সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭

কর্মজীবী নারীদের জীবনযুদ্ধ : কাজী খাদিজা আক্তার


প্রকাশিত:
৬ মার্চ ২০২১ ১৬:০০

আপডেট:
৬ মার্চ ২০২১ ১৬:২৩

 

আমার কর্তব্যপ্রেমী পুলিশ বাবা আর নিষ্ঠাবান গৃহিণী মা আমাকে ছোটবেলায় বলতেন, লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াও। শিক্ষাগুরু সকলে নিজ দায়িত্বে বলে দিতেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখো। বড়দের মুখে শুনেছি, নিজের পায়ে দাঁড়াও অনেক বড় হও। আমি ভাবতাম নিজের পায়েইতো দাঁড়িয়ে আছি। এ কেমনতরো কথা। যখন বুঝতে পারলাম, তখন থেকে সেই অদৃশ্য পায়ের খোঁজে মনকে নিবিষ্ট করলাম। তারপর চলে গেলো অনেকগুলো বছর। হয়তো সেই অদৃশ্য পায়ের উপর ভর করে কিছুটা হলেও দাঁড়াতে শিখেছি।

সময়ের হাত ধরে সকল বাঁধা, বঞ্চনা, কাঠিন্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে নারীসমাজ আজ এগিয়ে চলছে দেশের উন্নয়নের গতিধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বাংলার নারী আজ দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ের বিভিন্ন সূচকে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে ভূমিকা রেখে চলছে। আর সেই দৃশ্য প্রতীয়মান হয় তখন, যখন আমরা দেখতে পাই দেশের সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট পেশা থেকে শুরু করে কৃষি, নির্মাণ প্রকল্প, পোশাক শিল্প কারখানায় নারীর সচেতন কর্মযোগ এবং সরব উপস্থিতি। দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধির  এই যে ফসল তার অর্ধাংশ যে নারীর অবদান সে কথা অস্বীকার করবার কোনো ফুরসত নেই।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশের প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবী মানুষের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ নারী, ১৬ হাজার ৭০০ নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা, পোশাক শিল্পে ৮০ শতাংশই নারী কর্মী। কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সে দেশের নারীসমাজ কতটুকু অবদান রাখছে তা নিশ্চয়ই এই পরিসংখ্যানটি দিয়ে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এবং তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। নারীসমাজের সকল ক্ষেত্রের এই উন্নয়নের পেছনে সরকারের অবদান অধিকাংশ। কিন্তু আমি বলছিলাম এই যে উন্নয়নের চালিকা শক্তি নারীসমাজ, তাদের কর্মজীবন যুদ্ধের কথা। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে সরকারি উচ্চপদস্থ কিছু নারী ছাড়া বাকি সবাই কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলো প্রতিনিয়ত সামাল দিচ্ছেন এবং এরই মধ্য দিয়ে  নিজের কর্তব্যটুকু পালন করে যাচ্ছেন। একজন সাধারণ কর্মজীবী নারীর জীবনযুদ্ধ শুরু হয় সেই সক্কাল বেলায়। সকালের খাবার, বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ, স্বামীর কর্মক্ষেত্রে যাবার প্রস্তুতিতে সাহায্য করা, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি যাবতীয় সংসারের সকল কর্ম শেষ করে সঠিক সময়ের মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছাতে গিয়ে দেখা যায় অনেকসময়  নিজের সকালের নাস্তাটাও করা হয়না। এরপর রাস্তায় বেরুলে যাত্রাপথে মহিলা যাত্রীদের বিভিন্ন ভোগান্তির কথা আমরা সবাই অবগত আছি। কর্মস্থলে পৌঁছুতে দেরি হলে বসের চোখ রাঙানি আর কটুকথা তখন হাসিমুখে গলাধঃকরণ না করে উপায় নেই। আমরা অনেকই ভুলে যাই যে কর্মজীবী নারীদের দুটি কর্মস্থল থাকে, একটি তার পরিবারে এবং অন্যটি তার অর্থনৈতিক কর্মস্থল। এই দুটি ক্ষেত্র সামাল দিতে গিয়ে তার যে কি বেগ পেতে হয় তা কেবল সেই কর্মজীবী নারীরাই জানে। এই চলার পথে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যদি সাহায্যসুলভ মনোভাব নিয়ে না এগিয়ে আসে তাহলে যুদ্ধক্ষেত্র আরও কঠিন হয়ে পরে।

সকল শ্রেণির কর্মজীবী নারীরা সবচেয়ে কঠিন সময় পার করে যখন তারা ' মা' হয়। সরকারিভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছ'মাস। এই ছ' মাস পার হয়ে যায় যখন বাচ্চার বয়স থাকে, চার কি পাঁচ মাস। এরপর শুরু হয় কঠিন কর্মজীবন। তাছাড়া এখন যৌথপরিবারের অস্তিত্বও কম আর গৃহপরিচারিকা সেতো সোনার হরিণ। তাই একদিকে বাচ্চা আর একদিকে চাকরি নিয়ে কর্মজীবী নারীদের এ কঠিন জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়। সংসারে স্বামী  স্ত্রী উভয়ই যখন চাকরি করেন, আর সন্তানের দেখাশোনার জন্য কেউ থাকেনা, তখন চাকরিটা টিকিয়ে রাখাই অনেক নারীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। জীবনে অনেক কষ্ট করে, সমাজ, পরিবারের অনেক বাঁধা বিপত্তি, কটুকথা পার করে যখন একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয় তখন কে চায় চাকরিটা হাতছাড়া হোক। আর এই চাকরিটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কর্মজীবী নারীদের সময়ের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। কর্মজীবী নারীদের এই কষ্ট লাঘব করার জন্য দরকার ' ডে- কেয়ার' এর ব্যবস্থা করা, এবং তা কর্মক্ষেত্রের ভেতর হওয়া খুবই জরুরি। ' শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র ' এর নিশ্চয়তা যদি প্রত্যেক কর্মক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যেতো তাহলে হয়তো নারী কর্মী বা শ্রমিকরা আরও বেশি কাজে মনোযোগী থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বেশি অবদান রাখতে পারতো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা গেছে, কর্মজীবী নারীদের একটি বিরাট অংশ চাকরি ছেড়ে দেয় শুধু তাদের সন্তানদের  দেখাশোনা করার কেউ নেই বলে। এথেকে অনুমান করা যায় যে, ' ডে- কেয়ার' এর বিষয়টি নিয়ে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। বেসরকারিভাবে ঢাকায় কিছু ' ডে- কেয়ার ' প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তবে এতে আস্থা নেই অনেকেরই। তাই কর্মস্থলে ' শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র ' এর ব্যাবস্থা করা আবশ্যক। কারণ প্রত্যেকের কাছেই  তার সন্তানের নিরাপত্তা সবার আগে। তবে

এক্ষেত্রে আমরা যদি আমাদের যৌথপরিবার গুলোকেও টিকিয়ে রাখি তাহলে সবাই সবার প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে পারি। শুধু প্রয়োজন নয় ভালোবাসারও পরিচয় পাওয়া যায় যৌথপরিবারের বন্ধনে।

বিভিন্ন গবেষণার প্রতিবেদনে উঠে আসে পেশাগত জীবনে সিংহভাগ নারীই অবহেলা, অপমান আর অবিচারের মধ্যে কর্মজীবন চালিয়ে যান। এর মধ্যে নারী শ্রমিকরাই বেশি। মূলত এদেশের পোশাক শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে নারী শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমে। কিন্তু তারা তাদের পরিশ্রমের সঠিক পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। এছাড়াও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে রয়েছে পুরুষ সহকর্মীদের কটুক্তি, অশালীন আচরণ। এমনকি নারী কর্মীদের জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট ওয়াশরুম। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে হয় সারাদিন ধরে। তারপর রয়েছে পুরুষ এবং নারীর মধ্যে মজুরি অসমতা। ইত্যাদি বিভিন্ন অসুবিধা এবং অসমতার মধ্যে কাজ করে যেতে হয় নারী শ্রমিকদের।

সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলার অনেক পরিবারই এখন নারী সদস্যদের প্রতি বা মেয়ে সন্তানদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী। সকল মা বাবাই চায় তাদের ছেলে সন্তানদের পাশাপাশি তাদের মেয়ে সন্তানটিও সময়ের সাথে এগিয়ে যাক। সেজন্যই নারীসমাজ এগিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। নারীসমাজের অংশগ্রহণে আরও শক্তিশালী হবে আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থান। এই এগিয়ে যাওয়ার পথটি আরও মসৃণ ও সহজ সুন্দর করার জন্য কর্মজীবী নারীদের প্রতি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে আরো অনেক বেশি মনোযোগী হতে হবে এবং এটাই কাম্য।

 

কাজী খাদিজা আক্তার
প্রভাষক (ইংরেজি)
সরাইল সরকারি কলেজ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top