সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

তবে কি ব্রিটিশদের পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যার এক দলিল ছিল এই মন্বন্তর? : তন্ময় সিংহ রায়


প্রকাশিত:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:১১

আপডেট:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:৩৩

 

পবিত্র কোরান স্পর্শ করে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না, বাংলা-বিহার ও ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার অত্যন্ত বিশ্বাসী এই সেনাপতি সৈয়দ মীর জাফর আলী খান। কিন্তু ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত একটি গ্রাম পলাশীর প্রান্তরে সেদিন তিনি নিজেই সৃষ্টি করলেন ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়!  যেখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলারই আরেক গোলন্দাজ সেনাপতি মীর মদন দেশ ও জাতির জন্যে মৃত্যুর শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত চালিয়ে গেলেন একজন প্রকৃত বীরের লড়াই! অবশেষে সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে বাংলায় স্থাপিত হয় ইংরেজ শাসনের ভিত্তি।

সেমতবস্থায়, ইংরেজদের সহায়তায় মীরজাফর মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসলেও মূল ক্ষমতা থেকে গেল সেই ব্রিটিশদের হাতেই! আর ক্রমে একসময় এভাবেই বাংলা হারিয়ে ফেলে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা! এবং পুনরায় সূত্রপাত হয় ২০০ বছরের আর এক সু-বৃহৎ কলঙ্কিত অধ্যায়ের!

ভারতীয় উপনিবেশে ব্রিটিশ রাজত্বকালে ভারতকে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে হয়েছে প্রায় ছ'থেকে সাত বার!

কিন্তু বাংলার দুর্ভিক্ষের মতন এ বিভৎসতা  বোধহয় ছিলনা আর কারুরই। ব্রিটিশদের ভারত সংক্রান্ত বিশেষত আর্থিক নীতিগুলি ছিল মাত্রাতিরিক্ত কঠোর ও নির্মম! এ ব্যাপারে তাঁরা ভারতীয় নেটিভ প্রজাদের প্রতি কোনও সামান্যতম সহানুভূতি দেখানোরও পক্ষপাতী ছিলেন না! ভারতীয় উপনিবেশে ব্রিটিশ আগমন পূর্বে, দুর্ভিক্ষ সম্ভাবনায় স্থানীয় জমিদার, রাজা বা নবাব সাধারণত যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন তাঁদের প্রজাদের নিয়ে এই মহামারী বা বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ইংরেজ আগমনে এ ব্যবস্থাটাই গেল সম্পূর্ণ উল্টে!

অতি/অনাবৃষ্টি, ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত ও খরার পাশাপাশি দুর্ভিক্ষের আরেকটি অবধারিত কারন হয়ে দাঁড়ালো ইংরেজদের স্বার্থকেন্দ্রিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদে ইচ্ছেস্বাধীন হস্তক্ষেপ ও তার যথেষ্ট অপব্যবহার! 

এদিকে দিনের পর দিন ধরে ক্রমবর্ধমান অত্যাচার, শোষণ, লুন্ঠন, অনাচার, অবিচার প্রভৃতি স্বৈরাচারীতাজনিত এই কুকীর্তির জন্য অনুতাপ প্রকাশ থেকে অন্যায় তো বহু দুর, সামান্যতম ভুলটুকু পর্যন্ত স্বীকার করে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সাহায্যের জন্যে যথার্তভাবে এগিয়ে আসেননি তাঁরা! 

উপরন্তু দুর্ভিক্ষের ফলে বিশেষত অন্নবস্ত্রহীন অসহায় ভারতীয় প্রজাদের খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে, সে সময়ে দাঁড়িয়েও তাঁরা ছিল কঠোর ও চুড়ান্ত ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন! বলাবাহুল্য এই খাজনা আদায়কেই প্রধানত হাতিয়ার করে তাঁরা চালাতে থাকে অবাধে লুন্ঠন, শোষণ ও অত্যাচার! আর যার প্রভাব সাধারণের উপরে দেখা দিয়েছিল প্রকট হয়ে! 

১৭৭০, ১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩, ১৮৯২, ১৮৯৭ এবং সর্বশেষ ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষের মধ্যে নৃসংশতা, ভয়াবহতা ও প্রাণঘাতীর দিক দিয়ে ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষজনিত মহামারী ছিল সর্বাধিক উল্লেখ্য। ১৭৭০ থেকে ৭৩ টানা তিন বছর যাবৎ এই দুর্ভিক্ষের অকল্পনীয় ও অসহনীয় যন্ত্রণা গতিশীল থাকায় বাংলায় চুড়ান্ত মর্মান্তিকভাবে  মৃত্যু হয় ১ কোটি সাধারণ ও নিরীহ মানুষের! যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের রাজ্য জয় ও বর্ণবাদী আগ্রাসনের কারণে ৬০ লক্ষ ইহুদিকে পরিকল্পনামাফিক হত্যা বা 'হলোকস্ট'-এর চেয়েও বেশি মর্মান্তিক! 

একজন খ্যাতনামা আমেরিকান দার্শনিক ও ইতিহাসবেত্তা জন ফিসকে তাঁর 'দ্য আনসিন ওয়ার্ল্ড' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৭৭০ সালে বাংলার এই দুর্ভিক্ষ ছিল চতুর্দশ শতাব্দীতে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় মহামারী রূপ নেওয়া প্রাণঘাতী বিউবনিক প্লেগ, যা ইতিহাসে কুখ্যাত 'ব্ল্যাক ডেথ' নামে, এর চেয়েও কয়েক গুণ বেশি মারাত্মক! 

সে বছর অতিবৃষ্টি থেকে বন্যা, আর অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই বন্যার করাল গ্রাস থেকে কৃষক ঘরে তুলতে পারেন নি তাঁদের একমাত্র সম্বল ফসল! তদুপরি ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা এবং খাদ্যবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের ফলে ঘটে যায় অবস্থার চরম অবনতি! অথচ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকরা সম্পূর্ণ  বিষয়টিকে দাবি করে করে বসেন নিতান্তই এক প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে।

কিন্তু বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, ১৭৬৮ সালে আদায়কৃত রাজস্ব দেড় কোটি টাকার চেয়ে ১৭৭১ সনের আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৫,২২,০০০ রুপি বেশি, অথচ এর আগের বছরেই ঘটে যায় দুর্ভিক্ষ! 

সাল ১৯৪৩, ভবিষ্যতের 'পঞ্চাশের মন্বন্তর' নাম ধারণ করে বাংলার হতভাগ্য মানুষের ভাগ্যের আকাশে আবারও নেমে এল বিধ্বংসী মহামারীর জমকালো বড় মেঘ! যার প্রধান ও একমাত্র কারন ব্রিটিশদের সীমাহীন লোভ-লালসা, আর যে কারণে গোটা গ্রাম বাংলায় নেমে এল মৃত্যুর ঢেউ ও শ্মশানের নিস্তব্ধতা!

দুই বাংলায় চারিদিকে শুধু ক্ষুদার যন্ত্রণার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস মুখরিত! মুঠো খানেক অন্তত ভাতের জন্য সারা বাংলায়  পড়ে যায় বুভুক্ষুদের হাহাকার! মুহুর্তে গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষের এই আগুন! 

পথে-প্রান্তরে লুটিয়ে পড়তে থাকেন না খাওয়া অস্থিচর্মসার মানুষজন!

এক সময় যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে পচা-গলা দেহ ও হাড়গুলো! যাঁরা মৃত্যুর জন্যে ধুঁকছেন, তাঁদের অনেকেই বাসী-পচা খাদ্য / খাবারে উচ্ছিষ্ট অংশ কিংবা মৃত মানুষের মাংস নিয়ে করছেন কাড়াকাড়ি, ছেঁড়াছিঁড়ি ও মারামারি!

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী ছিলেন উইনস্টন চার্চিল। সে অবস্থার প্রক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জরুরি খাদ্য সরবরাহের জন্য চার্চিলের কাছে বারংবার আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন ভারতের তৎকালীন কিছু মানবিক ব্রিটিশ কর্মকর্তারা! শুধু তাই নয়, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে প্রেরিত ত্রাণের ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রীকে তিনি বাংলায় না পাঠিয়ে তা সরাসরি পাঠিয়ে দেন ইউরোপে যুদ্ধরত সেনা বাহিনীর জন্যে। কিন্তু তার প্রয়োজন ছিলনা আদৌ।

কারণ, সেই সময় ওই সেনাবাহিনীদের রসদের অভাব বা অতিরিক্ত প্রয়োজন, কোনটাই ছিল না। কিন্তু এ হৃদয়বিদারক বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ পর্যন্ত করা হলে প্রত্যুত্তরে তিনি বলে বসেন, "দুর্ভিক্ষ হোক বা না হোক, ভারতীয়রা খরগোশের মতই বংশ বিস্তার করবে।" 

জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, এই দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রাকৃতিক কোনো কারণই খুঁজে পাননি ভারতীয় ও মার্কিন গবেষকদের একটি দল। তাহলে কি এই দুর্ভিক্ষের জন্য আবহাওয়া নয় বরং তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের অমানবিক নীতিই ছিল প্রধানভাবে দায়ী??

 

তন্ময় সিংহ রায়
কোলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top