সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

আর্যভট্ট, বিশ্বশ্রেষ্ঠ এক গাণিতিক   জ্যোতির্বিজ্ঞানী! : তন্ময় সিংহ রায়


প্রকাশিত:
১২ অক্টোবর ২০২০ ১৫:২৮

আপডেট:
১২ অক্টোবর ২০২০ ১৫:৩৪

ছবিঃ আর্যভট্ট

 

(কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ প্রস্তাবনার ১০০০ বছর আগেই, ভারতীয় গণিতজ্ঞ ও গাণিতিক-জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট, সমগ্র বিশ্ববাসীকে ব্যক্ত করেছিলেন এ সংক্রান্ত ধারণা, এমনকি তাঁর শূন্যের ধারণাকেও চেষ্টা করা হয়েছে নানান যুক্তি-বিজ্ঞান দ্বারা ছিনিয়ে নেওয়ার।
ইতিহাসখ্যাত এই মহান ভারতীয়কে সম্মান জানাতে ভারতের প্রথম উপগ্রহের নাম রাখা হয় "আর্যভট্ট", এবং বিহার সরকার পাটনাতে নির্মাণ করেন "The Aryabhata Knowledge University" নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়।)  

 

ভারতীয় বিশুদ্ধ গণিতবিদ ও গাণিতিক-জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট, সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাম। খ্রিষ্টের জন্মের ৪৭৬ বছর পর যখন যুক্তিবাদী তেজস্বী প্রতিভাধর এই বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছিল, সে সময়টাকে বলা হয়ে থাকে ভারতের সুবর্ণযুগ। সে সময়ে ভারতে শাসন করছিলেন গুপ্ত বংশের রাজারা।

তাঁর জন্মস্থান নিয়ে আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কোনো সুস্পষ্ট তথ্য! গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত আর্যভট্টের বিভিন্ন কাজ সংকলিত হয়েছে মূলত দুটি গ্রন্থে।এর মধ্যে প্রথমটি ‘আর্যভট্টীয়’ ও দ্বিতীয়টি হল 'আর্য-সিদ্ধান্ত।' 

দুটি গ্রন্থের মধ্যে উদ্ধার করা গিয়েছে, চার খন্ডে রচিত বিজ্ঞানভিত্তিক, মহার্ঘ্য সংকলনের আর্যভট্টীয় গ্রন্থটি যা সম্পূর্ণভাবে গ্রন্থকারের মৌলিক চিন্তা-প্রসূত! এতে সংস্কৃত স্তোত্রের মোট সংখ্যা ছিল ১১৮ টি। সমগ্র পৃথিবীর গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের  ইতিহাসে এক মাইলস্টোন এই 'আর্যভট্টীয়' গ্রন্থটি।

গ্রন্থটি তিনি রচনা করেন মোট চারটি খন্ড/অধ্যায়ে। এগুলো হল যথাক্রমে, দশগীতিকা, গোলপাদ, কালক্রিয়াপদ ও গণিতপাদ। এর মধ্যে প্রথম তিনটিতে সংকলিত রয়েছে জ্যোতির্বিদ্যা ও গোলীয় ত্রিকোণমিতি সম্পর্কিত বিষয়বস্তু ও শেষ অধ্যায়ে অর্থাৎ গণিতপাদে ব্যাখায়িত আছে বীজগণিত, পাটিগণিত, দ্বিঘাত সমীকরণ সমতল ত্রিকোণমিতি, এন সংখ্যক(প্রথম), সাইন অনুপাতের সারণি প্রভৃতি। এছাড়াও বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গণিতপাদ অধ্যায়ে আর্যভট্ট সেই সময়কার জ্যোতিষচর্চার জন্যে অত্যাবশ্যক মোট ৩৩ টি গাণিতিক প্রক্রিয়ার বর্ণনা করেছেন।

 

পাই(π)-এর মানকে নির্ণয় করতে গিয়ে তিনি যে Calculation-কে তুলে ধরেছেন সেটি এমন, 'চার-এর সাথে একশ যোগ করে তাকে আট দিয়ে গুণ করে তার সাথে বাষট্টি হাজার যোগ করলে বিশ হাজার একক ব্যাসের বৃত্তের  পরিধি পাওয়া যায়।'  আর এই হিসেব অনুযায়ী আর্যভট্ট নির্ণয় করেছিলেন পাই এর মান, {(4+100)×8+62000}/20000 = 62832/20000 = 3.1416

 

দশমিক সংখ্যা পদ্ধতির প্রয়োগে তিনি শূন্য ব্যবহার করেছেন কিনা সে বিষয়ে রয়েছে কিছু দ্বিধা-দন্দ্ব। তবে শূন্যের সমতুল্য একটি ধারণা তাঁর কাজে ছিল বলে মনে করা হয়, যেটিকে বলা হয়েছে 'খ' (শূন্যতা অর্থে)। 

এখন 'খ' এর এই যে ধারণাটি, সেটি কোন অঙ্ক হিসেবে নাকি শূন্যস্থান জ্ঞাপক চিহ্ন হিসেবে ছিল সেটি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক! যদিও বর্তমানে সেই তর্ক-বিতর্ক অনেকটাই অবসানের মুখে। 

 

আজ থেকে প্রায় ৪০০০-৫০০০ বছর পূর্বে প্রথম গণনা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু করেন সুমেরীয়রা। কিন্তু সেই গণনায় শূন্য'কে তাঁরা ব্যবহার করতেন শুধুমাত্র 'খালি জায়গা' হিসেবেই। এবং সংখ্যার মাঝে মাঝে এই খালি জায়গা রাখার বিষয়টি থেকেই শূন্যের ধারণা পাওয়া যায় প্রথম বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে এই গণনা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার মানুষরা। ব্যাবিলনীয়রা লিখতেন সুমেরীয়দের থেকে প্রাপ্ত কিউনিফর্ম লিপিতেই। সেখানে সুমেরীয়দের মতন শুধুমাত্র খালি জায়গা না রেখে তাঁরা শূন্যকে ব্যবহার করতে শুরু করলেন একটু ভিন্ন মাত্রায়, অর্থাৎ শূন্য বোঝাতে ২টি কোণাকৃতির (‘’) চিহ্নকে ব্যবহার করতেন ব্যাবিলনীয়রা। ক্রমে ব্যাবিলনীয়দের থেকে প্রায় ১২-১৩,০০০ মাইল দূরে মায়ান সভ্যতায় 'খালি জায়গা' নির্দেশক হিসেবে এই শূন্যের প্রবেশ। এভাবেই ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে আর্যভট্ট থেকে ব্রম্ভগুপ্তে শূন্যের সংখ্যারূপে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ।

 

সর্বশেষ বলা যেতে পারে যে, শূন্যকে তাঁর 'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত' নামক বইয়ে সংখ্যার মর্যাদায় বসিয়েছেন এই ব্রম্ভগুপ্তই। তবে প্রচলিত বইগুলিতে, আর্যভট্টের এই ধারণাটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে শূন্যস্থান জ্ঞাপক চিহ্ন হিসেবে। ফরাসি লেখক ও বিশেষত সংখ্যাসূচক গণিতের ইতিহাসবিদ Georges Ifrah দাবি করেছেন যে আর্যভট্ট পরোক্ষভাবে সেটিকে ব্যবহার করতেন একটি দশমিক অঙ্ক হিসেবেই। তবে এটা ঠিক যে, দশমিক পদ্ধতিকে ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক প্রক্রিয়া বর্ণনা করেন তিনিই প্রথম।

 

আর্যভট্ট তাঁর সমস্ত গ্রন্থগুলিই রচনা করেছেন পদবাচ্যের (সংখ্যাগুলি উপস্থাপিত হয়েছিল  শব্দের আকারে) আকারে। আর্যভট্টীয় গ্রন্থের গোলপাদ অধ্যায়ে, একটি হিসেবমূলক উদাহরণের সাহায্যে আর্যভট্ট উল্লেখ করেছেন যে, 'পৃথিবী তার নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘূর্ণায়মান!' ও পৃথিবীর পরিধি ৩৯,৯৬৮ কিলোমিটার (মাত্র ০.২% ভুল) যা সেই সময়ে ও সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় এক নিখুঁত পরিমাপের ঈঙ্গিত বহন করে। চাঁদের যে নিজস্ব কোনো আলো নেই, সূর্য থেকেই প্রতিফলিত, সে ধারণাও তিনি ব্যক্ত করেছেন স্পষ্টভাবেই! 

 

ভাবলে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যে, অত্যাধুনিক কম্পিউটার, ক্যালকুলেটর বা টেলিস্কোপ তো কল্পনাতীত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কোন Minimum চিহ্নটুকুও সে সময়ে ছিলনা! অথচ কোনপ্রকার সংখ্যার উল্লেখ ছাড়াই, মাত্র ২৩ বছরের একজন যুবক, Computer Coding-এর ব্যবহারের মতন শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষার Coding-এর সাহায্যে, এই গ্রন্থে প্রস্তুত করেছেন তাঁর নির্ভুল গাণিতিক নির্দেশমূলক ব্যাখ্যা! কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি আর্যভট্টের আর্য-সিদ্ধান্ত-এর কোন পাণ্ডুলিপি! পরবর্তীতে, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত এবং প্রথম ভাস্করের রচনার মাধ্যমে জানা যায় যে, জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গণনা বিষয়ক একটি রচনার সংকলন এই আর্য-সিদ্ধান্ত নামক গ্রন্থটি। তবে সৌরজগতের পৃথিবী না সূর্যকেন্দ্রিক মডেল তিনি ব্যবহার করেছিলেন সেটি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক! আর্যভট্ট তাঁর আর্যভট্টীয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে কলিযুগের ৩৬০০ তম বছরে তাঁর বয়েস ছিল ২৩ বছর। আর এই তথ্যকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন পন্ডিতগণ পেয়ে যান, আর্যভট্টের জন্মসাল সম্পর্কে একটা নির্ভুল তথ্যযুক্ত ধারণা!

 

আর্যভট্টের পরবর্তী একজন গণিতবিদ প্রথম ভাস্কর (আর্যভট্টের শিষ্য হিসাবে জানা যায়)-এর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি জন্মেছিলেন নর্মদা ও গোদাবরী নদীর মধ্যবর্তী স্থানে দক্ষিণ গুজরাট ও উত্তর মহারাষ্ট্রের আশেপাশে ষোড়শ মহাজনদের অশ্মকা(অস্মক) নামক একটি জনপদে। আবার আর্যভট্টীয় গ্রন্থে তিনি নিজেকে কুসুমপুর/পাটলিপুত্রের (বর্তমান বিহারের রাজধানী পাটনা শহরে)-এর অধিবাসী হিসাবে উল্লেখ করেছেন।  

আর্যভট্ট তাঁর কাজের সিংহভাগ থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ, সবটাই সম্পন্ন করেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শিক্ষাশেষে তিনি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন একজন শিক্ষক হিসাবে। পরবর্তীতে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও একসময় আর্যভট্ট পালন করেছিলেন তাঁর গুরুদায়িত্ব। জ্যোতির্বিদ্যায় আর্যভট্টের অবদান প্রসঙ্গে জানা যায় যে, একজন ডাচ গণিতবিদ ও গণিতের ইতিহাসবিদ Bartel Leendert van der Waerden ও Cryptographer, আন্তর্জাতিক প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিত গবেষক Dr. Hugh Thurston এর লেখায় আর্যভট্টের জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত হিসাব নিকাশের পদ্ধতিকে সরাসরি দাবি করা হয়েছে সূর্যকেন্দ্রিক বলেই।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ ও California Institute of Technology-এর Visiting Professor Noel Swerdlow আবার, B.L. van der Waerden এর প্রত্যক্ষ সমালোচনা করে বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে আর্যভট্টের ধারণা অনুযায়ী সৌরজগত ছিলো পৃথিবীকেন্দ্রিক।  অপর দিকে Dennis Duke এর মতানুযায়ী, আর্যভট্টের কাজের পদ্ধতি ছিলো সূর্যকেন্দ্রিক, তবে সেটি তিনি লক্ষ করেননি কিংবা রয়ে গেছিল অবচেতন মনে।

 

বিশ্বকোষ সমতুল্য জ্ঞানভান্ডারের অধিকারী এ হেন একজন শ্রেষ্ঠ ভারতীয় গণিতবিদের এই মহান অবদান বর্তমানের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় পালন করে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

 

"বিদ্বত্ত্বঞ্চ নৃপত্বঞ্চ নৈব তুল্যং কদাচন। স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান্ সর্বত্র পূজ্যতে!"

 

তন্ময় সিংহ রায়
কোলকাতা, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top