সিডনী বুধবার, ৩রা মার্চ ২০২১, ১৮ই ফাল্গুন ১৪২৭

ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (ষষ্ঠ পর্ব) : সেলিনা হোসেন


প্রকাশিত:
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:৩৫

আপডেট:
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:৩০

 

আর কিছু ভাবার সুযোগ নেই। জানালার কাছ থেকে সরে আসার সময় টের পায় স্নিগ্ধ বাতাস বয়ে আসছে চারদিক থেকে। মুখে স্নেহের পরশ পাচ্ছে। মাইতো দেবে স্নেহের পরশ। দ্রুত মায়ের পাশে শুয়ে পড়ে। মা ঘুমে নিঃসাড়। কাত হয়ে শুয়ে আছে। আশিকা মায়ের পিঠের ওপর হাত রাখে। ঘুমে বুঁজে আসে নিজের চোখ। 
ভোরবেলা সবাই ধড়মড়িয়ে ওঠে। নূরবানু জোরে জোরে বলে, চলো চলো সূর্য ওঠা দেখতে হবে। 
আশিকার ঘুম ভাঙে না। ও অনেক রাতে ঘুমিয়েছে। হামিদা বানু ওর দিকে তাকিয়ে ভাবে, থাক আর একটু ঘুমাক পরক্ষণে মনে হয় সূর্য ওঠা না দেখতে পেলে মেয়েটি ওর ওপর রাগ করবে। ওর বাবাও চাইবেনা যে ও ঘুমাক। 
হামিদা ওর মাথায় হাত রেখে ডাকে, আশিকা, ভোর হয়েছে। 
আশিকা আকস্মিকভাবে জেগে উঠে তাকায়, কি হয়েছে মা? 
- ভোর হয়েছে রে। সূর্য দেখবিনা?
আশিকা ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। 
- সূর্য, সূর্য। জেগে ওঠার সূর্য। 

দুহাতে চোখ মুছে ও দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে যায়। বাইরে এসে দেখে অনেকে সমুদ্রের কিনারে চলে গেছে। ও দৌড়াতে থাকে। ওকেতো সবার সঙ্গে ওখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। ওকে দেখে ফাল্গুনি দুহাত বাড়িয়ে বলে, আয়। দেরি হলো কেন? 
- রাত জেগে আকাশ আর সমুদ্র দেখেছি। দেরি করে ঘুমিয়েছিলাম। 
- বুঝেছি। আমরা সূর্য ওঠা দেখে ইনানির পথে হাঁটব। 
আশিকা হাসতে হাসতে বলে, সূর্য ওঠা দেখব। দিনের হালকা আলোর সঙ্গে তাকালে দেখতে পাচ্ছি ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই-’। 
- বাহ, খুব সুন্দর উত্তর দিলি। 
- চল পানিতে পা ভিজিয়ে দাঁড়াই। 
- চল, আমার মনের মধ্যে এক অপূর্ব স্মৃতি ভেসে উঠেছে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে সে স্মৃতি অনুভব করব। 
- ঠিক আছে। তুই স্মৃতির স্বপ্নে চলে যা, আমি গুনগুনিয়ে গান করব। 

পূর্ব দিগন্তে তাকিয়ে আশিকার মনে ভেসে ওঠে আন্ধারমানিকের ছবি। দুই পাহাড়ের সামান্য ফাঁকে বয়ে যাওয়া ঝর্ণার স্রোত কেমন রহস্যঘেরা লাগছিল। অন্যদিকে এমন আবেশে প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য ভিন্ন মাত্রা ছড়িয়েছিল। সে উপভোগ রহস্য শব্দসহ এক হয়ে আছে। এখনও মনে হয় আন্ধারমানিকের মতো এমন দৃশ্য পাহাড়ি এলাকার অন্য জায়গায় আর কখনো দেখা হয়নি। সেদিন মনে হয়েছিল এটা এক অচেনা সৌন্দর্য। আশিকার এখন মনে হয় অচেনাতো হবেই। পাহাড়ি এলাকাতো প্রতিদিন দেখা হয়না। এটা অচেনা এলাকার জ্বলজ্বলে আলো। এরসঙ্গে মিশে থাকে নতুন কিছু দেখার উপভোগ। সেবার একসঙ্গে এগারোজন ছিল ওরা। ট্রলারে করে সাঙ্গু নদীপথে নানা দিকে চলা ছিল আশ্চর্য অনুভব। নদীর সঙ্গে ঝর্ণার ঝরঝর শব্দ গানের মতো লাগছিল সবার। আশিকা চেঁচিয়ে বলছিল, আমাদের কানে ভেসে আসছে ঝর্ণার সঙ্গীত। যদি কথা বুঝতাম তাহলে আমরাও সেই গান গেয়ে সাঙ্গু নদীকে ভরিয়ে দিতাম। বলতাম, এটা তোরও গান রে সাঙ্গু। কিন্তু সাঙ্গুরতো গান গাওয়া হয়না। জোয়ার-ভাটার টানে সাঙ্গু ভরে থাকে। 

অন্যপাশ থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে শীলা এসে ওদের পাশে দাঁড়ালে আশিকার স্মৃতির মগ্নতা কেটে যায়। শীলা পাথরে পা দিয়ে ধপধপ করে এসে ওদের পাশে বসে পড়ে। দুহাতে জড়িয়ে ধরে আশিকাকে। চেঁচিয়ে বলে, সূর্য উঠছে, সূর্য উঠছে। আমাদের জীবনের সূর্য। 

ফাল্গুনি রাগত স্বরে বলে, হয়েছে কবিতা বলতে হবে না। থাম। নিঃশব্দে তাকিয়ে থাক। 

তিনজনে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। একটু একটু করে আলো ছড়াচ্ছে। একসময় দেখা শেষ হয়। তিনজনে উঠে দাঁড়িয়ে পাথর পার হয়ে আসে। আশিকা বলে, আমাদের তো এখন হাঁটতে হবে। এবারে আমাদের বান্দরবনের মুরং এলাকায় যাওয়া হলোনা। ওদের একটি সুন্দর মিথ আছে। যেতে যেতে তোদেরকে বলব। এখন ঘরে গিয়ে আমরা তো নাস্তা খেতে রেস্তোঁরায় যাব। ওই যে আমার মা দাঁড়িয়ে আছে। 
- আশিকা শোন, আমরা তিনজনে এক টেবিলে বসব। তারপর মুরংদের জীবনের মিথ শুনব তোর কাছ থেকে। 
- ঠিক বলেছিস শীলা। হেঁটে হেঁটে শুনতে ভালোলাগবেনা। চারদিকের অন্যরা এসে পিছু ধরবে। 

সবাই টেবিলে বসে মিথের গল্প শোনার আনন্দে ভরে যায়। যে যার থাকার জায়গা ঘুরে এসে হাঁটতে শুরু করে। ইনানিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবে। ওখানেও একরাত থাকা হবে। আশিকা হাসতে হাসতে বলে, এবার আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুমাব। 
- তোর কথা শুনতে শুনতে আমাদের দুচোখ জুড়ে ঘুম আসবে। 
- হ্যাঁ, আসতে পারে ঘুম। ঘুম আসার মতো জাদুকরী গল্প। 
- গল্প বলিসনা। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস। 
- তা ঠিক। আর বলবনা। তবে শুনেছি ওদের জীবনে পাহাড় আর আকাশ বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত। তারপর আছে ওদের উৎসব। নাচ-গানে ভরে রাখে ওদের জীবনের শূণ্যতা। 
- যতবারই মুরংদের এলাকায় গিয়েছি দেখেছি ওদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান। 
- আমার সঙ্গে একবার লারা গিয়েছিল ওতো অনুষ্ঠান দেখে বলেছিল, আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। এত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে ওরা আমাদের দেশের গর্ব। আমি আবারও আসব এখানে। তোকেও আসতে হবে রে শীলা।
আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ আমরাতো দলবল নিয়ে আসব। একা একা আসলেতো বেড়ানো হয়না। 
লারা হাসতে হাসতে বলেছিল, দলবল আমি ঠিক করব। তোর কিছু ভাবতে হবেনা শীলা। 
- লারাকে একবার আমাদের সঙ্গেও নেব। তুই আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিস। 
- ওর সঙ্গে পরিচয় হলে প্রাণের  উচ্ছাস পাবি। হাসি-তামাশায় ওর জুড়ি মেলা যায়না। আর খুব বন্ধু-বৎসল। আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে আড্ডা দেবে। 
- ভালোইতো একজন ভালো বান্ধবী পাওয়া যাবে। 
আশিকা আরও বলে, এতদিন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করাসনি কেন? 
- ও পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আবার ঘুরেও বেড়ায়। 
- আমরা রেস্তোরার কাছে এসে পড়েছি। চল ঢুকে পড়ি। 
- মায়েরাতো আমাদের পেছনে আছে।
- চল গপগপিয়ে খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। ইনানির পাথরে বসে সমুদ্র দেখব। এখান থেতে ট্রলারে ঘুরতে যাওয়া যায়। যাবি? 
- যাব, যাব। আশিকা খুশির স্বরে বলে। বেড়াতে আসব বলে আমি বেশকিছু টাকা-পয়সা জমিয়ে রাখি। ট্রলারে ঘুরলে মাঝিতো টাকা চাবে? 
- তাতো চাবেই। আমরা সবাই মিলে ও যা চায় তা ভাগ করে দেব। 
- ঠিক। চল তাড়াতাড়ি খেয়ে নেই। 
মায়েরা রেস্তোঁরায় ঢুকে ওদের টেবিলের কাছে দাঁড়ায়। 
- কি রে খাওয়া শেষ করে ফেলছিস? 
- না গো মা আরও কিছু খাব। তারপর আমরা ট্রলার ভাড়া করে সমুদ্রে ঘরতে যাব। 
- হ্যাঁ, ঘাটে অনেক ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। 
- ট্রলার দেখেই আমাদের এই ভাবনা এসেছে মাগো। জেলেরা এখান থেকে মাছ ধরতে যায়। 
- ঠিক আছে যা তোরা ঘুরে বেড়া। আমরা ভাত খেয়ে নিচ্ছি। 

মায়েরা অন্য টেবিলে গিয়ে বসে। ওরা দ্রুত খেয়ে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে আসে। হাঁটতে হাঁটতে ঘাটে এসে পৌঁছায়। শীলা বলে, লারার সঙ্গে যেবার এসেছিলাম ও বলেছিল, চল ট্রলার দেখে সমুদ্রে ঝাঁপ দেই। তারপর সমুদ্রে সাঁতার কাটব। আমরা সবাই ওর হাত চেপে ধরে রেখে বলেছিলাম, পাগলামি করিসনা। ও হাসতে হাসতে উচ্ছসিত হয়ে বলেছিল, ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি মৃত্যুকে একটুও ভয় পাইনা। আমারাও হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ওহ, তাহলে আমরা তোকে সালাম করি। দে, পা এগিয়ে দেয়। ও বলেছিল, না দিব না। আমরা ওর পা টেনে বের করে ওকে সালাম করেছিলাম। 
- তারপর কি হলো? 
- কি আর হবে আমরা গালগল্প করতে করতে সমুদ্রে কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে আসি।
- তারপর আর কি হলো? 
- কিছু হয়নি। পাহাড়ে উঠিসনি?
- হিমছড়ি গিয়ে লারা পাহাড়ে উঠেছিল। পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা গাছের শিকড়, জমে থাকা গাছের গুচ্ছ এসব ধরে ঝুলে ঝুলে উঠে গিয়েছিল। আমরা উঠিনি। অবাক হয়ে ওঠে দেখছিলাম। পাহাড়ের মাথায় উঠে সে কি হাসির জোয়ার। বনের ভেতর তাকিয়ে একসময় বলল, ওরে দেখ ভাল্লুক আসছে। 
- নাম, নাম। আমরা চেঁচামেচি শুরু করলাম। ও নিজেও ভয়ে যেভাবে উঠেছিল, সেভাবে নেমে এসেছিল। আমরা পাহাড় ছেড়ে দৌড় সাগরের কাছে চলে যাই। 
- ভালোই করেছিস, তোদের ঘোরাঘুরি দারুণ হয়েছে। 
- হিমছড়ি কোথায় রে? 
- ইনানির পরেই হিমছড়ি। ওখানেই কক্সবাজারের সৈকত। তারপরে শহর। 
- ওহ, তাহলে আমরা কাছাকাছি চলে এসেছি। 
- চল, পাথরের উপর বসে মুরংদের মিথের বিষয় শুনি। 

সবাই গিয়ে ছোটখাটো পাথর বেছে কাছাকাছি বসে। আশিকা চারদিকে তাকালে ওর মনে হয় গভীর জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে মুরংদের নৃত্যগীতের ধ্বনি। বাজনার সুরেলা শব্দ। মন ভরিয়ে দিচ্ছে। পাথরের পাশ থেকে দুহাতে পানি তুলে কপালে ঠেকায়। বলে, সমুদ্রকে কপালে রাখলাম। সবাই নড়েচড়ে বসে। কেউ কোনো কথা বলেনা। শুরু হয় আশিকার মিথ বলা-  

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top