সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

উন্নত জীবনমান শিক্ষকের অধিকার, দয়া নয় : শাকিলা নাছরিন পাপিয়া


প্রকাশিত:
৬ অক্টোবর ২০২১ ১৭:০৬

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০৫:২৬

 

ইউনেস্কোর মতে, "শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।"
১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ই অক্টোবর বিশ্বের ১০০ টি দেশ ইউনেস্কোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করে আসছে।
বাংলাদেশেও এই দিনে শিক্ষক দিবস পালিত হয়।

বিশ্বের নানা দেশে শিক্ষকদের সম্মানার্থে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। তবে নানা দেশে নানা তারিখে এ দিবসটি পালিত হয়।
যেমনঃ
১/ আর্জেন্টিনাঃ রাষ্ট্রপতি ডোমিঙ্গো এফ সার্মিয়েন্টোর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১১ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালিত হয় আর্জেন্টিনায়।

২/ ভূটানঃ ভূটানের রাজা জিগমে দোরজি ওয়াঙ্চুকের জন্ম জয়ন্তীর দিন ২রা মে শিক্ষক দিবস পালিত হয় সে দেশে। তিনি ভূটানে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন।

৩/ ব্রাজিলঃ ১৯৬৩ সালের ১৫ ই অক্টোবর ব্রাজিলে আনুষ্ঠানিক ভাবে শিক্ষক দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

৪/চীনঃ চীনে শিক্ষক দিবস পালিত হয় ১০ ই সেপ্টেম্বর।

৫/ ইন্দোনেশিয়াঃ ইন্দোনেশিয়ার টিচার্স এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠার দিন ১০ই সেপ্টেম্বর। এই দিনটিকে তারা শিক্ষক দিবস হিসাবে পালন করে।

৬/সিঙ্গাপুরঃ সিঙ্গাপুরে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শুক্রবার পালিত হয় শিক্ষক দিবস।

৭/ ভারতঃ প্রতিবেশী দেশ ভারতে শিক্ষক দিবস পালিত হয় ৫ই সেপ্টেম্বর। ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, অধ্যাপক ছিলেন।১৯৬২ সাল থেকে তাঁর জন্মদিন ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।
রাধাকৃষ্ণণ বিশ্বাস করতেন, দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের শিক্ষক হওয়া উচিৎ।
আন্তর্জাতিক সমীক্ষা মতে,১০ টি দেশে শিক্ষকের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। এই ১০ টি দেশ হলো--
১/ চীন
২/মালয়েশিয়া
৩/তাইওয়ান
৪/রাশিয়া
৫/ইন্দোনেশিয়া
৬/দক্ষিণ কোরিয়া
৭/তুরস্ক
৮/ভারত
৯/নিউজিল্যান্ড
১০/সিঙ্গাপুর।
এই দেশগুলো শিক্ষার উৎকর্ষতায় এবং শিক্ষার্থীর দক্ষতার দিক দিয়েও অন্যান্য দেশের চেয়ে এগিয়ে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষক দিবস পালিত হয়।শিক্ষা যদি জাতির মেরুদন্ড হয় তাহলে সে মেরুদন্ড গড়ার দায়িত্ব শিক্ষকের। ন্যায়, নিষ্ঠা, সত্যবাদীতা, সাহসিকতার প্রতীক হিসাবে গন্য করা হয় শিক্ষককে। শিক্ষকের স্থান অন্য সবার চেয়ে আলাদা। এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে মা -বাবার চেয়েও শিক্ষককে উচ্চ স্থানে স্থান দেয়া হয়।
আলেকজান্ডার তাঁর শিক্ষক এরিস্টটল সম্পর্কে বলেছিলেন, To my father, I own my life ;to Aristotle, the knowledge to live worthly.

আমরা স্বাধীনতার অর্ধশত বছরেও একটা শিক্ষানীতি তৈরি করতে পারিনি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঝলক যত বাড়ছে মানবিকতার দীনতা ততটাই প্রকট আকারে প্রকাশিত হচ্ছে।
মান সম্মত শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু মান সম্মত শিক্ষক সৃষ্টির পরিকল্পনা নেই।
শিক্ষক হলেন সেই শিল্পী, যিনি মানুষের সুপ্ত মানবিকতার বিকাশ ঘটিয়ে মানুষের মাঝে গড়েন নতুন মানুষ। শিক্ষকের মর্যাদার স্থান যখন সবার চেয়ে আলাদা হয় তখন তার দায়িত্বও সবার চেয়ে আলাদা হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, " মানুষের অন্তর্নিহিত পরিপূর্ণ বিকাশই হলো শিক্ষা, আর তার পথপ্রদর্শক হলেন শিক্ষক। "
শিক্ষকের দায়িত্ব,কর্তব্য এবং তার গুরুত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষকের নিজের উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে শিক্ষকের উন্নত জীবনমান শিক্ষায় কী প্রভাব ফেলে তা নিয়ে গবেষণা না করে, শিক্ষককে কীভাবে পাহারা দেয়া যায় তা নিয়েই গবেষণা করা হয়।
শিক্ষক হবেন সবকিছুর প্রভাবমুক্ত স্বাধীন, নির্ভীক। সত্য এবং ন্যায়ের প্রতীক। তার ব্যক্তিত্বের কাছে অবনত শিরে দাঁড়াবে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিও। বাস্তবে আমরা কি সে শিক্ষক এখন দেখি?

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও কি শিক্ষক নির্ভীক? আজ শিক্ষার্থীদের যে অবক্ষয়, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন তার জন্য দায়ী শিক্ষকদের অবনত শির। দাস মনোবৃত্তি।
আমরা নিজেদের উন্নত বলে যদি দাবী করি তাহলে, কেন শিক্ষকদের নূন্যতম জীবন যাপনের জন্য অধিকার আদায়ের প্রশ্নে রাস্তায় নামতে হবে?
আমরা শিক্ষকদের পাহারা দিতেই আমাদের মেধা ব্যয় করেছি এতোকাল।শিক্ষকদের শিক্ষক হিসাবে গড়ে তুলতে যে পরিকল্পনা , যে নীতি প্রয়োজন তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি।

শিক্ষক যখন তার সম্মান মর্যাদায় মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে না তখনই সমাজে ধর্ষক আর চোরের বাম্পার ফলন হয়। সম্প্রতি ধর্ষণ আর চাল চোর থেকে পর্দা, বালিশসহ নানা কেলেঙ্কারি সেটাই প্রমাণ করে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপাসনালয়ের চেয়েও পবিত্র।সেই প্রতিষ্ঠানে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা আলোকিত না হয়ে লোভী,দানবে কেন পরিণত হয় সেটাও ভেবে দেখা উচিৎ।
আবরারকে কি আমরা ভুলে গেছি? ভুলে গেছি কি এমসি কলেজের সেই আগুনের কথা, যা দেখে সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী চোখের জল ফেলেছিলেন? আমরা কি ভুলে গেছি জাহাঙ্গীরনগরের ধর্ষণের সেঞ্চুরির কথা?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল অভিভাবক অধ্যক্ষ/ উপাচার্য।আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের মেরুদন্ড সোজা করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শাসন করার ক্ষমতা কি আছে?
হুমাযূন আহমেদ তার একটি বইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে থাকাকালীন স্মৃতি চারণে উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন নেতারা কীভাবে হলের একটা রুমে এক নারীকে আটকে রেখে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছেন। প্রতিবাদ করেও কিছু করতে পারেননি তিনি। ক্ষোভে লিখেছিলেন, মেরুদন্ড তখনও ছিল না শিক্ষকদের, এখনও নেই।
যারা ছাত্রাবস্থায় নানা নির্যাতন, অন্যায় করে, ক্ষমতার দাপটে অন্যদের পদানত করে পরবর্তীতে তারাই নেতা হয়, ক্ষমতার দন্ড হাতে নেয়।
রাজনীতি হিসাব করে কার আমলে কতোটা অন্যায় হয়েছে।আমরা সাধারণ মানুষেরা দেখি আমাদের সন্তানগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।তাদের কোন বর্তমান নেই, তাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই।
একটা নষ্ট সমাজকে, একটা বিভ্রান্ত প্রজন্মকে, একটা অস্থির সময়কে আলোকিত পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব শিক্ষকের।
প্রশ্ন হলো,সেই শিক্ষক রাষ্ট্র চায় কি না?
যে শিক্ষকবৃন্দ দারিদ্রতাকে বহন করে, বৈষম্যকে ধারণ করে সমাজে জ্ঞানের আলো বিতরণ করে যাচ্ছেন তারা এ জাতিকে দয়া করছেন। এ জাতির সেটা বুঝতে হবে।
জাতীয়করণের দাবীতে যারা পথে নামছেন তাদের কথা রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। শিক্ষকবৃন্দ যাদের নীতি নির্ধারক তৈরি করে উচ্চাসনে বসিয়েছে তাদের গুরুদক্ষিণা দেবার সময় এসেছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যারা বছরের পর বছর বঞ্চিত,তাদের অধিকারের কথা, তাদের চাওয়া পাওয়ার কথা,তাদের ত্যাগের কথা এবার রাষ্ট্রকে শুনতে হবে।
আলোচনা, টক শো, শুভেচ্ছায় শিক্ষকদের শত বঞ্চনার সমাধান হবে না।
শিক্ষকদের উন্নত, ঈর্ষণীয় জীবন আর মেরুদন্ড সোজা করে বাঁচার অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার শপথ নিতে হবে।
মেধা আর মননে দেশের সেরা যারা তারাই আসবে এ পেশায়। এর জন্য তৈরি করতে হবে পথ।

যারা নিজেদের সুখ, সম্পদ, বিত্ত বিসর্জন দিয়ে যুগের পর যুগ জ্ঞানের আলো বিতরণ করেছেন অকাতরে সেই শিক্ষা গুরুদের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আগামী দিনের মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য আজকের শিক্ষা গুরুদের জীবন আলোকিত করার গুরুদক্ষিণার দাযিত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে।

শিক্ষকদের জন্য উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষক দিয়ে প্রথম শ্রেণির নাগরিক তৈরি হয় না। মান সম্মত শিক্ষকের জন্য মান সম্মত জীবনমান নিশ্চিত করতে করতে হবে।



শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
শিক্ষক, কলামিস্ট ও কবি

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top