সিডনী সোমবার, ২৬শে অক্টোবর ২০২০, ১১ই কার্তিক ১৪২৭

বাংলার ওঝা-গুনিন ও সাপের বিষ ঝারার মন্ত্র : সুদীপ ঘোষাল 


প্রকাশিত:
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:৪২

আপডেট:
২৬ অক্টোবর ২০২০ ২১:১৫

 

অনেকদিন থেকেই ভাবি বাংলা ওঝা- গুণিন ও সাপের বিষ ঝাড়ার মন্ত্র নিয়ে কিছু লিখবো। কিছু কারণও আছে। আমার পিসির ছেলে সরাননদার বাড়ির লোকজন কোন উপায় না পেয়ে  বায়েন পাড়ার ওঝা গুনিনদের নিয়ে এসেছিলেন হাসপাতাল না গিয়ে। তখন হাসপাতাল যাওয়া দুষ্কর ছিল। মাঝে অজয় নদী কাটোয়াকে আলাদা করেছিল গ্রামগুলিকে। ন্যারোগেজ লাইিনে ট্রেন চলত। তবে তা সংখ্যায় অনেক কম। ফলে রোগী নিয়ে যেতে ছয় সাত ঘন্টা লেগে যেত। রোগীও কাহিল হয়ে পড়ত। তাই সাপে কাটা রোগীদের ভরসা ছিল এই ওঝা বা গুনিনরা।

তারা এসে গাছের শিকড় বাকড় বেঁটে খাওয়াতেন রোগীদের। অনেকে সুস্থ হয়ে যেত। আর যারা ভাল হত না, মরে যেত গুনিনরা বলতেন, ওকে কালে খেয়েছে গো। কিছু করা গেল না। সরাননদা সাপের কামড়ে মরে গেলেন।  ওঝা গুনিনরা সুর করে মা মনসার গান করতেন। মা মনসার দয়া প্রার্থনা করা সেইসব গান শুনে কান্না আসত। দর্শক শ্রোতারা গোল হয়ে ঘিরে গান শুনতে শুনতে কেঁদে ফেলতেন। সরাননদা মরে গেলে আমার মানসপটে ছবি তুলে রাখল মন ক্যামেরা। আমি ঘটনাটা আজও ভুলতে পারি নি। তাই মনে হয়েছিল এই ওঝা গুনিনদের কুসংস্কার কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে তা আশেপাশের গ্রাম ঘুরলেই বোঝা যায়। এখনও অনেকে আছেন যারা প্রথমে হাসপাতালে না গিয়ে ওঝাগুনিনদের ডাকেন। তবে তার সংখ্যা এখন অনেক কমের দিকে। এখন গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থায়  বিপ্লব এসেছে দু একটি গ্রাম ব্যতিরেকে।কোন প্রস্তুতি না নিয়ে এই হঠাৎ নেমে পড়ি কাজে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াই যেখানে ভালো ভালো ওঝা থাকেন এখনো ওঝা সম্প্রদায় হয়তো লুপ্তপ্রায়। কারণ বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এবং ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওঝার কাছে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সাপে কামড়ালে কেউ ওঝার কাছে না গিয়ে প্রথমে হাসপাতলে যায় এবং  হাসপাতালেই  সাপের এন্টিসিরাম পাওয়া যায় এবং তাতেই সুস্থ হয় সাপে কাটা রেগী।  এটা প্রচার ব্যাপকভাবে হয়েছে তার ফলে ওঝার কাছে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে। এর ফলে ওঝার কাছে যে মন্ত্র গুলো পাওয়া যেত, যেগুলো বিলুপ্তপ্রায় সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টায় আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি।

তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেছি তারা কেউ হয়তো বলতে পেরেছে। কেউ অজানা ভয়ে  বলতে চায় নি মন্ত্রগুলো।

আমি একবার ছোটবেলায় দেখেছিলাম আমাদের গ্রামে সাপে কাটা রোগী ছাড়ছে বেলুনের অনিল পাঠক বিখ্যাত ছিলেন, যেখানেই সাপে কাটা রোগী তিনি সেখানেই তার চিকিৎসা শুরু করতেন । তার চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল দেখার মতো । প্রথমে প্রথমে তিনি রোগীর সাপে কাটা জায়গাতে ব্লেড দিয়ে চিরে রক্ত বার করতেন এবং ধীরে ধীরে উপরদিকে আসতেন এবং সাপে কাটা জায়গাটি  টিপে রক্ত বার করে  করতেন। নীল রঙের রক্ত বেরোলে  বলতেন যে বিষ রক্তের  সঙ্গে মিশে আছে। এই ভাবে রক্ত বের করতে করতে রক্ত যখন লাল হয়ে যেত তখন বলতেন যে বিষ কমে গেছে। তারপর বিভিন্ন গাছ গাছড়ার ঔষধ এনে রোগীকে খাওয়াতেন। তাতেও যদি রোগী সুস্থ না হতো তারপর শুরু হতো পানি ছাট। পানি অর্থের জল বালতি বালতি জল ঢালা হত রোগীর মাথায়।  শেষে দেখা যেত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুস্থ হয়ে যেত রোগী  তবে দু-একজনকে মরে যেতেও দেখেছি। ছোট পুরুলের নামকরা ওঝা ছিলেন বিশ্বাস মহাশয়। বায়েন পাড়ায় একটা ওঝার দল ছিল। সাপে কাটা রোগী দেখলে তারা প্রথমে হাত চালাতেন। হাত চালিয়ে বুঝে নিতেন কোন সাপে, কোন স্থানে কামড়েছে। 

যেসব ব্যক্তি সচেতন ছিলেন তারা হয়তো বলতেন যে সাপে কাটা রোগী ভালো হয়ে যেত তাকে সাপটি বিষ ঢালতে পারে নি। সাপে বিষ হয়তো ঢালতে পারেনি তার জন্য সুস্থ হয়ে গেল আর যে সাপে বিষ ঢালতে  পেরেছে সেই সাপকে ওঝা কখনো ভালো করতে পারে না এটা সচেতন লোকের মত। কিন্তু যারা ওঝার চিকিৎসা পদ্ধতিতে  বিশ্বাসী তারা ওদের বিশ্বাস করত। তারা বলত ওঝারা  বিষধর সাপে কামড়ালেও সেই রোগীকে  ভালো করতে সক্ষম এবং অনেক ডাক্তারের থেকে এরা ভালো চিকিৎসা করতে সক্ষম। যাইহোক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বাইরে গিয়ে আমি শুধুমাত্র আগেকার ওঝাদের মন্ত্র তন্ত্র ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে  বর্ণনা করব। 

 

সাপকে কেন্দ্র করে মনসা মঙ্গল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পৌরাণিক গল্প গাথা রয়েছে । আর সেই গল্পগাথা শুনেই গ্রাম বাংলার মানুষের মনে সাপের কামড়ের ভয় এখনও লেগে রয়েছে। তাই সাপে কামড়ালে হাসপাতাল বা ডাক্তারের পরিবর্তে এখনো ওঝা গুণিনের কাছেই বেশি মানুষ যেতে পছন্দ করেন।

বর্তমানে যে অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে এই সাপের কামড়ের চিকিৎসা করা সম্ভব ও মৃত্যুর মুখ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব তা দেখিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু কিছুতেই গ্রামের সাধারন মানুষকে ওঝা গুণিনের কাছে যাওয়ার প্রবণতাকে বন্ধ করা যাচ্ছে না। সেই কারনেই  সচেতনতা শিবির  ঠিক করে যদি ওঝা গুণিনদের সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় তাহলেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই শুরু হয় এই ওঝা গুণিনদের নিয়ে কর্মশালা।সাপে কাটলে ওঝা-গুনিনের কাছে নিয়ে যাওয়া এখনও গ্রামবাংলার অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই দস্তুর। ফলে মৃত্যুর সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। চিকিৎসকেরা সব সময়েই বলে আসছেন, সময় মতো রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু দেখা যায়, ওঝা-গুনিনের কাছে নিয়ে গিয়ে অনেকটা দেরি করে ফেলেন রোগীর আত্মীয়েরা। হাত চালিয়ে ওঝা গুনিনরা সাপের নাম বলে দিতেন। গ্রামবাসীরা সন্দেহাতীতভাবে তাদের কথা বিশ্বাস করতেন।  ওঝার কাছে রোগী সুস্থ না হলে,  যখন উপায়ন্তর না দেখে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন চিকিৎসকদের আর কিছু করার থাকে না।

এই পরিস্থিতির জন্য সচেতনতার অভাব আর কুসংস্কারকেই দায়ী করেন সকলে। সাপে কাটা রোগীকে নিয়ে কী করণীয়, তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে মানুষকে সচেতন করার কাজটা করে আসছে ক্যানিঙের যুক্তিবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা। এ বার ওঝা-গুনিনদের নিয়ে এক কর্মশালার আয়োজন করল তারা। উদ্দেশ্য, ওঝা-গুনিনদের এটা বোঝানো, সাপে কাটা রোগী এলে তাদের হাসপাতালে পাঠানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া। কোনটা বিষধর সাপের ছোবলের চিহ্ন, কোনটা নয়, সে ব্যাপারে প্রশিক্ষিত করা। তা ছাড়া, সাপে কাটলে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু যেন করানো যায়, সে ব্যাপারেও যেন ধারণা থাকে ওঝা-গুনিনদের।

ওঝা ও গুনিনদের মন্ত্রঃ

১) বিষ কালা সিন্দুরের ফোঁটা হাঁড়ি ঝি কন্ঠের পরে না মানিস তুই বাধা 

২) কাল কাটি কুল কাটি কাটি কুকিয়ান দেখিয়া খসিয়া পড়ে সাপের ও পরান সাপা থাকে মুঠোর নিচে উচ্চ ভোরাটের দোহায় 

৩) তোর শিবের রাগ্যে মাথা করিস হেট বানধিয়ান কুগিয়ান দুরে চলে যাস নয়লে শিবের পাঁচ মাথা কামড়ায়ে খাস

৪) নেই বিষ বিষো হরি রাগ্যে বলো নেই নেই বিষ মনসার রাগ্যে বলো নেই (সংগৃহীত) 

৫) খটাৎ খটাৎ /সাত ভুবনের জাহাজ খটাৎ /বিষ কাটে যেতে কাটে /রোগীর অঙ্গে যে করে হান/ তার বুকে মারি মা মনসার বাণ (সংগৃহীত) 

বেলুন গ্রামে গিয়ে অনিল পাঠক মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ১৯৮২ সালে। আপনি কি করে বোঝেন কোন সাপে কামড়েছে?  

- আমি হাত চালাতে পারি। হাত চলতে শুরু করলে বিষহীন এবং বিষধর দুটি কাগজ রাখা থাকে। হাত যেদিকে যাবে সেইসাপই ধরে নিতে হবে।

- তারপর কিভাবে চিকিৎসা শুরু করেন?

- তারপর আমরা হাঁটুর উপরে গামছা দিয়ে বাঁধন দি। ভাল ওস্তাদ হলে ধুলো দিয়ে বাঁধন দেন।

- ধুলো দিয়ে কি বাঁধন হয়?

- হয় নিশ্চয়। মন্ত্রশক্তি আছে।

- তারপর কি করেন?

- তারপর নতুন ব্লেড দিয়ে ক্ষতস্থানের উপর থেকে কাটতে শুরু করি। রক্ত ধীরে স্বাভাবিক হলে বাঁধন খুলে দিই।

- বাঁধন খুলে দিলে মরে যাওয়ার ভয় থাকে না?

- না আমরা বুঝলে খুলি। তারপর গাছের শেকড় খাওয়াই। তেঁতো জিনিস খাওয়ায়। তিতকুটে লাগলে রোগী ঠিক হয়। আর স্বাদ বুঝতে না পারলে বিষ আছে জানি।

- তখন কি করেন?

- বিষ না কমলে পানিছাট পদ্ধতিতে মাথায় জল ঢালে পাঁচজন লোক। কলসি কলসি জল ঢালে ওরা। রোগী শীতে কাঁপতে শুরু করলে সুস্থ হয়।

২০১৮ সালে বেলুন গ্রামে গিয়েছিলাম। ওঝার ছেলেরা এখন ওসব বিদ্যা প্রয়োগ করেন না। ওনার বিভিন্ন রকম কাজ করে জীবীকানির্বাহ করেন। 

এখন সচেতন লোকের প্রচারে ওঝা গুনিনরা সচেতন হয়েছেন। ওঝা গুনিনের ব্যাপার চিকিত্‍সক ডাঃ আনন্দ  রায় জানান আমরা সব সময় সাপে কামড়ানো মানুষদের জানাই আগে হসপিটালে নিয়ে আসতে কেন জানিনা এখনো তারা ওঝা গুনিন করে বেড়ায়।এই ব্যাপারে আমরা গত কয়েক মাস আগে ওঝা গুনিনদের নিয়ে একটা সচেতন শিবির করেছিলাম তাতে হয়তো সব ওঝা গুনিন আসে নি।যারা আসেন নি তারা হয়তো এই কাজ এখনো করে যাচ্ছে। এদের সচেতন করার জন্য সচেতনতা শিবিরের প্রয়োজন আছে। একবার একটি লোক গুনিনের বাড়িতে গিয়ে ঝাড়ফুঁক করানোর পরে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি আসেন। বাড়িতে এসে তার স্ত্রী আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি আবারও স্ত্রীকে ওঝাড় বাড়িতে নিয়ে যান গতকাল রাতভর চলে ওঝার কেরামতি। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওঝার বাড়িতে গিয়ে তিনিও ঝাড়ফুঁক করেন। অবশেষে ঝাড়ফুঁকে মৃত্যু হয় শফিকুল দফাদারের।এদিকে  বৌ খাদিজা বিবিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে এদিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মানুষ যে আজ ও কুসংস্কার এর মধ্যে ডুবে রয়েছে একবিংশ শতাব্দীতে এত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও এসে এখনও যে মানুষ কুসংস্কার এর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারিনি তার জ্বলন্ত উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত গ্রামের ঘটনা।  

গুনিনরা বাণ মারার চিকিৎসাও করে।গ্রামের একটি লোকের পায়ে যন্ত্রণা শুরু হল। লোকটি গেল মধু গুনিনের কাছে।মধু গুনিন বলল,তোকে বাণ মেরেছে কেউ। সেইজন্য তোর পায়ে যন্ত্রণা হচ্ছে। লোকটি নানারকম শেকড় বাকড় খেল কিন্তু রোগ ভাল হল না। তখন সে ডাক্তারখানা গেল। কিছুদিনের চিকিৎসায় সে সুস্থ হল। এখন সে আর গুনিনদের বিশ্বাস করে না। এরকম অনেকরকম উদাহরণ আছে যা এখনও অনেক মানুষকে অন্ধ করে রেখেছে কুসংস্কারের আবর্জনার চাপা অন্ধকারে। 

 

সুদীপ ঘোষাল
পূর্ববর্ধমান, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top