সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন- অন্ধকারে এক আলোর তরবারি : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১৫:০৫

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০০:২৯

ছবিঃ বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন

 

ছোট মেয়েটির মনের মধ্যে সবসময় খেলে বেড়ায় এক দু:খ...এক জিজ্ঞাসা। গ্রামের বর্ধিষ্ণু জমিদার বাড়িতে জন্ম তার। ঐশ্বর্য ও বৈভবের কোনো অভাব নেই। অথচ ছোটোবেলা থেকে যে বিষয়ের উপর তাঁর আগ্রহ, উদ্দীপনা, মেয়েদের জন্য তা নিষেধযোগ্য। মেয়েরা পর্দানসীন হবে...বোরখায় নিজেকে ঢেকে গৃহস্থালির কাজ সম্পন্ন করবে, বাইরের লোকজন এলে বাড়ির অনূঢ়া কন্যারা অন্দরমহলের আড়ালে আবডালে লুকিয়ে ফেলবে নিজেকে, পুরুষের দিকে মুখ তুলে কথা বলবে না। সমাজ এটাই অনুশাসন বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে যে অধিকার পুরুষের জন্য সর্বজনগ্রাহ্য মেয়েদের বেলায় তা কেন দোষযুক্ত হবে? কেন মেয়েরা অক্ষর চেনার, শিক্ষার অধিকার থেকে হবে বঞ্চিত? কেন?কেন? এবং কেন?
১৮৮০ সালে রংপুর জেলার মিঠাপুর উপজেলার অন্তর্গত পায়রাবন্ধ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই ছোট্ট মেয়েটি, বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন, পরবর্তী কালে যাকে আমরা সবাই চিনি প্রথম বাঙালী নারীবাদী ও নারীজাগরণের অগ্রদূত হিসাবে।  এছাড়াও তিনি ছিলেন প্রাবন্ধিক,ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। মধ্যযুগীয় বাঙালী মুসলিন নারীসমাজ তথা সমগ্র বাঙালী নারীসমাজের যাবতীয় অন্ধকারকে আগুনের তরবারি দিয়ে ছিন্নভিন্ন করার প্রথম নারীশক্তি। তাঁর পিতা মহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলি হায়দার সাবের ছিলেন জমিদার আর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। বাড়ীর ছেলেরা উপযুক্ত শিক্ষালাভ করবে কিন্তু তাঁর মেয়েরা আর পাঁচজন মুসিলিম নারীর মত পর্দানসীন হবে আর কোরান পাঠের জন্য শুধুমাত্র উর্দু শিক্ষা লাভ করবে এই মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তাঁর অগ্রজ ইব্রাহিম সাবেরের সহায়তায় রোকেয়া ও তাঁর ভগ্নী করিমুন্নেসা বাড়ীর সবার চোখের আড়ালে গভীর রাতে মোমবাতির আলোয় শুরু করলেন বাংলা ও ইংরেজী ভাষা শিক্ষা। বাংলা উর্দু ও ইংরেজী এই তিনটি ভাষা  অধ্যয়নের মাধ্যমে রোকেয়ার সামনে খুলে গেল অক্ষরের সিংহদুয়ার...অক্ষরের ঘরবাড়ী...নিকানো উঠান। জীবনের এই পর্যায়ে রোকেয়া চরমভাবে উপলব্ধি করলেন যে উপযুক্ত শিক্ষা ছাড়া মুসলিম নারীসমাজের চেতনা বিকাশ ও আত্মনির্ভরশীল হওয়া সম্ভব নয়।
মাত্র পনের বছর বয়সে রোকেয়ার ভগ্নী করিমুন্নেসার (যিনি খুব ভালো কবিতা লিখতে পারতেন) বিবাহ হয়ে গেল। এই বাল্যবিবাহ রোকেয়ার মনে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করল এই বিশ্বাস যে শিক্ষার অধিকার বিনা নারীসমাজ চিরদিন সমাজের চোখে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত,চেতনাহীন পর্দানসীন এক বাহারী পুতুল হয়ে থাকবে।
১৮৯৮ সালে তদানীন্তন ভাগলপুরের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেনের সাথে বিবাহ হলো রোকেয়ার।  শাখাওয়াত ছিলেন উদার ও মুক্ত মনের মানুষ। স্ত্রীর যাবতীয় সৃজনশীল রচনা, মুসলিম নারীদের উন্নয়নমূলক কাজকর্মে তাঁর ছিল অকুন্ঠ সমর্থন। তাঁর উৎসাহে রচিত ও প্রকাশিত হয় রোকেয়ার  "সুলতানা ড্রীমজ" গ্রন্থ যা কিনা আজকের নারী অগ্রগতির মাইলস্টোন। এখানে রোকেয়া এমন এক জগতের কথা লিখেছেন যে জগতে মেয়েরা উপযুক্ত শিক্ষালাভ করে আত্মনির্ভশীল ও সর্বক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকায়। 

১৯০৬ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত সুলতানাজ ড্রীম এক আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। প্রথাগত স্কুল কলেজে না পড়েও নিজস্ব চেষ্টায় ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করে সেই ভাষাতে নারীশক্তি চালিত এক নতুন জগতের  কথা উপস্থাপনা করা তাঁ মুক্ত চিন্তা ও দূরদর্শিতার  পরিচয় বহন করে। এছাড়াও মতিচুর (১৯০৩),পদ্মরাগ (১৯২৪) অবরোধবাসিনী (১৯৩১) ইত্যাদি তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি।

অজস্র  ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কল্পকাহিনী, শ্লেষাত্মক রচনা তিনি লিখেছেন।  রোকেয়ার প্রতিটি রচনাই ছিল স্বকীয় বৈশিষ্টমন্ডিত। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। বিজ্ঞাণ সম্পর্কেও তাঁর অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন রচনায়। মতিচুর প্রবন্ধ গ্রন্থে রোকেয়া নারী পুরুষের সমকক্ষতা যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৯০৯ খৃস্টাব্দে  তাঁর স্বামী শাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যু হয়। সেই বছরেই রোকেয়া স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের জন্য সরিয়ে রাখা তাঁর স্বামীর অর্থ দিয়ে ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠা করলেন শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু সম্পত্তিজনিত বিবাদের কারণে তিনি বাধ্য হলেন স্কুলটিকে কোলকাতায় স্থানান্তরিত করতে ১৯১১ খৃস্টাব্দে। কোলকাতার মুসলিম  পরিবারের পর্দানসীন মেয়েরা যাতে স্বচ্ছন্দে স্কুলে আসতে পারে তার জন্য পর্দাটানা ঘোড়ার গাড়ীর ব্যবস্থা হয়েছিল।
১৯১৬খৃস্টাব্দে বেগম রোকেয়া গঠন করলেন আনজুমান এ খাওয়াতিন এ, বাংলার সর্বপ্রথম মুসলিম  নারী সংগঠন।  এই সংগঠনের মাধ্যমে  রোকেয়া বহু দরিদ্র  ,অসহায় ও বিধবা মুসলিম নারীদের শিক্ষার প্রসার ও আত্মনির্ভরশীলতার জন্য আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা রাখলেন। দূরদর্শী রোকেয়া এই সংগঠনের মাধ্যমে লেখাপড়া ছাড়াও শারিরিক ও পেশাজনিত বৃত্তির জন্য ট্রেনিং এর সুযোগ রেখেছিলেন। তখনকার সময়ে যা ছিল ভাবনা ও কল্পনার অতীত।
তাঁর সারাটা জীবন বেগম রোকেয়া মুসলিম মহিলাদের প্রতি সমাজের স্টিরিওটাইপ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও লিঙ্গসাম্যের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একমাত্র উপযুক্ত শিক্ষা  পেলেই মুসলিম মহিলারা সক্ষম হবেন সমাজের অন্ধবিশ্বাসের পাথর সরাতে| স্বামী ও তাঁর দুই সন্তানের অকালমৃত্যু ও নানান ধরনের সম্পত্তিজনিত বিবাদের জন্য এই মহীয়সী মহিলার ব্যক্তিগত জীবনে এসেছে অনেক ঝড়ঝাপটা।  পরিবার ও সমাজের তীব্র ও বিরূপ সমালোচনা সহ্য করেও তিনি  বিভিন্ন সভা সমিতিতে তুলে ধরেছেন  মুসলিম মহিলাদের নানান ধরণের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। ১৯২৬ সালে বেংগলস উওমেন এডুকেশনাল কনফারেন্সের সভাপতি হিসাবে আমন্ত্রন করা হয় এই বলিষ্ঠ বাঙালী সাহিত্যিকা ও সমাজ সংস্কারককে।
১৯৩২ খৃস্টাব্দে কোলকাতায় তাঁর ৫২ তম জন্মদিনে (৯ ডিসেম্বর) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বেগম রোকেয়া চলে যান।  মৃত্যুর সময় অবধি তাঁর কলম অক্লান্তভাবে চলছিল "নারীর অধিকার" নামক অসমাপ্ত একটি প্রবন্ধে।  সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সোদপুরে আবিস্কৃত হয়েছে তাঁর সমাধিসৌধ।  উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে  বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব মুসলিম তথা সমগ্র বাঙালী নারী সমাজের কাছে এক উজ্জল নক্ষত্রের মতো যে নক্ষত্রের আলোয় সামাজিক অনুশাসনে, অসাম্যের খাদে তলিয়ে যাওয়া  দুর্বল অসহায় নারীসমাজ খুঁজে পেয়েছে তাদের নিজস্ব সত্তা ও স্বনির্ভশীলতার প্রয়োজনীয়তা।  আজকের মুসলিম নারীজাতির কাছে তাই বেগম রোকেয়া চিরদিন থেকে যাবেন আলোকিত এক অধ্যায় হয়ে।

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



পশ্চিম বঙ্গ, ভারত



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top