সিডনী রবিবার, ৯ই আগস্ট ২০২০, ২৫শে শ্রাবণ ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও কর্মজীবন : শাহান আরা জাকির পারুল


প্রকাশিত:
১৩ জুলাই ২০২০ ১৭:৩২

আপডেট:
৯ আগস্ট ২০২০ ০২:২২

 

কৈশোরেই শেখ মুজিব রাজনীতিতে দীক্ষা নেন। এ দীক্ষাগুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তখনকার বাংলাদেশের এক নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ফরিদপুরেই যুবক সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কিশোর শেখ মুজিবের পরিচয়। সেই পরিচয় থেকে দু'জনেই দু'জনের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। উপমহাদেশের ঝঞ্ঝাক্ষুদ্ধ রাজনীতি এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঘনায়মান ছায়ায় কিশোর মুজিব বড় হলেন। দেখলেন যুদ্ধেতাণ্ডব, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর করার মুখব্যাদন। ৫০ লাখ বাঙালির আত্মাহুতি। ঔপনিবেশিক শাসনের জ্বালা তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলল।

শেখ মুজিব ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ টাউন মাঠে অনুষ্ঠিত কৃষি মেলায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই মেলাটি উদ্বোধন করেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। শেখ মুজিব নিজের নেতৃত্বগুণে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতৃত্ব লাভ করেন ও নেতৃত্ব সুসংহত করেন। স্থানীয় রাজনীতির চক্রান্তে দু'দফায় কারাবরণ করেন। প্রথমক সভায় বক্তৃতা দানের জন্য কয়েক ঘণ্টা এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জনৈক তারামিয়াকে অন্যায়ভাবে আটক অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য ৭ দিন। এ সময় তিনি ছাত্র নেতৃত্বের পাশাপাশি খেলাধূলায়ও নেতৃত্ব দেন। তিনি মিশন স্কুলের ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন।

শেখ মুজিব ১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জের পরিমণ্ডলে ছাত্রনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক এবং সরবরাহ বিভাগের মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একত্রে গোপালগঞ্জের মিশন স্কুল পরিদর্শন করেন। মুজিব ছাত্রাবাসের ও স্কুলের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে তাঁদের পথরোধ করেন। মুজিবের এ কাণ্ড দেখে এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরায়াওয়ার্দী পুলিশ কর্মকর্তা অবাক হয়ে যান। এটুকু ছেলের এতো সাহাস! মন্ত্রীর পথ আটকে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী বালক মুজিবের দাবি মেনে নিয়ে তাৎক্ষণিক ১২শ টাকা মঞ্জুর করেন এবং ছাত্রাবাস ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

১৯৪০ সালে শেখ মুজিব নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এবছর তিনি গোপালগঞ্জের মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারীও নিযুক্ত হন।

ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ১৯৪১ সালের মার্চ মাসে গোপালগঞ্জ টাউন মাঠে মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলন আহবান করেন। কিন্তু ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। বিচক্ষণ মুজিব তাৎক্ষণিক পাবলিক স্কুল হোস্টেল মসজিদ প্রাঙ্গণে এক মিলাদ মাহফিলের জন্য অনুমতি সংগ্রহ করেন এবং মিলাদ মাহফিলের শেষে সেখানেই সম্মেলনের কাজ সম্পন্ন করেন।

শেখ মুজিব ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস করার পর কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। এখানেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন এবং পাকিস্তান আন্দোলন ও রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সুপরিচিত বেকার হোস্টেলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। তখন থেকে তিনি শেখ মুজিবুর রহমান নামে পরিচিতি পেতে থাকেন।

শেখ মুজিব তাঁর নেতৃত্বগুণে ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

১৯৪৪ সালে শেখ মুজিব নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ ও কাউন্সিল অধিবেশনে যোগদান করেন। সংগঠনের দুটি উপ-দলের মধ্যে প্রগতিশীল অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। কোলকাতায় অবস্থিত ‘ফরিদপুর জেলা সমিতি'র সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হন।

১৯৪৫ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক রাজনৈতিক কাজে বিভিন্ন প্রদেশের কেন্দ্র পর্যায়ে সফর ও সভা করেন। তাঁর ভাষণে এমন একটা দিক ছিল যে, বড় বড় নেতাদের চেয়ে তাঁর ভাষণ শোনার জন্য সকলেই উদগ্রিব হয়ে থাকতো। সত্যি কথা বলতে কি তাঁর ভাষণে মানুষ শক্তি পেত, প্রেরণা পেত, তাদের মনে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠত।

শেখ মুজিব সকল ছাত্রের বিপদে-আপদে সবার আগে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াতেন। অভাবী ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। তাঁর এই কাজের জন্য ছাত্রদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, অনেক বাধাবিপত্তির মধ্যেও ১৯৪৬ সালে কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক পদে বিনা প্রতিদ্বন্দি¡তায় নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কোলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও খুনোখুনি ছড়িয়ে পড়লে অন্যদের সাথে মুজিবও মুসলিম মহল­াগুলোতে পাহারা দেন। এ অমানুষিক পরিশ্রমের জন্য এবছর পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারেননি।

১৯৪৭ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে অনার্সসহ ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন। এ বছর ভারত ও পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কোলকাতায় দাঙ্গা প্রতিরোধ কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনের উদ্যোগ নেন।

তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্বাচনী কাজে নিজেকে একান্তভাবে নিয়োজিত করেন। জনকল্যাণ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের জন্য এরই মধ্যে তাঁর কৃতিত্ব ও সুনাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৮ সাল ছিল ঘটনাবহুল। এবছর উলে­খযোগ্য অনেক ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিব ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। এ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ২৩ ফেব্র“য়ারি আইন পরিষদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে শেখ মুজিব তাৎক্ষণিক এর প্রতিবাদ জানান। অতঃপর সারাদেশ প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। তিনি এই ঘৃণ্য সরকারি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ছাত্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করেন। ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হক মুসলিম হলে শেখ মুজিবের প্রস্তাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে সচিবালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভরত অবস্থায় সহকর্মীদের সাথে গ্রেফতার হন। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করার খবরে সারাদেশের ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ছাত্র আন্দোলন দিনে দিনে তুঙ্গে উঠতে থাকে। সর্বত্র টান টান উত্তেজনা। এক পর্যায়ে মুসলিম লীগ সরকার শেখ মুজিবসহ গ্রেফতারকৃত ছাত্রনেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিব ১৯৪৮ সালে ১৫ মার্চ মুক্তিলাভের পর ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের বটতলায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক সভা তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের জন্য শেখ মুজিব আহবান জানান।

১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ ঢাকার রেলগেট ময়দানে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বক্তব্য দেন। সভাস্থলে শেখ মুজিবসহ তাঁর নেতৃত্বে অন্যান্য ছাত্র নেতারা একযোগে ‘নো' ‘নো' ধ্বনি তোলে।

ভাষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনড়। মায়ের ভাষা তথা বাংলা ভাষার অবমাননা তিনি কোনভাবেই মেনে নেবেন না। বাংলার মাটিতে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হতে পারবে নাÑ হতে দেয়া যাবে না। তাঁর এই আপোসহীন সংগ্রামী ভ‚মিকার জন্য ছাত্রসমাজ ‘মুজিব ভাই' সম্বোধন করে শ্লোগান দিতে থাকে। তখন থেকেই তিনি সকলের কাছে ‘মুজিব ভাই' বলে পরিচিত ওঠে ওঠেন। ছোট-বড় সকলের কাছেই তিনি মুজিব ভাই। বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ কেউ তাঁকে শেখ সাহেব বলেও সম্বোধন করত।

এবছরই তিনি ফরিদপুর জেলার কৃষকদের মজুরির ধান কর্তন প্রথার অজুহাতে অন্যায়ভাবে প্রশাসন কর্তৃক আটক করা হলে কৃষকদেরকে সেই ধান ফিরিয়ে দিতে প্রশাসনকে বাধ্য করেন।

এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীদের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা ও নেতৃত্ব দেয়া এবং কর্তন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

শেখ মুজিব ১৯৪৯ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত জরিমানা ও মুচলেকা দেওয়ার ঘোষণা দিলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীন নেতা শেখ মুজিব তাতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর ফলে তখন থেকেই শেখ মুজিবের শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে।

১৯৪৯ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি খাজা নাজিমউদ্দিন গোপালগঞ্জে কোর্ট মসজিদ এবং পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান মিনার উদ্বোধন করতে এলে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর মতানৈক্য ঘটে। ঐ সময় চাঁদা তুলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল যা ‘জিন্নাহ রিলিফ ফান্ডে' দিয়ে দেয়ার জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শেখ মুজিব ৫-৬ হাজার লোক নিয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দেন এবং পুলিশের ব্যারিকেড ভেদ করে নদীর পাড়ে খাজা নাজিমউদ্দিনের বোটের কাছে যান। নাজিমউদ্দিন তাঁকে বোটে ডেকে নিয়ে দাবি অনুযায়ী গোপালগঞ্জবাসীর দেয়া চাঁদার অর্থে গোপালগঞ্জে একটি কলেজ (তদানীন্তন কায়েদে আযম কলেজ) করার জন্য ঘোষণা দেন এবং ২ লাখ টাকা কলেজের জন্য বরাদ্দ করেন। শেখ মুজিবের এ-কাজের জন্য সারা এলাকায় তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাবাসী মুজিবের নামে শ্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।

শেখ মুজিব টাঙ্গাইলে মুসলিম লীগ বিরোধী প্রার্থী শামসুল হকের পক্ষে মাওলানা ভাসানীসহ উপ-নির্বাচনে বেশ কয়েকটি সভা করেন। পাকিস্তান অর্জনের পর ১৯৪৯ সালে ২৬ এপ্রিল প্রথম উপ-নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী পন্নী খান শামসুল হকের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। শাসক দলের এই পরাজয়ের জন্য মুজিবকে দায়ী করে এবং ঢাকা ফেরার সাথে সাথে তাঁকে গ্রেফতার করে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক গোপন বৈঠকে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' গঠিত হয়। কারাবন্দী শেখ মুজিবকে দলের যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। এবছর জুলাই মাসে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশব্যাপী খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচির জন্য এক বিশাল ভুখা মিছিলে ভাসানীর সাথে নেতৃত্ব দেন। অক্টোবর মাসে আরমানিটোলা এলাকায় পুলিশ মিছিলে বাধা দেয় এবং ভাসানী, শেখ মুজিব ও শামসুল হককে গ্রেফতার করে। ধীরে ধীরে অন্যান্যরা ছাড়া পেলেও শেখ মুজিবকে বিনা বিচারে প্রায় আড়াই বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।

১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নিহত হওয়ার পর ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনে আয়োজিত এক সভাতে খাজা নাজিমউদ্দিন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা' ঘোষণা করলে সমগ্র পূর্ববঙ্গে দ্বিতীয় দফায় ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এর প্রতিবাদে শেখ মুজিব জেলে থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের প্রতি ২১ ফেব্র“য়ারি পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দিনে ‘ভাষা দিবস' পালনের জন্য আহŸান জানান এবং ১৪ ফেব্র“য়ারি থেকে মহিউদ্দিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে অনশন শুরু করেন। নূরুল আমিন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করায় মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান জেলে থাকার কারণে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাষা সৈনিক গাজীউল হকসহ ১১ জন ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন  রফিক-সালাম-বরকত-শফিকসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র-জনতা। শেখ মুজিব জেল থেকে এক প্রতিবাদ লিপিতে ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলি বর্ষণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানান। তিনি ১৪ ফেব্র“য়ারি থেকে একটানা ১৪ দিন অনশন অব্যাহত রাখেন। জেলখানায় থেকে আন্দোলন পরিচালনা এবং যোগাযোগ রাখার দায়ে তাঁকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শেখ মুজিবের স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় ২৭ ফেব্র“য়ারি তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি চিকিৎসা এবং বিশ্রামের জন্য টুঙ্গিপাড়াতে গিয়ে কিছুদিন থাকেন। এই সময় আওয়ামী মুসিলম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের মস্তিষ্কের ভারসাম্য বিনষ্টের লক্ষণ দেখা দিলে মাওলানা ভাসানী দলের সভাপতি হিসাবে পদাধিকার বলে শেখ মুজিবুর রহমানকে অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করেন।

১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলল অধিবেশনে ৯ জুলাই শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ গণপরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৭টি আসন লাভ করায় মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। এ নির্বাচনে শেখ মুজিবের দল আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৫২টি আসন লাভ করে। গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া আসন থেকে শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী ও ধনবান নেতা ওয়াহিদুজ্জামান ঠাণ্ডা মিয়াকে ১৩ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে প্রথম প্রদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। অতঃপর ১৫ মে শেখ মুজিব ফজলুল হকের প্রাদেশিক সরকারে মন্ত্রিসভাতে কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল ঘোষণা করে। ঐদিনই করাচির থেকে ঢাকায় ফিরে আসার সাথে সাথে অন্যায়ভাবে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়। ২৩ ডিসেম্বর তিনি মুক্তিলাভ করেন। এ সময় নানা নাটকীয় অবস্থার পর স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। তিনি রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধসহ সামরিক আইন জারি করেন। একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়েরের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে হয়রানি করতে থাকেন। আইয়ুব খানের এই অন্যায় কার্যকলাপে বাংলার মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠতে থাকে।

১৯৫৯ সালে সামরিক জান্তা শেখ মুজিবকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে। বিনা বিচারে ১৪ মাস শেখ মুজিবকে বন্দী রাখার পর প্রহসনমূলক মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেটেই আবার গ্রেফতার করে।

শেখ মুজিবের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভীত হয়ে তাঁকে জেলখানায় বন্দী রেখেই ১৯৬০ সালে আইয়ুব খান গণভোট দেন। এই প্রহসনমূলক গণভোটে মধ্যে ৭৫,২৮৩ জনের সম্মতিসূচক ভোটে নিজেকে ‘নির্বাচিত' প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেন। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

১৯৬১ সালের ২৭ এপ্রিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ইনতেকাল করেন। শেখ মুজিব ছাত্র নেতৃবৃন্দ দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে গোপন রাজনৈতিক সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬২ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি জননিরাপত্তা আইনে শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। ১৮ জুন শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন। ২৫ জুন শেখ মুজিবসহ জাতীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খান কর্তৃক প্রবর্তিত উদ্ভট ‘মৌলিক গণতন্ত্র' ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথভাবে বিবৃতি দেন। ৫ জুলাই ঢাকার পল্টনে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিব আইয়ুব খানের কঠোর সমালোচনা করে ভাষণ প্রদান করেন।

১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দী লেবাননের বৈরুত নগরীর এক হোটেল কক্ষে রহস্যজনক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। শেখ মুজিবই তখন কঠোরভাবে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন।

আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের বাসভবনে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভোটের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি এবং গণমানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ সভায় মাওলানা তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে ১৭ জুন ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ২১ দফা ঘোষণা করা হয। ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলকে অসাম্প্রদায়িক করার জন্য ‘মুসলিম' শব্দটি প্রত্যাহার করা হয়। সৃষ্টি হয় আওয়ামী লীগের। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্র“য়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। ১৯৫৬ সালের ১৯ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের স্বার্থবিরোধী এই সংবিধান বিলে আওয়ামী লীগের ১৩ জন স্বাক্ষর প্রদান করেননি। ১৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ প্রস্তাবটি শেখ মুজিব উত্থাপন করেন। ৪ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে চকবাজার এলাকায় একটি বিশাল ভুখামিছিল বের হয়। মিছিলে পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হলে আবু হোসেন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করে। শেখ মুজিব ১৬ সেপ্টেম্বর শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ এইড দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ কেরন। কেন্দ্রে নতুন কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

১৯৫৭ সালের ৭ এবং ৮ ফেব্র“য়ারি কাগমারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বামপন্থী মতাদর্শের তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। মাওলানা ভাসানী দলীয় সভাপতির পদ থকে পদত্যাগেরে ঘাষণা দেন। ৩০ মে মুজিব মন্ত্রিসভা থেকে পদ্যাগ করেন। মাওলানা ভাসানী ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার পিকচার প্যালেস হলে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে পদত্যাগ করেন। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ-কে অস্থায়ী সভাপতি করে আওয়ামী লীগের (শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী অংশ) নতুন কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। সংগঠনকে সুসংগঠিত করবার উদ্দেশ্যে ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু চীন ও সোভিয়েত ইউয়িন সফর করেন।

১৯৫৮ সালে সমগ্র পাকিস্তানব্যাপী চরম রাজনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়। ১৮ জুন আতাউর রহমান খানের আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। ২০ জুন আবু হোসেন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ এবং মাত্র ৭২ ঘণ্টা ব্যবধানে পতন হয়। ২৩ জুন পুনরায় আতাউর রহমান মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

৭ অক্টোবর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন। ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। একের পর এক মিথ্যা মামলার দায়ে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলখানায় থাকার পর তাঁকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেটেই গ্রেফতার করা হয়।

৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রীট আবেদন করে তিনি মুক্তিলাভ করেন। সামরিক শাসন ও আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।

১৯৬২ ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়। ২ জুন চার বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটলে ১৮ জুন বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভ করেন। ২৫ জুন বঙ্গবন্ধু জাতীয় নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি দেন। ৫ জুলাই পল্টনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু আইযুব সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু লাহোর যান, এখানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় মোর্চা জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রট গঠিত হয়। অক্টোবর মাসে গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য বঙ্গবন্ধু শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সারা বাংলা সফর করেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য বিশিষ্ট ছাত্র নেতৃবৃন্দের দ্বারা ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৩ সালে জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন। এই সময় সামরিক জান্তা রাজনৈতিক কর্মীর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাঙালির অধিকার আদায়ের নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম শুরু করেন। পূর্ব বাংলায় দাঙ্গা রোধের জন্য ১৬ জানুয়ারি ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও' শীর্ষক ইস্তেহার প্রচার। ২৫ জানুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটে। ইস্তেহার প্রচারের দায়ে তাজউদ্দিন আহমেদ গ্রেফতার।

১৯৬৫ সালের ১১ মার্চ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। তাঁর উদ্যোগে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও' শিরোনামে দাঙ্গাবিরোধী প্রচারপত্র বিলি হতে থাকে। সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম চলতে থাকে।

সরকারের বিরুদ্ধে আপত্তিজনক বক্তব্য প্রদান এবং রাষ্ট্র্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ১৯৬৫ সালে মামলা দায়ের করা হয় এবং ১ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি মুক্তিলাভ করেন।

আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণের পর একের পর এক ভুল করতেই থাকেন। কিন্তু তিনি এবার একটা চরম ভুল করেন। কোন কারণ ছাড়াই ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৭ দিন ব্যাপী পাক-ভারত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলতে থাকে। ভারত ইচ্ছে করলে বাংলার জনগণকে ধ্বংস করে দিতে পারতো। শুধু তাই নয পূর্ব পাকিস্তানও দখল করে নিতে পারতো। কিন্তু ভারত তা করেনি। শেখ পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যস্থতায় পাক-ভারত যুদ্ধ বিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই যুদ্ধের দরুন আইয়ুবের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্র“য়ারী লাহোরের বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাবিত ৬ দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ। ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা বাংলায় গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় তাঁকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বার বার গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধু এ বছর প্রথম তিন মাসে আটবার গ্রেফতার হন। ৮ মে নারায়ণগঞ্জে পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা শেষে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয। ৭ জুন বঙ্গবন্ধু ও আটক নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গীতে পুলিশের গুলিতে ম্রমিকসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়।

১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বরের হরতাল ছিল অবিশ্বাস্য এবং অভ‚র্তপূর্ব। মিলিটারির গুলি জনতাকে থামাতে পারেনি। ৮ ডিসেম্বর হরতালের শহীদদের গায়েবি জানাজা পড়লেন মওলানা ভাসানী বায়তুল মোকাররমে।

১৯৬৮ সালে ৩ জানুয়ারী পাকস্তিান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৭ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত আসামীদের মুক্তির দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়।

১১ এপ্রিল পাঞ্জাবের জাস্টিস এস. এ. রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। বিচারপতি মকসুমুল হাকিম এই ট্রাইবুনালে একমাত্র বাঙালি সদস্য ছিলেন। ১৯ জুন ডাকার কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বিশেষভাবে নির্মিত আদালত কক্ষে সামরিক প্রহরায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার কার্য শুরু হয়।

১৯৬৯ সালে ৫ জানুয়ারী ৬ দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন শুরু করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। ছাত্রদের এই আন্দোরন গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আপামর ছাত্র-জনতা কারফিউ অগ্রাহ্য করে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ‘জয় বাংলা' শ্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলে।

১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১৯৬৯-এর ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল বের করে। আহত অবস্থায় বন্দি হন সেই বীর ছাত্ররা।

২০ জানুয়ারি। বীর ছাত্র-যুবক সেদিন পুলিশ, ই.পি. আর-এর সঙ্গে বীরবিক্রমে লড়াই করেছিল এবং এদেরকে পেছনে হটিয়ে দিয়েছিল। এই আন্দোলনেই ব্যান্ডেজ বাঁধা কৃষকনেতা আসাদুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জনতা লাশ ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেদিন সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইড করেছিল। ২৪ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস হয়ে উঠল গণঅভ্যুত্থান দিবস। সেক্রেটারিয়েটের সামনে কিশোর রুস্তম আলী, মকবুল আর নবকুমার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিয়ুর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হলো।

বিক্ষুব্ধ জনতা শহীদ মতিয়ুরের লাশ নিয়ে বিশাল মিছিল বের করে। দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ অফিস জনতার রোষানলে ছাই হয়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান বিচারক এস. এ. রহমানের বাসভবন, সরকারি অতিথিশালা, নবাব আসকারীর গাড়ি, খাজা শাহাবুদ্দীনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারাধীন বন্দিদের হত্যার ষড়যন্ত্র হয়, কাশ্মীরী অফিসার লে. নাসিরুদ্দীনের সতর্কতার ফলে শেখ মুজিব বেঁচে গেলেন, কিন্তু সার্জেন্ট জহুরুল হক রেহাই পেলেন না। ১৫ ফেব্র“য়ারি যেন ২৫ মার্চের পূর্বাভাস। ভোরের বেলা তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ১৮ ফেব্র“য়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ড. শামসুজ্জোহাকে বেয়নেট আর বুলেট দিয়ে হত্যা করা হয়।

সে রাতেই কারফিউ ভেঙ্গে হাজার হাজার মানুষ সামরিক বাহিনীর সাথে বীরের মতো লড়াই করেছিল। আইউব খানের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন ঘন আন্দোলনে পরিণত হয়। পরে ১৪৪ ধারা ও কার্ফু ভঙ্গ, পুলিশ-ইপিআর-এর গুলিবর্ষণ, বহু হতাহতের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে আইয়ুব সরকার ১ ফেব্র“য়ারী গোলটেবিল বৈঠকের আহŸান জানায় এবং বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তিদান করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তিদান প্রত্যাখ্যান করেন। ২২ ফেব্র“য়ারি জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য আসামীকে মুক্তিদানে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-জনতার এই সংবর্ধনা সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভুষিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ভাষণে ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।

২৬ ফেব্র“য়ারী বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিণ্ডির আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ৬ দফাসহ ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করে বলেন, ‘গণঅসন্তোষ নিরসনে দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিবিদরা বঙ্গবন্ধুর দাবি অগ্রাহ্য করলে ১৩ মার্চ তিনি গোলটেবিল বৈঠক ত্যাগ করেন এবং ১৪ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসেন। ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ২৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হন। ২৫ অক্টোবর তিন সপ্তাহের সাংগঠনিক সফরে বঙ্গবন্ধু লন্ডন গমন করেন।

৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ'। তিনি বলেন, ‘একমাত্র বঙ্গোপসাগর' ছাড়া আর কোন কিছুর সাথে ‘বাংলা' কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।.... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় এ প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ'। আর সেদিন থেকেই হলেন তিনি বাংলাদেশের স্থপতি।

১৯৭০ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সভাপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৭ জুন বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের জনসভায় ছয়দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। ১৭ অক্টোবর দলের নির্বাচনি প্রতীক হিসেবে ‘নৌকা' প্রতীক পছন্দ করেন। ২৮ অক্টোবর বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু ছয়দফা বাস্তবায়নের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১১ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারাভিযান বাতির ঘোষণা করে দুর্গত মানুষের পাশে গোর্কি উপদ্রুত এলাকায় চলে যান। আর্ত-মানবতার সেবায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উদাসীনতার বিষয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি বিপন্ন মানুষের সাহায্যের জন্য বিশ্ববাসীর দৃস্টি আকর্ষণ করেন এবং ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ দলীয় নেতৃবৃন্দসহ পরিচালনা করেন। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হয়।

১৯৭১ সালে ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিবৃন্দ ছয়দফার ভিত্তিতে মাসনতন্ত্র রচনার এবং জনসাধারণের প্রতি অনুগত থাকার শপথ নেন। জাতীয় পরিষদ সদস্যদের এক সভায় বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী দলের নেতা নির্বাচিত হন।

১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। পলে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধুর আহবানে ২ মার্চ দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি দাবি জানান।

ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা ও গড়িমসির মাঝে প্রতিদিনই পূর্ব পাকিস্তানে পাঞ্জাবী মিলিটারীর আগমন লক্ষ্য করে ৭ মার্চ রেসকোর্সের স্মরণকালের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন তার ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' তিনি বলেন ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।' তিনি সারাদেশে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ৩৫ দফা অলিখিত নির্দেশ জারি করেন যা দেশব্যাপী অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক ঢাকায় শুরু হয়। আলোচনায় যোগ দিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত বাংলার মানুষ ইয়াহিয়া খানের সরকারি নির্দেশ না মেনে ৩২ নম্বর থেকে দেয়া বঙ্গবন্ধুর অলিখিত নির্দেশ পালন করতে থাকে। এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। মূলত ৭ মার্চ থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বতঃসিদ্ধভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন স্বাধীনভাবে স্বাধীন দেশের সরকারের মতো। ২৫ মার্চ আলোচনা অসমাপ্ত রেখেই ইয়াহিয়া খান নাটকীয়ভাবে রাতের বেলা ঢাক ত্যাগ করেন। বাঙালি জাতির ওপর নেমে আসে ২৫ মার্চ মধ্যরাতের নারকীয় তাণ্ডবÑ পাকবাহিনীর বর্বর গণহত্যা। পাকবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার, পিলখানা রাইফেল সদর দপ্তর আক্রমণ করে এবং নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খুনের নেশায় মেতে ওঠে। সৃষ্টি করে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের রেকর্ড।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে নিজের পরিচয় জানিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে একটা ম্যাসেজ ডিকশনের অনুরোধ করলেন যেন অবিলম্বে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী-এর নিকট ম্যাসেজটি পাঠিয়ে দেয়া হয়। ম্যাসেজটি ছিল :

"The Pakistan army has attacked Police lines at Rajarbag and East Pakistan Rifles Headquarters at Pilkhana at Midnight. Gather strenght to resist and prepare for a war of Independence." Page 24, Massacre by Robert Payne. The Macmilan Compnay. Newyork.

এছাড়া বঙ্গবন্ধু বিশেষ ব্যবস্থায় ওয়ারলেস যোগে তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে, তা নিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবেলা করার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংরাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। জয় বাংলা।' এই ঘোষনা বাংলাদেশের সর্বত্র ট্রান্সমিটারে প্রচারিত হয়।

এর পরপরই তিনি বাংলায় আরো একটি ঘোষণা পাঠান ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানা ইপিআর ঘাটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঝরাতে আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে মাতৃভ‚মি মুক্ত করার জন্য শত্র“দের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেখ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভ‚মি থেকে শেষ শত্র“কে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল­াহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।'

বঙ্গবন্ধুর এই আহবান বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় সারাদেশে পাঠানো হয়। এ বার্তা পেয়েই চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর সেনানিবাসে বাঙালি জওয়ান ও অফিসারবৃন্দ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাত ১.১০ মিনিটে ধনামন্ডী ৩২ নম্বর বাসা থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করার দায়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা বাণী চট্টগ্রাম বেতারের আগ্রাবাদ স্টেশন থেকে ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ. হান্নান। পরদিন ২৭ মার্চ মেজর জিয়া কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর বরাতে স্বাধীনতার বাণী পাঠ করেন। সারা বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

২৬ মার্চ জে. ইয়াহিয়া এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে।

২৬ মার্চ চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (মুজিবনগর) বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। বাংলাদেশ লাভ করে স্বাধীনতা। তার আগে ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফায়জালাবাদ (লায়ালপুর) জেলে বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার করে তাঁকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। বিভিন্ন দেশ ও বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানায়। ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতির জনক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানের দাবি জানান হয়। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, কাজেই পাকিস্তানের কোন অধিকার নেই তাকে বন্দি করে রাখার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

 

 

১৯৭২

৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনই বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার উদ্দেশ্যে লন্ডন পাঠানো হয়। ৯ জানুয়ারি লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথের সাথে সাক্ষাৎ হয়। লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু দিলি­তে যাত্রাবিরতি করেন। বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি.ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছালে তাঁকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে লক্ষ জনতার সমাবেশ থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের আমন্ত্রণে তিনি ভারত যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৪৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে দেয়া বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে যান। ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে।

১ মে তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। ৩০ জুলাই লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর পিত্তকোষে অস্ত্রোপচর করা হয়। অস্ত্রোপচারের প লন্ডন থেকে তিনি জেনেভা যান। ১০ অক্টোবর বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরী' পুরস্কারে ভ‚ষিত করে। ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ (৭ মার্চ ১৯৭৩) ঘোষণা করেন। ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের কথা ঘোষণা করেন। ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষর করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড়সহ সমস্ত ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, ১১,০০০ প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ ৪০,০০০ প্রাথমিক স্কুল সরকারিকরণ, মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে ধর্ষিতা মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন সংস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ, বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বীমা ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও চালু করার মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, ঘোড়াশাল সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বন্ধ শিল্প কারখানা চালুকরণসহ অন্যান্য সমস্যার মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস চালানো হয়। অতি অল্প সময়ে উলে­খযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ ছিল বঙ্গবন্ধুর সরকারের উলে­খযোগ্য সাফল্য।

 

 

 

১৯৭৩

জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৯৩ আসন লাভ। ৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ, সিপিবি ও ন্যাপের সমন¦য়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। ৬ সেপ্টেম্বর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়া যান। ১৭ অক্টোবর তিনি জাপান সফর করেন।

 

১৯৭৪

২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে পাকিস্তান স্বীকৃতি দেয়। ২৩ ফেব্র“য়ারি ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গমন করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে এবং বঙ্গবন্ধু ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মত বাংলায় ভাষাণ দেন।

 

১৯৭৫

২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ। ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন¦য়ে জাতীয় দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় দলে যোগদানের জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রতি আহবান জানান। বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তাই স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজান। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে মানুষের আহার, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত করবার মানসে ৬ জুন বঙ্গবন্ধু সকল রাজনৈতিক দর, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী মহলকে ঐক্যবদ্ধ করে এক মঞ্চ তৈরি করেন, যার নাম দেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু এই দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণের আহবান জানিয়ে অভুতপূর্ব সাড়া পান। অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। চোরাকারবারি বন্ধ হয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার আওতায় চলে আসে।

নতুন আশার উদ্দীপনা নিয়ে স্বাধীনতার সুফল মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার জন্য দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে। কিন্তু মানুষের সে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না।

১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক অফিসারদের হাতে নিহত হন। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুননেছা, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র মুক্তিযোদ্ধা লে. শেখ কামাল, পুত্র লে. শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর অন্তঃসত্তা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্ণেল জামিল আহমেদ এবং ১৪ বছরের কিশোর আবুদল নঈম খান রিন্টুসহ ১৬ জনকে ঘাতকরা হত্যা করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ হবার পর দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। গণতন্ত্র হত্যা করে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। শুরু হয় হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। কেড়ে নেয় জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার।

বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার জন্য হত্যাকারীদের বিচারে বিধান রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে জাতির জনকের আত্ম স্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রেহাই দেবার জন্য ২৬শে সেপ্টেম্বর এক সামরিক অধ্যাদেশ (ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স) জারি করা হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স নামে এক কুখ্যাত কালো আইন সংবিধানে সংযুক্ত করে সংবিধানের পবিত্রতা নষ্ট করে। খুনিদের বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে।

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের সদস্যগণকে হত্যার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হয়। ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। ১ মার্চ '৯৭ ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। ৮ নভেম্বর '৯৮ জলো ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ৭৬ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ১৪ নভেম্বর ২০০০ সালে হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে দুই বিচারক বিচারপতি মোঃ রুহুল আমিন এবং বিচারপতি মোঃ ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। এরপর পাঁচজন আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৭ সালে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০০৯ সালে ২৯ দিন শুনানির পর ১৯ নভেম্বর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি রায় ঘোষণায় আপিল খারিজ করে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ২০১০ সালের ২ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আসামিদের রিভিউ পিটিশন দাখিল এবং তিন দিন শুনানি শেষে ২৭ জানুয়ারির চার বিচারপতি রিভিউ পিটিশনও খারিজ করেন। এদিনই মধ্যরাতের পর ২৮ জানুয়ারি পাঁচ ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা গেছে এবং ছয়জন বিদেশে পলাতক রয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর বাস্তবায়িত হল।

১৫ আগস্ট জাতির জীবনে এক কলঙ্কময় দিন। এই দিবসটি জাতীয় শোক দিবস হিসাবে বাঙালি জাতি পালন করে। 

 

(জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত এলবাম জাতির জনক, ৩য় প্রকাশ, ১৭ মার্চ ২০১০ থেকে উদ্ধৃত।)

(চলবে)

 

শাহান আরা জাকির পারুল 
নাট্যকার, লেখক ও গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top