সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

বেকারদের দুর্দশার হেতু শুধুই কি প্রশ্নফাঁস : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
১৩ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:০৪

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০২:৫৯

 

২০১৭ সালে অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগের প্রিলিমিনারী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।  প্রথমবার, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষাটি বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। তাতেও গলদ থেকে যায়। দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কয়েকটি সেট কোডে বিভক্ত ছিল। কিন্তু, একটি নির্দিষ্ট সেট কোডের প্রশ্নে সমস্যা দেখা দেয়। একই সেট কোডের প্রশ্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র শুরু হয় দুটি ভিন্ন সাবজেক্টের (গণিত ও ইংরেজী) প্রশ্ন দিয়ে। একই সেট কোডে দু'টি ভিন্ন বিষয় দিয়ে প্রশ্নপত্র শুরু পরীক্ষার্থীরা সম্ভবত তখনই প্রথম দেখল। ফলে, পরীক্ষার্থীদের মনে এক ধরণের সংশয় তৈরি হলো। যার নেতিবাচক প্রভাব পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নে প্রতিফলিত হয়। উক্ত সেটের গণিত দিয়ে শুরু প্রশ্নে সবাই অকৃতকার্য হয়েছিল। বিষয়টি কারো দৃষ্টিগোচরে আসার কথা নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের অনেকেই বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাই ফলাফল পুনর্বিবেচনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেন। আবেদনখানা কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় এনে ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন করে। ফলে, অনুত্তীর্ণদের মাঝ থেকে অনেকেই উত্তীর্ণ বা কৃতকার্য হয়!

প্রথমবার প্রশ্ন ফাঁস, দ্বিতীয়বার ভাল পরীক্ষা দেয়া সত্ত্বেও পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নে ত্রুটি জনিত কারণে একটি নির্দিষ্ট সেটের প্রশ্নধারী (একই সেট কিন্তু গণিত বিষয় দিয়ে প্রশ্ন শুরু) পরীক্ষার্থী সবাই অকৃতকার্য থেকে যায়। বাদ পড়া পরীক্ষার্থীদের মাঝে সন্দেহ তৈরি না হলে পরবর্তী লিখিত পরীক্ষায় তারা অংশ গ্রহণ করতে পারতো না। যদিও পরবর্তী সময়ে তাদের মাঝ থেকে অনেকেই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়ে চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন। এখন তারা ব্যাংকে চাকরি করছেন। প্রথমবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, দ্বিতীয়বার ফলাফল মূল্যায়নে ত্রুটিজনিত কারণে মেধাবীরা চাকরি থেকে ছিটকে পড়েছিল। এ সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একটি ভুলের কারণেই সাধারণ পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি মেধাবীরাও ট্র্যাক থেকে ছিটকে পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা উত্তরপত্র মূল্যায়নে অসামঞ্জস্যতা সবই চাকরি প্রত্যাশীদের মনোবল নষ্ট করে দেয়। এভাবে চলতে থাকলে চাকরি প্রত্যাশীরা কোন জায়গায় আস্থা খুঁজে পাবে?

এমনিতে বেকারদের পক্ষে পরিবারের কাছে টাকা চাওয়া কষ্টের ব্যাপার। পরীক্ষার জন্য ঢাকায় যাওয়া-আসা বাবদ যে টাকার প্রয়োজন তা অনেকেই ধার-দেনা করে যোগান দিয়ে থাকে। এমনও অনেক পরিবার আছে বেকার ছেলে বা মেয়েটির দিকে চাকরি পাবার আশায় তাকিয়ে থাকে। এত কষ্টের পরও প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা অন্য কোন ভুলের কারণে পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে চাকরি প্রত্যাশীরা যাবে কোথায়? শুধু একটি পরীক্ষার আশায় প্রায় শুক্রবারেই চাকরি প্রত্যাশীরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসে। গত ৬ নভেম্বর পাঁচ ব্যাংকের অফিসার (ক্যাশ) পদে সমন্বিত পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল অনেক প্রার্থী। সেদিন ছিল পরিবহণ ধর্মঘট। তাই, অনেক কষ্ট করে ঢাকায় এসে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিন্তু, পরীক্ষার পর যখন শুনতে পেল প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তখন তাদের দু:খের সীমা ছিল না। যদিও পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

তবে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে চাকরি পরীক্ষার একটা অনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। কোন কিছুর বিনিময়ে চাকরি একবার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতের পথ সুগম হয়। চাকরি পাবার নিশ্চয়তার বিনিময়ের মাধ্যম ‘অর্থ’হলে অর্থকে তুচ্ছ বিবেচনায় নিয়ে চাকরির জন্য পাকা স্থান করা চাই। তাই, সেখানে ব্যাপারীর অভাব থাকে না। ঘটে প্রশ্ন ফাঁসের মতো অনৈতিক সকল ঘটনা। যার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।

আমাদের সময়ে আমরা কখনো প্রশ্ন ফাঁসের কথা শুনিনি। তবে, যেটুকু শুনতে পেতাম তা হলো পরীক্ষার হলে নকল করা। পরীক্ষার হলে প্রবেশের সময় কেউ কেউ টুকলি নিয়ে আসতো। তাছাড়া আর তেমন কিছু নয়। এখন নকলের পরিবেশ আর নেই। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা বাতিল করে নতুনভাবে পরীক্ষার আয়োজন করে। তবে, তা হলো প্রশ্ন ফাঁস থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সাময়িক উপায়। সব মিলিয়ে বেকারদের দুর্দশা লাঘবের কোন পথ নেই। যেখানে বেকারদের একবার পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করাই কষ্টকর, সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা ভুল পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ মানসিক পীড়া এবং অর্থনৈতিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চাকরি পরীক্ষার জন্য রাজধানী ঢাকায় বার বার যাতায়াত কতজন বেকারের সাধ্য থাকে। সেটা আমরা কখনো বিবেচনায় নেই না।

তাই, চাকরি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে সকল পরীক্ষার্থীর উপর দুর্দশা নেমে আসে। পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হলে যে কয়জন প্রশ্ন পায় শুধু তারাই অনৈতিকভাবে সুফল ভোগ করার চেষ্টা করে। তার প্রভাব অন্যজনকে তেমন বিচলিত করে না। যদিও তা কখনো কাম্য নয়। চাকরির মতো প্রতিযোগিতামুলক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের জন্য সবাইকে চরম মূল্য দিতে হয়। ফলে, যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। একজনের অনৈতিকতার দায় অন্যজনের সারা জীবনের দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা যে জায়গায়ই চষে বেড়াবে দুর্নীতি তাদের পিছু ধাওয়া করবে। কারণ, তাদের চাকরি জীবনের শুরুই হয় দুর্নীতির মধ্য দিয়ে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বেকাররা সবচেয়ে কঠিন সময় পাড় করছে। একদিকে করোনা কালীন সময়ের বেকারত্ব অন্যদিকে একই দিনে একসাথে অনেকটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া। তার উপর প্রশ্নফাঁস চাকরি প্রত্যাশীদের উদ্বেগের আরেক কারণ। বেকারত্বের কারণে তাদের না আছে চলার সামর্থ্য না থাকে কোন কিছুতে ভাল করার প্রত্যাশা। আছে শুধু না বলার ভাষা। এভাবেই তাদের কষ্টের দিনগুলো বহমান।

টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন সংগ্রহ করে কৃতকার্য হয়ে যারা চাকরি প্রত্যাশা করে তারা চাকরির ক্ষেত্রটাকে অশোভন করে তোলে। তাদেরকে যেভাবেই হোক খুজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা উচিত। ইতোমধ্যে তাদের অনেকেই ধরা পড়েছে। আশা করি মুল হোতা বেরিয়ে আসবে। এদের বিচার হবে, মেধাবীরা নিজেদের যোগ্যতায় চাকরি পাবে সেটাই হবে আমাদের পরম চাওয়া।

 

অনজন কুমার রায়
কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top