সিডনী বুধবার, ২৭শে মে ২০২০, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

নীলকন্ঠ মন্দির, হৃষিকেশ : সম্বুদ্ধ সান্যাল


প্রকাশিত:
৬ মে ২০২০ ১৫:২২

আপডেট:
২৭ মে ২০২০ ১১:৩১

ছবি- সংগ্রহীত

 

তা এক তুলকালাম কান্ডই বটে। রত্নাকর সমুদ্রকে মিক্সার গ্রাইন্ডারের মধ্যে ফেলে ফুলস্পীডে ঘোরানো কি চাট্টিখানি কথা! সেই সত্যযুগে, যখন মিক্সার গ্রাইন্ডারের আমল আসেনি, তখন মন্দার নামের এক খাড়া পর্বতকে দেবতা আর অসুরেরা মিলে ক্ষীরসমুদ্রের মধ্যে কূর্ম, অর্থাৎ কচ্ছপের শক্তপোক্ত ও মসৃণ খোলের উপর বসিয়ে অনন্তনাগ বাসুকীকে পেঁচিয়ে সবে মিলে কী কান্ডটাই না বাধিয়েছিল তা বোধ হয় অনেকেরই জানা। না জানলে সহজ ভাষায় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখাও সহজে পড়ে নেওয়া যেতে পারে। আরো বেশী জানার ইচ্ছা থাকলে বিষ্ণুপুরাণ সমেত নানা পৌরাণিক কাহিনি খুঁজে দেখা যেতেও পারে। এখানে অবশ্য তার খানিক ছোট্ট করে উল্লেখ করে দিলাম।

পৌরাণিক যুগে দুর্বাসা ছিল এক বদমেজাজী ঋষি। পান থেকে চুন খসলেই তিনি বেজায় খাপ্পা হয়ে বসতেন যখন তখন। তা তিনি একদিন রাস্তা দিয়ে চলেছেন আপন মনে। সামনে হঠাৎ দেখেন দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর ঐরাবত হাতিতে চড়ে ভ্রমণে বেড়িয়েছেন। ঋষি রাজামশাইকে দেখে একখানা ফুলমালা উপহার দিলেন। দেবরাজও তা গ্রহণ করলেন সাদরে। এরপর তিনি সেই মালাটিকে তাঁর ঐরাবতের উপর রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। ঐরাবতও কম যায় না। রাজার হাতি বলে কথা, সেও তেমনি আমোদপ্রিয়। ফুলের মালাটিকে শুঁড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে তা পা দিয়ে আচ্ছা করে দলাই মলাই করে খানিক খেলাধূলা করে নিলো। দূর্বাসা মুনি অমনি এই দেখে খাপ্পা। অবলা হাতিকে কি আর বলে, যত রাগ গিয়ে পড়ল হাতির মালিকের উপর। লাল লাল চোখ আরো রাঙিয়ে তিনি অভিশাপ দিয়ে বসলেন, এই যে রাজার এত ঐরাবতী বাহার যে ধনসম্পদের জন্য, একদিন সেই ধনসম্পদের কিচ্ছুটি থাকবে না। রাজা লক্ষ্মীছাড়া হবে কিছুদিনের মধ্যেই। দুর্বাসা বলে কথা, তার অভিশাপ তো ফলবেই তা ইন্দ্রের বিলক্ষণ জানা। অমনি ঐরাবতের পিঠের থেকে নেমে ইন্দ্র দূর্বাসার হাতে পায়ে ধরে আর কি। অবলা প্রাণীটির এই হেন মতিভ্রমে তাঁর আর কি দোষ তা অনেক কষ্টে বোঝাতে দুর্বাসা খানিক বুঝলো বোধহয়। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়েই গেছে। একবার ছেড়ে দেওয়া অভিশাপ আর ফেরানোও যায় না। দুর্বাসা উপায় দিলো এই বিপর্যয়ের থেকে দেবকূলকে রক্ষা করতে পারেন একমাত্র শ্রী বিষ্ণুই। ততক্ষণে দেবকূল থেকে শ্রী লক্ষ্মী শাপের কবলে পড়ে বিদায় নিয়েছে সমুদ্রগর্ভে। অমন সোনার অলকাপুরী বিলকুল খাঁ খাঁ।

ওদিকে অসুরেরা সবসময়ই অপেক্ষায় থাকত স্বর্গরাজ্য দখলের জন্য। এই সুযোগ কি আর তারা ছাড়ে? লক্ষ্মীছাড়া দুর্বল দেবকূলকে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বর্গছাড়াও করে বসলো আচ্ছা করে ঠেঙিয়ে। তেত্রিশ কোটি ঘরছাড়া দেবতারা পড়লো মহা বিপদে। এই অবস্থা নিবারণের একমাত্র উপায় জানা ছিল কেবল দেবরাজ ইন্দ্রের। তিনি দেবতাদের নিয়ে সেই উপায়ের খোঁজে চললেন ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মাও চারমাথা চুলকে ভেবে দেখল শ্রী বিষ্ণুই একমাত্র এই বিপর্যয়ের অবসান ঘটাতে পারে। বিষ্ণু সব শুনে দেবতাদের বুদ্ধি বাৎলালো যে ক্ষীরসাগরকে যদি কোনোভাবে মন্থন করা যায়, তবে তার থেকে নির্গত হবে অমৃত, যা খেলে দেবতারা অমর হবে আর এই একমাত্র উপায় অসুরদের পরাজিত করার। সঙ্গে সমুদ্রের নীচ থেকে লক্ষ্মীকেও আবার স্বর্গে স্থাপন করা সম্ভব।

কিন্তু সাগর মন্থন তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। অতবড় সাগর মন্থনের দন্ড হিসেবে মন্দার পর্বতকে বাছা হলো। দড়ি হিসেবে নেওয়া হলো সর্পরাজ বাসুকীকে। মন্দার পর্বতকে ঠিকঠাক স্থাপন করতে একটি শক্তপোক্ত কিন্তু মসৃণ প্লাটফর্মের প্রয়োজন। বিষ্ণু সেই প্ল্যাটফর্ম তৈরী করলো এক কচ্ছপের রূপ ধরে, যাকে আমরা তাঁর কূর্মাবতার বলে জানি। কিন্তু এই মন্থন শুধুমাত্র দেবতাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তখনও আমেরিকা দেশ তৈরী হয়নি যে কেউ চট করে এর জন্য একটা মেশিন বানিয়ে দেবে। তাই অগত্যা অসুরদের হাত ধরাই কর্তব্য। দেবরাজ ইন্দ্র ছিলেন যত কূটবুদ্ধির জনক। অসুরদের ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে অমরত্বের লোভ দেখিয়ে সাদা পতাকা সমেত একটা মিটিং ডাকলেন দুই দল মিলে। অসুরদের শক্তি থাকলেও বুদ্ধি ছিল বেশ কমতির দিকেই। অমরত্বের লোভে পড়ে তারাও রাজী হয়ে গেল মন্থনে। বাসুকীর মাথার দিকের দায়িত্ব পেল অসুরেরা, আর ল্যাজার দিক পাকড়ালো দেবতারা। হাজার বছর ধরে চললো সে মন্থন।

মন্থনের প্রথমেই নাগরাজ বাসুকীর সাঙ্ঘাতিক বিষের প্রভাব বেড়িয়ে এসে এক ধোঁয়ার মেঘের সৃষ্টি করলো চার দিকে। বিষের প্রভাবে অসুরেরা মারাও পড়তে লাগলো। দেবতারা এই দেখে খুশি হলেও খানিক পরে বুঝতে পারলো তা ত্রিভূবনের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত পদার্থ। এর ফলে তাদের জীবনদীপও নিভবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। হলাহল নামের এই বিষ তিন লোকের কোথাও নিরাপদে রাখার স্থান নেই। সবারই তখন মাথায় হাত।

ইতিমধ্যে শিবঠাকুর এসবের থেকে দূরে তাঁর তুরীয় জগতে অবস্থান করছেন। দেবতারা ভেবে দেখল এই দুর্গতির থেকে এই আধ পাগলা দেবই একমাত্র রক্ষা করতে পারে। তারা নানা ছলে শিবকে বোঝাতে লাগলো সমুদ্র মন্থনের থেকে শিবঠাকুরের কি চাই। শিব ঠাকুর আপনভোলা। তিনিও ঘোরের মধ্যে বলে বসলেন সবাই যা ত্যাগ করবে, তাই তিনি নিজের জন্য রাখবেন। ব্যাস, দেবতারাও নিশ্চিন্ত, এমন জনকেই গছানো যায় হলাহল বিষ। এরপর সমস্ত শুনে শিব দেখলেন তিনি কথা দিয়ে দিয়েছেন, তাই এই বিষ তাঁরই প্রাপ্য। কিন্তু এই বিষের প্রভাবে তাঁর মৃত্যুও অবশ্যম্ভাবী। অগত্যা তিনি তিন দুনিয়ার রক্ষার্থে নিজের শরীরে তা ধারণ করতে পান করতে লাগলেন হলাহল। এই সময় তাঁর স্ত্রী পার্বতী স্বামীকে বাঁচাতে তাঁর গলা টিপে ধরলেন যাতে বিষ তাঁর পাকস্থলীতে না পৌঁছয়। বিষ আটকে রইল মহাদের কন্ঠে। বিষের প্রভাবে তাঁর কন্ঠ হয়ে পড়ল নীল। সেই থেকে মহাদেবের আরেক নাম হলো নীলকন্ঠ।

কিন্তু সেই বিষের জ্বালা এমন সাঙ্ঘাতিক যে মহাদেব ত্রিভুবন জুড়ে ছটফট করতে করতে ছুটে বেড়াতে লাগলেন। শেষে হিমালয়ের কোনো এক স্থানে তিনি পড়ে রইলেন। ওদিকে দেবাসুর মিলে চলল সমুদ্র মন্থন পর্ব।

এবার ফিরে আসি কলিযুগের ২০০৮ সালে। আমি আমার পরিবার ও পারিবারিক বন্ধুদের নিয়ে চলেছি হরিদ্বারে। সেখান থেকে ঋষিকেষ। ঋষিকেষে গঙ্গার ধারে এক সাধুসঙ্গে ক্রমে জানতে পারলাম সেখানকার সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করছে নীলকন্ঠ মন্দির। তার সঙ্গে আরো দুটি মন্দির হনুমানের ও পার্বতীর। শিবপার্বতীর মন্দিরের সাথে হনুমানের সম্পর্কে বড়ই কৌতূহল জাগল। পরদিন সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম আমি ও আমার এক বন্ধু। পরের দিন কোনো কারণবশত বন্ধুটির যাওয়ায় বিঘ্ন ঘটায় শেষে একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই প্রসঙ্গে হরিদ্বারের হোটেল থেকে বেড়োতে খানিক দেরিই হয়ে গেছিল। রামঝোলায় এসে শুনলাম নীলকন্ঠ মন্দিরে যাওয়ার পক্ষে বড়ই দেরি করে ফেলেছি। সমস্ত ট্যুরিস্টদের নিয়ে সব গাড়িগুলি উঠে গেছে উপরে। সাধারণত ট্যুরিস্টরা গাড়িতে উপরে উঠে পুজো দিয়ে অন্য পথে ১২ কিমি হেঁটে নেমে আসে সন্ধ্যার আগেই। আর কোনো উপায় নেই উপরে যাওয়ার। তখন এদিক ওদিক টুকটাক ট্রেক করে ফেলেছি কিছু। সঙ্গে এমন এক ইতিহাসের সন্ধান। পরের দিনই আমরা চলে যাব দেরাদুনের দিকে। আবার কবে আসা হবে এখানে তার কোনো ঠিক নেই। তাই চটজলদি সিদ্ধান্ত নিলাম একা হেঁটেই উঠব নীলকন্ঠ মন্দিরে। সঙ্গী কেবল সোনি এরিকসন w550i আর আমার ক্যানন ডিজিটাল ৫ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা।

 

 

প্রথমে উৎসাহবশেই দুখানি পেল্লায় সামোসাহস্তে হাঁটা শুরু করলাম। তখন প্রায় বেলা এগারোটা। সবুজ প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তার উপর দিয়ে। পথ বেশ খাড়া। পথের পাশের জঙ্গলে সাধুবাবারা গেরুয়া টেন্ট খাটিয়ে আখড়া বানিয়েছে বেশ। তাই দেখতে দেখতে চলেছি নিজের আনন্দে। তিন কিলোমিটার যেতেই বুঝলাম কষ্ট কাকে বলে খাড়া চড়াই ভাঙার। একখানা বাঁধানো চাতালের উপর দেখি দিল্লির কিছু ছেলে চিৎপাত। পানি পানি রবে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমার অবস্থা অবশ্য তাদের মতো না হলেও বেশ খানিক করুণ। পথে নিম্বুপানি বিক্রি হচ্ছে অবশ্য গ্লাসে করে। দিল্লির ছেলেগুলোর ‘মাত যাও’ বাণী উপেক্ষা করেই এগোতে লাগলাম। মনে হতে লাগলো একবারই এই সুযোগ এক নতুন পৌরাণিক ইতিহাস জানার। আরো এক কিলোমিটার এগিয়ে আমার অবস্থাও তখন বেশ সঙ্গীন। এক চায়ের দোকানে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে এক ভাঁড় চা হাতে সিদ্ধান্ত নেব নেব করছি নীচে নেমে আসার। পাশে এক সাধুবাবা বসে চা খাচ্ছেন আর আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছেন। তিনি যথেষ্টই বুঝতে পেরেছেন আমার হাল। এমনিতেই তখনও পর্যন্ত সাধুসঙ্গে আমার যথেষ্ট ভক্তি নেই। তাই তাঁর উপেক্ষায় বেশ রাগই হলো। ভাবলাম আরো খানিক এগিয়ে দেখি। না পারলে নেমেই আসব। সাধুবাবাটি উঠে পড়লেন আমার আগেই। সঙ্গে সেই দোকান থেকে কিছু চীনেবাদামও কিনে নিলেন। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে আবার সেই মিটিমিটি হাসি। গা জ্বলে গেল আমার। চায়ের গ্লাসটা ফাঁকা করে জেদের বসে খানিক পরে আমিও উঠে পড়লাম। প্রায় পঞ্চাশ মিটার আগে সাধুজি চলেছেন, আর সেই ফাঁকা রাস্তায় ক্যামেরা মোবাইল আঁকড়ে আমি। মধ্যে মধ্যে রাস্তার মাঝে তিনি উধাও হয়ে যাচ্ছেন, আবার খানিক বাদে তাঁর দেখা পাওয়া যাচ্ছে। এক সময় তিনি নজরের বাইরে চলে গেলেন। আমার অবস্থাও ততক্ষণে শোচনীয়। ধুঁকতে ধুঁকতে একটা বাঁক নিয়েছি কি দেখি সাধুজি ফাঁকা একটি জায়গায় এক মুঠো চিনেবাদাম হাতে ‘আও আও’ বলে হাঁক পাড়ছেন। বিশ্রামের জন্য আমি একটা পাথরের উপর বসে তার কীর্তিকলাপ দেখতে লাগলাম।

যারপরনাই অবাক করে চারিদিক থেকে প্রায় পঞ্চাশটি বাঁদরের আবির্ভাব হলো নিমেষে। তারা সাধুবাবাকে ঘিরে আছে। সাধুজি প্রত্যেককে সামান্য বাদাম বের করে দিচ্ছে প্যাকেট থেকে। অবিশ্বাস্য লাগলো যখন দেখলাম প্রত্যেকটি বাঁদর বাদাম নেওয়ার সাথে সাথেই তা মাথায় ঠেকিয়ে পেটে চালান করছে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য আমার কাছে। অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম গোটা প্যাকেটটা এইভাবে তিনি বিলিয়ে দিলেন বাঁদরদের মধ্যে। এরপর তিনি এগিয়ে যেতে লাগলেন। আমারও ততক্ষণে খানিক জিরোনো হয়ে গেছে। সাধুজির প্রতি কৌতূহলবশত আমিও এগোতে লাগলাম তাঁর নজরের আড়ালে। তখনও ক্যামেরা আর মোবাইলের প্রতি প্রেমে তাঁর সাথে কথা বলার ঝুঁকি নিতে পারছি না। এমনিতেই ফাঁকা রাস্তা, কখন যে কি হয়ে যায় বিদেশ বিভুঁইয়ে তারই বা গ্যারান্টি দিচ্ছে কে!

মস্ত মস্ত গাছ, আর সবুজের মধ্যে দিয়ে আরো খানিকটা এগোনোর পর দেখতে পেলাম উপর থেকে এক দল ছেলে নেমে আসছে আমাদের দিকে। সাধুজিকে দেখে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, “বাবাজি, চপ্পল ফাঁড় গ্যয়া। আপনা চপ্পল দে দো না।” বলাও সারা, বাবাজি দেখি তাঁর চপ্পল খুলে এগিয়ে দিলো ছেলেটির দিকে। ছেলেটিও বেজায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। এমনটা যে হবে তার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না মোটেই। সে মজা করে বলেছিল স্বীকার করল বাবাজির কাছে। বাবাজি চপ্পলহীন হয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। ছেলেগুলোর তখন বিবেক জেগে উঠেছে। বাবাজির পিছনে তাঁকে অনুরোধ করতে করতে ধাওয়া করেছে চপ্পল ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। যতবারই তাঁকে অনুরোধ করে, ততবারই তিনি বলেন, “ম্যায় সাধু হুঁ। সবকুছ দুসরোঁ কে লিয়ে ছোড় চুকা হুঁ। এক চপ্পল মে ক্যায়া রাকখা হ্যায়। ইয়ে তুমহারে জরুরত হ্যায় আভি। তো মুঝে ছোড়নাহি পড়া।” পরপর দুটি কান্ড দেখে আমিও অবাক। ছেলেগুলি তাঁর হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করে, বাবাজি কেবল বলেন, “আমি তো আরেকটা চপ্পল পেয়ে যাব। নিশ্চয়ই কেউ কোথাও একটি চপ্পল রেখে যাবে আমার জন্য। লেকিন বেটা, আভি ইয়ে তুমহারে জরুরত হ্যায়।” অনেক চেষ্টায় ছেলেগুলি নিরাশ হয়ে এগোতে লাগল নীচের দিকে। আসার পথে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় বললো, “ইয়ে জরুর কোই যোগীবাবা হ্যায়।”

আমার ততক্ষণে তাঁর কান্ডগুলি দেখে বেশ ভক্তি জেগে গেছে। সাহস করে এগিয়ে গেলাম তাঁর কাছে। যাত্রায় তখন আমার মুখে ক্লান্তির ছাপ। অর্ধেক পথও শেষ হয়নি। বাবাজি আমার অবস্থা দেখে পাহাড়ের পাশে একটি পাথরে খানিক বসার পরামর্শ দিলেন। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। বাবাজি নিজের ব্যাগের থেকে একটি জলের বোতল বের করলেন। পথে নিম্বুপানি পাওয়া যায় শুনে আমিও আর জলের বোতল কিনিনি। বোতলের থেকে মাত্র একটি ঢোক জল খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। আমি বেশ খানিকটা খেয়ে ফেললাম। বাবাজি বকা দিলেন। বললেন চলার পথে তেষ্টা পেলে যেন এক ঢোকই জল খাই, তার বেশি নয়। নিম্বু পানি পেলে তবেই সেখানে বসে এক গ্লাস খেয়ে খানিক জিরিয়ে তার পর আবার চলো। এরপর বলতে শুরু করলেন মনের জোরেই শুধু পাহাড়ে চড়া যায় না। কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো অবশ্যই মানতে হবে চড়াইয়ে উঠতে গেলে। জিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সেগুলি সম্পর্কে সচেতন করতে লাগলেন। একসময় উঠে পড়ে আমাকেও জোর করে তুললেন। বললেন আমাকে সেই চায়ের দোকানে দেখেই তিনি মনে করেছিলেন আমি পারব না। আমি বললাম তাহলে কি নীচে নেমে যাব। উনি তাঁর কথামতো সঙ্গে চলার উৎসাহ দিলেন। চলতে লাগলাম দুজনে।

প্রথমে সাধারণ ঘরোয়া কথাবার্তা দিয়ে শুরু করলেন। আমি অবাক হলাম যখন শুনলাম তাঁর নিজস্ব এক সংসার আছে হরিদ্বারে। তিনি বছরে তিন মাস তাঁর পরিবারের জন্য ব্যয় করেন। বাকি নয় মাস সারা ভারতের এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান। রাতে থাকার জন্য সর্বত্রই কোনো না কোনো ব্যাবস্থা হয়ে যায়, সঙ্গে খাবারও। সাধুজির চেহারা শ্যামবর্ণ, কিন্তু তারমধ্যেই বেশ একটা জেল্লা আছে। তাঁর নিজের একখানি ছেলেও আছে যে দেরাদুনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। স্ত্রী একাই থাকেন বাড়িতে। জমিজমাও আছে কিছু। তিনি তিনমাস সেই জমিগুলির দেখাশোনা করে যান। তার থেকেই অর্থসংস্থান হয় তাঁদের। ইতিমধ্যে আমি একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না, তিনি সংসারে থেকেও সাধু হলেন কেন। তিনি জানালেন মানব জাতির সেবা করতে। সারা ভারতে নানা আশ্রমে তিনি ঘুরে বেড়ান, অনেক সময় কিছু অর্থ সংস্থান হয়ে যায় নানা ভক্তের মাধ্যমে। বছরের শেষে যখন বাড়ি ফেরেন, তখন কোনো আশ্রমে তা দান করে দেন। এইভাবে এক বছরে সর্বোচ্চ আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত তিনি দান করেছেন যার সম্পূর্ণটাই ভক্তদের থেকে পাওয়া। স্থানটি গুজরাট।

যাত্রার শুরুতে তিনি প্রথম এক মাস থাকেন নীলকন্ঠ আশ্রমের পাশের এক গ্রামে। সেখানে বাচ্চাদের তিনি পড়াশোনা শেখান সময় কাটাতে। এরমধ্যে মাত্র একবারই তিনটি মন্দির পরপর দর্শন করেন। তবে আজ আমার জন্য তিনি মন্দিরে প্রবেশ করবেন। ইতিমধ্যে হঠাতই বলে উঠলেন আমরা আট কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এসেছি। শুনে চমকে উঠলাম। অতটা খাড়া পথে ইতিমধ্যে আমি একটুও হাঁপাইনি বা একবারও তেষ্টা পায়নি। প্রশ্ন করলাম আর কতটা পথ বাকি আছে। তিনি উত্তর দিলেন, “যবতক তুমহারা শ্বাস চল রাহা হ্যায়, উতনা হি রাস্তা চলনা আভি বাকি হ্যায়। রাস্তার কোনো শেষ নেই। এই মন্দির তোমার শেষযাত্রা নয়। এই জীবনের পথ ততক্ষণ চলবে, যতক্ষণ তোমার শ্বাস চলছে। মন্দির তোমার আরো এক জিরোনোর জায়গা। সেখান থেকে তুমি হোটেলে গিয়ে আবার জিরোবে। ঘোরার শেষে বাড়িতেও তুমি জিরোবে। তোমার পথ শেষ হবে চিতায়।” অবাক হয়ে শুনলাম তাঁর কথাগুলো। এখনও আমি বিশ্বাস করি প্রতিটা সেকেন্ডে পথ চলছি এক মহানির্বানের উদ্দেশ্যে।

এই প্রসঙ্গে নীলকন্ঠ মন্দিরের ইতিহাস উঠে আসলো। সাধুজি জানালেন বিষপানের পর মহাদেব পাগলের মতো ত্রিভুবন ছুটে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন ঠিক এই স্থানে। পার্বতী শিবের কোনো খোঁজ না পেয়ে হনুমানকে পাঠান তাঁর খোঁজ করতে। হনুমান সারা বিশ্ব ঘুরে তাঁকে খুঁজে পান ঠিক এই জায়গায়। অচৈতন্য মহাদেবকে দেখে ভয় পেয়ে পার্বতীকে খবর দেন তাঁকে বাঁচানোর জন্য এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসেন সেখানে। অনেকেই দেখে থাকবে শিশুরূপী মহেশ্বরকে মাতৃরূপী পার্বতী তাঁর স্তন্যপান করাচ্ছেন। চিত্রটির অর্থ হলো কখনও কখনও পত্নী পতির মাতৃরূপী এবং মাতৃস্তন্য সর্ববিষহন্তারক।

আমি নিবিষ্ট হয়ে শুনতে শুনতে এগোচ্ছিলাম তাঁর সাথে। কত কত জীবন বিষয়ক আলোচনা, তার সবটা এখানে আলোচনা করতে পারলাম না। তবে আজও তাঁর প্রত্যেকটি কথা স্মরণে রেখে জীবনের পথে এগিয়ে চলেছি আর্থিক কোনো উদ্দেশ্য না রেখে। প্রয়োজনটুকু মেটানোর জন্য জীবিকা নির্বাহ করে চলেছি নানা বন্ধুর অবন্ধুর পথ পেরিয়ে। নানা বাধা এসেছে জীবনে, স্মরণ করে চলেছি তাঁর কথাগুলো। বন্ধুর পথ একসময় শেষ হয়ে গেছে, আবারও এসেছে। কিন্তু কথাগুলো আজও অমলিন রয়েছে হৃদয়ে।

এক সময় এসে পৌঁছলাম মন্দির সংলগ্ন গ্রামে। সেখানকার ছোট বাচ্চারা সাধুজিকে দেখে হৈ হৈ করে ছুটে আসলো। আমাদের নিয়ে যেতে চাইল তাদের গ্রামে। সাধুজি মানা করল তাদের। তখন প্রায় বিকেল গড়িয়ে এসেছে। নীলকন্ঠ মন্দিরের পেছনে এক রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখতে পেলাম, জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত তার অবস্থা। গ্রামের এক পাশ দিয়ে একটি পথ চলে গেছে পার্বতী মন্দিরের দিকে। দুজনে এসে পৌঁছলাম নীলকন্ঠের মন্দিরে। সাধুজি বললেন আমাকে গর্ভগৃহে নিয়ে যাবেন। কিন্তু আমার পার্থিব বস্তুগুলি নিয়ে সেখানে প্রবেশ নিষেধ। একটি গাছতলায় ক্যামেরা, মোবাইল, মানিব্যাগ ইত্যাদি রাখতে বললেন। একটি গেরুয়া কাপড় জোগার করে আনলেন কোত্থেকে। সেটি জড়িয়ে জামাকাপড়ও ছাড়তে বললেন। আমি খানিক সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম জিনিষগুলির জন্য। চারিদিকে এত লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে, যদি সেগুলো খোয়া যায়। তিনি আশ্বাস দিলেন ওগুলোর কিছু হবে না। তাঁর প্রতি ভরসা রেখে নেমে গেলাম গর্ভগৃহের উদ্দেশ্যে, যেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সাধুজিকে দেখে অবাধে প্রবেশ করতে দিলেন সেবায়েতরা। শিবরূপী এক প্রস্তরখন্ডের উপর মাথা ঠেকিয়ে ফিরে আসলাম খানিক বাদে। এসে দেখি আমার জিনিষগুলি তখনও একইভাবে বিরাজ করছে সেখানে। মন্দিরে প্রবেশের পর সেগুলোর চিন্তাতেই নিমগ্ন ছিলাম। ফেরত পেয়ে সাধুজির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি মুখে এক অর্থবহ হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। বললেন, “বেটা, তুম আব যাও। ম্যায় তো ইয়েহিঁ রহুঙ্গা আব। পাস মে হনুমান মন্দির দেখকে তুম নিচে উতর যাও জীপ লেকে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, এখন আর পার্বতী মন্দিরে তোমার যাওয়া হবে না। তবে আবার কখনও এসে একদিনে তিনটি মন্দিরই দর্শন করে যেও। নইলে তোমার অভিষ্ট কখনও পূরণ হবে না। তুম মেরে সাথী হো। আগলে বার তুম মুঝে ইয়েহিঁ গাও পর মিলোগে।”

আমি বললাম, “আমি তো এক সাংসারিক মানুষ, আপনার সাথী হলাম কি করে?”

তিনি জানালেন, “তিন কদম চলনেওয়ালা হর কোই সাথী বন যাতা হ্যায়, তুম তো মেরে সাথ আট কিলোমিটার চল চুকে হো। ইতনে দূর তক আজ ভি কোই মেরে সাথ নেহি চল পায়া।”

তাঁকে প্রণাম করে বিদায় জানিয়ে হাঁটা দিলাম হনুমান মন্দিরের উদ্দেশ্যে। মন্দিরের পাশে দেখলাম হনুমানের মস্ত পায়ের ছাপ। দূর থেকে দেখলাম পার্বতী মন্দিরের দিকে যাওয়ার রাস্তা। তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে প্রায়। মন খারাপ করে জিপ স্ট্যান্ডের দিকে ফিরে এলাম। জিপ ধরে নীচে নেমে এলাম।

আমি বরাবরই উল্টোপথের পথিক। আজও নিজের অভিষ্ট কখনও সম্পূর্ণ পূরণ হয়নি। সম্ভবত তিনটে মন্দির একদিনে না দেখার ফল। ভগবান আমি আজও বিশ্বাস করি না। কিন্তু পরমেশ্বরের শক্তিতে বিশ্বাস করি। হয়ত তেমনি কোনো শক্তি আমাকে আজও টানে নীলকন্ঠ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। সময়াভাবে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কখনও যাওয়ার ইচ্ছে আছে সম্পূর্ণ এক সন্ন্যাসীর বেশে। হরিদ্বারে লঙ্গরখানায় খাব, গঙ্গাপারে শোব, আর সম্পূর্ণ করব নীলকন্ঠ ভ্রমণ। হয়ত আবার দেখা হয়ে যাবে সেই সাধুজির সঙ্গে সেই গ্রামে। সম্পূর্ণ সাংসারিকও হতে পারিনি কখনও। আবার সন্ন্যাসীও হতে পারিনি সংসারের জন্য। এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে যায় প্রত্যেকটি কাজই।

হর হর মহাদেব...

 

সম্বুদ্ধ সান্যাল
বাদকুল্লা, নদীয়া
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top