সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

এসো গড়ে তুলি পাপাত্মাহীন নতুন স্বদেশ : ফারুক নওয়াজ


প্রকাশিত:
১২ নভেম্বর ২০২০ ১৬:২২

আপডেট:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ২৩:৫৭

 

কবি-সাহিত্যিক অভিধায় আমি কাউকে অভিষিক্ত করতে কুণ্ঠা বোধ করি। কারণ, এই শব্দদুটির মধ্যে অনেক গুরুত্ব বহন করে। 

বস্তুত, আমরা লেখালেখি করি। যাই লিখি না কেন, লিখি তো। সে-হিসেবে আমরা লেখক। এই লেখকদেরও কিছু সামাজিক দায় থেকে থাকে।

বিশেষকরে দেশে, সমাজে বা বিশ্বের কোথাও মানবতা লাচ্ছিত হলে, মনুষ্যমুখোশে পশুশক্তির দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে প্রথম প্রতিবাদী হতে হয় তাদেরকে। তারাই জনগণের পাশে এসে দাঁড়াবে এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে সাহস ও প্রেরণা যোগাবে। সরকার ও রাষ্ট্রের কাছে এর বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানানোর পাশাপাশি সরকারকে সঠিক পরামর্শ ও প্রয়োজনে সর্বাত্মক সহায়তাও তারা দিয়ে থাকেন।

কিন্তু আমরা এতোই দুর্ভাগা জাতি যে আমাদের লেখকরা সেদিকে নেই। তারা সর্বাত্মকভাবে ধামাধরা। তারা কেউ সরকারি, কেউ দলীয়, কেউ ধর্মীয়, কেউ বিরোধী। মূলত, ধান্দাবাদী। নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারা আখের গোছাতে বড়োই শশব্যস্ত।  

জাতি বা রাষ্ট্র এদের কাছে কিছু আশা করতে পারে না। সোজা কথায় এরা ক্লীব। এরা বোধপ্রতিবন্ধী বা বিবেক-অটিস্টিক। 

আজ যখন অভিশপ্ত ধর্ষকচক্রের দ্বারা নারী নিরন্তর ছিন্নভিন্ন হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, বিপর্যস্ত হচ্ছে তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো লেখকপদবাচ্যদের টিকিটিও কোথাও দেখি না। হ্যাঁ, কিছু নারীর প্রতিবাদ অবশ্য আমাদের চোখে পড়ছে। তবে এর ধরন পশুশক্তিকে রোধের চাইতে সেইশক্তিকে আরো প্রমত্ত হওয়ার পথ নির্মাণে ইন্ধন যোগানোর মতোই। নাটকীয় বা প্রহসনের ভংগিমায় এরা ফ্যাশনশো করছে বলে আমার মনে হচ্ছে। প্রতিবাদ হবে প্রতিবাদ। হবে কঠিন তবে, নিঃশব্দ। যেমন পাহাড়। সে শব্দহীন কিন্তু অটল।সে বুক পেতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে নড়াবার শক্তি নেই কারো। এজন্যই সে পাহাড়। এটাই তার ভাবমূর্তি। এতসব গূঢ় ব্যাখ্যায় না গিয়ে বলব, প্রতিবাদ হতে হবে ভাবমূর্তি বজায় রেখে, সঠিক প্রতিবাদের প্রক্রিয়ায়। ধর্ষকের বিরুদ্ধে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ধর্ষিতার অভিনয় করে প্রতিবাদ নয়। আমার, বক্ষদেশ, আমার লজ্জাদেশ ওদের দ্বারা লাণছিত হয়েছে বলে আমি নিজের অনাবৃত বক্ষদেশ বাড়িয়ে দিয়ে বলব কী কে আছিস আয়..! এটা খেলো প্রবণতা।

আমাদের কিছু টাকাখোর সুযোগবাদী সংগঠন আছে। এরা ইস্যু খোঁজে সুযোগ কাজে লাগানোর। এরা প্রচুর টাকা পায় বিভিন্ন অপফান্ড থেকে। সেটার খরচ দেখানোর বা নতুন করে প্রাপ্তির  একটা পথ খোঁজে। তখনই তারা পথে নামে কিছু একটা দেখাতে। এরা কখনোই সামাজিক আন্দোলনকে সফল করতে পারে না। ফায়দা লোটে মাত্র। এদের মধ্যেও অনেক ধর্ষক আছে, লুণ্ঠক তো আছেই। সেটা আমরা নিরন্তর দেখি তথ্য মিডিয়ায়। প্রায় দেখি, অমক এনজিও কর্মকর্তা দ্বারা অমুক নারী ধর্ষিত, গরীব মানুষের গচ্ছিত টাকা নিয়ে লোপাট ইত্যাদি। বস্তুত, এদের অধিকাংশই সমাজ উন্নয়নের নামে সমাজকে ক্ষয় করতে উদয় হয়]।

বলার অপেক্ষা রাখে না, লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিবেত্তারাই পৃথিবীর অশুভ মানচিত্র বদলে দেয়। ইতিহাস এটা সাক্ষ্য দেয়। আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন থেকে জাতির সকল দুঃসময়ে এদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু আজ আমরা সে-কথা ভাবতেই পারি না। বস্তুত, আমাদের এ-সমাজের সদস্যরা একএকটি নপুংসক সত্তা বহন করে চলেছে। 

অথচ, এই অনাচারের বিরুদ্ধে আমরা নারীর পাশে দাঁড়াতে পারতাম একটি কবিতা বা একটি স্বরচিত রচনার মাধ্যমেও। একটি একটি হয়ে উঠত শত শত-সহস্র সহস্র অপ্রতিরোধ্য শক্তির আগুন। এই আগুন ভস্ম করে দিতে পারত ঘৃণ্য পশুশক্তির পাপিষ্ঠ অস্তিত্বকে। না, আমরা সেই আগুন জ্বালানোর যোগ্য নই। 

আমার দুঃখ হয়, লজ্জা হয় একজন লেখক হয়েও সে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হওয়ায়। এবং এই অক্ষমতার অপরাধবোধ আমার আত্মাকে নিরন্তর কাঁদায়, জ্বালায়, দগ্ধ করে। তবে, হতাশায় একেবারে নিঃশেষ হতেও চাই না। অবশ্যই স্বপ্ন দেখতে পারি, প্রতিজ্ঞা করতে পারি জেগে ওঠার। আসুন, অন্তত যাদের বিবেক এখনো পচে যায়নি তারা অন্তত একবার বিপুল আগুন হয়ে জ্বলে উঠি। নারীকে বলি, আমরা মরিনি, আমরা সাথে আছি। চলো, আমরা গড়ে তুলি ধর্ষকমুক্ত, পাপাত্মাহীন নতুন স্বদেশ।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top