সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বধির নিরবধি (পর্ব আট) : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
১৯ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৪৩

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ১৮:১৫

 

(দেশসেরা দুই ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ ও ‘রস+আলো’তে লেখার সুবাদে আসিফ মেহ্‌দী রম্যলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আগেই। ‘বেতাল রম্য’ নামের প্রথম বইয়েই তিনি লাভ করেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। তারপর একে একে প্রকাশিত তাঁর প্রতিটি বইয়ে ব্যঙ্গ আর হাসির সঙ্গে গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি শুধু পাঠকপ্রিয়তাই লাভ করেননি, তাঁর বইগুলো উঠে এসেছে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায়। সেগুলোর মধ্যে 'বধির নিরবধি', ‘মায়া’, ‘অপ্সরা’, ‘তরু-নৃ’ অন্যতম। এছাড়া এনটিভিতে প্রচারিত তাঁর লেখা নাটক ‘অ্যানালগ ভালোবাসা’-র বিষয়বস্তুর জীবনঘনিষ্ঠতা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। ‘ন্যানো কাব্য’ নামে একটি বিশেষ কাব্যধারার প্রবর্তক আসিফ মেহ্‌দী কবিতা প্রেমীদের কাছে ন্যানো কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশ।)

 

পর্ব আটঃ
ইনো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে ফিরছে রুহান। দুটো বিষয় তার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে চলেছে-বাবার জ্ঞান এখনো না ফেরা এবং পারিবারিক অশান্তি। অবশ্য অশান্তির বিষয়টি সুরাহার জন্য ইনো ভাই একটি কৌশল বলে দিয়েছেন। সবার কাছেই ইনো ভাইয়ের মর্যাদা ‘ভাই’ হিসেবে। তাই রনির কাছে তিনি যেমন ভাই, তেমনি রনির চাচা রুহানেরও ভাই তিনি। তার বলা কৌশলটি রুহানের খুব পছন্দ হয়েছে কিন্তু এটি সে খাটাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে ভুগছে। তবে সংসার থেকে কালকেউটে দূর করার জন্য এর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুহান অফিসের দায়িত্ব সেরে এবং ইনো ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ফিরছে ঠিকই কিন্তু বাসায় দিকে যাচ্ছে না। যাচ্ছে ধানমণ্ডিতে। রাতে থাকবে হাসপাতালে। রুহান পৌঁছলে সুহান ও দিলারা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বাসায় যাবেন।  

 

শ্রাবণী ভিলাতে যেন আত্মাহীন শরীর নিয়ে মূর্তির মতো নিজের রুমে শুয়ে আছে রনি! কিছুক্ষণ আগে তার জীবনে ঘটে গেছে সুনামি। যে অপ্রত্যাশিত ভীষণ বিপদের আঁচ তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, তা আকস্মিকভাবে সুনামির মতো দেখা দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার সত্ত্বা! খানিক আগে রনি জানতে পেরেছে আজ সন্ধ্যায় ছিল নূপুরের আকদ এবং আকদপর্ব শেষে সে তার স্বামীর বাড়িতে চলে গেছে। রনি হঠাৎ খবরটি পেলেও নিশ্চয়ই পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া এসব ঘটেনি; অথচ কখনো সে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারেনি। প্রিয়মানুষ প্রতারক হলে মানুষ এভাবেই নিদারুণ অসহায় হয়ে পড়ে।

মানসিক দিক থেকে চরমভাবে বিধ্বস্ত হলেও একেবারে ভেঙে পড়েনি রনি। ইনো ভাই এমন পরিণতির কিছুটা আঁচ দিয়েছিলেন বলেই সংবাদটি রনিকে সম্পূর্ণভাবে ধরাশায়ী করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, ইনো ভাই বলার পর থেকে তার হৃদয়ও কেন যেন অনুভব করতে শুরু করেছিল যে সে প্রতারিত হচ্ছে। তারপরও প্রাণপ্রিয় মানুষটির আঘাতের ধকল মন থেকে মেনে নিতে দারুণ কষ্ট হচ্ছে তার। নানাভাবে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিছানায় শুয়ে ইনো ভাইয়ের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল রনি। তিনি জানিয়েছেন জীবনের তিন সূত্র-নিজেকে চেনা, পরিস্থিতি চেনা, নেশাগ্রস্ত হওয়া। আজকের পরিস্থিতি নিয়ে রনি ভিন্নভাবে ভাবা শুরু করল। যেহেতু জন্ম-মৃত্যু-বিয়ের ওপর মানুষের হাত নেই, তাই এসব নিয়ে বিচলিত হওয়া ঠিক না; বরং এতদিন সে অন্যের বউ নূপুরের সঙ্গে যে অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে গেছে, সেই পাপের খেসারত হিসেবে তার কিছুদিন খারাপ লাগবে-এভাবে চিন্তা করাটাই রনির কাছে যৌক্তিক বলে মনে হলো। জীবন নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে চায় সে। এখন থেকে পরিস্থিতি চিনে এগোবে রনি, কৌশলী হয়ে পাড়ি দেবে জীবনের পথ। 

 

ইনার বেশ অস্বস্তি লাগছে। সে বাসের চালকের পেছন বরাবর চতুর্থ সারির দুটো সিটের টিকিটই কিনেছিল। কিন্তু বাসে ওঠার পর শুনল, একটি সিটের টিকিট আরেকজনের কাছেও বিক্রি করা হয়েছে! চালক ও সুপারভাইজার এসে ইনাকে অনুরোধ করছে, সে যেন লোকটিকে বসতে দেয়। দুটো সিট নিয়ে একাকী যাচ্ছে জানার পর তারা আরও জেঁকে বসেছে। অস্বস্তি অনুভবের পাশাপাশি ইনা আতংকিত। তাই সুপারভাইজারকে বকা দিতে গিয়েও তার গলার স্বরের ভলিউম আপনাতেই মিইয়ে গেল। শোনা গেল ইনার মৃদুকণ্ঠ, ‘এটা কী ধরনের দুই নম্বরি! আমি দুটো সিট ছাড়া যেতে পারব না বলেই এভাবে রিজার্ভ করেছি।’ 

যে তরুণের কাছে আরেকটি সিটের টিকিট বিক্রি করা হয়েছে, সে অদ্ভুত রকমের অসহায় একটা লুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতিরিক্ত ভোলাভালা টাইপের দেখাচ্ছে দেখে ছেলেটিকে ইনার ভয় লাগছে। এমন সময় সুপারভাইজার বলল, ‘মার্ডার কেস আপা’! লোকটির কথাতে ইনা ভড়কে উঠল।

স্বপ্রণোদিত হয়ে মর্মার্থ খোলাসা করল সুপারভাইজার, ‘স্যার মার্ডার কেস-এর কাজে যাইতেছেন। দেরি হইলে বিপদ। একটু বিবেচনা করেন, আপা।’ ইনা বুঝতে পারল, অচেনা যুবক গোয়েন্দা বা পুলিশবাহিনীর সদস্য। তাই আর কথা বাড়াল না। অবশ্য কথা বলার কোনো সুযোগও নেই। কারণ, গলার স্বরই তো শোনা যাচ্ছে না। জানালার পাশের সিটে চুপ করে গুটিশুটি মেরে বসল ইনা। পাশে বসল আগন্তুক।

 

‘আপনি কি চিটাগাং যাচ্ছেন?’ প্রশ্ন শুনে ইনা চমকে উঠল। বাস ছেড়েছে কিছুক্ষণ হলো। সাধারণ একটি প্রশ্নে এভাবে চমকানো উচিত হয়নি। ইদানিং কী জানি হয়েছে তার-গতকাল ভোরে মাকে দেখে চমকে উঠেছে, আজকে সহজ-স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন শুনেও চমকে গেছে! অবশ্য প্রশ্ন স্বাভাবিক হলেও পরিস্থিতি তো গোলমেলে। উত্তর দিতে ভালো লাগছে না ইনার। তাই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে চুপ রইল।

একটু পর পাশে বসা ছেলেটি আবার একই প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি চিটাগাং যাচ্ছেন?’

‘জি।’ ইনা স্বাভাবিক স্বরে বলার চেষ্টা করল কিন্তু উত্তর শোনা গেল মৃদুস্বরে! এসি বাসের মধ্যেও ইনা ঘামছে। হাত-পা অসাড় লাগছে। তবে ভয় বা আতংক আর কাজ করছে না তার মধ্যে। যে বিষয়টি তাকে নার্ভাস করে তুলেছে, তা হলো ছেলেটি একটু বেশিই হ্যান্ডসাম। তাছাড়া তার শরীর থেকে একধরনের গন্ধ ভেসে আসছে। সম্ভবত পারফিউমের গন্ধ। ইনার ঘ্রাণশক্তি প্রখর হওয়ায় সেটি পরখ করতে পারছে। তাকে নার্ভাস করার জন্য এই গন্ধও কিছুটা দায়ী।

‘আমি যাচ্ছি হালিশহর এলাকায়। বাসস্ট্যান্ড থেকে ওখানে কীভাবে যাব, বললে উপকার হতো।’

ছেলেটির প্রশ্ন শুনে ইনা কিছুটা নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, ‘জানি না।’ ইনা জানাল না যে তারও গন্তব্যস্থল চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকা এবং চিটাগাংয়ে সে যাচ্ছে প্রথমবারের মতো। নিজে কিছু না জানালেও তার জানতে ইচ্ছা হচ্ছে, গোয়েন্দারা কীভাবে খুনের ঘটনা হ্যান্ডেল করে। কিন্তু নার্ভাসনেস তাকে আজ খেয়েছে! বাইরে প্রকৃতি ভিজছে বৃষ্টিতে আর বাসের ভেতরে ইনা ভিজছে নার্ভাসনেসে। ছেলেটি আঁচ করতে পারল কিনা কে জানে, বলল, ‘আপনি কিছু মনে করবেন না, একটা মিথ্যা বলেছি আমি।’

এমন কথায় ইনার ভয় পাওয়া উচিত। কিন্তু নার্ভাসনেস সম্ভবত অন্য সব অনুভূতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। ইনা মৃদুস্বরে বলল, ‘কী মিথ্যা বলেছেন?’ 

‘আমি আসলে কোনো খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে যাচ্ছি না। ইন ফ্যাক্ট, আমি গোয়েন্দা বা পুলিশের লোক না। আমি চট্টগ্রামের হালিশহরে যাচ্ছি এক অদ্ভুত লোকের উদ্ভট ইচ্ছাপূরণের জন্য।’

ইনা একটু নড়েচড়ে বসে বলল, ‘উদ্ভট ইচ্ছা!’

‘জি, উদ্ভট ইচ্ছা। আমি আর্টিস্ট সাজিদ হকের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিনি প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে তাঁর একজন ভক্তকে নিজের আঁকা ছবি উপহার দেন! এই উদ্ভট ইচ্ছাপূরণের জন্যই আমি যাচ্ছি চট্টগ্রামে। আমার সঙ্গে তাঁর আঁকা একটি ছবি আছে। সেটা পৌঁছে দিতে হবে তাঁর ভক্তের ঠিকানায়।’

ইনা ছুটে চলা বাসের আলো-আঁধারির ভেতর পাশের মানুষটির দিকে ঠিকমতো তাকাল। এমন হ্যান্ডসাম ছেলে সাধারণত চোখে পড়ে না। সেই তুলনায় ইনা খুব সাধারণ এক মেয়ে। ইনা বলল, ‘ইস, সেই ভক্ত কত ভাগ্যবান! আমি নিজেও সাজিদ হকের পেইন্টিংয়ের ভীষণ ভক্ত। ধানমণ্ডির একটা আর্ট গ্যালারিতে তাঁর একক চিত্র প্রদশর্নী হয়েছিল কয়েকমাস আগে। সেটাতে অ্যাটেন্ড করেছিলাম।’

‘কী বলেন, আপনি স্যারের ভক্ত! তাহলে তো আপনাকে এসব কথা বলা ঠিক হলো না।’

‘না-না, তা কেন? আমি কি আর কাউকে বলতে যাব নাকি?’

‘সত্যি বলবেন না তো?’

‘না, কখনোই না।’

‘ধন্যবাদ। আপনি এই যে বললেন, ভক্তের ভাগ্য ভালো-এ কথাটায় আমার দ্বিমত আছে। যদিও বিষয়টা আমি আর ব্যাখ্যা করব না। কারণ, তাহলে স্যারের প্রতি আপনার ভালোবাসাটুকু চলে যাবে।’

‘আন্দাজ করার মতো গুণ কিন্তু আমার আছে।’

‘নিজেই বুঝে গেলে তো ভালো। তবে আন্দাজ কিন্তু সবসময় ঠিক হয় না। আপনি কি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে আমি আসলে পুলিশের লোক না?’

‘না, সেটা অবশ্য পারিনি।’

‘আমি খুব দুঃখিত। খারাপ লাগছে যে মিথ্যা বলতে হয়েছে। আসলে ওদের পরের বাসগুলোরও টিকিট শেষ। অন্য কোম্পানির বাসে জার্নি করতে আমার ভালো লাগে না। তাছাড়া স্যারের এই ছবি পৌঁছাতে হবে কালকেই। সব মিলিয়ে ডেডলাইনে আটকা পড়ে এই চালাকি করতে হয়েছে। ওরা ম্যানেজ করে পরবর্তী কোনো একটা বাসে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু জানেনই তো, হাতের এক পাখি বনের পাঁচ পাখির চেয়ে ভালো।’

ইনা মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল যে এত কঠিন কথা তার জানা নেই। তাহমিদ বলল, ‘আমার নাম তাহমিদ। টুকটাক লেখালেখি করি। ইতিমধ্যে আমার দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে। একটা উপন্যাস, আরেকটা ভ্রমণ বিষয়ক বই।’

ইনা আরও একবার তাকাল তাহমিদের দিকে। কিছু বলল না। মৃদু হাসল। কোনো লেখক নিজের পরিচয় ও বইয়ের বর্ণনা দেওয়ার পরও তাকে চিনতে না পারলে কেমন অভিব্যক্তি ব্যক্ত করতে হয়, তা ইনার জানা নেই। তাই মৃদু হেসেই অনুভূতি প্রকাশ করল। বলল, ‘আমি বই পড়তে খুব ভালোবাসি। আপনার বইগুলোর নাম কী?’

‘উপন্যাসের নাম, শ্রাবণ ও শহরের গল্প। ভ্রমণ সংক্রান্ত বইটার নাম, ইংল্যান্ডের ডায়েরি।’

‘বাহ, নাম শুনে তো বেশ ভালো লাগছে! সংগ্রহ করব আপনার বই। আপনি ইংল্যান্ডে কি পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন?’

‘না। ইংল্যান্ডে বেশ কবার গেছি সাজিদ স্যারের সঙ্গে তাঁর আর্ট এক্সিবিশনে অংশ নিতে। তিনি তাঁর ছবি নিয়ে গেছেন; সঙ্গে আমাকেও যেতে হয়েছে। একবার ইংল্যান্ডে আমরা মাসখানেক ছিলাম। সেসব দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বইটা লেখা। এছাড়া স্যারের সঙ্গে অন্য অনেক দেশেও গেছি। কিন্তু লেখার আর সময় পাইনি। তাঁর উদ্ভট সব খায়েস মেটাতে গিয়ে সবসময় দৌড়ের ওপর আছি।’

ইনা বলল, ‘দৌড়ের ওপর কোথায়, বেশ তো আছেন।’

তাহমিদ হঠাৎ একদম চুপ হয়ে গেল। কে জানে, কোন অভিমানে! ইনার মনে হচ্ছে, তার কথায় হয়তো তাহমিদ মন খারাপ করেছে। আসলে তো সে কষ্টের মধ্যে আছে। স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তার নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে মনের বিরূদ্ধে আনন্দহীন এই কাজ করে চলেছে। এসব ভেবে বেচারার জন্য ইনার মায়া হচ্ছে। তাই তাহমিদের মন ভালো করার জন্য বলল, ‘আমিও কিন্তু হালিশহরে যাচ্ছি! তবে জায়গাটা কোথায়, ঠিক জানা নেই। চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো যাচ্ছি কিনা।’

তাহমিদ যেমন হঠাৎ চুপসে গিয়েছিল, তেমনি হঠাৎ সতেজ হয়ে উঠল। ইনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনিও হালিশহরে যাচ্ছেন! কী অদ্ভুত এই পৃথিবী দেখেছেন? একই শহরের বাসিন্দা আমরা; অথচ দু ঘণ্টা আগেও দুজন দুজনার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না! হঠাৎ বিব্রতকর এক পরিস্থিতির মাধ্যমে বাসের মধ্যে পরিচয়। আর এখন জানলাম, দুজনের গন্তব্য শুধু চট্টগ্রাম না; সেখানকার একই এলাকায়! কে জানে, হয়তো একই বাসায়!’

ইনা হেসে বলল, ‘ঠিকই বলেছেন, এক বাসাতেও হতে পারে! আমি আমার দাদাজানের একটি বিশেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য যাচ্ছি। তার ইচ্ছাটাকেও উদ্ভট ইচ্ছা বলা যেতে পারে। কারণ, এমন ইচ্ছার কথা সচরাচর শোনা যায় না।’

তাহমিদ খুশিমনে বলল, ‘উদ্ভট ইচ্ছার বিষয়টা একটু ভাব সম্প্রসারণ করে বললে ভালো হতো।’

কথা বলতে ইনার বেশ লাগছে; তবু সে বলল, ‘ভাব আর সম্প্রসারিত করা যাবে না, জনাব।’

তাহমিদ মৃদু হাসল। ইনা ভালোই বুঝতে পারছে যে এই মৃদুহাসির কোনো অর্থ নেই। প্রসঙ্গ বদলে তাহমিদ বলল, ‘আপনার নাম কিন্তু জানা হলো না।’

‘আমার নাম ইনা।’

‘ইমা?’

‘ইমা না। ইনা। হ্রস্ব-ই দন্ত্য-ন আকার। ইনা।’

‘ইনা নামটা এই প্রথম শুনছি! এই নামের অর্থ কী?’

‘ইনা নামের তেমন কোনো অর্থ নেই।’

‘কোনো অর্থ নেই!’

‘আছে। ইনা অর্থ বাসনকোসন, হাড়িপাতিল...’

ইনা হাসিমুখে কথা বলে চলল। হঠাৎ তাহমিদের আবার কী যেন হলো! একদম চুপ হয়ে গেল। বাসের ভেতরে মুহূর্মুহু ছলকে পড়ছে বাইরের মৃদু আলো। সেই আলোয় ইনার ঠোঁট দুটো দেখাচ্ছে কমলার কোয়ার মতো টসটসে। বিস্ময়ে তাহমিদ তাকিয়ে রইল ইনার ঠোঁটের দিকে, যা হাসি ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো মুখমণ্ডলে। কাঠের মতো হয়ে ওঠা তাহমিদের জীবন যেন অকস্মাৎ পেয়েছে শুঁষে নেওয়ার মতো সুপেয় জীবন! এর স্পর্শে তার নীলরঙা জীবনের মেঘগুলো হতে পারে প্রজাপতির রঙিন পাখার মতো!

‘কী হলো?’ ইনার প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরে পেল তাহমিদ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘নাহ, কিছু না।’ তারপর বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা আসন গেড়ে বসল দুজনের মাঝে।

তাহমিদ চুপ হয়ে যাওয়ায় কিছুক্ষণ অস্বস্তির সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পর ইনা আর চুপ থাকতে পারল না। বলল, ‘আমার কোনো কথায় কি আপনি মাইন্ড করলেন?’

‘কই না তো!’

‘তবে যে চুপ হয়ে গেলেন।’

‘আসলে জীবন নিয়ে ভাবছি।’

‘জীবন নিয়ে কী ভাবছেন?’

‘জীবনে যেসব খুব করে চেয়েছি, সেগুলো কেন যেন পাইনি!’

‘কি চেয়েছেন খুব করে?’

‘ছোটবেলায় কিছু উদ্ভট শখ মাথায় চাপত। একদিন খেলার মাঠে এক বড়ভাইকে সানগ্লাস পরতে দেখে আমার খুব ইচ্ছা হলো, নিজের জন্য একটা সানগ্লাস কিনব। কিন্তু শৈশব-কৈশোরে সানগ্লাসের চাওয়াটুকু আর পূরণ হয়নি। এখন টাকা দিয়ে আমি মুহূর্তেই ডজন-ডজন সানগ্লাস কিনতে পারি কিন্তু ইচ্ছেটা যে মরে গেছে!’

‘ব্যস, সানগ্লাস পাননি মনে করে এত উদাস হয়ে পড়লেন?’

‘শুধু সানগ্লাস তো না, আরও কত কী! যেমন-ছেলেবেলায় খুব চাইতাম, বাসা থেকে লুকিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে একা সিনেমা দেখব।’

ইনা হেসে বলল, ‘এ ইচ্ছাটা নিশ্চয়ই পূরণ হয়েছে।’

‘না, হয়নি। বাবাকে আমি খুব ভয় পেতাম। তার ভয়েই এসব ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। এখন বাবা নেই, শাসনের কেউ নেই কিন্তু জীবনে সেসব ইচ্ছারাও যে নেই!’

‘এই মুহূর্তে আমার কি ইচ্ছা করছে জানেন?’

‘আমি যাতে বকবকানিটা থামাই, তা-ই তো চাচ্ছেন নিশ্চয়?’

‘না, না। আমার খুব ইচ্ছা করছে, বাসের টিমটিমে আলোয় আপনার লেখা বই পড়তে। সঙ্গে করে কি একটা বইও আনেননি?’

তাহমিদ মাথা নেড়ে দুঃখিত চোখে জানাল যে তার সঙ্গে কোনো বই নেই। ইনা বলল, ‘তাহলে আমাকে দিয়েই শুরু করুন না! সাজিদ হক যেমন নিজের ভক্তদের একটা করে ছবি উপহার দেন, আপনি আপনার লেখা একটা বই আমাকে উপহার দেবেন! আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, আমার কাছে পৌঁছে যাবে আপনার বই।’

‘আপনি আগামীতে যেখানেই থাকুন না কেন, আপনাকে আমার বই দুটো পাঠাব-এটুকু নিশ্চিত থাকুন। তবে জনেজনে পাঠাতে পারব না। স্যারের মতো এত সময় বা খায়েস কোনোটাই আমার নেই।’

‘থাক, এত সময় থাকা ভালোও না। চরিত্রের জন্য হানিকর!’ কথাটুকু বলে হাসল ইনা। তাহমিদের এই কথা বোঝার কথা কিন্তু এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন বুঝতে পারেনি। ইনা এই প্রথমবারের মতো খানিক অন্যরকম অনুভব করল নিজের মাঝে। কোনো অচেনা শিহরণ তরঙ্গায়িত হলো তার শরীরজুড়ে। একটু আগের এবং বর্তমানের তার মাঝে অনুভূতির বিশাল তফাৎ। হঠাৎ-ই যেন হৃদয়ের গহীনে সযত্নে লুকিয়ে রাখা হাহাকার তাকে গ্রাস করেছে! জীবনে সে-ও তো যা চেয়েছে, পায়নি। চেয়েছিল রূপকথার মতো জীবন, সরল একটি মন। অথচ দেখা পেয়েছে শোভনের, যে কিনা ছায়ার পেছনে ছুটে চলা এক মানুষ; হৃদয় বোঝার সময় তার নেই। এই যে ছুটে চলা বাস, এই যে আলোআঁধারির খেলা, বাইরের শ্রাবণধারা, পাশে বসা রাজকুমার-চাইলেই তো আর মুহূর্তগুলোকে জীবনজুড়ে সম্প্রসারিত করে দেওয়া যায় না।

আকস্মিকভাবে ইনা ও তাহমিদ খেয়াল করল, দুজনই চুপ হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবতারও ভাষা আছে। সেগুলো থেকে যায় হৃদয়ের আঙিনায়। এ ভাষার ব্যাপারে মানুষেরা কেন যেন বধির নিরবধি; অথচ সেগুলোর পরিচর্যাই সবচেয়ে জরুরি।  

(চলবে)

 

আসিফ মেহ্‌দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

বধির নিরবধি (পর্ব এক)
বধির নিরবধি (পর্ব দুই)
বধির নিরবধি (পর্ব তিন)
বধির নিরবধি (পর্ব চার)
বধির নিরবধি (পর্ব পাঁচ)
বধির নিরবধি (পর্ব ছয়)
বধির নিরবধি (পর্ব সাত)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top