সিডনী রবিবার, ৭ই আগস্ট ২০২২, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৯

যে যুগে মেয়েরা বড় : সাইফুর রহমান


প্রকাশিত:
৩০ মে ২০২০ ১১:৫০

আপডেট:
৩ জুন ২০২০ ১০:৫২

সাইফুর রহমান

 

১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর, দীর্ঘ দুই মাস নয় দিন একটানা সমুদ্র অভিযান শেষে কলম্বাস গিয়ে পৌঁছলেন আমেরিকা মহাদেশটির বাহামা নামক দ্বীপটিতে। কলম্বাসের সঙ্গে আসা বেশ কিছু মাঝি-মাল্লা ও লোক-লস্কর খুব আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ্য করল যে সেখানকার গৃহনির্মাণ কাজের সব দায়ভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন মেয়েরা। মোটের ওপর বলতে গেলে বলতে হয় একটি পুরুষকেও বাড়িঘর নির্মাণের ধারেকাছে দেখা গেল না। কলম্বাসের সঙ্গী সাথীদের মধ্যে কিছু ছিল আবার পাদ্রি। তো সেই পাদ্রিদের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, 'আহা ঘরবাড়ি তৈরির মতো এমন একটি কঠিন কাজ মেয়েদের দিয়ে করানো হচ্ছে। এ তো দেখছি ভারি অন্যায়।' পাদ্রি-মহাশয় করলেন কী- মহিলাদের মধ্য থেকে অর্ধেকখানি মেয়ে কর্মী দিলেন বিদায় করে। তাদের পরিবর্তে বেশ কিছু পুরুষ কর্মী লাগিয়ে দিলেন সেই কাজে। পুরুষ কর্মীরা কাজ শুরু করল, ভালো কথা কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই গ্রাম উজাড় করে সব লোকজন, ছেলেপুলে ছুটে এসে জড়ো হলো, বাড়ি নির্মাণের আশপাশে। পুরুষ কর্মীদের বাড়ি নির্মাণ কাজে নিয়োজিত দেখে তারা সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। পুরুষ মানুষ বাড়ি নির্মাণ করছে! এটা তাদের কাছে একটি অতি আশ্চর্য ও অভাবনীয় বিষয়। ব্যাপারটি অনেকটা এমন যেন কোনো গৃহস্থ বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল যে সে বাড়ির কোনো পুরুষ উঠোনে বসে কুলোয় ধান ঝাড়ছে।

পাঠকবৃন্দ আপনারা জেনে অবাক হবেন যে পৃথিবীর সভ্যতার সূচনালগ্নে আমাদের মৌলিক যে তিনটি বস্তু- অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান এই তিনটি জিনিসেরই উদ্ভাবক ও আবিষ্কারক ছিলেন নারী। অর্থাৎ কৃষি কাজ, বীজ বপন এবং ফসল উৎপাদন, কৃষি আবিষ্কারের আনুষঙ্গিক হিসেবে বয়নশিল্প ও গৃহনির্মাণ মেয়েদেরই আবিষ্কার। শুধু তাই নয় হাঁড়ি, ঘটি-বাটি তৈরিসহ কুমোর শিল্পেরও আবিষ্কারক ছিলেন নারী। সেই গল্পই আমি আপনাদের শোনাব কিন্তু একটু পরে। এখন অন্য প্রসঙ্গে দু'চার কথা বলি, পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে যা ঘটল তার জন্য সমস্ত পুরুষ জাতি তথা সমগ্র দেশবাসীর জন্য এটি ছিল নিদারুণ এক লজ্জার বিষয়। আমরা সমগ্র দেশবাসী নিরাপত্তা নিরীক্ষণের জন্য স্থাপিত ক্যামেরার কল্যাণে দেখলাম কিছু নপুংসক হায়না কীভাবে নিরীহ মেয়েদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কি পৈশাচিক ও বীভৎস সেই দৃশ্য। যেন মধ্যযুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। আমি ভেবেছিলাম দেশের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে যেহেতু আজ নারীরা আসীন আছেন সেহেতু অন্তত মেয়েদের উপর নির্যাতনকারীরা সহসাই ধরা পড়বে। কিন্তু হায় সে আশা করা যে কতটা মূর্খতা তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কেন তারা ধরা পড়ল না? আমার ধারণা বাংলাদেশের মানুষ এতটা নির্বোধ ও মূর্খ নয় যে, সেই সব পিশাচ ও হায়েনাদের কেন গ্রেফতার করা হয় না সে কারণ তারা জানেন না। অথচ সিংহভাগ মানুষেরই এ বিষয়টি হয়তো অজানা যে আজকের এই মানব সভ্যতায় নারীদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া সভ্যতার সূচনালগ্নে এমন একটা সময় ছিল যখন পরিবারে নারীরাই কর্তৃত্ব করতেন; তখনকার সমাজ ছিল মাতৃপ্রধান সমাজ যা বিশ্বের নানা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো টিকে আছে। আমাদের দেশে খাসিয়া উপজাতি বর্তমানে খাঁটি মাতৃপ্রধান সমাজের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কৃষি আবিষ্কারের আগে বন্য মানুষ বন জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ফলমূল আহরণ করার চেষ্টা করেছে। হয়তো নদীর ধারে শামুক-গুগলি, কাঁকড়া আর মাছ খুঁজে খুঁজে বেরিয়েছে আহারের জন্য। নৃতত্ত্ব-বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন সেই যুগে সমাজ ছিল মাতৃপ্রধান সমাজ কিন্তু বল্লম তৈরি করতে শেখার পর সব কিছু হয়ে গেল অন্যরকম, কর্তৃত্ব চলে গেল পুরুষের হাতে। বনে জঙ্গলে শিকার করে বেড়ানোটা হয়ে গেল পুরুষদের কাজ। মেয়েরা এই কাজে পুরুষদের সঙ্গে সমানে-সমান হয়ে বনে জঙ্গলে শিকার করে বেড়াতে পারত না। কারণ তাদের ঘরে বসে বাচ্চাকাচ্চা পালন করতে হতো। দুগ্ধপোষ্য ছেলেপুলে লালন পালন করার পাশাপাশি ফলমূল আহরণের চেষ্টা থেকেই শেষ পর্যন্ত মেয়েরা কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন বুনোফল বীজ প্রভৃতি আহরণ করতে করতে মেয়েরা ক্রমশই দেখতে পেল যে কোথাও কোথাও জমির ওপর বীজ ফেলে রাখলে সেই বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হয়। অঙ্কুর থেকে গাছ হয় এই জ্ঞানটিই ছিল কৃষি আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। কৃষি কাজের প্রথম দিকটায় কিন্তু সম্পর্ক পুনরায় বদলে গেল। পরিবারে মেয়েরা হয়ে উঠল প্রধান আর অন্যদিকে পুরুষেরা হলো অপ্রধান। কিন্তু মেয়েদের কপাল পুনরায় পুড়ল যখন ইস্পাতের তৈরি লাঙ্গলের ফলা আবিষ্কৃত হলো। লাঙ্গলের ফলা আবিষ্কারের ফলে বনে পশুপাখি শিকার করা পুরুষ, কাপুরুষের মতো জোর করে কৃষি কাজ তুলে নিল নিজ হাতে। কারণ বনের মধ্যে ঝড় জলে শিকার করা ছিল বিপদ সংকুল ও কষ্টসাধ্য কাজ। নারী আবিষ্কৃত কৃষিকাজ পুরুষ কর্তৃক লুণ্ঠন যে নারী জাতির উপর কি পরিমাণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল তার একটি উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে। সনাতন ধর্মে সাবিত্রী সত্যবান বলে একটি পূজো এখনো প্রচলিত আছে যার বিস্তারিত বর্ণনা আমরা পাই মহাভারতে। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে সিলেট ও ভারতের কাছাড় জেলায় সাবিত্রী ব্রত একটি অতীব জনপ্রিয় মেয়েলি আচার। বিশেষত বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে। এই ব্রত পালন করা হয় তিন দিন ধরে। ব্রতধারিণী নারী এই তিন দিন লাঙ্গল কর্ষিত চাল-গম ইত্যাদি কোনো প্রকার খাদ্য গ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিরত থাকেন। শুধু খাদ্যশস্যই নয়, লাঙ্গল থেকে উৎপন্ন যে কোনো ফলমূলও তার জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই সঙ্গে ব্রতের তিন দিন চাষিরা জমিতে লাঙ্গল টানতে পারবে না। এই ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মেয়েদের কাছ থেকে কৃষিকাজ ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে তারা 'সাবিত্রী ব্রত' নামে অভিনব এই আচারটি পালন করে আসছেন কয়েক সহস্র বছর ধরে। অন্যদিকে বয়নশিল্প অর্থাৎ কাপড় বোনার শিল্পটিও আবিষ্কার করেছিলেন নারীরা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় এখন থেকে পাঁচ হাজার বছর আগের মিসরীয় ফারাও সভ্যতার লিখিত ইতিহাস থেকে। পাঁচ হাজার বছর আগে যেহেতু বর্ণমালার আবিষ্কার হয়নি, মিসরবাসী লিখত এক একটি শব্দ বা অর্থের জন্য এক একটি প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করে। সেই ভাষাকে বলে হাই-রোগি্লফিস্। প্যাপিরাসের উপর লেখা এসব প্রতীক চিহ্নের অর্থ আবিষ্কৃত না হলে আমরা জানতেই পারতাম না বুনন শিল্পটির আবিষ্কারকও যে নারী। হাই-রোগি্লফিস্ ভাষাটির পাঠ উদ্ধারের কৃতিত্ব ফরাসি পণ্ডিত শ্যাঁপোলিয়ঁরের। প্রায় একটানা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি এই প্রতীক চিহ্নগুলোর অর্থ আবিষ্কার করেছিলেন। আর গৃহনির্মাণ শিল্পের আবিষ্কারক যে মেয়েরা তার উদাহরণ তো লেখার শুরুতেই দিয়েছি।

মানব সভ্যতায় যে নারীর রয়েছে এরূপ বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত ইতিহাস, পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সেই নারীই আজ নিগৃহীত, পীড়িত, অপমানিত হচ্ছেন মাঠে ময়দানে, অফিস আদালতে কিংবা শিক্ষা প্রাঙ্গণে। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতার লগ্নেও নারী নিরাপদ নয় স্বয়ং তার নিজগৃহে। বিবেকবর্জিত ও নৈতিকতা লুপ্ত বখাটেরা কেন সহসা একজন নারীকে উত্ত্যক্ত, রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করতে চায়? আমার মতে এর কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে। স্থানাভাবের কথা ভেবে এদের মধ্যে শুধু দু-একটি নিয়েই আলোচনা করছি- প্রথমত, যে সব বখাটে ছেলে মেয়েদের ওপর যৌন উৎপীড়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তারা তাদের স্বভাব ও চরিত্রের কারণেই হয়তো নারী দ্বারা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও বর্জিত। মানসিকভাবে অসুস্থ ও মনোবৈকল্যগ্রস্ত। আর সে জন্য তাদের স্থান হওয়া উচিত মানসিক হাসপাতালে, কোনো উৎসব ও পালা-পার্বণে নয়। দ্বিতীয়ত, বখাটেদের এই মানসিক বিকারগ্রস্ততার জন্য আমাদের সমাজ, পারিবারিক রীতিনীতি ও পরম্পরাও অনেকাংশে দায়ী- অনেক পরিবারেই মেয়েদের দেখা হয় অসম্ভব তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে। সমাজের যা কিছু বৃহৎ, সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ সব ছেলেদের জন্য আর মেয়েদের জন্য তুলে রাখা হয় শুধু উচ্ছিষ্ট অংশটুকু। সেই সব পরিবারে সব আদর যত্ন ও আমোদ-আহ্লাদের কেন্দ্র জুড়ে থাকে ছেলে। আর গৌণতারও অনেক নিচে থাকে পরিবারের সেই মেয়েটি। তো সেই পরিবারের একটি ছেলে যখন দেখে যে তাদের সংসারে মেয়েদের অবস্থান অনেক নিচে তখন বাইরে গিয়ে সে অবধারিতভাবে বৈষম্যমূলক আচরণই করে থাকে। ছেলেটির মনোস্তত্ত্ব্বে সব সময় কাজ করে যে মেয়েরা হলো নীচু ও তুচ্ছ। ফলে তাদের সঙ্গে যে কোনোরকম ঘৃণিত ও উদ্ভট আচরণই করা যেতে পারে। তাতে আর এমন কী অন্যায়?

পাশাপাশি প্রতিটি দেশে আইনের শাসন বলে একটি বিষয় থাকে। বাংলাদেশে আইনের শাসন কতটুকু বলবৎ আছে সেটা পাঠক মাত্রই অবগত আছেন। একটি প্রবাদ সর্বত্র প্রচলিত আছে যে, একটি দেশ কতটা সভ্য সেটি নির্ভর করে সেই দেশে নারীরা কতটা নিরাপদ ও স্বাধীন। এই মুহূর্তে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ছে। তখন আমি যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ছাত্র। সময়টি ছিল ইংরেজি নববর্ষের রাত। আনুমানিক রাত দুটোর দিকে আমি ও আমার এক বাংলাদেশি বন্ধু কার্ডিফের একটি জনাকীর্ণ রাস্তা দিয়ে হেঁটে হোস্টেলে ফিরছিলাম। দেখলাম একটি ইংরেজ যুবতী অর্ধনগ্ন অবস্থায় নেশায় বুঁদ হয়ে উল্টে পড়ে আছে রাস্তার এক কোণে। আমার বন্ধুটিও দেখল বিষয়টি। তারপর চুকচুক শব্দ করে অনেকটা আফসোসের সুরে বলল- 'দেখেছিস কি অসভ্য মেয়ে। নেশায় মাতাল হয়ে পড়ে আছে রাস্তায়।' আমি বললাম বিষয়টি একটু উল্টোভাবে দেখা যায় কী? আমার বন্ধুটি বলল- কেমন? আমি বললাম নেশায় আসক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকাটা আসলে কোনো কাজের কথা নয়, কিন্তু একটা বিষয় ভেবে দেখ, এ মেয়েটি যদি সমস্ত রাতও এখানে এভাবে পড়ে থাকে তারপরও কোনো পুরুষ ওর ত্রিসীমানার মধ্যেও ঘেঁষবে না। যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণ তো অনেক দূরের কথা। এসব উন্নত দেশে বিচার কখনোই মানুষের মুখ দেখে হয় না। সেই সঙ্গে নারীরাও যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বস্তু নয় সেই সংস্কৃতিও প্রাশ্চাত্যের এসব দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে নারী সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতেই হবে। মাথার মধ্যে একটি বিষয় রাখতে হবে যে পৃথিবীতে যত ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয় যেমন খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, যুদ্ধবিগ্রহ সে সব দায়ভারের ৯০ ভাগই বর্তায় পুরুষের ওপর। তার মানে আমি এটা বলছি না যে সমাজের শতভাগ নারীই ধোয়া তুলসী পাতা। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন খারাপ হতেও পারে। তাছাড়া সমাজে কিছু কুঁদুলে নারী হয়তো আছেন যাদের জিহ্বা কানপুরের ছুরির চেয়েও ধারালো। তারা অনেক নিরীহ পুরুষকে কেটে কুচিকুচি করেন প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে। সে সব কিছু সংখ্যক নারীর কথা বাদ দিলে নারীরা সাধারণত হয় কোমল, শান্তিপ্রিয় ও ধৈর্যশীলা। নারীরা আজ জ্ঞান বিজ্ঞানেও অনেক এগিয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো যে কোনো ক্ষেত্রে তাদের এই কৃতিত্বের জন্য তাদের ভাগ্যে সব সময় জুটে পুরুষকার (পুরস্কার)। আমার মতে শব্দটি পুরস্কারের বদলে স্ত্রীকার হলে মনে হয় ভালো হতো। নারীদেরও আজ সময় এসেছে তাদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার। পহেলা বৈশাখের বেদনাবিধুর এ ঘটনাটি নিয়ে আমি কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে বেশ ব্যথিত হলাম।

তাদের দু-একজন আমাকে বলল, 'মেয়েরা কেন ওসব ভিড়াভিড়ির মধ্যে মরতে যায়'! আমি জানি, তাদের এই উক্তির মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশ পায় প্রচণ্ড রাগ, বিরক্তি ও উষ্মা। কিন্তু আমি মনে করি এসব বললে নারীদের আরও ছোট করা হয়। প্রাশ্চাত্য দেশগুলোতে মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফট, ভার্জিনিয়া উলফ্, সিমোন দ্য বোভেয়ারদের মতো অনেক নারীবাদী মনীষীর জন্ম হয়েছে বলেই সে সব দেশে যুগে যুগে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের এখানে কামিনী রায়, (প্রথম বাঙালি নারী যিনি ১৮৮৬ সালে অনার্স গ্রাজুয়েট হয়েছিলেন)। বেগম রোকেয়া কিংবা তসলিমা নাসরিনের মতো হাতেগোনা দু-একজনকেই দেখা যায় নারীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে। নারীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে হবে পুরুষ সমাজকেও কারণ এটা মনে রাখতে হবে যে, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই নারী নিগৃহ হয় পুরুষ দ্বারা। শুধু বিখ্যাত ও প্রতিভাবান মনীষী মাত্রই যে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে এমনটি ভাবা কিন্তু ঠিক নয়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নারীদের প্রতি সুবিবেচক ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন নারীরা ঘরে থাকবে, স্বামীর সেবা করবে, সন্তান পালন করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আবার কিছু নারী থাকবে যারা কবিতা পড়বে আর হবে তাঁর মতো কবির একান্ত অনুরাগিনী। পক্ষান্তরে রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগর এ দুজন ছিলেন নারী মুক্তির প্রধান দুই প্রতিভূ ও দিকপাল। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবাদের পুনরায় বিয়ের আইন প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। আর একটি বিষয় আমাদের বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে যে নারীরা সহসাই যৌনতার স্বীকার হয় তার নিজস্ব পরিমণ্ডলের মধ্যেও। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটি হয় তার পরিবার-পরিজন ও আত্দীয়স্বজন দ্বারা।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের পরিবারের শতকরা ৩০ জন নারী কিংবা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তার দূরসম্পর্কীয় ভাই, খালু, ফুপা, কিংবা এ জাতীয় লোকজন দ্বারা। আমার জনৈক এক পাঠিকা আমাকে জানিয়েছিলেন, তিনি যখন সবে মাত্র ছয়-সাত বছরের বালিকা তখন তিনি জঘন্য এক যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তার আপন ফুপা কর্তৃক। আমাকে তিনি বিনীতভাবে অনুরোধ করেছিলেন যে, এ ধরনের শিশু নির্যাতন নিয়ে আমি যেন কখনো কিছু লিখি। তার অনুরোধটি রাখা গেল বলে বেশ ভালো লাগছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে নারী কোনো আলাদা জাতি গোষ্ঠী নয়। তারা আমাদেরই একটি অংশ। আর যদি তাদের নষ্ট হতে দেই তাহলে প্রকারান্তে আমরা আমাদের নিজেদেরই নষ্ট করার মতো আত্মঘাতী কাজে লিপ্ত হব।

 

সাইফুর রহমান
কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট
ব্যারিস্টার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top