সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৭ই কার্তিক ১৪২৮

বিপন্ন পরিবেশ ও উষ্ণায়নের প্রভাব : অঞ্জন কুমার রায়


প্রকাশিত:
৭ অক্টোবর ২০২১ ১৮:৪৯

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০৬:৫৭

 

যদি অরণ্য রক্ষার পাঠ শুরু করি শৈশবের লগন থেকেই, তাহলে আরণ্যকদের ছায়া দান করে বাঁচিয়ে রাখবে আগামীর দিনগুলোতে। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে পরিবেশের প্রাণকে ধরে রাখতে হবে, এ ভাবনা যখন প্রাচীনকালের মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয় দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান তখনো ততখানি সহায়ক হয়ে উঠেনি। কারণ, তারা ভেবেছিল মানুষের হস্তক্ষেপ থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে পারলে তবেই গাছ-গাছালি রক্ষা পাবে। সে ধারণা মতে, গাছ-গাছালির সঙ্গে সম্পর্কিত লোক কথা, মিথ, জনশ্রুতি ইত্যাদি জুড়ে জায়গাটিকে রক্ষা করার উপায়ে পরিবেশ ধরে রাখতে চেয়েছিলেন যাকে ‘সেক্রেড গ্রুভস’ অভিধায় অভিহিত করা হয়।
প্রাচীনকালে মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। প্রকৃতিকে ভাবা হতো মানুষের জীবিত থাকার উত্তম পন্থা। আস্তে আস্তে প্রকৃতির উপর অত্যাচারে ধ্বংসাত্মক কাজ চালিয়ে যায়। ক্রমেই বাড়তে থাকে পরিবেশ দূষণজনিত সমস্যা। বস্তুত, মানুষ যেদিন প্রকৃতি থেকে সরে আসায় সভ্যতার গায়ে ছোঁয়া লাগে সেদিন থেকে প্রকৃতির উপর আঘাত হানতে শিখে। যাদের নিষ্ঠুতার শিকার থেকে বাদ যায়নি বৃক্ষরাজি। ফলে আমাদের বসবাসযোগ্য পৃথিবীর মাঝে প্রতিনিয়ত শক্সকা ঘনিভূত হয়ে আসে। আমরা তা থেকে পরিত্রাণের আশায় বিভিন্ন পথ খুঁজে বেড়াই। অথচ প্রকৃতিকে তাদের মতো করে বাঁচতে দিলে আমাদের জীবদ্দশায় এ পরিণাম ভোগ করতে হতো না।
মানুষ যেদিন থেকে গতিকে নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষমতা যন্ত্রের হাতে সঁপে দিয়েছে সেদিন থেকে পরিবেশ বিপন্ন হতে চলেছে। গতির মোহে অন্ধ হয়ে বন-জঙ্গল কেটে কখনো বসত-বাড়ি স্থাপন, কখনো বা সেখানকার জীব-জন্তুদের বিতাড়ন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোথাও পাহাড় কাটা, কোথাও বন উজাড়করণ হচ্ছে অর্থাৎ পরিবেশের উপর নিপীড়ন আমাদের সেটাই দেখিয়ে দেয়। এ ঘটনা যেন আরো বেশি করে প্রমাণ দিচ্ছে বৃক্ষচ্ছেদন ও অরণ্যের উপর অত্যাচার যা পরিবেশের পাশাপাশি বাস্তুতন্ত্র ও প্রকৃতি ঘেষা মানুষগুলোকে বিপন্ন করে তুলছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঋতুচক্রের বদল ঘটছে। এ ঘটনাগুলো আমাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দেয়। অথচ, উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করতে কিংবা গ্রীণ হাউস গ্যাস সামলাতে গাছ হতে পারে মোক্ষম পরিচায়ক।
আমাদের শিশুরা যখন বুঝতে পারবে সময় থাকতেও আমরা সঙ্কট সমাধানে এগিয়ে আসিনি তখন ভবিষ্যৎ পন্থা শিশুদের আমরা কিভাবে পথ দেখিয়ে দেব? ইহা আরো গভীর থেকে গভীরতম সঙ্কটে ফেলে দেবে। তাহলে আমরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা কিভাবে বিবেচনা করব। পরিবেশ না বাঁচলে পৃথিবীর সমস্যা ঘনিভুত হবে। তাতে জীব-জন্তু, মনুষ্যকুলের সর্বস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। হয়তো আপন বাসগ্রহের গ্রহবাসী মানুষের ঔদাসীন্যতা মুল কারণ। ঔদাসীন্যতার পেছনে নীতিভ্রষ্ট বাজার সর্বস্ব অর্থনীতিও যথেষ্ট কারণ। নদী, পাহাড়, মৃত্তিকা, অরণ্য- সকলি সেই বাজারের দৃষ্টিতে আয় বৃদ্ধির উপকরণ। তাতে অন্য কোন মূল্য মাপার হাতিয়ার বাজারের হাতে নেই। তার সাথে অতি আধুনিকায়নে নির্মিত মনুষ্যকুলের সৃষ্ট সম্পদ। তাতেই বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রাণ হারাচ্ছে শতবর্ষী পুরণো গাছ কিংবা বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যরে আধার।
আগেকার সময়ে মানুষের সাথে প্রকৃতির একটা মেলবন্ধন ছিল। যে কারণে গাছ-পালার কোন ক্ষতি সাধন না করে প্রযোজনীয় কাজ করার উপায় খুঁজে বের করে নিত। এখনো যারা গাছ-গাছালির সংস্পর্শে থেকে বেড়ে উঠে, তারা প্রকৃতির সংস্পর্শকে উপলব্ধি করতে পারে বলেই অনেক জায়গায় বন জঙ্গল টিকে আছে। বিশেষ করে যারা পাহাড়ের কুলে কিংবা বন-জঙ্গলে আনাচে-কানাচে বেড়ে উঠে তাদের কাছে গাছ এখনো মাতৃসম। তাই তারা প্রকৃতির মেলবন্ধনে গাছকে সুরক্ষা প্রদান করে। যুগ যুগ ধরে আমরা সেটাই দেখে আসছি।
প্রকৃতির উপর হানা, প্রকৃতিকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন, আপাত দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা পেলেও ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে অন্ধকার। তবে এটা যে অতি দূরে নয় তা সহজেই অনুমেয়। যতই দিন যাচ্ছে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। দেখা দিচ্ছে পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব। এ পরিবর্তন পরিবেশের সাথে সাথে মনুষ্যকুলের উপরও বহমান রয়েছে। আমাদের যা কিছু আছে তাতে আমরা সুখী নই। আত্মতুষ্টির জন্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী গাছকে বিপন্ন করতে কুন্ঠাবোধ করি না। প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন করে কৃত্রিমতায় সুখ খুঁজে পাই। সেখানে ইট, বালি গেঁথে মানসিক প্রশান্তি আনয়নের চেষ্টা করি। অথচ, গাছ-পালায় বেষ্টিত সবুজাভের জায়গা পরিবেশ তথা সামগ্রিক জীবনে রূপরেখায় নির্ণীত হয়ে আছে।
মানুষ ক্রমশ বন-জঙ্গলে দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে চট্টগ্রামের সিআরবি কিংবা কক্সবাজারের বনভূমি সব জায়গা নিয়েই আমাদের মনে বিষমতার ছাপ। গাছ কর্তন করে নতুনভাবে কৃত্রিম প্রাণ জাগানো বেদনা দায়কই নয় বরং উদ্বিগ্নের বিষয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুস্থ পরিবেশের জন্য গাছের অবদান অনস্বীকার্য। গাছকে বাদ দিয়ে কিংবা পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন মানে পরিবেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। কখনো ভাবি না পরিবেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কয়টা গাছ রোপন করি, তার চেয়ে কর্তনেই আমরা বেশি মনোযোগী। আমাদের বোধটুকু হয়তো এমন, আমরা তো নিরাপদেই জীবন ধারণ করে বেঁচে আছি, যা হবে তা ভবিষ্যত ঘটনার দায়ভারটুকু পরবর্তী প্রজন্মই নেবে। কিন্তু, পরিবেশকে বাদ দিয়ে সাময়িক উন্নয়ন হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলবে। এমনিতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে দিন দিন পৃথিবী কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
কয়েক মাস আগে উত্তাল সাগরের জোয়ারে কক্সবাজারের উপকূলে প্রায় আট হেক্টর চারাগাছ এবং ৮৪ টি বড় ঝাউগাছ উপড়ে গেছে। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে ক্রমেই বিলিন হয়ে যেতে পারে ঝাউবন। প্রাকৃতিক ঘাত-প্রতিঘাতে ঝাউবন উজাড় হলে সমুদ্র তটে ভাঙ্গন দেখা দিবে। অপরদিকে, সমুদ্র তটের নিকটবর্তী এলাকায় কক্সবাজারের বনভূমি কাটা পড়লে আবহাওয়ার উপর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকবে, যার ফলে পরিবেশের উষ্ণায়ন বাড়তে থাকবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের নি¤œচাপের শক্তি বাড়ছে। যার ফলে, জলোচ্ছ¡াসের আশঙ্কা বেড়ে যাবে। আবার, উষ্ণায়ন বৃদ্ধির ফলে সাগরে জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে জল স্তর বৃদ্ধির হার বাড়ে। যার ফলে প্রবল জলোচ্ছ¡াসে জনপদ প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই, সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় এখনই অত্যাচার বন্ধ করা জরুরী। না হলে নিজেরাই নিজের ক্ষতি ডেকে আনবো।
আমাদের পরিবেশ আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ বিপন্ন হলে আমাদের সামগ্রিক জীবনের উপর বিরুপ প্রভাব পড়বে। শত বছরের পুরণো ঐতিহ্য রক্ষার দাবিতে অনেকেই মানব বন্ধনে শামিল হয়। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিআরবি এলাকা কিংবা শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেলে মানসিক প্রশান্তি মেলে। তাই, সিআরবিকে রক্ষায় গান, আবৃত্তি, পথ নাটক হচ্ছে। কিছুদিনের জন্য পরিবেশবাদীরা পরিবেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামে। কিছু সময়ের জন্য গাছ কাটা থামানো গেলেও পরক্ষণেই অন্য কোথাও গাছ কেটে কৃত্রিম সৌন্দর্য্য বর্ধন!
আমাদের চেতনায়ও লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য। যা দ্বারা নিজেরা উপকৃত হবো তা সাময়িকভাবে অন্যের ক্ষতির কারণ হলেও তা আমরা সাদরে গ্রহণ করি। তাই, পরিবেশ সচেতনতা আমাদের তেমন ভাবায় না। যার ফলে প্রতিনিয়ত বৃক্ষ নিধন কিংবা গাছ-পালা বিনষ্ট করে নতুনভাবে কৃত্রিম প্রাণ আনয়নের চেষ্টা করি। পরিবেশ আস্তে আস্তে বিপর্যস্ত হয়ে আসে। আমরা উষ্ণায়নের কথা চিন্তা করলেও সেটা তিমিরেই থেকে যায়। ফলে আমরা আর সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারি না।


অন্জন কুমার রায়
কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top