সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭


এক পবিত্র উৎসব : শিবব্রত গুহ


প্রকাশিত:
৩ আগস্ট ২০২০ ১৬:১২

আপডেট:
৩ আগস্ট ২০২০ ১৭:২৩

 

ভারতবর্ষে অনেক উৎসব মহাধুমধাম সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। তার মধ্যে একটি উৎসবের নাম হল রাখীবন্ধন উৎসব। এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে প্রতি বছর, হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে। এই পূর্ণিমাকে বলে রাখীপূর্ণিমা।

এই উৎসব পালন করে হিন্দু , জৈন ও শিখেরা আনন্দের সাথে। এই উৎসব ভাই বোনের পবিত্র সম্পর্ক রক্ষা করার। এদিন, দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এই রাখী হল ভাই বা দাদার প্রতি দিদি বা বোনের ভালোবাসার প্রতীক। এই রাখী হল দিদি বা বোনকে ভাই বা দাদার আজীবন রক্ষা করার শপথের প্রতীকস্বরূপ।

এই উৎসবে ভাই বোন পরস্পরকে মিষ্টি খাওয়ায়। ভাইবোন ছাড়াও জ্ঞাতি ভাইবোন ও অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যেও, এই উৎসব প্রচলিত আছে। অনাত্মীয় ছেলেকেও দাদা বা ভাই মনে করে রাখী পরানোর রয়েছে রেওয়াজ।

আমাদের পুরাণে রাখীবন্ধনের কাহিনী আছে। এবার সে বিষয়ে আমি আপনাদের সামনে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। মহাভারতে আছে, এক যুদ্ধে, ভগবান কৃষ্ণ - এর কবজিতে, আঘাত লেগে, রক্তপাত শুরু হয়েছিল, তাই দেখে দ্রৌপদী, তাঁর শাড়ীর আঁচল, কিছুটা ছিঁড়ে, কৃষ্ণ - এর হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। তাই দেখে, শ্রীকৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে মেনে নিয়েছিলেন।

তিনি তখন দ্রৌপদীকে দিয়েছিলেন প্রতিশ্রুতি, তিনি এর প্রতিদান দেবেন। এর অনেক বছর পরে, যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে গিয়েছিল দুঃশাসন, ঠিক সেই সময়, সবার অলক্ষ্যে থেকে, তিনি দ্রৌপদীর সন্মান রক্ষা করে, এর প্রতিদান দিয়েছিলেন। এভাবেই রাখীবন্ধনের প্রচলন হয়।

ইতিহাসেও রাখীবন্ধনের উদাহরণ রয়েছে অনেক। এক কিংবদন্তী অনুযায়ী, ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, বীর
আলেকজান্ডার, ভারত আক্রমণ করলে, আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুকে, একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে, তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, আলেকজান্ডারের ক্ষতি না করার জন্য। বীর পুরু কিন্তু সেই কথা রেখেছিলেন।

তিনি সেই রাখীকে দিয়েছিলেন সন্মান। যুদ্ধক্ষেত্রে, তিনি নিজে আলেকজান্ডারকে করেননি কোন আঘাত। এক জনপ্রিয় গল্প অনুযায়ী, চিতোরের রানী কর্ণবতী, ১৫৩৫ সালে, মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে, একটা রাখী পাঠিয়েছিলেন। গুজরাতের সুলতান চিতোর আক্রমণ করলে, বিধবা রানী কর্ণবতী অসহায় বোধ করছিলেন। তিনি হুমায়ুনকে একটি রাখী পাঠিয়ে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।

কর্ণবতীর রাখী পাঠানোতে, আনন্দে অভিভূত হয়ে যান, হুমায়ুন। তিনি চিতোর রক্ষা করার জন্য, সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। তবে, দুঃখের বিষয়, এই যে, হুমায়ুনের সেনা পাঠাতে হয়েছিল দেরী। বাহাদুর শাহ রানীর দুর্গ করেছিলেন জয়। শোনা যায়, বাহাদুর শাহের হাত থেকে নিজের মান সম্ভ্রম বাঁচাতে, ১৫৩৫ সালের ৮ই মার্চ, রানী কর্ণবতী, তেরো হাজার নারীকে নিয়ে পালন করেছিলেন জহর ব্রত। তাঁরা আগুনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
চিতোর পৌঁছে, হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে দুর্গ থেকে উৎখাত করেছিলেন। তিনি কর্ণবতীর ছেলে বিক্রমজিৎ সিংকে বসিয়েছিলেন সিংহাসনে।

১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ করার জন্য, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখী বন্ধন উৎসব করেছিলেন পালন। তিনি কোলকাতা, ঢাকা ও সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু, মুসলিম ভাই বোনকে আহ্বান করেছিলেন, হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে একতার উৎসব রাখীবন্ধন পালন করার জন্য।

সেই সময় সারা দেশে, ধর্মীয় বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছিল। ১৯০৫ সালের জুন মাসে, লর্ড কার্জন, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গভঙ্গের। ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসে, আইন পাশ হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের। এই কালা আইন কার্যকরী হয়েছিল ১৯০৫ সালের ১৬ ই অক্টোবর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, এই রাখীবন্ধন উৎসব পরিবর্তিত হয়েছিল হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উৎসবে। যা ছিল সত্যিই অপূর্ব।
বঙ্গভঙ্গ রদ করার পেছনে অনেক অনেক অবদান ছিল একদিকে যেমন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, অন্যদিকে ঠিক তেমনই এই হিন্দু মুসলিম রাখীবন্ধন উৎসবের। তাই, রাখীবন্ধন হল এক পবিত্র উৎসব, সত্যিই এক
পবিত্র উৎসবই বটে, একথা বলাই যায়।

( তথ্য সংগৃহীত)

শিবব্রত গুহ
কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top