সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পর্যায়ে : মাহবুবুল আলম


প্রকাশিত:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:০৭

আপডেট:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:০৮

ছবিঃ বাংলাদেশের তিস্তা নদী

 

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে যতটুকু সুসম্পর্ক থাকার কথা তেমনটা বর্তমানে নেই বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। তবে দুই প্রতিবেশী দেশের সুসম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন কুটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন ভারত কেবল বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশীই নয় দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুও।

ভৌগলিক দিক দিয়েও ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারত আর এক দিকে বঙ্গোপসাগর। নৃ-তাত্বিক, ভাষা এবং সংস্কৃতির দিক থেকেও ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সাথে বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে অনেক মিল। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সবচেয়ে সুসম্পর্কটা গড়ে ওঠে ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধকালে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ২৫ মার্চ ১৯৭১ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল, সে দিন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারতের সর্বস্তরের মানুষ সর্বশক্তি দিয়ে বিপন্ন বাঙালিদের পাশে না দাঁড়ালে স্বাধীনতা লাভ এত সহজ হতো না। সে জন্য আমরা ভারত ও সে দেশের
জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ভারত সবসময় আমাদের ওপর ছড়ি ঘোরাবে বা দাদাগিরি দেখাবে।

কয়েক বছর যাবত ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুব একটা ভাল যাচ্ছে না। যার মূল কারণ ভারতের সাথে বাংলাদেশের বেশ কিছু অমীমাংশিত ইস্যু। এর মধ্যে তিস্তার পানি বন্টন, সীমান্ত হত্যাকান্ড বন্ধ ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ, তিস্তা ও গঙ্গাসহ অভিন্ন ৪৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাংলাদেশ ভারত বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে প্রচার প্রভৃতি বিষয় রয়েছে।
যদিও ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নতুন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবেগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একটি সামগ্রিক বৈদেশিক চুক্তি সাক্ষর করেন। এই চুক্তিটি ছিল বাংলাদেশকে ন্যূনতম পানিসরাবরাহের গ্যারান্টিসহ ৩০ বছরের চুক্তি। যা ছিল গঙ্গার নিম্নঅববাহিকায় বাংলাদেশের অধিকার।

সেই চুক্তিটি আরও কার্যকর আছে ছয় বছর। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পানি পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশকে প্রায়ই ভারতের সাথে দেনদরবার করতে হচ্ছে৷ এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে এই সমন্বয়হীনতার কারণে পদ্মা অববাহিকার সাধারণ মানুষকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে৷ শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে তাদের জীবন-জীবিকা হয়ে ওঠে দুঃসহ । এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে শীর্ণকায় হয়ে গেছে।

মানুষ পায়ে হেঁটে, পানিভেঙে এপার ওপার হতে পারে। শুধু তা ই নয় পানি নিয়ে আরো এক দুশ্চিন্তার কারণ তিস্তা। ভারতের জলপাইগুড়িতে ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে কমে গেছে বাংলাদেশের তিস্তার পানি প্রবাহ৷ পানির অভাবে নদীতে পলি পড়ে জেগেছে ওঠেছে বিস্তীর্ণ চর, তাতে বেড়েছে নদী তীরের মানুষের দুর্বিষহ যন্ত্রণা। আর বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্দশা শুরু হয় বাঁধ খুলে পানি ছেড়ে তিস্তার পানি প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বন্যায় তলিয়ে যায় বাংলাদেশের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল। এশিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর জেলার ৩৫টি উপজেলার পাঁচ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। ২০১১ সালের হিসাব অনুসারে তিস্তা নদীর পাড়ে বাস করেন প্রায় ৯২ লাখ মানুষ। যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল।

ভারত পানি না দিলেও বাংলাদেশ ভারতকে এর মধ্যে ত্রিপুরার মানুষের খাবার পানির সংকট মেটাতে বাংলাদেশের ফেনি নদী থেকে এক দশমিক আট কিউসেক পানি নিতে ভারতকে অনুমতি দিয়ে দেয়া হয়েছে৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং বলেছেন, ‘‘কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আর তা যদি না দিই কেমন দেখায়?'' প্রতিবেশীর প্রতি বাংলাদেশের এই মহানুভবতা মানবিক কারণে, সকল দেনা-পাওনার হিসেবের উর্ধ্বে৷ এতে এ কথা স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ভারতকে দেবার ক্ষেত্রে যতটা হাতখোলা, ভারত ততটা নয়।

যতটুকু মনে হয় ২০১৭ সাল থেকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের শীতল সম্পর্কের শুরু। দীর্ঘদিনের সূত্রে বাংলাদেশ আশা করছিল মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে কিন্তু ভারত এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করায় বাংলাদেশ হতাশ হয়। তখন নয়াদিল্লির হয়তো আশঙ্কা ছিল যে তারা যদি মিয়ানমারের বিপক্ষে যায়, তাহলে মিয়ানমার ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।

যাক, তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি নিয়ে শেখ হাসিনার শাসনকালে ১২ বছর ধরে ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনীহার যুক্তি দেখিয়ে এখনো তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে কোন চুক্তি করা সম্ভব হয়নি৷ এনিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ। সেজন্য বাংলাদেশ সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আর সেই প্রকল্পে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে চীন। এ প্রকল্পের সফল বাস্তায়ন হলে তা ভারত ক্ষতিগ্রস্থ হবে মনে করে ভারত এখন অনেকটাই নড়েচড়ে বসেছে, এবং একই সাথে কুটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ মানুষ মনে করছে যে বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থকে যতটা প্রাধান্য দিচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের স্বার্থকে ততটুকু প্রাধান্য দেয় না৷ দুনিয়াটাই চলছে 'গিভ এন্ড টেক' পলিসির মাধ্যমে একথাটা ভারতকে অবশ্যই বুঝতে হবে। ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতের সমর্থন, সীমান্ত হত্যা, ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশসহ বেশ কিছু ইস্যু অনেকদিন ধরে ঝুলে আছে। এই কারণে কারণে ভারতের সাথে সম্পর্কের কিছুটা টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। যা দুই দেশের জন্যই ভালো দিক নয়। তবে বাংলাদেশের দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে যে কারও সঙ্গে সম্পর্কে জোরদার করবেন না এটা আমরা আমরা দৃঢ়ভাব বিশ্বাস করি।

পরিশেষে বলতে চাই, শেখ হাসিনার উদার বৈদেশিক নীতির কারণে ভারত বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে বা পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ যতটুকু পাওয়ার কথা তার অর্ধেকও পাচ্ছে না। কাজেই আমাদের উদার নীতিকে সন্মান দেখিয়ে ভারত সরকার দ্রুতই অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান করে দুই দেশের সম্পর্ককে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে তা দুই দেশের সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।


মাহবুবুল আলম
কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top