সিডনী বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২০, ৬ই কার্তিক ১৪২৭

বাংলা সাহিত্যে মধুসূদন দত্তের অবদান : আরিফুল ইসলাম সাহাজি


প্রকাশিত:
১৭ অক্টোবর ২০২০ ১৬:৩৩

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০২০ ০৭:৩৬

ছবিঃ মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

মনীষী বিদ্যাসাগর কোচবিহারের মহারাজের কাছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের চাকরির সুপারিশ করেছিলেন । সুপারিশ পত্রে দয়ার সাগর লিখেছিলেন , 'একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পাঠাইলাম, দেখিও যেন ইহা বাতাসে উড়িয়া না যায়।' বাঙালির শ্রেষ্ঠতম শিক্ষাগুরু মনীষী বিদ্যাসাগর একটুও বাড়িয়ে বলেননি, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন অগ্নিস্ফুলিঙ্গই বটে। প্রথম দিকে কীটস, শেলী প্রমুখ ইংরেজ কবিদের মতো বিশ্বকবি হওয়ার বাসনা ছিল তাঁর, ছাত্রজীবনেই তিনি বলতেন, 'I happen to be A great poet, which I am almost sure I shall be', জীবনের প্রথম প্রহরে তাই মাতৃভাষা চর্চা তাঁর কাছে নিন্মগোত্রীয় বলে মনে হয়েছিল। ইংরেজি সাহিত্য সাধনায় নিজেকে পুরোপুরি নিমজ্জিতও করেছিলেন, কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, ইংরেজ সমাজ একজন নেটিভ কবির ইংরেজি কাব্য চর্চাকে মন থেকে মেনে নেননি। 

মধুসূদন দত্তের বাংলা সাহিত্য চর্চার প্রাক সময়ে সংস্কৃত ও ইংরেজি অনুবাদ মূলক নাটকের বেশ রমরমা ছিল। একাধিক রঙ্গমঞ্চ গঠনের মধ্য দিয়ে নাট্যমোদী দর্শককুল বিনোদন অনুভব করছিলেন। মৌলিক নাটক রচনার মত দক্ষতা সম্পূর্ণ নাট্যকারের বেশ অভাব ছিল সেই সময় পর্বে। পাইক পাড়ার রাজা ঈশ্বরচন্দ্র প্রতিষ্টিত বেলগাছিয়া নাট্যশালার বিশেষ অবদান রয়েছে বাংলা সাহিত্যের সাবালকত্বয়ানে, রামনারায়ণ তর্কালঙ্কারের নাটক 'রত্নাবলী' অভিনয়ের জন্য তখন প্রস্তুতি চলছিল, নাটকটির শরীরী গঠন, ভাষার প্রাচীনত্ব, উপস্থাপন গুণ পছন্দ হয়নি মধুসূদন দত্তের। তাঁর মনে হয়েছিল, নাটকটি বড্ড সেকেলে। বন্ধু গৌড়দাস বসাক মধুসূদনকে বাংলা নাট্য জগতে প্রতিভাবান নাট্যকারের অভাব সম্পর্কীত বিষয়ে ওয়াকিবহাল করান। তখন মধুসূদন দত্ত নাটক লেখার প্রস্তাব দেন। প্রথম দিকে বন্ধু গৌড়দাস মধুসূদনকে আমল দেননি, নেপথ্যে যথেষ্ট কারণও ছিল, মধুকবি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মহাপন্ডিত একথা তাঁর পরম বিরুদ্ধ সমালোচকও স্বীকার করবেন, গৌড়দাসের থেকে এই বিষয়ে উত্তম আর কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এই মহৎ গুণ থাকা সত্ত্বেও, মধুসূদন পূর্বে কখনও বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেননি, এইখানে আশঙ্কা ছিল গৌড়দাসের। কিন্তু যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর মধুকবির বিষ্ময়কর প্রতিভার উপর আস্থা প্রকাশ করেন। তিনি গৌড়দাস বসাককে এক পত্রে লেখেন, ইংরেজি সাহিত্যে যাঁর এমন ভয়ঙ্কর পাণ্ডিত্য, তিনি বাংলা ভাষা চর্চা করলে নিঃসন্দেহে বাঙালি পাঠক উপকৃত হবেন, সমৃদ্ধ হবে মাতৃভাষা । 

মধুসূদন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য দিকবলয়ই পরিবর্তন করে দিলেন। এতদিন যেখানে অনূদিত সাহিত্য সম্ভার দিয়েই চলছিল কাব্য সাহিত্যের মহৎ কর্ম, সেই জায়গাতে মক্ষম আঘাত করলেন তিনি। মৌলিক সাহিত্য  রচনা করা এমন কোন দুঃসাধ্যময় কর্ম নয়, সেটা তিনি প্রমাণ করলেন ১৮৫৯ সালে শর্মিষ্ঠা নাটক প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। নাটকটি ব্যপক জনপ্রিয় এবং মঞ্চসফল হয়েছিল। এই অভূতপূর্ব সাফল্য বিষয়ে মহাকবি মধুসূদন বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে এক চিঠিতে লেখেন, 'Should be drama ever again flourish in India posterity will not forget these noble gentlemen, the artist friends of our rising national theatre.' মধুসূদন নিজ নাটক সম্পর্কে যে মোটেই বাড়িয়ে বলেননি তার প্রমাণ মেলে যতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গৌড়দাস বসাককে লেখা পত্রে। সেই পত্রে যতীন্দ্রনাথ লিখলেন, 'The representation of the drama of Sharmishtha has come off gloriously. Night before last was the sixth of last night of its performances.' ইংরেজ কবি হওয়ার বাসনায় ছুটে বেড়ানো মধু কবির প্রথম নাটকের অভিনয় সাফল্য তাঁকে স্বস্তি দিয়েছিল, তিনি উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। হওয়ারই কথা, বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লেখা চিঠিতে মধুসূদনের উচ্ছ্বাস ধরা পরে, তিনি লিখলেন, 'This Sharmishtha has very neatly put me at the head of all Bengali writers. people talk of its poetry with rapture.' 

মধুসূদনের বাংলা সাহিত্য চর্চা বাংলা সাহিত্যের জন্য কল্যাণবহ হয়েছিল। মধুসূদন বিশ্বসাহিত্য বিশেষত ইংরেজি সাহিত্যের এক দিকগজ পন্ডিত হওয়ার অভিজ্ঞানই বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে নতুন অক্সিজেন সঞ্চারের কাজ করেছিল। 'মেঘনাদ কাব্য' ভূমিকা অংশে সমালোচক মহান চক্রবর্তী ভয়ঙ্কর সুন্দর কিছু কথা লিখেছেন, 'মধুসূদন রেনেসাঁসের যজ্ঞকুণ্ড থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন বলেই তার মধ্যে এই যন্ত্রণাবোধ আরো তীব্র, আরো গভীরতর, আরো ঘন। এ যুগের জয়সিংহ মধুসূদন, যাঁর একদিকে লালনকর্তা অতীত সংষ্কার রঘুপতি, অন্যদিকে নবীন মানবতাবাদের প্রতীক গোবিন্দমানিক্য। জয়সিংহকে এ যুগের অস্থিরতার শিকার হতে হয়েছিল, হৃদপিন্ড ছিন্ন করে রক্তপদ্ম অর্ঘ্য উপহারে এ যুগের দেনা মেটাতে হয়েছিল, তেমনি মধুসূদনকেও এ যুগের দেনা মেটাতে হয়েছিল, জীবন সাগর মন্থন করে বিষামৃতকে তুলে আনতে হয়েছিল, কিন্তু বিষের জ্বালায় তিনি নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন। যুগের সমস্ত বেদনা বাসনা, স্বপ্ন - ব্যর্থতাকে নিজের মধ্যে গ্রহন করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন যুগন্ধর।' (মেঘনাদবধ কাব্য  ভূমিকা অংশ, ১৩৭৭ , পৃষ্টা -৩১ )

মধুসূদনের বাংলা ভাষায় কাব্য ও নাটক চর্চার ফলে বাংলা সাহিত্য যথার্থ দিশা পেয়েছিল। মহাকবির জাদুর স্পর্শেই যুগান্তর আসে বাংলা সাহিত্যে। যা এক আধুনিক ভাব ও মননের সঞ্চার করেছিল অন্যদের মধ্যে। সমালোচক মনি বাগচী মধুসূদনের আবির্ভাব প্রসঙ্গে যথার্থই লিখেছেন, 'এলো সে বাংলার শ্যামল মাটিতে - কপোতাক্ষ নদের তীরে, সাগর দাঁড়ি গ্রামে । কী দাহ সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ! সে দাহ মহতী কামনার দাহ - এক বিপ্লবী চিত্তের যন্ত্রণাদাহ। দেহ তাঁকে ধারণ করতে পারেনি । জীবনে নিস্ফল, কিন্তু কাব্যলোকে অমর।' একেবারেই যথার্থই বলেছেন সমালোচক। ব্যক্তি জীবনে, মানুষ মধুসূদনের অনেক চরিত্রদোষ ছিল। অমিতব্যয়ি, মদ্যপান, নারী সঙ্গ তাঁকে নিঃস্ব করেছে। বলতে গেলে সোনার চামচ মুখে নিয়েই তাঁর জন্ম, যুবক বয়সে সাহেব হওয়ার প্রলোভন তিনি ত্যাগ করতে পারেননি। সেই প্রবল বাসনা পূরন করবার অভিলাষেই ত্যাগ করলেন স্বধর্ম। পিতা রাজনারায়ণ পুত্রের এ অপরাধ মার্জনা করেননি, তাঁকে ত্যাজ্য করলেন। এই পর্বে এসে ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখোমুখি হলেন তিনি। সব রকম চেষ্টা করেও জীবনানন্দ দাশের মত কর্ম জীবনে তেমন কিছু অনুভব অর্জন করতে সক্ষম হলেন না। জীবনে তিনি ব্যর্থ হলেন সত্য, তবুও সাহিত্য কর্মের মধ্যে চিরন্তন শাশ্বত ভাবে অমর থাকলেন। বাংলা সাহিত্যের পরম লাভ হল, সাহিত্যের দিকবলয়ই পাল্টে গেল। মধ্যযুগীয় কচকচানির পরিবর্তে এক আধুনিক যুগের সঞ্চার হল মধুকবির পবিত্র হাতে। যে ধারাকে পরবর্তীকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্বদরবারে। 

 

আরিফুল ইসলাম সাহাজি 
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top