সিডনী বুধবার, ৩রা মার্চ ২০২১, ১৮ই ফাল্গুন ১৪২৭

কিশোরদের নিদ্রিত বিবেক ও শঙ্কিত সমাজ : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২:৩১

আপডেট:
৩ মার্চ ২০২১ ০১:৫৪

 

বীতশ্রদ্ধ মনকে শৃঙ্খলিত সীমানায় আটকে রাখা যায় না। তাই হিংসাত্মক কার্যকলাপ মানব মনকে চালিত করে। সমাজকে শঙ্কিত করে তুলে দু:সাহসিক কাজের অমোঘ বার্তা দিয়ে। দৃষ্টিকটু কাজ অনেকটা অগ্রাহ্যবাদের সীমানায় লুকিয়ে থাকে। চাওয়া-পাওয়া তাদের সীমাহীন রাজ্যে আরও দুর্বিনীত করে তুলে।

সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় রূপালী ব্যাংকে ঘটে যাওয়া দু:সাহসিক কাজ সেটাই জানান দেয়। ব্যাংকে ডাকাতি চেষ্টার মামলায় এক ভয়ঙ্কর তথ্য বেরিয়ে আসে। গ্রেপ্তারকৃত কিশোরের ভাষ্যমতে, ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মীদের খারাপ আচরণের প্রতিশোধ নিতে ব্যাংকে নিয়োজিত নিরাপত্তা প্রহরীদের উপর হামলা করে। বর্বরোচিত হামলা করার স্পৃহা মনের মাঝে গেঁথে রেখেছিল। একদিন সে কাল্পনিক চাওয়া বাস্তবে রূপান্তরিত করে। সবশেষে হামলা করার মাধ্যমেই মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের উন্মেষ ঘটায়। বলা যেতে পারে সেটা ক্ষোভের চরম পরিণতি, হিংস্রতার পরিপূর্ণ তৃপ্তি।

একই কারণে, হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় সংগঠিত হয় হত্যার মতো নির্মম কাজ। গ্রেপ্তারকৃত কিশোরের ভাষ্যমতে, ওই এলাকার সৈয়দ আলীকে অপমান করেছিলেন তানভীরের বাবা ফারুক। বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিতে প্রবাস জীবনে ছয় বছর কাটিয়ে দেশে ফিরে উজ্জ্বল। পরিকল্পিতভাবে উজ্জ্বল ফারুক মিয়ার ছেলে তানভীরকে হত্যা করে। হত্যা করার পেছনে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিল। তাই এক সময় সে তানভীরকে খুন করতে উদ্যত হয়। জানি না কি দোষ ছিল কিশোর তানভীরের। তার বয়স ছিল ১৯ বছর (সূত্র: দৈনিক সমকাল, ২৮ জানুয়ারী ২০২১)। সে হয়তো পূর্বের ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতো না। তার বাবার খেসারতে এভাবেই তাকে জীবন বলি দিয়ে দিতে হলো। এ হামলার মাধ্যমেই জানান দেয় দুর্বিনীত রাজ্যে প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে উঠার দু:সাহসিক কাজের নগ্নরূপ। এ সকল নেতিবাচক ঘটনা সমাজ ব্যবস্থাকে দিন দিন শঙ্কিত করে তুলে।

উগ্র মনোভাব হৃদয়ে পোষণ করে রাখলে কতটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বর্ণিত দুটি ঘটনার সৃষ্ট প্রবাহ আমাদেরকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেয়। ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমাজকে বিভাজিত করে। এ সকল কাজে নিমজ্জিত কিশোররা বেশিরভাগই শোষণ বঞ্চনার মাঝে বেড়ে উঠে। মানবিকতার আবেশ তাদের এতটুকু স্পর্শ করে না। বিভাজিত সমাজ ব্যবস্থাকে কাছ থেকে অবলোকন করে। তাই অবচেতন মনে বিভাজিত সমাজই অবলম্বন হয়ে উঠে। বৈকল্যতায় ধেয়ে আসে তাদের অসহনীয় জীবনবোধ। ফলে বেড়ে উঠা কিশোরদের মানসিক ক্ষেত্রে এক ধরণের নেতিবাচক পরিবর্তনের আভাস লক্ষ্য করা যায়। ঈপ্সিত আকাঙ্ক্ষার ব্যাপ্তি ঘটাতেই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আঁকড়ে থাকে মনের চাওয়াগুলি। তাদের কাছে পাওয়াটাই মুখ্য হয়ে উঠায় ব্যর্থতার পরিমণ্ডলে হামাগুড়ি দিতে হয় বার বার। দৈনন্দিন জীবনে টানাপোড়েনের মাঝে বেড়ে উঠায় অপরাধের প্রতি তারা আরও দিন দিন সক্রিয় হয়ে উঠছে। উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মাঝে বেড়ে উঠা এ সকল কিশোররাই সমাজের অন্যান্যদের আর্তচিৎকারের কারণ হয়ে থাকে। রুদ্ধশ্বাসে বিঁধে রাখে উশৃঙ্খলতার আবেশে।

মানসিক চালিকা শক্তি দৃঢ়ভাবে পরিচালিত না করে আবেগের চালিকাশক্তিই তাদের অহংবোধ। শারীরিকভাবে দ্রুতই উন্মেষ ঘটাতে পারদর্শী কিশোর বয়স। নি:শব্দে পুরো রাজ্যটাই যেন ধূসর হয়ে আসে। দিন দিন বিস্তৃতির জাল সীমানাকে অতিক্রম করে চলে। কখনো অলিতে গলিতে, কখনো রাজপথে যত্রতত্র এদের বিচরণ। শঙ্কিত করে তুলে তাদের সীমাহীন বিচরণক্ষেত্র। নির্যাতনের কালো থাবায় শিহরণ জাগিয়ে তুলে। বিভৎসতার চরমে নির্মম সহিংতায় প্রাণ হরণ করে। আক্ষেপের সীমানায় বসে হৃদয়বান মানুষ কোঁকড়ে কাঁদে। বিষণ্নতার চাদরে মোড়ানো থাকে অন্ধকার জগতের হাতছানি। স্তম্ভিত করে দু:সহ যাতনায় নিমজ্জিত হয়ে আসে সমাজের ব্যাপ্তিময় জগত।

ফলে, জেগে উঠা সুশৃঙ্খল সমাজ এক রহস্যাবৃতের মাঝেই থেকে যায়। আস্তে আস্তে অসংলগ্নতার বহরে আরও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড যোগান দিতে থাকে। সভ্য সমাজটা নিমিষেই হয়ে উঠে অসত্যের আবরণে ঢাকা এক অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজ। কিন্তু মনের ভিতর যে ক্ষতটা তৈরি হয় তার রেশটুকু অন্তরাত্মায় বিষিয়ে তুলে। হয়তো তাদের পাশে মানুষ দাঁড়াবে,বিচারের দাবিতে মৌন মিছিল হবে। কেউ কেউ হয়তো নিস্তব্ধতায় হার মেনে নেবে। সহসায় রচিত করবে প্রাণের সংবরণ। নিরবে কেউ একা অশ্রু ফেলবে, কেউবা দু'এক কলম লিখে যাবে মনের সান্ত্বনার নিমিত্তে। কিন্তু; মনের ভেতর দিন দিন তৈরি হওয়া ক্ষতটি আরও ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলে। শঙ্কিত করে তুলবে সমাজের পুরো ক্ষেত্রকে। কখনো রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠে প্রাণের সংবরণ।

কিন্তু, নিষ্ঠুরতার আঘাতে যাকে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হলো তার স্মৃতিকে আমরা কোন ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখবো? বিচার পাওয়া মানেই কি সবকিছু ফিরে পাওয়া নাকি আশা জাগানিয়ার পিছনে মরিচীকার মতো ছুটে চলা। এতে হাহাকারে নিজেকে সান্ত্বনার মাঝে একটু সংবরণ করে নেয়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

মানবিকতার সুন্দর নিদর্শন অন্তরাত্মার মাঝেই নিহিত। কিশোর বয়সটাই পরিবর্তনের কর্ণধার বলা যেতে পারে। তা সত্ত্বেও তাদের দ্বারা বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন দেখতে পাই না। যা দেখতে পাই তা শুধুই নেতিবাচক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি। অথচ আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থার মাঝেও কিশোর ক্ষুদিরামকে খুঁজে পাই। যেখানে সমাজে বিপ্লবের ছায়া ছড়িয়ে দিতে চেয়ে সমাজকে এক নিশানার মাঝে টেনে নিতে চেয়েছিল। যে পরিবর্তনটুকু তখনকার সমাজে কাম্য ছিল সেটুকুই ঘটাতে চেষ্টা করেছিল। উপেক্ষিত ছিল না কোন ইতিবাচক ঘটনার। এ ধারাটা যেন সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যায়। তবেই আমরা দেখতে পাবো সুন্দরের মিশেলে গড়ে উঠা এক সভ্য সমাজ।

পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা যাদের কিশোর গ্যাং বলে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি তাদেরও সুন্দর একটা পৃথিবী এই জগৎকালে রয়েছে। কিন্তু, অবস্থার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে অন্ধকার জগতের সাথে তারা সর্বদাই নিজেদের আবদ্ধ করে রাখে। দু:সহ যাতনার বারতা সেখানে শৃঙ্খলিত জীবনকে বার বার ভেঙ্গে দেয়। হাহাকারে মনের মাঝে জেগে উঠে বিষণ্নতার ছাপ।

বিচিত্র এ ভুবনে তারপরও বেঁচে থাকার আর্তি নিয়ে সমাজকে কেউ জাগাতে চায়, কারো জীবন নিষ্পেষিত হয়ে থেমে যায়। নিষ্প্রভ সমাজে দেখতে পাওয়া যায় শেষ অবধি নিষ্কৃতির চাওয়া। কিন্তু অভিশপ্ত জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের নিকষ কালো থাবা। স্থবিরতা ধেয়ে আসলে সমাজ যেমন অস্থিরতার বেড়াজালে আটকে থাকে, কিশোর গ্যাংয়ের অচ্যুত থাবা আমাদের সুন্দর সমাজ ব্যবস্থাকে আরো অবনমিত করে। অথচ আতঙ্কের কালো মেঘের আস্তরণ ভেদ করে আশার আলোকচ্ছটা দেখা যাবার কথা এই কিশোরদের হাত ধরেই।

 

অনজন কুমার রায়
ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top