সিডনী শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ই ফাল্গুন ১৪৩০

শপথ করতে হবে - এটাই হবে শেষ ঘটনা : শাকিলা নাছরিন পাপিয়া


প্রকাশিত:
১১ আগস্ট ২০২২ ০২:২৮

আপডেট:
৩১ আগস্ট ২০২২ ০১:৫০

 

একই ঘটনা বারবার ঘটলে সেটা আর অবাক করে না মানুষকে। ফেসবুকের পোষ্ট থেকে এই যে অগ্নি সংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ এটা বহুকাল যাবৎ চলছে।
এটা এখন আর আমাদের অবাক করে না।
যেমন, শিক্ষকদের পিটানো, ঘুষি মেরে দাঁত ফেলে দেয়া, কান ধরে উঠ বস করানো, পিটিয়ে মেরে ফেলা, জুতার মালা দেয়া এগুলোও আমাদের এখন আর অবাক করে না।
আসলে এতো এতো ঘটনা প্রতিদিনই জীবনে ঘটছে যার কারণে অবাক হবার ক্ষমতা আমরা হারিয়েছি।
নাসির নগরের ঘটনা, রামুর ঘটনা, রসরাজের অসহায় মুখ আমাদের সহ্য হয়ে গেছে।
আমার স্কুল যে এলাকায় সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রতিটি ঘটনার পর আমি স্কুলে যাবার পথে মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাই।
আমার মনে হয় রাস্তার দু'পাশে বসে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষগুলো তীব্র ঘৃণা নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
ক্লাসে আমার হিন্দু শিক্ষার্থীদের সামনে আমি লজ্জায় ছোট থেকে ছোট হয়ে যাই।
আমার শিক্ষা, আমার শিখানো জাতীয় সংগীত আদৌ কি ওরা হৃদয়ে ধারণ করে এসব ঘটনার পর?
বছরের শুরুতেই প্রতিটি ক্লাসে ক্লাসে বলে দেয়া হয় টিফিনে কেউ যেন গরুর মাংস নিয়ে না আসে।কুরবানির ঈদের পরও যাতে কেউ গরুর মাংস দিয়ে স্কুলে টিফিন না আনে সে ব্যাপারে জানিয়ে দেয়া হয় আগেই।
ছোটরা সে আদেশ ঠিকমতো পালন করে।
শুধু বড়রাই বুঝে না ভালোবাসার কথা।
মানুষকে অসম্মানের মাঝে বড়দের থাকে এক পৈশাচিক উল্লাস। এখন সময়টাই যেন অসম্মানের অপমানের।
হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পর্কে যা শোনা যায়ঃ
১/ এ দেশে হিন্দুরা ভারতের চেয়ে নিরাপদে থাকে।
প্রশ্ন হলো এ দেশের মালিক কি শুধু মুসলিমরা? যুদ্ধ করার সময় মুসলিম, হিন্দু, পাহাড়ি সবাই যুদ্ধ করবে আর দেশের মালিক হবে শুধু মুসলিমরা। নিজের দেশে নিরাপদে থাকা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
২/ এ দেশে হিন্দুদের জামাই আদরে রাখা হয়।
আপনি রাখার কে? দেশ কি আপনার বাবার? নিজের দেশে নিজের মত করে সবাই থাকার অধিকার রাখে।
৩/ হিন্দুদের মুখে বাংলাদেশ, মনে ভারত।
বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যা লঘু - প্রতি পদে পদে তাদের মনে করিয়ে দেয়া হবে অথচ তারা নিজেদের অসহায় ভাবতে পারবে না। সমাজে,কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষায়, চিকিৎসায় সর্বত্র তাদের মনে করিয়ে দেয়া হবে তোমরা সংখ্যায় কম, তোমারা থাকবে এ দেশে দয়ায়, করুণায়। এ অবস্থায় যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করবে সেখানে অভিমানে বা ভয়ে যদি চলে যাবার চিন্তা করে সেটা কি অন্যায়?

ওপারে মুসলিমরা, এপারে হিন্দুরা একই অসম্মান, একই ভয় নিয়ে কি বাঁচে না?
আজ যদি হিন্দু ধর্মের কোন দেব দেবী নিয়ে অশ্লীল কোন মন্তব্য কেউ ফেসবুকে লিখে তা হলে কি নির্বিচারে মুসলিমদের ঘর বাড়ি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হবে?
সে সাহস কি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পাবে?
একটু একটু করে যে ঘৃণা , অসম্মান আর অত্যাচার এ দেশের লোভী, ক্ষমতাবানেরা হিন্দুদের উপহার দিয়েছে তারই ফলশ্রুতিতে সৃস্টি হয়েছে পাল্টা ঘৃণা। সংঘবদ্ধ হয়েছে, প্রতিহত করার প্রত্যয়ে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন সংগঠন।
দেশের বড় বড় পদে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা অধিষ্ঠিত। দেশে হিন্দু মন্ত্রী, এমপি আছেন। তারপরও একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।
কোন না কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে মন্দির ভাঙ্গা, ঘর- বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। উচ্চপদে বসে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের প্রতিবাদ কোথায়? তাদের কার্যকর ভূমিকা এমন কি কোন জোড়ালো প্রতিবাদও চোখে পড়ছে না।
দরিদ্র শ্রেণির মানুষের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেবার এই ধ্বংস যজ্ঞ চলছে বছরের পর বছর।
ধর্ম অবমাননা করে কেউ যদি পোষ্ট দেয় অথবা কেউ যদি কোন বক্তব্য দেয় অবশ্যই তার বিচার করতে হবে। দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে তাকে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু অপরাধি শনাক্ত না করেই তার সম্প্রদায়ের সবাইকে গণহারে শাস্তি দিতে হবে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিতে হবে এই ধৃষ্টতা কেন পাবে এদেশের মানুষ।
এতই যদি চেতনাধারী হয় মানুষ তাহলে এপর্যন্ত কোন দুর্নীতিবাজ, ধর্ষক বা অবৈধ ব্যবসায়ীর বাড়ি বা তাদের স্বজনদের বাড়ি কেন ভাঙ্গচুর হলো না?
যারা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বা আমাদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অসম্মান করে কথা বলার অভিযোগ তুলে, প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত না করে নির্বিচারে অসংখ্য মানুষের ঘর ভাঙ্গে, মন্দিরে অগ্নি সংযোগ করে তারা আমাদের মহানবী (স)কে বেশি অসম্মান করে।
বিদায় হজে বলা হয়েছে, একজনের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেয়া যাবে না।
মহানবী ( স) এর জীবন আর তাঁর কর্ম শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, সারা মানব জাতির জন্য আদর্শ। তাঁর সহনশীলতা, ক্ষমা, বিচার ব্যবস্থা, মানুষকে মানুষ হিসাবে সম্মান দেয়া গোটা মানব জাতির জন্য শিক্ষণীয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি নির্যাতন মহানবী(স) এর আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুতরাং বছর বছর এই যে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে তা মুসলিম সম্প্রদায় এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা পৌছে দিচ্ছে সর্বত্র।
একজন মুসলিম হিসাবে আমি অবশ্যই আমার নবী (স) সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যের বিচার চাই। প্রকৃত দোষীর শাস্তি চাই। সেই সাথে নিরাপরাধ মানুষের ন্যায়ের জন্য, তাদের সাথে ঘটা অন্যায়ের শাস্তিও আমি চাই।
আমার ধর্ম সম্পর্কে যারা মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদেরও শাস্তি দাবি করছি।
বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে একমাত্র জমি দখলের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন বিভেদ থাকে না। তখন সবাই এক হয়ে যায়।
ধর্মের নামে, সূক্ষ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে হিন্দুদের বাড়ি ঘরে হামলা চালিয়ে যারা নেপথ্যে থেকে কলকাঠী নাড়ে তারা সব সময় ক্ষমতাসীন দলেরই প্রতিনিধি।
কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। বিচার হবেই। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বের করা হবে।এসব কথা শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। এবার আমরা রেহাই চাই।
ঘৃণার বীজ বপন করে সম্প্রীতির বাণী প্রচার করে কোন লাভ নাই।
একজন শিক্ষক হিসাবে আমি আমার হিন্দু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চাই। তারা নিজেদের দেশে নিজেদের মত করে, সম্মানের সাথে বেড়ে উঠছে সেটা দেখতে চাই।
একজন মুসলিম হিসাবে আমার ধর্মের মানবতা, আমার নবী (স) ভালোবাসার আলো তুলে ধরতে চাই বিশ্বের কাছে।
একদল লোভী ক্ষমতাধর আর একদল ধর্মান্ধদের হিংস্রতার অনলে আমার হিন্দু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা হুমকীর মুখে। আমার মুসলিম শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে বিভাজনের দেয়াল, ঘৃণার বীজ। আমি আমার শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ভালোবাসার আলো জ্বালাবার জন্যই এই জঘন্ন ঘটনার অবসান চাইছি।
প্রতিশ্রুতি নয়, রাষ্ট্রকে শপথ করতে হবে -- ভবিষ্যতে এদেশে নাসিরনগর বা নড়াইলের মতো কোন ঘটনা ঘটবে না।

 

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
শিক্ষক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top