সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

শিবঠাকুরের দেশে : ডঃ গৌতম সরকার


প্রকাশিত:
১০ অক্টোবর ২০২০ ১৭:০২

আপডেট:
১০ অক্টোবর ২০২০ ১৭:০৪

 

উখিমঠে আরেকদিন থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু পরেরদিন রিসর্ট পুরো বুকড, আমরা থাকতে থাকতেই পরবর্তী বোর্ডারদের আসা শুরু হয়ে গেল৷ ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যাবো; আজ আমাদের গন্তব্য চোপতা, তবে যাবার পথে ইচ্ছে দেওরিয়াতাল দেখে যাওয়া৷ উখিমঠ থেকে  চোপতার পথে ১২ কিলোমিটার এগিয়ে বাঁ দিকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে সারি গ্রাম; দেওরিয়াতালের ট্রেক এখান থেকেই শুরু হয়৷ ৩ কিলোমিটার ট্রেক, তবে মাথার ওপর গনগনে সূর্য্য গোটা পথেই অহরহ আগুন ঢালায় পথের কষ্ট বেশ কয়েকগুণ বেড়ে গেল৷ অন্যদিকে পাহাড়ের গা দিয়ে কৃত্রিম রাস্তা বানানো হয়েছে ফলে পথে কোনো গাছপালা নেই, চড়াইও যথেষ্ট৷ প্রায় দেড় কিলোমিটার ওঠার পর প্রথম ছাদওয়ালা একটা বসার জায়গা এলো৷ মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা শুরু, যত ওপরে উঠছি দমের ঘাটতি ঘটছে, বাতাসে অক্সিজেন কমছে আর  সাথে সাথে গতি আরো শ্লথ হচ্ছে৷

 

আরো কিছুটা উঠে আসা গেল;  একটা কথা বলা হয়নি- ট্রেক আমি একাই করছি, আমার সঙ্গিনীর একটা কার্তিকস্বামী ট্রেক করেই দম শেষ, সে নীচে একটা দোকানে বসে আছে৷ যত ওপরে উঠতে হচ্ছে মনে হচ্ছে - আর বোধহয় পারবো না, আসলে এই রোদটা বড় বেশি জ্বালাচ্ছে! যখন নিজের ওপর ভরসা, বিশ্বাস কমতে শুরু করেছে তখন প্রখর মরুতে মরুদ্যান দর্শনের মতো বেশ ওপরে একটা চালাঘর চোখে পড়ল৷ তুরীয় আনন্দে ঘসটাতে ঘসটাতে পৌঁছে একটা দোকান পেলাম৷ আমার সঙ্গে জল ছিল তাই শুধু বসেই একটু বিশ্রাম নিলাম; অনেকেই মিনারেল ওয়াটারে তেষ্টা মেটাচ্ছে, কেউ কেউ গুরাসের শরবত খাচ্ছে৷ দোকানদার মি. নেগি জানালেন -দেওরিয়াতাল এখান থেকে আধ কিলোমিটার, শুনে ধড়ে প্রাণ এলো৷ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নবোদ্দমে এগিয়ে চললাম, বহু ঘাম -দম ঝরিয়ে যখন জায়গাটায় গিয়ে পৌছলাম তখন সত্যি কথা বলছি – সমস্ত কষ্ট নিমেষের ফুৎকারে দূর হয়ে গেল -সামনে মনকাড়া সবুজ দূরত্বে ঘন তৃণভূমির বুকে শান্ত, কাকচক্ষু, টলটলে জলে ভরা 'দেওরিয়াতাল ', আর তার মাথার ওপর মুকুটের মতো শোভা পাচ্ছে - চৌখাম্বা, কেদারনাথ, ভাতৃঘুণ্টা, সুমেরুর শিখরচূড়া৷ সূর্য্যের অবস্থান বদল হয়েছে, সকালের মতো তালের জলে পর্বতচূড়াসমূহের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলামনা৷ কিন্তু যা পেলাম তা -জন্ম জন্মান্তরেও ভোলবার নয়৷ পরিষ্কার আকাশ, রজতশুভ্র পর্বতসমূহ, সবুজ মখমল বুগিয়াল আর শান্ত -সমাহিত দেওরিয়াতাল আমার চারিপাশে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করলো, যার রসাস্বাদন ওই এক ঘন্টায় কতটুকুই বা করতে পারলাম ! ইচ্ছে ছিল এখানে টেন্টে একটা রাত থেকে সূর্য্যাস্ত আর সূর্য্যোদয় দেখব ! কিন্তু হল কই !!!

যাই হোক -এটুকুই আমার প্রাপ্য, এটাই বা কম কি ! এটুকুই আমার পাওনা ছিল-

ভাবতে ভাবতে ফেরার পথ ধরলাম ৷

ছবিঃ লেখক ডঃ গৌতম সরকার

চোপতায় থাকার ব্যবস্থা কিন্তু খুব খারাপ৷ মূল চোপতায় যে কটা থাকার জায়গা আছে সেগুলোকে হোটেল না বলে খোঁয়াড় বললেই ভালো হয়৷ আমাদের সাথে সারি গ্রামে একটা বড় বাঙালি পর্যটকদলের দেখা হয়েছিল, তারা আগের রাতে চোপতা থেকে ৮-১০ কিমি দূরে ‘ম্যাগপাই জাঙ্গল ক্যাম্পে’ ছিল -খুব ভালো ব্যাবস্থা; কিন্তু আমার ইচ্ছা চোপতাতেই থাকা, তাহলে পরের দিন ভোর ভোর তুঙ্গনাথ আর চন্দ্রশিলা অভিযান শুরু করতে পারবো৷ চোপতা পৌঁছনোর ৫-৬ কিলোমিটার আগে দুগ্গলভিটায় কয়েকটা থাকার ব্যবস্থা আছে আর আছে ২-৩ কিলোমিটার আগে ‘অ্যালপাইন ইকো ক্যাম্প’৷  আমরা ওইসব জায়গা পেরিয়ে চোপতায় পৌছলাম, দুয়েকটা হোটেল দেখে পছন্দ হলোনা, অগত্যা আরো দু কিলোমিটার উজিয়ে  একটা মন্দের ভালো হোটেলের দেখা পেলাম -যার ভালোর দিকে পাল্লা বেশ হালকা, তবু ওই আর কি ! একটা আপাত পরিষ্কার ঘর আর একটা বাথরুম৷ চোপতা সম্পূর্ণভাবে সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল; সন্ধ্যে সাতটা থেকে রাত এগারোটা আর সকালে আপনার প্রয়োজনমতো দু ঘণ্টার জন্য আলো পাবেন৷ গিজারের কোনো প্রশ্নই ওঠেনা, এক বালতি গরম জল ৩০ টাকা; এসব বাদ দিলে অসম্ভব ভালো সার্ভিস আর ওদের সময়জ্ঞান সত্যিই মনে রাখার মতো৷

হোটেলে ঢুকে একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম, হোটেলটা  রাস্তা থেকে অনেকটা নীচে৷ তবে চড়াই ভেঙে মূল রাস্তায় উঠেই মনটা ভালো হয়ে গেল -মাখনের মতো মসৃণ -মোলায়েম কালো রাস্তা, সবুজ জঙ্গল আর বাদামী পাহাড়ের বুক চিরে সর্পিল গতিতে এগিয়ে গেছে৷ হোটেলের মালিক বললেন -"এই পথে কিছুটা এগিয়ে গেলে মোনাল আর থরের দেখা মিলবেই মিলবে”

 - মোনাল হল গাড়োয়ালের জাতীয় পাখি আর থর ( বন্য ছাগল ) জাতীয় পশু৷ রাস্তার সৌন্দর্য্য অতুলনীয়, হালকা চড়াই তাই বিশেষ কষ্ট হচ্ছেনা, সূর্য্য আস্তে আস্তে পাটে বসতে চলেছে, একটা পাহাড়ের বাঁক থেকে অভূতপূর্ব  সূর্য্যাস্ত দেখলাম ৷ অস্তগামী সূর্য্য পশ্চিম আকাশের একাংশ আর কয়েকটা পাহাড় কামরাঙা লালে রাঙিয়ে দিয়ে আজকের মতো পৃথিবীর এপ্রান্তে ডিউটি শেষ করছে৷ আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামছে অজস্র নাম -না -জানা পাখিদের ঘরে ফেরার কলরবে! পথে অনেক থরের দেখা মিললেও, মোনালের দেখা কোনো ভাবেই মিললোনা৷

পরেরদিন ঠিক সকাল ছটায় বৌয়ের তাড়নায় ঘোড়ায় চড়ে বসলাম –সে তো একদিকে  পায়ে হেঁটে চড়াই ভাঙতে পারবেনা, অন্যদিকে আবার একা একা ঘোড়ায় চড়েও যাবেনা; তো অগত্যা বেশ আরামদায়ক প্রকৃতি আর পরিস্থিতিতে আমাদের ঊর্ধ্বারোহন শুরু হল৷ প্রায় চল্লিশ -পঁয়তাল্লিশ মিনিট চলার পর প্রথম ব্রেক, সবাই মিলে চা -বিস্কিট খেয়ে আবার চলা শুরু; এবার রাস্তা আস্তে আস্তে আরো উধ্বর্গামী, তবে সিমেন্টবাঁধানো চওড়া রাস্তা, মাঝে মাঝে বিপজ্জনক জায়গা গুলোতে রেলিং বসানো৷ বেশ কিছুটা ওঠার পর দেখি -একটা রাস্তা হালকা চড়াইয়ে সটান ওপরে উঠে গেছে, মনে হল এই পথের কোনো শেষ নেই, আমাদের চোখেতো কোনোভাবেই পথের শেষ ধরা পড়ল না - মনে হল এটাই বোধহয় স্বর্গের পথ৷ সেই স্বপ্নের পথ ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে চললাম, অনেকটা যাবার পর ওপর দিকে তাকাতে চোখে পড়ল -সেই কাঙ্খিত তুঙ্গনাথ মন্দির - প্রভাতী আকাশের প্রেক্ষাপটে এক পুরাতাত্বিক ইতিহাসের জীবন্ত নিদর্শন৷ সারাটা পথ আমাদের সঙ্গ দিয়েছে ত্রিশূল, নন্দাদেবী আর চৌখাম্বার মতো শৈলশিখর৷ ধীরে ধীরে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম মন্দির থেকে ২০০ মিটার নীচে৷ প্রথমে গিয়েই পূজো দিলাম, তারপর ম্যাগির সাথে এককাপ চা খেয়ে বৌকে ওখানে বসিয়ে শুরু করলাম চন্দ্রশিলা ট্রেক৷ তুঙ্গনাথ পঞ্চকেদারের মধ্যে উচ্চতম -৩৬৮৬ মিটার, এরও ওপরে চন্দ্রশিলা -উচ্চতা ৩৯৬৯ মিটার; একটু কষ্টকর ট্রেক, উচ্চতাজনিত কারণে বাতাসে অক্সিজেন কম, রাস্তাও দূর্গম, পাথরে পাথরে পা দিয়ে উঠতে হয়৷ যাই হোক, মোটামুটি ৫০ মিনিটে সোয়া এক কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যখন ওপরে পৌঁছলাম তখন সেই অপার্থিব দৃশ্যের সাক্ষী থাকতে পেরে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল৷ সেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়ায় চন্দ্রশিলা মন্দির আর সংলগ্ন অপরিসর পাহাড়ের ছাদ এক স্বর্গীয় নান্দনিকতায় সেজে উঠেছে৷ এই অপরূপ দৃশ্যদর্শনে সত্যি করে নীচে বসে থাকা মানুষটার জন্যে কষ্ট হয় !!! কিন্তু কি আর করা ! যতটুকু সৌন্দর্য্য ক্যামেরাবন্দী করা যায় করে নীচে নেমে এলাম৷ একটু বিশ্রাম নিয়ে দুজনে মিলে তুঙ্গনাথ থেকে পায়ে হেটেঁ নামতে শুরু করলাম ৷

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বদ্রীনাথ, তবে মাঝে একটা জায়গায় ব্রেক নেব৷ এই ব্রেকের পিছনে দুটো কারণ আছে; গৌণটা হল দীর্ঘ পথটা একটু কাটছাঁট করা আর মুখ্যটা হল, ভারত -পাকিস্তানের ম্যাচের একটা বলও মিস না করা৷ তাই আড়াইটে নাগাদ এক পেট খিদে নিয়ে যখন গোপেশ্বরের ঘিঞ্জি বাজার সন্নিহিত জি. এম. ভি. এনে ঢুকলাম তখন সূর্য্যদেব প্রচন্ড আক্রোশে পৃথ্বীবুকে বলকে বলকে জ্বলন্ত লাভা ঢেলে চলেছে ৷

সকালে মাখন-পাউরুটি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে রওয়ানা দিলাম বদ্রীবিশালের উদ্দ্যেশ্যে; অনেকটা পথ যেতে হবে, তার ওপর ওখানে আমাদের কোনো বুকিং নেই৷ তিন মাস আগে কলকাতার অফিসে বুকিং করতে গিয়ে শুনেছি -বদ্রীর তিনটে ক্যাম্পাসে কোথাও কোনো জায়গা নেই৷ তাই সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে গাড়িতে চড়ে বসলাম ৷ আস্তে আস্তে পেরিয়ে গেলাম চামোলি, বিরহী, পিপলকোটি, আর প্রায় ৬০ কিলোমিটার যাওয়ার পর পৌঁছলাম যোশিমঠ৷ এখানে একটু চা বিরতি নিয়ে এগিয়ে চললাম ৫২ কিমি দূরের বিখ্যাত বিষ্ণুতীর্থ বদ্রীনাথধাম৷

যোশিমঠ পেরোনোর পর রাস্তা কোথাও কোথাও অদ্ভূত সুন্দর -মসৃণ কালো পিচের দুর্নিবার হাতছানি আবার কোথাও কোথাও রক্ত জল করা ভয়ংকর ভ্রু- কুটির ভঙ্গুর পাহাড়ি পথ৷ এই ভয় আর আনন্দের  দ্বৈত সংঘাতে পথ চলার উত্তেজনা আরোও বেড়ে গেলো৷ আস্তে আস্তে পৌঁছে গেলাম পিকচার -পোস্টকার্ডে দেখা অতি সুন্দর পাহাড়ি জনপদ -বিষ্ণুপ্রয়াগ; অলকানন্দা আর সরস্বতীর সঙ্গম, যদিও সরস্বতী অন্তঃসলিলা৷ অলকানন্দার ওপর সুন্দর এক ব্রিজ, আর তার পাশে ছোট্ট -মিষ্টি এক ঝরনা৷ বেশ কিছুটা সময় এই অপার্থিব জায়গায় চোখের পলকে কেটে গেল৷ আবার যাত্রা শুরু - হাজার হাজার তীর্থ যাত্রী বাসে, গাড়িতে, মোটরবাইকে, পায়ে হেঁটে চলেছে সেই এক লক্ষ্যে --বাবা বদ্রীনাথজির চরণে একবার মাথা ঠেকানোর ইচ্ছে নিয়ে; এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, গরীব, বড়লোক, ব্রাহ্মণ, শূদ্র -সবাই সমান, সবার একটাই পরিচয়, সবাই বাবার কৃপাপ্রার্থী । বিষ্ণুপ্রয়াগ ছেড়ে ৮-১০ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে আসবে আর এক বিখ্যাত জায়গা -গোবিন্দঘাট৷ বিখ্যাত এই কারণে, এখান থেকে রাস্তা ডানদিকে চলে গেছে ঘাংঘারিয়া -  যেখান থেকে একদিকে যাওয়া যায় 'হেমকুণ্ড সাহিব’ আর অন্যদিকে ' ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস '৷ আজ সোমবার, অনেক আগে থেকে রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিং দেখছি -বদ্রীতে বিশাল ভাণ্ডারা চলছে, তাই পাঞ্জাবীদের ভিড়ে গোবিন্দঘাট আর বদ্রীগামী রাস্তা ঠাসা৷ অবশেষে প্রায় ১০০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে একটা নাগাদ বদ্রীনাথে পৌঁছলাম৷ জি. এম. ভি. এনের কোনো ক্যাম্পাসে একটা ঘরও খালি নেই ৷ তাই দেবলোক ট্যুরিস্ট রেষ্ট হাউসে দুপুরের খাবার খেয়ে বেরোলাম হোটেল খুঁজতে ; আধ ঘন্টা খোঁজাখুঁজির পর আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম -আজ বদ্রীধামে ঘর পাওয়া খুব মুশকিল৷ লাখে লাখে মানুষ আজ এখানে এসেছে আর আমাদের মতো হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় রাস্তায় হন্যে হয়ে একটা ঘরের খোঁজ করে চলেছে৷

আমি সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করে নিলাম -আজই বদ্রী থেকে ফিরতে হবে, আমরা হোটেল খুঁজতে খুঁজতে 'মানা ' গ্রামের দিকে কিছুটা চলে গিয়েছিলাম, তাই যোশিজিকে বললাম আগে মানা গ্রামটা ঘুরিয়ে দিতে, বদ্রী থেকে তিন কিমি৷ তবে শুধু মানা গ্রামটাই ঘোরা হল, তাড়াহুড়োয় মানা গ্রাম থেকে দু কিলোমিটার ট্রেক পথে ভীমপুল এবারে অধরা থেকে গেল ; তার সাথে ভীমপুল পেরিয়ে ৭ কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথে বসুধারা জলপ্রপাত৷

বদ্রীনাথ শহরটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩১৩৩ মিটার উচ্চতায় অলকানন্দা নদীর বুকের মধ্যে অবস্থিত এক অতি পবিত্র তীর্থস্থান, চারধামের এক গুরূত্বপূর্ণ ধাম৷ অপরূপ শৈলীর মন্দিরের পিছনে নর -নারায়ণ পর্বতের মাঝখান দিয়ে বিরাজিত নীলকণ্ঠ শৃঙ্গ, যা এই পড়ন্ত বিকেলে সমানভাবে ভাস্বর ; অলকানন্দার এপার থেকে মন্দির, তীর্থযাত্রীদের দর্শনাকুতি, অলকানন্দার গর্জন, সাধু -সন্ত, দোকান -বাজার সব মিলিয়ে হাঁকডাক, কলকোলাহল চব্বিশ ঘণ্টা ধরে বদ্রীধামকে ঘিরে চলতেই থাকে৷ মানা গ্রাম থেকে ফিরে চটপট দেবদর্শনের লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম তখন দুপুর তিনটে বাজে ; একটা টেনশন মাথার মধ্যে চেপে বসছে এখান থেকে পাঁচটার মধ্যে বেরোতে হবে, তারপর সরকারি নিয়মে আর বেরোতে দেবে না৷ যদি তা না পারি আর  আস্তানার যোগাড় না হয়, তাহলে এই প্রচন্ড ঠান্ডায় আমাদের কি হবে ভাবতেই আতঙ্ক হচ্ছে৷ ততক্ষনে আশপাশ থেকে শুনতে পাচ্ছি ৫০০ টাকার অতি সাধারণ যাত্রীনিবাসও ৫০০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছেনা৷ আসলে আমরা আজ বড় অসময়ে এসে পড়েছি -ওই বিশাল ভাণ্ডারার সাথে আরো কয়েকটা ভাণ্ডারা আর প্রবচন আছে কয়েক জায়গায়, তাই এতো ভক্ত সমাগম৷ যাই হোক বাবা বদ্রীর কৃপায় চারটের মধ্যে আমাদের খুব ভালোভাবে দর্শন হয়ে গেল ৷ এই মন্দিরের চূড়ায় সোনার কলস বসানো আর মন্দিরের ভিতরে কালো শালগ্রাম শিলার বিষ্ণুমূর্তি৷ মূর্তি দর্শনের পর চট করে দেখে নিলাম তিনটি কুণ্ড - নারদকুণ্ড, সূর্য্যকুণ্ড আর তপ্তকুণ্ড৷ কয়েকটা ঘন্টা মাত্র বদ্রীনাথে কাটালাম, কিছু ছবি আর কিছু রোমন্থন মুহূর্তকে সঙ্গী করে যখন বদ্রীধাম ছাড়লাম তখন ঘড়িতে পৌনে পাঁচটা ৷

এবার ফেরার পালা, আলো কমছে অস্তাচলে, ভয়ংকর রাস্তাগুলোকে শেষ সূর্য্যের হালকা আলোয় পেরিয়ে যেতে লাগলাম, ঠিক করলাম রাতটা যোশিমঠে কাটাবো ৷ ফেরার পথে অনেকটা সময় বিষ্ণুপ্রয়াগ মন্দির আর সঙ্গম চত্বরে কাটালাম, অবশেষে সন্ধ্যে পেরিয়ে যখন যোশিমঠে পৌঁছলাম তখন শরীর আর চলছে না ; এখানেও যখন জি.ভি.এনে জায়গা পেলামনা তখন আমাদের দুজনের অবস্থা –“ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি” - যাই হোক কপালজোরে কাছাকাছি একটা বেসরকারি হোটেলে ঘর পেয়ে শরীরটাকে সটান বিছানার আশ্রয়ে সঁপে দিলাম ৷

 

 

গৌতম সরকার
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, যোগমায়া দেবী কলেজ, কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top