সিডনী রবিবার, ৩১শে মে ২০২০, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ঈদুল ফিতর - ২০২০ : আফরোজা অদিতি


প্রকাশিত:
২১ মে ২০২০ ০৬:২২

আপডেট:
২৪ মে ২০২০ ১৫:৪৯

 

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ-উৎসব। ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ ইসলাম ধর্মের প্রধান দুটি উৎসবের একটি; অন্যটি ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ইংরেজি সন অনুযায়ী আমাদের অফিস-আদালত চললেও অন্যান্য
পালাপার্বন চলে বঙ্গাব্দ ও হিজরি সন অনুসারে। মুসলিম সম্প্রদায়ের রোজার ঈদ, কোরবানির ঈদসহ অন্যান্য ধর্মীয়উৎসব চলে চান্দ্রমাস অনুসারে কারণ হিজরি বর্ষপঞ্জি চন্দ্রনির্ভর; এই বর্ষপঞ্জি অনুসারে রমজান মাস বছরের নবম মাস। অষ্টম মাসের শেষ দিন অর্থাৎ শাবান মাসের সন্ধ্যাকাশে চাঁদ দেখা গেলে রমজান মাসের শুরু; রমজান মাসকে দহনের মাসও বলা হয়ে থাকে কারণ রোজার মাধ্যমে ব্যক্তির পার্থিব লোভ-লালসা দগ্ধ হয়! রমজান মাসের সুবেহ্ সাদেক থেকে সন্ধ্যা (মাগরিব ওয়াক্ত শুরু) পর্যন্ত রোজা রাখা হয়। এই রোজার মাসেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরানশরিফ যা আল্লাহ্র নিকট থেকে হযরত মুহম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রাপ্ত ঐশী-বাণীসংবলিত মূল ধর্মগ্রন্থ।

ঈদের আগে রোজা রাখা ফরজ; রমজান এবং শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার ওপর রোজা রাখা এবং ঈদ উদ্যাপন নির্ভর করে। চাঁদ দেখে ইফতার করা ধর্মীয় রীতি বিধায় শেষ রোজাতে চাঁদ দেখার জন্য সকলে ফাঁকা স্থানে আসে; আকাশ যদি স্বচ্ছ থাকে, যদি নীলিম থাকে তাহলে চিকন কাস্তের মতো চাঁদ দেখা যায়। বর্তমানে নানাবিধ কারণে চাঁদ দেখতে পাওয়া যায় না। যেহেতু রোজা রাখা এবং ঈদ উদ্যাপন চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল সেহেতু চাঁদ দেখার কমিটি চাঁদ দেখতে পাওয়ার ঘোষণা দিলে রোজা এবং ঈদ-উৎসব পালিত হয়। ঈদ শুধু খুশি নয়; ঈদ হলো অন্যকে খুশি করে বা অন্যের খুশি দেখে নিজে খুশি হওয়া। অন্যকে খুশি করার জন্য ইসলাম ধর্মে জাকাত ও ফিতরা দেওয়ার নির্দেশনা বা নিয়ম প্রচলিত আছে; জাকাত-ফিতরা দেওয়া রমজান মাসের অংশ; জাকাত-ফিতরা রমজান মাসের মধ্যেই অর্থাৎ শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার আগেই আদায় করা উচিত। সামর্থবান ব্যক্তি যার জাকাত দেওয়ার তৌফিক আছে সেই ব্যক্তি দরিদ্রদের মধ্যে অর্থ বা পোশাক-আশাক বিতরণ করেন কেউ বা খাদ্য সামগ্রি দেন। জাকাত আদায় করা সামর্থবান ব্যক্তিদের ফরজ এবাদত; জাকাত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। জাকাতের অর্থে নিজে বা পরিবারের প্রয়োজন মিটাতে পারবেন না; জাকাত শুধু দরিদ্রদের হক। জাকাতের পরে পরিবারে স্বজনদের মুখে হাসি দেখতে পরিবারের কর্তাব্যক্তি নতুন কাপড়-চোপড় উপহার দেয় ছোটোবড়ো সকলকে। ফিতরা বা সদকাতুল ফিতরা ঈদের নামাজের আগেই আদায় করতে হয়; পরিবারের যিনি কর্তা তাঁকে ছোটো-বড়ো সকলের পক্ষে ফিতরা আদায় করতে হবে; ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

ঈদ নিয়ে অনেক কবি লিখেছেন কবিতা; আমাদের প্রিয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” গান দিয়ে শুরু হয় টেলিভিশনে প্রচারিত হয় প্রারম্ভিক ঈদ-অনুষ্ঠান; মুসলিম উম্মাহ্ মেতে ওঠে আনন্দ উৎসবে। শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্বের প্রতিটি দেশই ঈদ-উৎসব পালন করে। ভিন্ন দেশে ভিন্ন নামে ঈদ-উৎসব পালিত হয় এবং সব দেশেই তাঁদের ঐতিহ্যগত প্রধান রান্না দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করে। ঈদ-আনন্দ আয়োজনের নানাবিধ পদ-এর সঙ্গে মিষ্টি থাকে; কেউ সেমাই প্রস্তুত করে কেউ বা পায়েস। সেমাই দিয়েও কয়েকরকম মিষ্টিজাতীয় (জর্দাসেমাই, চালের জর্দা, দুধ সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, কুনাফা) খাবার তৈরী করা হয়। ঈদের ভোরে নামাজে যাওয়ার আগে বাড়ির গৃহিণীরা বাড়ির বয়স্ক পুরুষ ও ছেলেশিশুদের ¯œান শেষে নতুন কাপড়ে সাজিয়ে মিষ্টিমুখ করিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে পাঠায়। প্রত্যেক দেশেই ঈদের জামাত পড়ার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের দিনাজপুরের ‘গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান’ এবং কিশোরগঞ্জ ‘শোলকিয়া ঈদগাহ্ ময়দান’ সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীতে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে জাতীয় ঈদগাহ্ ময়দান; এখানে নারীদের ঈদের জামাত পড়ার বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও আছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ প্রায় ৩/৪ শতাধিক নির্ধারিত স্থান রয়েছে যেখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

শিশু-নারী-পুরুষ সকলেই ঈদ-পরবে নতুন কাপড়ে সজ্জিত হতে পছন্দ করে; বাড়ির শিশু ও পুরুষ ঈদের নামাজ আদায় করতে চলে গেলে বাড়ির মেয়েরাও অন্যান্য কাজ শেষ করে ¯œান শেষে নতুন শাড়ি-গহনায় সজ্জিত হয়; আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে যায় এবং অতিথি আপ্যায়ন করে। ঈদের জন্য একে অপরকে উপহার দেওয়া এবং দেখাসাক্ষাৎ সব দেশের মুসলিম ধর্মালম্বীদের মধ্যে প্রচলিত রীতি।

ঈদ আমাদের প্রধান ধর্ম-উৎসব হলেও এবার ঈদ এসেছে মহামারী বা দুর্যোগকালে; ২০২০ সালে বিশ্বে রোজা এসেছে নভেল করোনাকালে; সমগ্র বিশ্বের জীবন এখন সাদা কাফনে মোড়ানো আনন্দহীন। দুই লক্ষাধিক মানুষ যোগ হয়েছে নভেল কোরনাভাইরাসের মৃত্যুমিছিলে। এই নিরানন্দ সময়ে ধর্মপ্রাণ মুসলিম রোজা রাখছেন, ইফতার করছেন, নামাজ পড়ছেন। রোজার মাসে ‘তারাবি’ নামাজ আদায় করা সুন্নত; এই নামাজ বিশ রাকাত। নভেল করোনা ছোঁয়াচে রোগ। একজনের স্পর্শ-হাঁচি-কাশির মাধ্যমে অন্যজন আক্রান্ত হয়। খুবই জটিল সময়ের মধ্যে কালাতিপাত করছে বিশ্ব। মসজিদ-মন্দির-গির্জা-মঠ সবত্র বন্ধ; ঘরে বসে প্রার্থনা। তবে লকডাউনের মধ্যেও মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে; “সামাজিক দূরত্ব” মেনে নামাজ আদায় করা যাবে। রোজার ঈদ উপলক্ষে অনেকে কাপড়ের মতো ইফতারি (সিদ্ধ বুট রান্না, পিঁয়াজু, চপসহ নানা রকমের খাদ্যসামমগ্রী) বিক্রয় করে উপার্জনের চেষ্টা করে। কিন্তু করোনাকালে সেটাও খুব একটা সম্ভব হয়নি বা বলা যায় হচ্ছে না। কিছু কিছু স্থানে ইফতারি বিক্রয় হলেও ক্রেতার তেমন ভীড় নেই। ঈদের কেনাকাটার জন্য সীমিত আকারে দোকানপাট-ও খুলে রাখা হয়েছে ; কিন্তু প্রতিবছরের মতো এই বছরের রমজানে ক্রেতা-সমাগম কম।

ঈদের আনন্দ ছোটো বড়ো সকলের; ঈদের চাঁদ সকলের মধ্যে খুশি ছড়িয়ে দেয়। মানুষ পরিবার-পরিজন-আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলকে নিয়ে মেতে ওঠে আনন্দে। কিন্তু আতঙ্কিত মনে কোনো কিছুতেই আনন্দ পাওয়া যায় না। এবারের ঈদ আত্মীয়-পরিজনবিহীন আনন্দহীন ঈদ।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন পত্রপত্রিকা

 

আফরোজা অদিতি
কবি ও কথা সাহিত্যিক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top