সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে জানুয়ারী ২০২১, ৮ই মাঘ ১৪২৭

বিষে বিশের ক্ষয় হয়ে

মাথা না নোয়াবার বার্তা নিয়ে উদ্ভাসিত হোক দুই হাজার একুশ : শাকিলা নাছরিন পাপিয়া


প্রকাশিত:
৭ জানুয়ারী ২০২১ ১৬:৩৬

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ২০:২২

 

এই তো সেদিন। করোনা এ বিশ্বে আগমনের পূর্বেও আমরা অহংকারে দাপিয়ে বেড়াতাম পৃথিবী।
পারি না এমন কিছুই ছিল না মানব জাতির কাছে। দম্ভে মাটিতে পা পড়ত না মানুষের।
সবাই তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল।
বাতাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে উড়ছিল অহংকারি মানুষ।

আচমকা মানুষের সকল দম্ভ, সকল অহংকার চূর্ণ করে সৃষ্টিকর্তা জানান দিল, নাটাই তাঁর হাতে। রিমোট নিয়ে তিনি অলক্ষে বসে আছেন।

সভ্যতা, প্রযুক্তি, জ্ঞান সব ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যু এসে অসহায় করে দিল উন্নত বলে যেসব দেশ গর্বিত তাদের।
মানব জীবন থেকে, গোটা পৃথিবী থেকে একটা বছর যেন নাই হয়ে গেল। থমকে গেল সারা বিশ্ব।
হিসাব নিকাশ সব বিফলে গেল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র জীবনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। অর্থ, বিত্ত, শিক্ষা, সম্মান সব ফেলে শুধু বেঁচে থাকাটাই মুখ্য হয়ে উঠলো।

আমরা অবশ্য এইসব উন্নত দেশের চেয়ে আলাদা। আমরা কোনকালেই ভয় পাই না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নাস্তানাবুদ আমরা তখন সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে চুরিতে সৃজনশীলতা দেখাতে ব্যস্ত।

এই মহামারীতে দেবদূতের মত গুরুত্বপূর্ণ ডাক্তার, নার্স। অন্যান্য দেশ যখন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত, আমরা তখন এদের বাসা থেকে, এলাকা থেকে বিতারিত করেছি।

মা বাবা স্বজনদের রাস্তায় ফেলে দিয়ে এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছি যাতে মনে হয়েছে একমাত্র করোনায়ই মানুষ মারা যায়। অন্য কোন কিছুতেই মানুষ মরে না।

সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি, করোনার ভূয়া রিপোর্ট তৈরি করে। এই সৃজনশীল প্রতিভা বিশ্বের অন্য কোন দেশই দেখাতে পারেনি।

করোনা শুধু যে আমাদের অসুন্দর দেখিয়েছে তা নয়। করোনার কারণে আমরা মানুষ দেখেছি। মানবতা দেখেছি।
চুরির জন্য  আমরা যখন নোবেল পাবার যোগ্যতা অর্জনের প্রমান দিচ্ছিলাম ঠিক তখনই ভিক্ষুক থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ সহায়তার হাত প্রসারিত করেছে মানবতার জন্য।
একদিকে  সিনহা হত্যা,প্রদীপের অপকর্ম, ১০ হাজার টাকার জন্য পিটিয়ে মেরে ফেলার মত ঘটনা যেমন দেখেছি তেমনি অন্যদিকে দেখেছি এ দেশের পুলিশের দিন রাত পরিশ্রম করে মানুষের দ্বারে দ্বারে খাবার পৌঁছে দেবার মহান কর্মযজ্ঞ।
সন্তানেরা  করোনার ভয়ে যেখানে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছে মা বাবাকে, সেখানে পুলিশের সহায়তায় এ মানুষগুলো পেয়েছে আশ্রয়।
করোনার বিপর্যয় আমাদের সম্মূখে এনেছে মানবিক পুলিশের অন্য এক রূপ। যা জানা ছিল না সাধারণ মানুষের।

বদলায়নি ধর্ষকের চরিত্র। ধর্ষণ এবং গণধর্ষণ এখন অতি স্বাভাবিক হযে গেছে আমাদের দেশে। এটা একটা অশনিসংকেত। 
৭১ টিভির সিনিয়র সাংবাদিকের তার সহকর্মীর ১০ বছরের শিশু পুত্রকে বলাৎকার চেষ্টার নিউজ গুরুত্ব পায়নি। বাসে ধর্ষণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে লাফিয়ে পড়ে আহত হওয়া কলেজ ছাত্রীর ঘটনা দেশের মানুষের মাথা ব্যথার কারণ হয়নি কিন্তু সারাদেশ আর সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড়  বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নাপিত পেশার একজনকে বিয়ে করার কাহিনী।
এই ঘটনা আমাদের চরিত্রের নতুন একটি দিক উন্মোচন করেছে।
আমদের সংবিধান বলে সব মানুষ সমান, আমাদের পাঠ্যবই শিক্ষা দেয় সব মানুষ সমান, আমরা সন্তানদের বলি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করা অন্যায়। অথচ আমরা একটা বৈধ সম্পর্কে  ডাক্তার আর নাপিতের সম্পর্ক টেনে একটা পেশাকে অসম্মান করছি।
আমরা সনদ নির্ভর শিক্ষায়  উন্নত হলেও প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারিনি। মানসিক উৎকর্ষতা অর্জন করতে পারিনি তারই প্রমান এই বিয়ে নিয়ে নানা বিরূপ মন্তব্য।

শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের সেরা উক্তি, "মরার আবার জাত কি?"
করোনাকালে দেখেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অসাধারণ দৃশ্য। শেষ যাত্রায়  ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে এগিয়ে এসেছে এদেশের মানবিক মানুষ।
সারা বিশ্বকে দু হাজার বিশ যা যা বুঝিয়েছেঃ

১/ মানুষের শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন সাড়ে তিন হাত জমি।
২/ ভালো থাকতে হলে সবাইকে নিয়েই ভালো থাকতে হবে।
৩/একা ভালো থাকা সম্ভব নয়। প্রতিবেশিকে নিয়েই ভালো থাকতে হবে।
৪/ মানুষের অহংকার এক নিমিষে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
৫/প্রাকৃতিক প্রতিশোধ ভয়ঙ্কর হয়।
৬/ মানুষের আশ্রয় মানুষ।
৭/ অমানুষ যে কোন পরিস্থিতিতে তার স্বভাব ঠিকই রাখে।
৮/ মানুষের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।

মানুষ স্বপ্ন দেখার, নির্মানের অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। সুন্দর, অসুন্দর দু'টো  চিত্রই দেখেছি দুই হাজার বিশে।
  দুই হাজার একুশ সকল ব্যর্থতা, সকল অসুন্দর মুছে ফেলে, আলো আর সফলতার পথে এগিয়ে  নিয়ে যাবে বিশ্বকে।

 
জীবনের জয়গান গাইবো। নির্মানের আনন্দ নিয়ে উদ্ভাসিত হবো সবাই। এটাই হোক শপথ আর স্বপ্ন নতুন বছরের।

 

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
শিক্ষক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top