সিডনী সোমবার, ৬ই ডিসেম্বর ২০২১, ২২শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

যৌন শিক্ষা : কাজী খাদিজা আক্তার 


প্রকাশিত:
৯ নভেম্বর ২০২০ ১১:০১

আপডেট:
৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩:৩৪

ছবিঃ কাজী খাদিজা আক্তার 

 

"যৌন শিক্ষা" এই শব্দটির সঠিক প্রয়োগ এখন যে সময়ের দাবী হয়ে পরেছে সে কথা লিখতেই আমার এই লিখার উপর একদল মনুষ্যজাত হুমড়ি খেয়ে পরবেন শুধুমাত্র নেতিবাচক ভাব এবং ভাষা নিয়ে। এনারা বলতেই পারেন- এই অখ্যাত লেখিকা এসব কি বলে?  তবে আমি বলিকি, সময় অনেক আগেই হয়েছিল যখন আমাদের ক্লাস গুলোতে বয়ঃসন্ধিকালের যেমন মেয়েদের পিরিয়ড, ছেলেদের বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তন এই বিষয় গুলো আসলে শিক্ষা গুরুজনেরা বলতেন এইপাঠটি তোমরা বাসায় নিজেরা পড়ে নিও অথবা বাসায় মেয়েরা  মা, বড় বোন আর ছেলেরা বাবা কিংবা বড় ভাইদের কাছ থেকে জেনে নিও। সেই যে শিক্ষা গুরুদের সংকোচ, লজ্জা, দ্বিধা এখনও আমাদের সমাজটাকে আড়ষ্ট করে রেখেছে। অথচ অতি প্রাকৃতিক একটি বিষয় যা আমাদের জানা বোঝা খুবই প্রয়োজন। 

 

এইতো কয়েকবছর আগেও আমাদের দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে কথা বলা গণমাধ্যমে প্রচারকরা অতোটা সহজ বা জরুরি ছিলোনা।কিন্তু আমরা জানি আজ যা অস্বাভাবিক, অশোভনীয় মনে হয় সময়ের দাবীতে তা একসময় স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এইযে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রচার এবং গ্রহণ এটিও একপ্রকার যৌন শিক্ষা। আফ্রিকান দেশসমূহে যেখানে এইডস মহামারি আকার ধারণ করেছিলো সেখানে এইডস এর প্রাদুর্ভাবের কারণে যৌন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই জরুরি বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিলো। এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সেখানে যৌন শিক্ষা বিজ্ঞানীদের মতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কৌশল বলে বিবেচিত হয়েছিলো। 

 

"যৌন হয়রানি" নামক কিছু না কিছু ঘটনা আমাদের বর্তমান সমাজে প্রায় প্রতিদিনই ঘটে যাচ্ছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা আর ঘৃণা জানিয়ে সমাজের কাছে রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাই। কিন্তু বিচারের পাশাপাশি আমাদের এটাও ভাবতে হবে কিভাবে সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করা যায়। এই ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে সন্তানদের ধর্মীয়, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, আচার-আচরণ শিক্ষার সাথে সাথে যৌন শিক্ষাও দেয়ার প্রয়োজন আছে বৈকি।

 

যৌন কর্ম যে শুধুমাত্র প্রজনন কর্ম বা মানব শিশু জন্ম দেয়া তাতো নয়। একটি শিশু জন্ম হবার দুএক বছর পর থেকেই মা-বাবার দায়িত্ব হয় তাকে আস্তে আস্তে বিভিন্ন জিনিস চিনিয়ে দেয়া, সম্পর্ক গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া, তারপর কোনটা খারাপ কোনটা ভালো বুঝিয়ে দেয়া। ধীরে ধীরে আমরা তাকে সব শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা  করি। একসময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আমরা তাকে বুঝিয়ে দেই।কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় আমরা তাকে শরীরের কিছু গোপন অঙ্গ সম্পর্কে বলতে সংকোচ বোধ করি অথবা এসম্পর্কে বলার প্রয়োজন বোধ করিনা। তবে আমাদের উচিত আমাদের সন্তানদের তার শরীরের প্রাইভেট পার্টস যেমন ব্রেস্ট, জেনিটাল অরগান এগুলো সম্পর্কে বুঝিয়ে বলা।এদের কার্যকারিতা কি, পরিচর্চা কিভাবে হবে ইত্যাদি বিষয়ে যত্ন সহকারে বন্ধু হয়ে বোঝানো।

 

তারপর আসে গুডটাচ এবং বেডটাচের বিষয়টি।যেটি আমাদের সন্তানদের শিশু বয়স থেকেই বুঝিয়ে দেয়া খুবই জরুরি। বিশেষ করে মেয়েদের। শরীরের কোন অঙ্গে কে এবং কিভাবে স্পর্শ করলে সেটা খারাপ এবং কোনটা ভালো সেটা তাকে জানানো উচিত। যেমন ছোট বাচ্চাদের আমরা সবাই আদর করি সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে আপনার সন্তান কার আদরটা পছন্দ করছেনা কাকে সে এড়িয়ে চলছে।অনেকসময় এমন হয় বাসায় নিয়মিত কোনো পরিচিতজন আসে কিন্তু  হঠাৎ করেই আপনার সন্তান তার কাছে যেতে পছন্দ করছেনা, সেক্ষেত্রে আপনি তাকে নিরবে প্রশ্ন করুন এবং জানার চেষ্টা করুন কারণটা কি? কারণটা কিন্তু সবসময় স্বাভাবিক নাও হতে পারে। ভদ্রসমাজেও কিন্তু নরপশুর অভাব নেই।সমাজ বাদ দিন আপনার পরিবারের ভেতরই কিন্তু এধরণের নরপিশাচের অস্তিত্ব থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আপনার সচেতনতাই আপনার সুরক্ষা। ছেলে শিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হয়।তাই খুব কাছের মানুষ যেমন বাবা মা, দাদা দাদী, নানা নানী, খালা, ফুফু এমন একান্ত আপনজন ছাড়া বাকিদের সাথে মেলামেশার সময় খেয়াল রাখুন। সেজন্যই বলছিলাম গুডটাচ এবং বেডটাচের শিক্ষা দেয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চারপাঁচ বছরের পর থেকে একটি শিশু যখন এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে বা শিখতে পারে তখন সে নিজেই অনেক সচেতন থাকে, সহজেই কেউ তার সাথে  যৌন হয়রানি মূলক আচরণ করতে পারেনা।ভারতের জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যান  অনুযায়ী দেশের অর্ধেকের বেশি শিশু যৌন নিগ্রহের শিকার হয়ে থাকে এবং সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো যে নাবালিকা বা শিশু যৌন হয়রানির বেশির ভাগ ঘটনা তার পরিবারের মধ্যেই ঘটে। আমাদের সমাজেও এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটে যাচ্ছে শুধু আমরা সব ঘটনাগুলো জানতে পারিনা। কেননা বেশিরভাগ শিশুরাই এসম্পর্কে বলতে ভয় এবং লজ্জা পায়। তাই ওদেরকে এমনভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, যখন কেউ তাদের সাথে এমন আচরণ করবে তখন যেন বিষয়টি গোপন না রেখে আপনার কাছে এসে বলে।

 

১২/১৩ বছরের সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা বয়ঃসন্ধি কালের সময়।ছেলে এবং মেয়েদের এসময় নানা ধরনের শারীরিক পরিবর্তন হয়। যেমন মেয়েদের পিরিয়ড, শারীরিক গঠনের পরিবর্তন, ছেলেদের কণ্ঠ স্বর পরিবর্তন, কাধ চওড়া হওয়া, হাল্কা গোঁফ উঠা ইত্যাদি বিভিন্ন পরিবর্তন হয়ে থাকে। চিন্তা চেতনায় বিশেষ পরিবর্তন, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং নিজস্ব মতামত তৈরি হয় এই সময়টাতেই। তাই মাবাবাদের এসময় সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাটাই সবচেয়ে সঠিক কাজ এবং জরুরি। মা বাবার উচিত তখন তাদের সাথে এইসব নতুন পরিবর্তন গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা।বাহিরের দেশে যৌন শিক্ষার জন্য  স্কুল গুলোতে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা রয়েছে যা আমাদের দেশে নেই।তবে আমাদের দেশেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এদের পাঠ্যসূচিগুলোতে যৌন শিক্ষার প্রাথমিক বিষয়গুলো নিয়ে আরও একটু ভাবা উচিত।এসময়ে প্রজনন স্বাস্থ্য পুষ্টি এবং মানসিক গঠনেও সচেতন হতে হবে। ছেলেদের মধ্যে মেয়েদর সম্মান করা এবং মেয়েদের মধ্যে ছেলেদের সম্মান করার প্রবনতাও জাগ্রত করতে হবে। 

 

শত শত বছর ধরে আমাদের সমাজের নারীরা পুরাতন কাপড়, মাটি ইত্যাদি দিয়ে পিরিয়ড কালীন সময়ে নিজেদের পরিচর্চা করে আসছেন যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এবং এর ফলে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি হয়ে থাকে এমনকি অনেকসময় মৃত্যুও হতে পারে। আমাদের মতো স্বল্প আয়ের দেশে কজন নারীইবা প্যাড ব্যবহার করতে পারে? এর পার্সেন্টিজ খুবই কম। তাই সব নারী যেন এই সুবিধাটুকু পায় সেজন্যে সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এরমধ্যে হতে পারে প্যাডের দাম খুব কমিয়ে আনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে মেয়েদের জন্য প্যাডের ফ্রী ব্যবস্থা করা, জনসচেতনতা মূলক কার্যক্রম আরও বেশিকরে তৈরি এবং প্রচার করা।

 

যৌন শিক্ষা বিষয়ে আমাদের সমাজ সম্পূর্ণ একটি আড়ষ্ট সমাজ। আমরা বিষয়টিকে গোপন রেখে ইতিবাচক পরিবর্তনে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী। এই সমাজে যৌন বা সেক্স শব্দটি যেন একটি নিষিদ্ধ শব্দ। স্বাস্থ্য শিক্ষার সাথে এটি যে ওতপ্রতভাবে জড়িত তা যেন আমরা অনেকেই মানতে রাজি নই। তবে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের যৌন শিক্ষার বিষয়ে আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়া উচিত। আশাকরি আমাদের অভিভাবকদেরও এবিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রস্ফুটিত হবে।

 

কাজী খাদিজা আক্তার 
প্রভাষক (ইংরেজি)  
সরাইল সরকারি কলেজ

   

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top