সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮

আলোদূষণ ও শব্দদূষণ : আবু আফজাল সালেহ


প্রকাশিত:
১০ জুন ২০২১ ১৩:২৮

আপডেট:
২১ জুন ২০২১ ০৪:৪২

 

আলোদূষণ ও শব্দদূষণ নিয়ে আলোচনা একেবারেই কম। কিন্তু এ দুটো দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব-ঘাতক। উন্নয়ন-গতির সাথে সাথে এ দূষণ বাড়ছে। মানুষ্যসৃষ্ট কারণেই ফলাফল ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় কারণে বৃদ্ধির হার তরান্বিত হচ্ছে। অধিক ভোগ বিলাসিতার জন্য আলো দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। শিল্পায়নের সাথে সাথে শব্দদূষণের মাত্রা উর্ধমুখী। শব্দ প্রাণীকূলের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু এর সীমা থাকা দরকার। যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।

বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবল (শব্দের নিন্মতম পরিমাপক) সাময়িকভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেয়, আর ১০০ ডেসিবেল শব্দ হলে চিরতরে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে। শব্দদূষণের সাথে বধিরতার সম্পর্ক রয়েছে। আকস্মিক তীব্রশব্দ কানের ভয়াবহ ক্ষতি করে। স¤পূর্ণ বধিরও করতে পারে। যানবাহন ও শিল্পকারখানা থেকে ভয়াবহ শব্দ দূষণ হয়। শব্দদূষণের ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগ, মস্তিস্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়া রোগ হয়ে থাকে। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, মাথাধরা, বমি বমি ভাব ও মানসিক অস্বাভাবিবকতা হতে পারে। একটানা গাড়ির শব্দ বা উচ্চশব্দ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কলকাতা ও ঢাকা এখন ভয়াবহ শব্দদূষণের শিকার। বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক শহরের শব্দ সহ্যসীমার অনেক বেশি রয়েছে। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণমাত্রার দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত রয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কলকাতা ও ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ লোকের শ্রবণশক্তি কমে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

আইনের প্রচার ও বাস্তবায়ন, সচেতনতা সৃষ্টি, হর্ণ বাজানো থেকে বিরত, জেনারেটর ও যন্ত্রপাতির শব্দ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা করতে হবে বা রাখতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ণ বাজানোর ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা আছে- যা কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। শিল্প-এলাকায় কম শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। যন্ত্রপাতিগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যথা সম্ভব মাইকের ব্যবহার কম করতে হবে। এড়িয়ে চলতে পারলে খুব ভালো হবে। তা নাহলে কম শব্দ সৃষ্টি করে এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। জাপানিরা বা উন্নত দেশের লোকেরা কথা কম বলেন। কাজ বেশি করেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। আমরা ধীরে ধীরে এ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি।

এবার আসি আলো দূষণের কথায়। রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কিছু লাইন এরকম- ‘আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা’। কৃত্রিম-আলোতে বিশ্ব ভরে গেছে। শহরে অনেক সময় রাত ও দিনের পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে পরে । অনেক শহর  কৃত্রিম আলোয় দিনের ফ্লেভার পায়। উন্নত দেশের বেশিরভাগ শহর তো এরকমই। কায়রোকে তো বাজারের শহর বলা হয়। রাতের বেলায় জাঁকজমক বেশি হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধান শহরগুলো এমনকি জেলা বা মফঃস্বল অনেক শহরে আলোর খেলা চলে রাতে। কসমেটিক বা বিপনীকেন্দ্রগুলোতে রাতেই উপচেপড়া ভিড় হয়। কর্মব্যস্ত মানুষ রাতেই বাজার বা মার্কেট করতে চাই। বাচ্চারাও কৃত্রিম আলোর নাচুনীতে মুগ্ধ হয়ে অভিভাবকদেরকে বাইরে যাওয়ার জন্য প্রভাবিত করে। এ সংখ্যা এখন বেড়েই চলেছে। কসমেটিক বা বিপনীকেন্দ্রগুলোর কৃত্রিম আলো বাচ্চাসহ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। দেখা যায় অনেক শহরে দিনের আলোর চেয়ে রাতে কৃত্রিম আলোয় আকাশ জ্বলজ্বল করে। রাতের বেলা আকাশ বা গ্রহ-তারা কৃত্রিম আলোর ছটায় পরিস্কার দেখা যায় না। লোকালয়ের অনেক দূরে দেখতে যেতে হয়। তখনই আমরা ধরে নেব আলোক দূষণ চরম মাত্রায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের ৮৩ শতাংশ শহর আলো দূষণের শিকার। আমেরিকার আর ইউরোপের প্রায় শতভাগ (৯৯ শতাংশ) শহর আলো দূষণের শিকার। কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর সবচেয়ে বেশি আলো দূষণের শিকার। আর দক্ষিণ আফ্রিকার সাদসহ দরিদ্রপীড়িত দেশ কম আলো দূষণের শিকার। দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নের একই গতিতে আলো দূষণের হার বেড়েই যাচ্ছে।

জার্মানির কোলন জ্যোতিবিজ্ঞানী হ্যারাল্ড বার্ডেন হাগেন পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান থেকে বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই রাতের আলর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য অন্যদিকে জীববৈচিত্রের ক্ষতিসাধন। এছাড়া রাতের কৃত্রিম আলোর ছটা  আকাশের গ্রহ-তারাকেও  ম্লান করে দিতে পারে। তিনি আরো বলেন, এটা মানুষের উপরেও প্রভাব ফেলে। এটি বডি-ব্লক ওলটপালোট করে দিতে পারে। রাতের কৃত্রিম আলোর কারণে স্তন ও প্রস্ট্রেট ক্যান্সারের আশংকাও বাড়িয়ে দেয়। যেসকল প্রাণীরা অন্ধকারে চলাচল করে তাদের জন্য কৃত্রিম আলো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বাদুড় লক্ষ্ণী-পেঁচা, হুতুম পেঁচা, শিয়াল, বনবিড়াল প্রভৃতি প্রাণীর চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। বংশবিস্তার কমে যায়। সোডিয়াম আলোর কারনে অনেক প্রাণী বাসস্থানের পরিবেশ নষ্ট হয়। অন্ধকারে চলা বা নিশাচর প্রাণীরা খাদ্যসংকটে পরে। পোকামাকর, কীটপতঙ্গের জীবনযাত্রা দিন-রাতের নিয়তির উপর নির্ভর্শীল। ফলে জৈববৈচিত্র বিপন্ন হয়। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এলইডি প্রযুক্তি আসার পর আলোর ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। ভিজিবল ইনফ্লায়েড ইমেজিং রেডিও (ভিআইআইএস)-এর মাধ্যমে দেখা যায়, কলকাতা ও ঢাকায় কৃত্রিম আলোর তীব্রতা বেড়েছে দুই শতাংশেরও বেশি। এতে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন- বাস্তুতন্তে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ঠিক রাখার জন্য অন্ধকার খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক কীটপতঙ্গের খাবারের যোগান উদ্ভিদ থেকেই হয়ে থাকে। অনেক উদ্ভিদের ফুল ফোটে অন্ধকারে। উদ্ভিদ থেকে বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড নিস্বঃরণ হয়।পরাগায়ণ হয় রাতের বেলায়। নিশাচর কীটপঙ্গের মাধ্যমে অনেক উদ্ভিদের পরাগায়ণ হয়ে থাকে। যা রাতের বেলায় বা অন্ধকারে হয়। আলোর প্রভাবে প্রকৃতির এই চেইনও বিঘ্ন হচ্ছে।

বিশ্বে উৎপাদিত  বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ কৃত্রিম আলো তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। অতিরিক্ত আলোর এলাকায় বিলবোর্ডের আলোর ঝলকানিতে গাড়ির চালক নিশানা ভুল করতে পারেন। আলোক সংকেত নাও দেখতে পারেন। ঢাকা ও কলকাতার রাস্তার দুধারে অনেক আলোক-বিলবোর্ড রয়েছে। কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যবহার করা হয় তার ৩০-৬০ ভাগ পর্যন্ত অপচয় হয় বলে জানা যায়। সড়কবাতি, বিলবোর্ড ইত্যাদি ব্যবহারের প্রয়োজনে আলো যাতে কম ছড়ায় তা খেয়াল রাখতে হবে। অনেক দেশেই আবিষ্কৃত (যেমন- জার্মানি) হয়েছে লক্ষ্যবস্তুতে আলোকিত করার বাল্ব। এতে চারিদিকে আলো ছড়িয়ে যাবে না। কিন্তু আমাদের অনেক অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য থাকে লোক দেখানো বা জাঁকজমক করা। এতে আলোর অপচয় হবে। আলো দূষিত হবে। সচেতনতাই কেবল পারে আমাদের দেশে শব্দদূষণ ও আলোক দূষণ কমাতে। এ ব্যাপারের সরকারের সাথে আমরাও এগিয়ে আসব। ব্যর্থ হলে আমদের ভবিষ্যতের জন্যই খারাপ হবে। 

 

আবু আফজাল সালহে
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top