সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনত্রিশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
১ মার্চ ২০২১ ১৫:০৫

আপডেট:
১৩ এপ্রিল ২০২১ ০৮:০৭

ছবিঃ অমর মিত্র

 

উজ্জয়িনী ফেরার পথটি তো কম নয়। যেন যেতে যত যোজন, ফিরতে তার চেয়ে অনেক অনেক যোজন বেশি। শরীরে ক্লান্তি ছিল, ছিল মনেও ক্লান্তি। দুর্ভাবনা কিছুটা কমেছিল অলঙ্কারগুলি শ্রেষ্ঠীকে হস্তান্তরের পর। কিন্তু মন যে নিঃস্ব হয়ে গেছে তা হাঁটতে হাঁটতে টের পেয়েছিল প্রৌঢ়। ভেবে এসেছিল একরকম, হলো অন্যরকম। কিছু তো সেভাবে বলতেই পারেনি। অভিযোগের সমস্তটাই রয়ে গেছে মনের ভিতরে। ভেবেছিল শ্রেষ্ঠীকে বলবে কার্তিককুমারের কথা। যুদ্ধ থেকে না ফেরা সৈনিকের পুত্রীকে রক্ষা করার দায় তো রাজারই। রাজকর্মচারী তাকে অপহরণ করতে চায়, এর কি কোনো প্রতিবিধান নেই অবন্তী দেশে? তার পুত্রটি যে অবন্তী দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়ে নিরুদ্দিষ্ট, এই কথা রাজার কানে কি পৌঁছেছে? খোঁজ হবে না কার্তিককুমারের?

বলতে পারেনি বেশির ভাগটাই। অলঙ্কার দেখে শ্ৰেষ্ঠী এমন আগুন হয়ে উঠলেন। ফিরতে ফিরতে শিবনাথ সত্যিই যেন ভেঙে পড়তে লাগল। মনে পড়ে যাচ্ছিল শ্ৰেষ্ঠীর দাস উতঙ্কের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ‘প্রভু’ সম্বোধন। ধ্রুবের বয়স্য সুভগ দত্তকে ‘প্রভু’ ডেকে অভিবাদন। এ জীবনে এমন কখনো হয়নি। মন ভেঙে গেছে। যদি থাকত কার্তিককুমার, যদি থাকত ধ্রুবপুত্র, এমন দুর্বিষহ কি হতো এ জীবন? হায়! সে ধনবান না হতে পারে, জীবন তো পূর্ণই ছিল। আজ জীবনের সব পূর্ণতা হারিয়ে নিঃস্ব পিতামহ ফিরছে, তা কি জানে গন্ধবতী? এমন নিঃস্বতা এ জীবনে আর কখনো অনুভব করেনি প্রৌঢ়।

শিপ্রাতীরে মঙ্গলনাথের মন্দিরের কাছে পৌছে থেমেছিল সে। সূর্যদেব তখন গগনমন্ডলের পশ্চিমে ঢলেছেন মাত্র। তাঁর তেজ, দীপ্তি অতীব প্রখর। রৌদ্রে যেন সর্ব অঙ্গ ভস্ম হয়ে যাবে, এমনই ছিল সেই সূর্যের রোষ! সে বসেছিল নদীতীরে। দেহটি ছেড়ে দিয়েছিল পিপুল গাছের ছায়ায়। দু’ চোখে তখন শুধুই শূন্যভাব। ঊরু, হাঁটু ভেঙে তার ভিতরে মুখখানি রেখে চেয়েছিল নদীর শূন্যতায়। জলের চিহ্ন অনেক দূরে। শুধু বালি আর বালি। সকালে দেখেছিল গ্রামবধূরা বালি খুঁড়ে জল সংগ্রহ করছে,  এখন তারা কেউ নেই। রোদে পুড়ছে নদীর বুক। দেখে মন হু হু করে উঠেছিল। অবন্তী দেশ নিঃস্ব হয়ে গেছে। কার্তিককুমার নেই, নেই ধ্রুবপুত্র। মেঘ নেই, ফসল নেই, মানুষের মনে ভালবাসা নেই, চোখে মায়া নেই, আছে শুধু আগুন। শ্রেষ্ঠী কেমন জ্বলে উঠলেন অলঙ্কারগুলি দেখে! শিবনাথের চোখে জল এসে গেল। সে বীর কার্তিককুমারের পিতা। ধ্রুবপুত্রকেও পালন করেছে সে। সমস্তজীবন কঠোর পরিশ্রম করেছে। নিজ হাতে ফসল কেটেছে। নিজ হাতে ফসল রোপণ করেছে, বীজ বুনেছে। কোনোদিন কারো দুয়ারে দাঁড়ায়নি দু’ মুঠি অন্নের জন্য। সেই কিনা ‘প্রভু উতঙ্ক’ বলে সম্বোধন করল শ্ৰেষ্ঠীর দাসটিকে। দাসী কিনা তাকে প্রহার করল প্রায়। ধ্রুবের বয়স্যর কাছে মাথা নামাতে হলো ‘প্রভু’ ডেকে। কাঁদছিল শিবনাথ। হু হু কান্নায় বুক ভিজে যাচ্ছিল প্রৌঢ়ের। কতদিনের কান্না যে জমা হয়ে আছে তার বুকের ভিতরে। এই অশ্রুপাত তো গৃহে সম্ভব নয়। সেখানে সে যেন বটবৃক্ষের ছায়ায় ঢেকে রেখেছে পুত্রবধূ আর পৌত্রীকে। রেবা তো কাঁদেই গোপনে। তা কি সে বোঝে না? গন্ধবতীও কাঁদে নিঃশব্দে, আড়ালে, গম্ভীরার শরবনে গিয়ে এ খবর কি তার অজানা? অজানা ছিল তার নিজের কান্নার খবর। শিবনাথ জানতই না সে কত কান্না ধরে রেখেছে গোপনে। মানতই না কান্না আছে অকালপ্রয়াত ধ্রবসখার জন্য, হারিয়ে যাওয়া পুত্রের জন্য, নির্বাসিত ধ্রুবপুত্রের জন্য, ফসলহীন জমির জন্য, জলশূন্য শিপ্রানদীর জন্য, পুড়ে যাওয়া মাটি, আকাশ, পৃথিবীর জন্য, কুয়োর জলের জন্য, বসন্তের ফুলের জন্য, বাতাসে ভেসে বেড়াত যে ফুলের গন্ধ তার জন্য, হারিয়ে যাওয়া ভ্রমর, মৌমাছির জন্য, বহুদিন না দেখা মেঘের জন্য, দুর্বৃত্ত উদ্ধবনারায়ণের বাসনার জন্য।

সব শ্রীহীন হয়ে গেছে। অবন্তী দেশ আজ রূপহীন। শিবনাথের দু’চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল ঝরে যেতেই থাকে। ধ্রুবপুত্রের কথা মনে পড়ে যায়। কার্তিককুমারের কথা মনে পড়ে যায়। এ জীবন যে এমন হয়ে যাবে কে জানত? শ্রেষ্ঠীর দাসকে প্রভু সম্বোধন করতে হবে। নদীতীরে বসে সে একা কেঁদেই যাচ্ছিল। কতক্ষণ বসেছিল এইভাবে তা তার খেয়াল ছিল না। এর মধ্যে কি ছায়া বড় হয়েছে পূর্বদিকে? সূর্যদেব পশ্চিমে আরো নেমে গেছেন? কে জানে? তার পিঠে হাত পড়তেই সে চমকে উঠেছে, কে এল? সেই উতঙ্ক? নাকি উদ্ধব? উদ্ধব কি আবার চলেছে গন্ধবতীর উদ্দেশে? ফিরতেই দেখল দশার্ণ দেশীয় সেই যুবক।

তাম্ৰধ্বজ বিষণ্ণ হয়েছে শিবনাথকে কাঁদতে দেখে, জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
আপনি?
এই তো আচার্যের আশ্রম সন্নিকটে, এই নদীঘাটেই না একদিন দেখা হয়েছিল আপনার সঙ্গে, মনে নেই?
শিবনাথ চুপ করে থাকল। অনেকদিন তাম্ৰধ্বজ গম্ভীরা যায়নি। তার গণনা কি শেষ হলো? মাঘের শেষের পর ফাল্গুন গেল, চৈত্রও ফুরিয়ে এল প্রায়। সম্পূর্ণ জানা গেছে কি কারা কোথায় আছে?
তাম্ৰধ্বজ বলল, গন্ধবতী এবং মা রেবার কুশল তো?
শিবনাথ ভাবছিল উদ্ধবের কথা বলবে কিনা। তাম্ৰধ্বজের কী ক্ষমতা যে রাজকর্মচারীকে নিবৃত্ত করবে? আর এসব তো বহুজনকে জানানোর কথা নয়। সে জবাব দিল না।
তাম্ৰধ্বজ বলল, আমি যাব যাব ভাবছিলাম।
খুঁজে পেয়েছেন তাদের?
তাম্ৰধ্বজ বলল, আপনি কি ফিরবেন?
ফিরছি।
চলুন, আজ না গেলে হবে না, আপনি কাঁদছিলেন কেন?
শিবনাথ বিষন্ন মুখে হাসল, তারা তো কেউ ফিরল না।

দশার্ণ দেশীয় জ্যোতির্বিদকে নিয়ে ফিরে আসছিল শিবনাথ। তাম্ৰধ্বজকে পেয়ে একটু নিশ্চিন্তও হয়েছে যেন। হোক সে জ্যোতির্বিদ, অনাত্মীয়, স্বল্প পরিচিত এবং ভিনদেশী, তবু তো সে যুবক। উদ্ধবনারায়ণ তার সামনে একটু সামলে নেবে নিজেকে। তাম্ৰধ্বজ খুব স্বাস্থ্যবান পুরুষ নয় বটে, শিবনাথ ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল, কিন্তু বলহীন বলেও তো মনে হয় না। গায়ের উত্তরীয় সম্পূর্ণ আবৃত করে নেই তার উর্ধ্বাঙ্গ, প্রথম দর্শনে শীর্ণকায় মনে হলেও ভাল করে দেখলে বোঝা যায় শক্তপোক্ত দেহ। পেশীগুলি প্রকট না হলেও, নবীনতা আছে তার আভাসে। তাম্ৰধ্বজ যতটা কৃষ্ণকায় বলে ধারণা ছিল শিবনাথের এখন তা মনে হচ্ছে না। তামাটে বর্ণের পুরুষ। পুরুষ কৃষ্ণবর্ণের হোক, আর গৌরবর্ণের হোক কী যায় আসে? তার স্বাস্থ্য, শৌর্য, তার জ্ঞানই তাকে বিশিষ্ট করে তোলে। নিষাদের মতো কুঞ্চিত কেশ কত ঘন। চক্ষু দুটি কেমন উজ্জ্বল। আহা এ কে? মহাকাল একেবারে অনাথ করেন না কাউকে। কার্তিককুমার, ধ্রুবপুত্র কেউ নেই, কিন্তু এই যুবক তো আছে। এই যুবক ক্রমশ তাদের সহায় হয়ে উঠছে ও যেন। শিবনাথ ভাবছিল উদ্ধবের কথাটা প্রকাশ করবে কিনা। আচার্য বৃষভানু কি বলতে পারেন না  রাজাকে? তাম্ৰধ্বজ কি পারে না? রাজা কি আসেন না বৃষভানুর আশ্রমে?

শিবনাথ বলল, সকালে গিয়েছিলাম উজ্জয়িনী, এই ফিরছি।
সে কী! আপনার খাওয়া হয়েছে কি?
সূর্যাস্তের আগেই পৌঁছে যাব গম্ভীরা।
তাম্রধ্বজ বলল, আশ্রম থেকে অনেকটা চলে এসেছি, ইস, আমিই ভুল করেছি, সমস্ত কথা জিজ্ঞাসা  করতে পারতাম, আপনি কাঁদছিলেন কেন?
শিবনাথ মদ গলায় বলল, একা হলে মানুষ কাঁদে না?
তা কেন হবে, মানুষ নিবিষ্ট হয়।
যার কান্না থাকে বুকের ভিতরে?

আমি তো সেই কথাই জিজ্ঞেস করছি, আচ্ছা থাক, আপনি ক্ষুধার্ত অথচ আমি তা জানতে পারলাম না, খুবই অন্যায় হয়েছে এটি, না জানতে পারা আমার অক্ষমতা মশায়,  মাথা ঝাঁকাতে লাগল তাম্রধ্বজ, ছি, ছি, আমি নিরুদ্দিষ্ট গ্রহ তারার কথা জানতে চাই, মানুষের ক্ষুধা, তৃষ্ণা অনুধাবন করতে পারি না।

শিবনাথ আবেগাকুল হয়ে ওঠে তাম্ৰধ্বজের কথায়। তারা পথের ধারে একটি আমগাছের নীচে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। গাছটিতে মুকুল ধরেছিল, কিন্তু ঝরে পড়ে গেছে ধুলোয়। শিবনাথ তা দেখতে দেখতে তাম্ৰধ্বজের হাত চেপে ধরল, এমন কথা কেউ বলে না। চারধারে সব দুর্বৃত্ত, আমার অভ্যাস আছে, গৃহে ফিরে যা পারি খেয়ে নেব, আর উজ্জয়িনী থেকে ফেরার সময়ে একটি গৃহদ্বারে দাঁড়িয়েছিলাম  জলের জন্য, কে জানে কেন একবাটি পরমান্ন দিল আমাকে।

কথাটা সত্য বলল না শিবনাথ। কিন্তু অসত্য না বললে তো এই তাম্ৰধ্বজ শান্ত হবে না। মনে মনে পীড়িত হতেই থাকবে। অথচ তাম্ৰধ্বজ যেভাবে তাকিয়ে আছে তাতে তার মনে যে সন্দেহ জেগেছে, তা বোঝা যায়। শিবনাথ প্রসঙ্গ বদলে নিতে চায়, বলল, আপনি কি এই পথে কোনো অশ্বারোহীকে যেতে দেখেছেন?

কখন?
সকাল থেকে এখন পর্যন্ত।
কার যাওয়ার কথা?
কথা নেই কোনো, মশায় সত্য বলি, রাজসত্রীকে চেনেন?
রাজসত্রীকে কে না চেনে? আর সে তো এই পথেই বিচিত্র বেশে গম্ভীরার দিকে চলে যায় ক্ষুদ্র অশ্বটিতে চেপে, ফিরেও আসে। অবাক লাগে লোকটাকে দেখলে। মাঝেমধ্যে অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায়ও থাকে মনে হয়। তাম্ৰধ্বজ কোনোদিন তার কাছাকাছি যায়নি। যেতে প্রবৃত্তি হয়নি তার।
তার কি যাওয়ার কথা ছিল?  আবার জিজ্ঞেস করে তাম্ৰধ্বজ।
না, না, গেছে কিনা জিজ্ঞেস করছি। শিবনাথ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। আসলে এই প্রসঙ্গ অবতারণার ঔচিত্য বোধ নিয়ে তার ভিতরে সংশয় তৈরি হয়ে যাচ্ছে। তাম্ৰধ্বজও অতি সুভদ্র। কিছুটা আন্দাজ করে সেও কোনো কৌতূহল প্রকাশ করে না। যদি ইনি তার উপর নির্ভর করেন, তবে নিজে থেকেই সমস্ত কথা বলবেন, তেমন কিছু বলার থাকলে। কৌতূহল প্রকাশে এঁকে বিব্রত করা হবে শুধু ।
হাঁটতে হাঁটতে অবসন্ন হয়ে পড়ছিল শিবনাথ। এই বয়সেও শরীর যে যথেষ্ট পোক্ত তা ধরা যাচ্ছে, কিন্তু ক্ষুধার ঘুম ভাঙছে ভিতরে ভিতরে। এর হাত থেকে রেহাই পেতে একে ভুলতে হবে। না ভুললে ক্ষুধা তাকে যাতনা দেবে। অধিকার করে নিয়ে নিশ্চল করে দেবে। শিবনাথ মৃদুস্বরে বলল, শুনেছি সূর্যই মেঘের স্রষ্টা, মেঘ জলপূর্ণ করে ধরিত্রী, সূর্য আবার সেই জল শোষণ করে জলহীন করে দেয় জগৎ সংসার।

এইই তো সত্য।
যে জল গ্রহণ করেছেন সূর্যদেব, তা মেঘ হয়ে অবন্তীর আকাশে তো আসবে?
আসাই তো স্বাভাবিক।
স্বাভাবিক ঘটনা তো ঘটছে না, যা ঘটছে তা ঘটার কথা নয়।
জানি। তাম্ৰধ্বজ ফিসফিস করল, উজ্জয়িনীর সিংহাসনে নাকি দাগ পড়েছে?
সত্য? শুনেছি একথা।
অস্বাভাবিক ঘটনার তো সত্য হতে বাধা নেই।
শিবনাথ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, দেশ যদি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে, আকাশে মেঘ এলেও বৃষ্টি হয় না, বজ্রপাত হবে, গর্জন শোনা যাবে মেঘের, কিন্তু রাজার অবর্তমানে জল নামবে না আকাশ থেকে।

কে বলেছে?
শুনেছি আমি, আর মনেও হয় এসব যেন সত্য, রাজা যদি সিংহাসনের মর্যাদা না রাখেন, রাজা যদি না থাকেন রাজার মতো, মানীর মান থাকে না, ভৃত্যকে তখন প্রভু সম্ভাষণ করতে হয়, নবীনের কাছে প্রবীণ হেয় হয়।
তাম্ৰধ্বজ তাকায়, কী হয়েছে আপনার? কেন গিয়েছিলেন নগরে?
শিবনাথ বলে, রাজা না থাকলে মানুষের মনে আনন্দ থাকে না, উদ্যানে ফুল থাকে না, বসন্তে কোকিল ডাকে না, ভ্রমর দেখা যায় না ফুলে ফুলে।
হতে পারে তা, কিন্তু রাজা তো আছেন এদেশে।
রাজা থাকলে কি রাজকর্মচারী...। শিবনাথ থেমে যায়। তার চোখে তাম্রধ্বজের চোখ। তাম্রধ্বজ যেন টের পেয়ে গেছে কী বলতে চায় শিবনাথ। রাজকর্মচারী মানে সেই উদ্ধব। উদ্ধবের কথাই তো জিজ্ঞেস করছিল গন্ধবতীর পিতামহ। কী করেছে সে?
শিবনাথ বলল, রাজকর্মচারী স্বাধীন হয়ে যায়, অত্যাচার শুরু করে।
সে তো রাজা থাকলেও হয়।
হলে প্রতিবিধান চাওয়া যায়।
এখন কি তা হয় না, আপনি যাবেন রাজা ভর্তৃহরির কাছে?
শিবনাথের চোখে আবার জল এসে গেল। মনে পড়ে গেল প্রভু উতঙ্কের সামনে হাঁটুমুড়ে বসে এক প্রৌঢ়। প্রভু সুভগ দত্তের সামনে মাথা নত করে এক প্রৌঢ়। এরপর হয়ত উদ্ধবের পা ধরতে হবে তাকে। দেশে রাজা থাকলে এমন হতো না। রাজা না থাকলে মানুষ এমন অসহায় হয়ে যায়। রাজা যদি থাকে এদেশে ধ্রুবপুত্র কেন নির্বাসিত হবে উজ্জয়িনী থেকে? কার্তিকুমারের কেন খোঁজ হবে না?
তাম্রধ্বজ আবার জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে?
শিবনাথ বিড়বিড় করে, রাজা না থাকলে নদী জলহীন হয়, কূপ জলহীন হয়, আকাশ  জলহীন হয়, হৃদয় অনার্দ্র হয়, উদ্ধবকে আমিই পাঠিয়েছিলাম নগরে, শ্রেষ্ঠীর শরণাপন্ন হতে আমিই পরামর্শ দিয়েছিলাম একদিন।
তাম্ৰধ্বজ দুটি হাত বাড়িয়ে প্রৌঢ়ের দুই স্কন্ধ স্পর্শ করল, গর্জন করে ওঠে, কী হয়েছিল, বলুন, বলুন আমাকে।
আপনি জানেন না, জলহীন নদী, তৃণহীন অরণ্য, মেষহীন মেষপালক, আলোকহীন দুটি চক্ষু--এসবই দেখা যায় রাজার অবর্তমানে, শুনুন জ্যোতির্বিদ, আপনি ধ্রুবপুত্রর সন্ধান দিন আমাকে, না হলে গন্ধবতী মা-র সব্বেনাশ হয়ে যাবে।

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব কুড়ি)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একুশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বাইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁচিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছাব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাতাশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আটাশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top