে অঙ্গ ওই ব্যক্তির বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা যখন জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে, তখন তাদের কান, চক্ষু ও ত্বক তাদের কর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা হা-মিম সেজদা : ২০)

খাদ্য গ্রহণে সংযম : অতিভোজন পশুর স্বভাব। রোজার উদ্দেশ্য পশু প্রবৃত্তি দমন করা। বুযুর্গানেদ্বীন প্রবৃত্তির সঙ্গে মুজাহাদার জন্য কম খাওয়ার কথা বলে থাকেন। বর্তমানে ডাক্তাররা দেহের সুস্থতার জন্য কম খাওয়ার পরামর্শ দেন। একজন স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষকের মতে রমজান মাসে বেশি খেলে লাভের চেয়ে শারীরিকভাবে ক্ষতিই বেশি হয়।

আল্লাহর ভয় আশা রাখা : যেকোনো ইবাদত আদায় করে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হওয়ার আশা রাখা এবং ভয় রাখা। রোজাদারের দিন কাটবে আল্লাহর আজাবের ভয় এবং রহমতের আশার মধ্য দিয়ে। আর রাত কাটবে নামাজ, দোয়া ও কান্নাকাটির মধ্য দিয়ে। তাহলে রমজানের সওয়াব, বরকত ও রহমত পূর্ণভাবে পাওয়া যাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন।


বিষয়: রমজান


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top