সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

নাগরিক কবি শামসুর রাহমান : আবু আফজাল সালেহ


প্রকাশিত:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৭:২৮

আপডেট:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৭:৫৩

 

শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যের কবিতাক্ষেত্রে এনেছেন নান্দনিকতা। নাগরিকতার ছোঁয়া। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বাংলাসাহিত্যে প্রথম নাগরিক কবি। কিন্তু পুরাপুরি নাগরিক কবি নন। তিরিশের আধুনিক পঞ্চপান্ডব নাগরিক কবিতার ক্ষেত্রে এনেছেন নতুন মাত্রা। তবে আজীবন ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা শামসুর রাহমানের মতো কেউ নাগরিকতার উপাদানে কবিতা লিখেননি। তাইতো শামসুর রাহমানকে পুরোপুরি নাগরিক কবি বলা হয়। দেখা যায়, শামসুর রাহমান প্রথমদিকে পঞ্চপান্ডবের(জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী) প্রভাব ছিল। প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটি, বিদ্ধস্ত নীলিমা সহ ৫-৬ টি কাব্যে এ প্রভাবের বিষয় লক্ষ্য করা যায়। পরে তিনি নিজের বলয় তৈরি করেন কবিতার ক্ষেত্রে। শব্দ প্রয়োগ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের দারুণ ব্যবহার, আর নতুন নতুন শব্দাবলির ব্যবহার তাঁকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তাঁর কবিতায় ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলনের সাহসী উচ্চারণ আছে। তিনি সময়কে উপেক্ষা করেন নি। যা অনেক প্রতিথযশা কবির ক্ষেত্রে অনুপস্থিত দেখা যায়। সময়-ইতিহাস তাঁকে নিয়ে গেছেন জনপ্রিয়তার শিখরে। ছোটদের জন্যও তিনি বেশকিছু শিশুতোষ ছড়া-কবিতা লিখেছেন। তাঁর এলাটিং বেলাটিং, ধান ভানলে কুঁড়ো দেব শিশুদের মুখেমুখে। আর এসব কারণে দুবাংলায় তিনি প্রধানতম আধুনিক কবি হিসাবে বিবেচিত হন। তাঁকে 'নাগরিক কবি' বলা হয়।

শামসুর রাহমানের বিশেষত্ব হলো- তিনি সব ঘটনাকে কবিতা করে তুলতেন। সংবেদনশীল কবিসত্তা, জীবনাসক্তি ও আধুনিক কবিতার কলাকৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকায় তিনি অর্জন করেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবির শিরোপা। তিনি পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি অধিকাংশ কবির সঙ্গে ব্যক্তিগত বা রচনাশৈলীর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। জীবনানন্দ দাশ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টপাধ্যায়, এলিয়ট থেকে লাওয়েল, বোদলেয়ার থেকে নেরুদা, বরার্ট ফ্রস্ট সব কবির রচনাশৈলীর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন নিবিড়ভাবে। অনেকের কবিতাও বাংলায় রূপান্তর করেন সফলভাবে।

কবি শামসুর রাহমানের কবিতার প্রধান ধারা হচ্ছে- দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, হতাশাকে সহজ ও সুদূরপ্রসারী করে বর্ণনায় মূর্ত করে তোলেন। শব্দ নির্মাণ ও প্রয়োগ সংহত এবং মিতব্যয়ী কবিতাশিল্পী। মানুষের ভাঙাগড়া শূন্যতাও বিষণœতার পরিপূর্ণ রূপকে অভাবনীয়ভাবে কবিতায় প্রকাশের ফলে তার কবিতা পাঠকপ্রিয় হয়েছে শুরু থেকে। ৫০ দশকের সমকালীন কবিবন্ধু সুহৃদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি কবিতাকে সহজবোধগম্য করার প্রয়াস নিয়েছেন প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' প্রকাশের শুরুতে তিনি সমকালীনদের থেকে আলাদা ভাষার সন্ধান করেছেন। নিজ বাসভূমে, বন্দি শিবির থেকে,বিধ্বস্ত নীলিমা, ফিরিয়ে দাও ঘাতক কাঁটা, উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ- বাংলা কবিতার দীর্ঘকালীন সময়ের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশমান অবয়ব পাওয়া যায় তার কবিতায়।

তিনি সময় ও কালকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টির আগের প্রতি বাঁক বদলে তিনি কবিতা লিখেছেন, কিছু ছড়াও লিখেছেন সমাজের কিছু অসংগতি তুলে ধরে। এ কারণেই তিনি পাঠকসমাজে চিরস্থায়ী আসন গড়েছেন। অনেকে প্রবল প্রতিভা নিয়ে কবিতা লিখেও সময় ও কালকে এড়িয়ে যেতে চাওয়ায় হারিয়ে গেছেন, প্রস্ফুটিত হয়েছেন প্রথমদিকে তবে টিকে থাকতে পারেন নি। শামসুর রাহমান বলতেন- কবি হওয়ার আগে ভালো মানুষ হতে হবে আগে। আয়ুব খানের বিরুদ্ধে গিয়ে লিখলেন 'হাতির শুঁড়'। বাংলা ভাষার উপর বারবার হামলা করেছ বিদেশি শত্রুরা। তাঁর কবিতায় প্রকাশ ঘটে-
‘নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
মমতা নামের প্রতি প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়
ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে
শিউলিশৈশবে 'পাখী সব করে রব' ব'লে মদনমোহন
তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,
অবিচ্ছিন্ন পর¯পর মমতায় লীন,
ঘুরেছি কাননে তাঁ নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই
ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।

আজন্ম আমার সাথী তুমি,
আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ'ড়ে পলে পলে,
তাইতো ত্রিলোক আজ সুনন্দ জাহাজ হয়ে ভেড়ে
আমারই বন্দরে’ - (বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা/সংক্ষেপিত)

চারিদিকে লাশ, রক্ত। তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা ’কবিতায় দৃপ্ত উচ্চারণ-

‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহন?’


ছড়ায় শামসুর রাহমান রাজনীতি, অর্থনীতি এবং দেশের সামাজিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ছড়াতেও সময় বা কালকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ছড়া ‘ফাও’এ বিষয় তুলে ধরেছেন পানির অব্যবস্থাপনা নিয়ে-
‘ফাও পেতে চাও ফাও?
ওয়াসার কাছে চাও।
পানির সঙ্গে পাবে
গুবরে পোকার ছা-ও’

ঢাকার কাব্যজগতের সনামধন্য বরেণ্য কবি হিসেবে তার সময়ের শ্রেষ্ঠ সম্মান অর্জন করেছেন। কী রাষ্ট্র, কী বি-রাষ্ট্র, কবিতা আড্ডা, কবির জন্মদিন, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, প্রকাশনা উৎসব, বইমেলা, বৈশাখী মেলা সবক্ষেত্রে শামসুর রাহমান ছিলেন প্রধান আকর্ষণ। তিনি কবিতা নিয়ে কথা বলতেন। নিজের কবিতা শোনাতেন। কবি হিসেবে তিনি মনে করতেন- যদি আমি সত্যিকারের কবি হতে পারি, এটাই আমার জন্য একটা বড় পাওয়া এবং সেটি অনাদিকাল কিংবা আগামীকাল যখন আমি থাকব না তখন যদি আমাকে কবি হিসেবে স্মরণ করা হয় তাহলেই আমার জন্য যথেষ্ট।আজন্ম নগরবাসী হলেও তার কবিতায় গ্রামীণজীবনের স্বপ্ন বাস্তবতা অনেকটা অ¯পষ্ট। অন্যদিকে নগরজীবনের দ্ব›দ্ব, নৈরাজ্য, অসঙ্গতি প্রেম, বিরহ সবকিছু ধারণ করেছেন তিনি কাব্যভাষা নির্মাণে।তাঁর কবিতায় প্রকাশ ঘটে-
‘জীবন মানেই
তালে তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলা, নিশান ওড়ানো
জীবন মানেই
অন্যায়ের প্রতিবাদ শূন্যে মুঠি তোলা’

শামসুর রাহমান ইংরেজি সাহিত্যে এম এ করেন। আধুনিক বাংলার অন্যতম কবি সাংবাদিকও ছিলেন। অনেক পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। তিনি সাংবাদিকতায় জাপানের 'মিতসুবিসি পুরস্কার' পান। আর সাহিতে অনেক দেশি-বিদেশি পদক/পুরুস্কার পান। বাংলা একাডেমী পুরুস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরুস্কার পান। এ ছাড়া আদমজী পুরুস্কার, আনন্দ পুরুস্কারসহ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবংগের বেশ কিছু সাহিত্য পদক/পুরুস্কার পান। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট উপাধি পান।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top