সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে জানুয়ারী ২০২১, ৮ই মাঘ ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ১৬:১২

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ২০:২৮

ছবিঃ অমর মিত্র

 

অমর মিত্রের ‘ধ্রুবপুত্র’ একটি কালজয়ী উপন্যাস। ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য অমর মিত্র ২০০৬ সালে আকাদেমি পুরস্কার পান। এই উপন্যাসের পটভূমি প্রাচীন ভারতের নগর উজ্জয়িনী, শিপ্রা নদী আর তার চারিদিক – পশ্চিমের সৌরাষ্ট্র, মরুদেশ, উত্তর-পশ্চিমের সিন্ধুনদ, পুরুষপুর, গান্ধার বাহ্লিক দেশ, হিন্দুকুশ পর্বতমালা, অক্সাস নদী, দক্ষণের বিদিশা নগর, পুবের পাটুলিপুত্র থেকে লোহিত্যনদ – যেন সমগ্র ভারতবর্ষই। এই উপন্যাস সেই সময়ের কথা যে সময় আছে কালের ধূসর ছায়ার ভিতরে মুখ লুকিয়ে। উজ্জয়িনী নগরে প্রচলিত একটি লোককথা এই উপন্যাসের মূলসূত্র। সেই লোককথা বিস্তারিত হয়েছে মেঘ-নির্ভর ভারতবর্ষের হৃদয়ের কথায়। বাস্তবকে বাস্তবতার ইন্দ্রজালে উত্তীর্ণ করে দিয়েছেন কল্পনাপ্রবণ এই লেখক। দেবদাসী, গণিকা, রাজরানী থেকে সামান্য গৃহবধূ, গ্রাম্যবালিকা, শূদ্রনারী, শূদ্র, নিষাদ – এক ভারতবর্ষ তার সময়ের চিহ্ন নিয়ে ধূসরতা থেকে জেগে উঠেছে উপন্যাসের বাস্তবতায়। ধ্রুবপুত্র নির্বাসিত, তাই নগর যেন অন্ধ হয়ে যায় – আশ্চর্য এক নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের কথা এই সৌন্দর্যময় আখ্যানে বিস্তৃত হয়েছে আলো-ছায়ার বিস্তারের মতো,  ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো।

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)

আজ দীপাবলী। বিশালার ঘরে ঘরে ধনদাত্রী লক্ষ্মীর আরাধনা অলক্ষ্মীর বিদায়। সন্ধ্যায় এই বিশালা নগর—অবন্তী দেশের রাজধানী উজ্জয়িনী, কণকশৃঙ্গ মহাকালেশ্বর মন্দির, দুই নদী শিপ্রা, গন্ধবতীর বুক দীপের আলোয় আলোকিত হবে। অবন্তী দেশের প্রতিটি গৃহের দুয়ারে, বাতায়নে প্রদীপ জ্বলবে। আজ দীপোৎসব, আলোকোৎসব, কোথাও কোনও অন্ধকার থাকবে না। সারাদিন রাজপথে মানুষ হাঁটবে। ঘরে ঘরে গীতবাদ্য, গণিকালয়ে নুপুরধ্বনি, বীণা, বল্লকী মৃদঙ্গের মধুর ধ্বনি—নগরের হিমেল বাতাস ভারী হয়ে উঠবে পুষ্প, অগুরু, চন্দন, ধূপ এবং সুরার গন্ধে।

হাট বসে গেছে দীপাবলীর। ক্রেতা বিক্রেতার সংখ্যা ক্রমশ অধিক হয়ে যাওয়ায় হাট বিস্তৃত হতে হতে শিপ্রা নদীর পূর্ব তীরে এসে থমকে গেছে। উজ্জয়িনীর মেলায় আজ নানারকম মানুষ, দেশবিদেশের বণিক, ব্যাপারি। এই অবন্তী দেশের পশ্চিমে অপরা-সমুদ্রের দুই বন্দর, বারুগাজা  এবং শূর্পারক থেকে আসা যখন বণিকের দল। দূর সমুদ্রতীরের দ্রাক্ষাবীথির দেশ থেকে এসেছে তারা। এসেছে সার্থবাহ, দূর উত্তর-পশ্চিম থেকে, বাহ্লিক, গান্ধার, পুরুষপুর, কম্বোজ দেশ থেকে, সিন্ধুতীর হতে। বাহ্লিক দেশের সুখ্যাত পীত বর্ণের রেশম, কম্বোজের বেগবান অশ্ব নিয়ে। তাদের সঙ্গেই এসেছে উত্তর দেশ থেকে টাঙ্গন ঘোড়া, কম্বল, কাঁচা হলুদ, কাঁচা সোনার গয়না, নানা বর্ণের পাথর। এসেছে মগধ, কোশল, কলিঙ্গ, বঙ্গ, অপরান্ত দেশ থেকে নানা ব্যাপারি নানা পণ্যদ্রব্য নিয়ে। উজ্জয়িনীর হাট থেকে তারা নিয়ে যাবে নানা মণিমাণিক্য, রত্নসামগ্রী, চন্দন, রঙিন সুতীবস্ত্র, অতি সূক্ষ্ম মসলিন, কবুতর, ময়ূর, আরো নানা পণ্য। ক্রয়বিক্রয় জমে উঠেছে ক’দিন ধরেই। দীপাবলীর সকালে ক্রতা বিক্রেতা, দর্শনার্থীর হাঁকডাকে হাট রমরমা। কামারশাল, কাঁসারির দোকান, শঙ্খের দোকান থেকে বিচিত্র শব্দ উঠছে ঠং ঠং, ঘর্ঘর, সাঁই সাঁই। সেই সব শব্দ মিশে যাচ্ছে মানুষের কণ্ঠস্বরের ভিতর।

বৃদ্ধ শিবনাথ, এই নগরের দুই যোজন পশ্চিমে গম্ভীরা নদীর কূল থেকে দীপাবলীর মেলায় এসে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই বণিককে, যে শূর্পারক বন্দর থেকে এসেছিল গেল ভাদ্রমাসের শেষে, যে নাকি শূর্পারক বন্দরেই দেখেছিল এক নবীন যুবককে, যার চোখের মণি নীল, গাত্রবর্ণ গ্রীসদেশীয় মানুষদের মতো গৌর, উচ্চতা ততটা নয়, মাথায় ঘনকালো চুল অযত্নে লালিত, কাঁধ ছুঁয়েছে প্রায়, গালময় দাড়ি। গায়ে একটি শ্বেতবর্ণের রেশম চাদর, পরণে শিউলি ফুলের নির্যাসে রঞ্জিত সূতীবস্ত্র। এই খবর প্রোষ্টপদ মাসের শেষের। সে রঙিন বস্ত্র নিতে এসেছিল উজ্জয়িনীতে। অর্ণবপোতগুলির ছাড়ার কথা আশ্বিনের মাঝামাঝি। এ বৎসরও বর্ষা নেই। দক্ষিণ পশ্চিমের অনুকূল বাতাসের বেগও কম। তবু সেই ধীরগামী বাতাসে ভর করে পশ্চিমের অর্ণবপোত আসছে। এখন উত্তরপুবের বাতাস শুরু হয়ে গেছে। অর্ণবপোতগুলি ফিরছে নিজদেশে। শিবনাথ খুঁজছিল সেই ব্যাপারিকে। সে আসলে কোশল দেশের মানুষ, শূর্পারক বন্দরেই পড়ে থাকে ব্যবসার কারণে। দীপাবলীর মেলায় আসবে বলেছিল যবন বণিকদের সঙ্গে। সংবাদও আনবে। যদি পারে তাকে সঙ্গে করেই ফিরবে। সেই যুবককে। সে যে উজ্জয়িনীর সন্তান তা জানবে কী করে মণিভদ্র, সোপারা বন্দরের ব্যাপারি?

গলা থেকে পা পর্যন্ত দীর্ঘবস্ত্র পরিহিত বনায়ু দেশের যে বণিকেরা উজ্জয়িনীতে আসে, তারা বারংবার আসায় মালবীয় ভাষায় বেশ সড়গড়। যে তরুণ বণিক প্রথম এসেছে মহাকালেশ্বরের আর্শীবাদধন্য এই সোনার দেশে, তাকে সাহায্য করেছে তার সহযাত্রীরা। শিবনাথ খুঁজে বেড়াচ্ছিল সেই মণিভদ্রকে।  তার কথা কেউ বলতে পারেনি। যবন বণিকেরা এ ওর মুখের দিকে তাকিয়েছে। শিবনাথের বয়স ষাটের নিকটবর্তী, মাথার চুলের প্রায় সবটাই সাদা, গালে পাকা দাড়ি, চক্ষু দুটি ঘোলাটে, তার উজ্জ্বলতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে মুখমণ্ডলের অন্ধকারে। মধ্যম উচ্চতার মানুষ শিবনাথের গায়ে একটি মৃগরোমের চাদর, মলিনবর্ণ, নগ্নপদ। ভোরবেলায় বেরিয়েছে বৃদ্ধ, তখন পূর্ব আকাশে আলোর আভাস ফুটেছিল। চরাচর হিমনীল, মুক্তাবর্ণ। হাঁটতে হাঁটতে সূর্যোদয় দেখেছে এক বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে। জোয়ার এবার হয়নি ভাল। বর্ষাকালটি মেঘহীন গেছে প্রায়। মরা, আধমরা জোয়ারের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সে দেখেছিল গাছগাছালির আড়ালে ঘুমিয়ে থাকা সূর্যদেব উঠে আসছেন উপরে। মনে পড়েছিল বন্ধুপুত্রের কথা। কতদিন দেখেছে শিবনাথ, গম্ভীরার তীরে দাঁড়িয়ে উজ্জয়িনী নগর, মহাকালেশ্বর শিবের অধিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে দুটি হাত জোড় করে সূর্য বন্দনা করছে সে—

                              ওঁ জবাকুসুমশঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম

                               ধ্বন্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম

                              .............

শিবনাথ বৈশ্য সম্প্রদায়ের। তার অকাল প্রয়াত বয়স্য ছিল ক্ষত্রিয়। ধ্রুব ক্ষত্রিয় সন্তান হলেও রাজসভা, সেনাবাহিনী প্রায় ত্যাগ করে উজ্জয়িনীর বণিক সুভগ দত্তের সঙ্গে বাণিজ্যে নেমেছিল। তার পুত্রটির বাণিজ্যে মন ছিল না, কৌতূহল ছিল। সে ছিল বিদ্বান, সর্বশাস্ত্রেই তার অধিকার নাকি সে ক্রমশ প্রতিষ্ঠা করছিল। ক্ষত্রিয় সন্তান তার হৃত অধিকার যেন ফিরে পাচ্ছিল। এখনো মনে মনে অবাক হয়, বাউন্ডুলে, প্রায় বোধহীন ধ্রুবের পুত্র কীভাবে এমন হলো! বঙ্গ, কলিঙ্গ, শূর্পারক, বারুগাজা এই সব দেশ, বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়াত সে। অপরা সমুদ্র, পূর্ব সমুদ্র, দক্ষিণ সমুদ্র, রেবা, তাপ্তি নদী, মলয় চন্দনাদ্রি পর্বত—পাগল, পাগল ছিল ধ্রুবসখা।

মণিভদ্রর কথা বলল একজন। সে পাটুলিপুত্র থেকে ব্রীহিধান্য নিয়ে এসেছে উজ্জয়িনীতে। তার সঙ্গে নাকি দেখা হয়েছিল কোশলদেশের ওই ব্যাপারির, সে যাচ্ছিল বঙ্গদেশে, সেখানে উত্তরপূর্বের লোহিত্য নদের কূল থেকে গুবাক এনে অপেক্ষা করবে এক ব্যাপারি। গুবাক নিয়ে সে শূর্পারকে ফিরবে। এই দীপাবলীতে আর উজ্জয়িনীর পথে আসা হলো না তার।

পাটুলিপুত্রের ব্যাপারির নাম বৃকোদর। দ্বিতীয় পাণ্ডবের মতোই তার চেহারা। মস্ত শরীর, তামাটে বর্ণ, মাথার চুল অনেকটাই অন্তর্হিত হয়েছে সামান্য এই বয়সেই। মানুষটি যথেষ্ট কৌতূহলী, জিজ্ঞেস করল, কেন, তাঁর খোঁজ কেন, সে কি ঋণ শোধ করেনি?

মাথা ঝাঁকায় বৃদ্ধ, না, না, শুনুন আপনি তো নানা জায়গায় ঘোরেন, দেখেছেন কি এমন কোনো যুবককে...। ধ্রুবপুত্রের রূপ বর্ণনা করল শিবনাথ। লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, বলে, কত মানুষই তো দেখি। তাদের মধ্যে ঠিক এই রকম ও যে নেই তা নয়, কিন্তু সে কে? কার কথা বলছেন?

শিবনাথ বলে, ওই মণিভদ্র, যদি দেখা হয়, বলবেন তার অপেক্ষায় ছিলাম আমি, যার কথা বললাম, যে যুবকের কথা, তার খোঁজ আনবে বলেছিল মানুষটা।

বৃকোদর বেশ ভাল মানুষ, বলল, আমিও খোঁজ করব, কিন্তু কী ব্যাপার বলুন দেখি সে কি আপনার পুত্র?

পুত্রের মতো, হয়ত তার চেয়েও বেশি, এই অবন্তী দেশ ছেড়ে চলে গেছে সে অভিমানে।

কেন?

শিবনাথ চুপ করে আছে। এই এক হাট লোকের মধ্যে সে কথা কি বলা উচিত? কতরকম মানুষ ঘুরছে, কোন কথা কার কানে চলে যাবে ঠিক কী। এখন তো বেচাকেনার সময়ও, বৃকোদরের কর্মচারী যদিও আছে বেশ কয়েকজন, তিনটি গো-শকট নিয়ে সে তার পণ্য এনেছিল, সেই পণ্যের বেশিরভাগ যদিও নিঃশেষিত, তবুও তার ব্যস্ততা তো আছেই। কিন্তু বৃকোদর শুনতে  চাইছে। আবার জিজ্ঞেস করে কথাটি। শিবনাথের মুখে ক্লিষ্ট হাসি ফোটে, বিড়বিড় করে সে তার বয়স্য ধ্রুব সখার কথা বলে, ধ্রুবপুত্রের সামান্য পরিচয় দেয়।

বৃকোদরের কৌতূহল আরো বাড়ে। না ধ্রুবপুত্র নয়, ধ্রুব সম্পর্কে। কৌতূহল বাড়ারই কথা, ক্ষত্রিয় সন্তান, বাণিজ্যে মত্ত হয়েছিল যুদ্ধবিদ্যা ছেড়ে। কী কী বাণিজ্য করত, কোন পণ্য, কী রকম দর। লোকটির মাথা নিতান্তই মোটা। ধ্রুব মারা গেছে বছর পঁচিশ। তখন অবন্তী দেশের রাজা ছিলেন রাজা ভর্তৃহরির পিতা গন্ধর্ব সেন। আজকের কথা তো নয়। তখনকার দর শুনে করবে কী?

বৃকোদর বলল, আপনি কি জানেন যবন বণিকরা গুবাককে কী বলে, তারা জানে গুবাক বুঝি শূর্পারক বন্দরের ফল।

ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে শিবনাথের, এও কি আজকের কথা, ধ্রুবই তো বলেছিল, গুবাক নাকি শূপারি নামে চিহ্নিত হয়ে গেছে ওই সব যবন দেশে। অপরা সমুদ্রের কোলে এসেই পূর্বদেশীয় এই ফল তার নাম বদলে ফেলে। বৃকোদর কথাটি এই সদ্য শুনেছে পথিমধ্যে, ওই শূর্পারক বন্দরের ব্যাপারি মণিভদ্রর মুখে। কোথায় দেখা হয়েছিল? না বিদিশা নগরে। এক পান্থশালায় রাত্রি যাপন করেছিল দুই ব্যাপারি। বৃকোদর বলল, যদি ফেরার পথে আবার দেখা হয় বিদিশায়।

হাসি আসে শিবনাথের মুখে, তাহলে বিদিশায় অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে বৃকোদরকে। মণিভদ্র, যদি সেই ব্যাপারিই হয়, পূর্বদেশ থেকে ফিরতে বহু সময় নেবে। কম দূর নাকি? আর যদি অন্য পথে ফেরে, সমুদ্র উপকূল ধরে নেমে এসে—না, তা  হয়ত হবে না, পাটুলিপুত্র হয়ে এই দিকে আসাই বোধহয় নিরাপদ পথ। ঠিক ধারণা নেই শিবনাথের। অবন্তী দেশ ছেড়ে বেরোয়নি সে কখনো। আর অবন্তীরই বা কতটা দেখেছে? বিদিশা নগরে ও তো যায়নি কখনো। চাষবাস নিয়েই কেটে গেছে জীবন। গম্ভীরা, উজ্জয়িনী, এইটুকু পথের যতগুলি গ্রাম, শিপ্রা, গন্ধবতী নদী, সপ্তসরোবর, এইটুকুই তার পৃথিবী। শুনেছে বিদিশা দক্ষিণপুবে, কম্বোজীয় অশ্বে গেলে দিন পাঁচ ছয়, এই গো-শকটে একপক্ষেও পৌঁছানো যাবে না। বৃকোদর আবার বলে, যখন বাণিজ্যে নেমেছি মহাশয়, দেখা তো হবেই, আমিও ভাবছি শূর্পারক বন্দরে যাব একবার এখান থেকে জোয়ার নিয়ে, না এবারে হবে না, আমি আবার কি না পিতা হতে যাচ্ছি।

বাহ্‌, এ তো অতি সুসংবাদ, এই প্রথম?

হ্যাঁ, মহাশয়, আমাকে, ফিরতে হবে পাটুলিপুত্র, পাটুলিপুত্রের কাছেই আমার গ্রাম, এবার তাহলে মণিভদ্রর সঙ্গে দেখা হবে না বলছেন?

যেন কত কালের চেনা এই মানুষটি, এমন ভাবে কথা বলছে বৃকোদর। মণিভদ্রর  সঙ্গে বিদিশায় দেখা হতে পারে না—এই কথা শুনে বিষণ্ণই হয়েছে যেন মানুষটি। বলছে, দেখা হলে খুব ভাল হত, যবন বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারলে লাভ প্রচুর হয় এই কথা শোনা যায়। কিন্তু সে ভয়ই পায় তাদের। পাটুলিপুত্র থেকে বিদিশা, উজ্জয়িনী আসতে দ্বিধা হয় না, বন্দরের গিয়ে ভিনদেশীদের সঙ্গে ব্যবসা করার সাহস থাকা চাই। সে বিদিশা থেকে আসতে আসতে ভেবেই রেখেছে মণিভদ্রর সাহায্য নেবে। মহাশয় কি জানেন, মণিভদ্র যবন ভাষাও জানে।

শিবনাথ চুপ করে আছে আবার। কী করে জানবে সে? মণিভদ্রর সঙ্গে তার একদিন মাত্র কথা হয়েছিল। আচমকা দেখা হলে চিনতেও পারবে না বোধহয়, তবে হ্যাঁ মনে পড়ে যাবে হয়ত, বিশেষত ধ্রুবপুত্রের খোঁজের জন্য তার নামটি সে যেভাবে মনে রেখেছে। বৃকোদর বাণিজ্যে নেমেছে এই প্রথম। তার উৎসাহ তাই খুব বেশি। ব্রীহিধান্য বিক্রয় করে লাভও করেছে কম নয়। বিদিশাতেও দুই শকট খালি করেছে। এখাএন পাটুলিপুত্রের আরো ব্যাপারি এসেছে। আগামী কালই রওনা হবে সবাই এক সঙ্গে।

শিবনাথের মনে পড়ল গন্ধবতীর জন্য কিছু নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কী নিয়ে যাবে? ধ্রুবপুত্র এই অবন্তী দেশ ত্যাগ করার পর শিবনাথের পিতৃহারা পৌত্রী গন্ধবতীর আনন্দময়ী ভাবটি চলে গেছে। প্রোষিতভর্তৃকা পুত্রবধূ রেবা, তার কন্যা গন্ধবতী—দীর্ঘশ্বাস ফেলল বৃদ্ধ। পাঁচটি বৎসর পার হয়ে গেল দশপুরার যুদ্ধর পর। সেই যে যুদ্ধে গেল কার্তিককুমার, হূণ বিজয় করে ফিরল অবন্তীর সেনাবাহিনী, ফিরল না সে। উৎসবের দিনগুলিতে শূন্যতা যেন আরো গভীর হয়ে ওঠে, আরো ব্যপ্ত হয় চতুর্দিকে।

শিবনাথকে লক্ষ্য করেছে বৃকোদর, কী হলো মহাশয় আপনার?

কিছু না, ফিরতে হবে তো, অনেকটা সময় লাগবে, যেতে যেতে সূর্যদেব মাথায় উঠে যাবেন, কিছু কেনাকাটা আছে।

কিন্তু মণিভদ্রকে কী বলব তা তো পরিষ্কার করে বললেন না।

আশ্চর্য! যেন মণিভদ্রর সঙ্গে ওর দেখা হবেই, এবং তা বিদিশা নগরের সেই পান্থশালায়। বিদিশা থেকে মণিভদ্র তার কথা শুনে চলে আসবে উজ্জয়িনীতে। কবে দেখা হবে ঠিক নেই, দেখা হবে কিনা ঠিক নেই...। বৃকোদরকে শিবনাথ বলে, বলবেন, উজ্জয়িনীতে তার জন্য অপেক্ষা করছে একজন।

সেই যে যুবকের কথা বললেন আপনি?

হ্যাঁ, তার খবর চাই, তাকে সে দেখেছিল নাকি শূর্পারক বন্দরে।

সে সমুদ্র যাত্রা করেনি তো?

ভীত হল শিবনাথ। বিহ্বল মুখে তাকিয়ে থাকল বৃকোদরের মুখের দিকে। এই ভাবনা তার ভিতরেও যে উঁকি মারেনি তা নয়, কিন্তু সযত্নে তাকে পরিহার করেছে বৃদ্ধ। তবে কিনা বন্দরে গেছে যে, সে তো চলেও যেতে পারে এই ভূখণ্ড ছেড়ে। মণিভদ্র কোনো খবর দেয়নি। কে জানে কোথায় ধ্রুবপুত্র!

বৃকোদর বলল, আমারও ইচ্ছে করে যবনদের দেশটি দেখে আসি, ওই দেখুন মহাশয়, শুনছিলাম বাহ্লিক থেকে এসেছে, যবন বণিক, রঙটা পুড়ে গেছে, তবু কী সুন্দর চেহারা, চুল দেখেছেন রেশমের মতো, রেশমই যেন, বাহ্লিক দেশের রেশম দিয়ে যেন তৈরি, ওদের আসল দেশ নাকি সমুদ্রপারে?

শিবনাথ শুনছে। এসব কথায় তাল দিতে পারত ধ্রুবপুত্র। সে এসবের কোনো খোঁজই রাখে না। মনে বিষণ্ণতা এলো। ধ্রুবপুত্র কত খোঁজই না রাখত। এই যে বৃকোদর মানুষটি, সত্য বলছে, না অর্ধসত্য? কোন  কথা বলছে,  তা বলে দিতে পারত সে।

বৃকোদর বলে এখনো যখন ফেরেনি, প্রোষ্টপদ, আশ্বিন, কার্তিক, সে বোধহয় সমুদ্রযাত্রাই করেছে, শুনলাম বিদিশার এক যুবক যবনদেশে চলে গেছে ভাগ্য অন্বেষণে।

শিবনাথ বিপন্ন হলো মনে মনে। লোকটির সঙ্গে আলাপ না হলেই যেন ঠিক হতো। এখন তো ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। ধ্রুবপুত্র তো প্রোষ্টপদে যায়নি, গেছে গত বসন্তের আগের বসন্তের শেষে, চৈত্রপূর্ণিমার রাতে, সেদিন ছিল কামদেবের পূজা, রঙের উৎসব। তার আগে সে অপমানিত হয়ে চলে এসেছিল উজ্জয়িনী থেকে। যাঁর আশ্রয়ে ছিল, শ্রেষ্ঠী সুভগ দত্ত, তিনিই ওকে নগর ত্যাগ করতে বলেছিলেন। তাঁর কামনার রমনী গণিকা দেবদত্তার প্রতি তার আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পেরে। শিবনাথ এবার যাবে।

আমি আছি আজ সারাদিন, বৃকোদর বলল, তারপরেই যেন মনে পড়ল তার, হ্যাঁ, তা তো বললেন না কেন সে  ত্যাগ করেছে অবন্তী দেশ?

শিবনাথ বলল, থাক এখন, মণিভদ্রর কাছে শুনে নেবেন।

বৃকোদর বলল, দাঁড়ান আর একটু।

মাথা নাড়ে শিবনাথ। গন্ধবতীর জন্য কী কিনবে সে? মুক্তমালা। অনেক দাম। দশ রকমের মুক্তার কেনাবেচা হয় উজ্জয়িনীতে। তাম্রপর্ণী নদীর মুক্তা, মলয়কোটি পর্বতের মুক্তা, পাশিকা নদীর মুক্তা, সিংহল দেশের কুলা নদীর মুক্তা থেকে হিমালয় পর্বতের মুক্তা হৈমবত। মুক্ত বিপণির দিকে যেতে হয় তাহলে। পৌত্রীর মুখে হাসি ফেরাতে একটি মুক্তাহার নিয়ে যাবে বলে প্রস্তুত হয়েই এসেছে বৃদ্ধ। ভীড় ঠেলে এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরতে হলো তাকে। এত মানুষের ভিতরেও ছোট একটি টাঙ্গন অশ্বে চেপে রাজকর্মচারী উদ্ধবনারায়ণ ঢুকে পড়েছে হাটের ভিতর। শিবনাথের কাঁধে হাত দিয়ে তাকে থামিয়ে ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নামল, আপনি এসেছেন খুড়ো মশায়, আমি তো আপনারই খোঁজ করছি।

আশায় মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল শিবনাথের। তাহলে কি উদ্ধবনারায়ণ খবর এনেছে ধ্রুবপুত্রের? নাকি এতকাল বাদে হূণ বিজয় থেকে না ফেরা কার্তিককুমারের খবর এল? অশ্বের বল্গা ধরে টানতে টানতে উদ্ধব জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন আপনি, আপনার সঙ্গে আমার খুব দরকার

ধ্রুবপত্রের খবর--? অস্ফূটস্বরে বলল শিবনাথ।

সেই দূরাচারীর খবর, কৃতঘ্ন।

একথা কেন বলছেন?

উজ্জয়িনী নগরবাসী এখনো অসন্তুষ্ট হয়ে আছে তার উপরে, শ্রেষ্ঠী সুভগ দত্ত যে কী আঘাত পেয়েছেন তা তো জানেন না, রাজসভায় খবরটি যায়নি, তাহলে হয়ত আপনারই ডাক পড়ত মশায়, তবে হ্যাঁ আপনি ভয় পাবেন না, আমি তো সব জানি--, চলুন ওই অশোক গাছটির নিচে ঘোড়াটিকে বেঁধে কথা বলি।

চলবে

 

অমর মিত্র
লেখকসাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারবঙ্কিম পুরস্কার এবং যুগশঙ্খ পুরস্কার প্রাপ্তভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top